-
দিদি
আমাদের বাড়ির উঠোনে যে রক্তকরবী গাছটা রয়েছে
দিদি ছিল ঠিক সেইরকম।
রক্তকরবীর মতোই টকটকে সুন্দরী।
ঠাকুমা তাই রক্তকরবীর সাথে মিলিয়ে নাম দিয়েছিলো করবী।
আর বাবা ডাকতো বুড়ি।
আমি যেদিন জন্মালাম সেদিনই মায়ের আয়ু ফুরোলো।
সবাই যখন আমায় অপয়া বলে আতুর ঘরে ফেলে রাখলো দিদি তখন কোলে তুলে নিলো।
তখন দিদি খুব ছোট।
কিন্তু অল্পদিনেই আমার মা হয়ে উঠলো।
ধীরে ধীরে আমি যেন দিদির খেলার পুতুল হয়ে গেলাম।
পুতুল হাসলে দিদির চোখ খুশিতে
চিকচিক করে উঠতো আর কাঁদলে
দিদি ও কেঁদে বুক ভাসাতো।
ঠাকুমা সব দেখতো আর বলতো,”পাগল মেয়ে একটা!দুদিন বাদে যাকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে তার এতো মায়া বাড়িয়ে কি লাভ?”
দিদির মুখে তখন মেঘ জমতো,চোখ দুটো
হতো আগুন লাল।
আর আমি তারস্বরে চেচিয়ে উঠে বলতাম,”দিদিকে আমি কোথাও যেতে দিবোনা,যে নিয়ে যাবে তাকে গুলি করে মারবো!,তোমার মুখে নিমপাতা পড়ুক!”
কথা শুনে ঠাকুমা হেসে গড়িয়ে পড়তো।
আমি আর দিদি মিলে সারাদিন খুব মজা করতাম।
সারা গ্রামে টইটই করে ঘুরে বেড়াতাম।
পুকুরে স্নানের সময় গামছা দিয়ে ছেঁকে পুটি মাছ ধরতাম।
অন্যের গাছ থেকে কাঁচা আম চুরি করে এনে
নুন মরিচ মেখে খেতাম।
রেলগাড়ি যখন কালো ধোয়া ছেড়ে হুস করে বেড়িয়ে যেত
আমরা তখন রেলগাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াতাম।
কত মধুর ছিলো সেই দিনগুলো!
একদিন বিকেলে দিদি যখন সবে সুগন্ধী তেলের শিশি নিয়ে আমার মাথায় তেল দিতে বসলো,বাবা এক হাড়ি মিষ্টি নিয়ে এসে ঠাকুমার হাতে দিলো।
দিদির নাকি বিয়ে পাকা হয়ে গিয়েছে!
কিন্তু কি আশ্চর্য! দিদির মুখ সেদিন ভার হলোনা,চোখ লাল হলোনা।
তার দিন দশেক পরে এক গোধূলী লগ্নে ঠাকুমার মুখে ফুলচন্দন পড়লো।
দিদি সেদিন লাল বেনারসী তে সাজলো ।
কপাল জুড়ে আঁকা হলো কুমকুমের আল্পনা।
ঠিক যেন সত্যিকারের রক্তকরবী ফুল!
জন পঞ্চাশেক বরযাত্রী নিয়ে পালকিতে চড়ে দিদি শ্বশুরবাড়ি চলে গেল।
তীব্র অভিমানে আমি সেদিন দোর লাগিয়ে অনশন করেছিলাম।
দিদি যাওয়ার সময় বন্ধ দোরের বাইরে থেকে বলে গিয়েছিলো,”খুকু! আমার উপর অভিমান করিসনা।লক্ষী মেয়ে হয়ে থাকবি।আমি কয়েকদিন পরে নাইওর আসবো।”
সেই কয়েকদিন শেষ হলো দেড় বছর পরে।
দিদি সারা জীবনের জন্য বাপের বাড়িতে নাইওর চলে আসলো।
ততদিনে দিদির কোল জুড়ে একটা ছোট্ট পুতুল এসে গেছে।
দিদির মেয়ের যেদিন মুখেভাতের অনুষ্ঠান সেদিন জামাইবাবু গলায় ভাত আটকে ঈশ্বরের কাছে চলে গেলেন।
দিদির শ্বশুর,শ্বাশুড়ী ছেলের শেষকৃত্য শেষ হতে না হতেই বউমা আর নাতনীকে ঘর থেকে নামিয়ে দিলেন।
“যে মেয়ের মুখেভাতের অনুষ্ঠানের দিনই তার বাবা মারা যায় সে অবশ্যই অপয়া,বাকি দিন থাকলে আর কাকে কাকে যে গিলে খাবে তার কি কোন ঠিক আছে!”
দিদি এখন সাদা থান পরে।
শিউলি ফুলের সুবাস মাখানো যেন সে থান।
নিরবতা এখন দিদির প্রিয় সঙ্গী।
ইদানীং ছোট্ট পুতুলটাকেও কাছে ঘেষতে দেয়না।
কি জানি! দিদি ও কি তবে পুতুলটাকে অপয়া ভাবে?
আমার এখন অনেক দায়িত্ব।
পুতুল এখন মাসি বলতে অজ্ঞান।
মাসি ছাড়া একদন্ড ও তার চলেনা।
অনেক বছর আগে অপয়া ভেবে ফেলে রাখা মেয়েটিকে যে কোলে তুলে নিয়েছিল তারই মেয়েকে আমি ফেলে রাখি কি করে?2 Comments
Friends
mr.architect
@mr-architect
Halima-Moly
@halima-moly
Md. Nur Alam (এইচ. এম নুর আলম)
@nuralam
Drako Shajib
@drako
আল রিফাত শাওন
@shawon980
সুশান্ত সরকার
@sushanto
[email protected]
@mhrmesbah6gmail-com
onindomuhib
@onindomuhib
Bobita Khatun
@boby



অনবদ্য লাগলো লেখাটি! শুধু দিদির জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল শেষে।