-
অদৃশ্য লাল দাগ-২
ঠিক এগারটায় নীলাদ্রির বাসায় এসে উপস্থিত হলো দেবস্মিতা।কলিং বেল টিপতেই নীলাদ্রি দরজা খুলে দিলেন।মুখে স্বাভাবিক হাসি টেনে বললেন,”কেমন আছিস মা?”দেবস্মিতা ভেতরে ডুকতে ডুকতে বললো,”শরীরটা ভালোই আছে আঙ্কেল।তুমি কেমন আছ?”দু’জনে এসে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসলে নীলাদ্রি বললেন,”আমাদের আর থাকা। আশি পেরিয়ে চাইলেই কি আর ভালো থাকা যায়রে মা?”দেবস্মিতা নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে বললো,”তোমার কি শরীর খারাপ?”
——– এখন মোটামুটি ভালোই আছি।বল কেন এত জরুরীভাবে ছুটে আসলি?
——– তেমন কিছু না।আসলে আদি সম্পর্কে তোমার থেকে কিছু জানতে চাইছিলাম।
——— আদি সম্পর্কে আর কি বলবোরে মা? এ সময়ে এমন ছেলে হয় না।যেমন ভদ্র,তেমনি মেধাবী।ওর সততা নিয়ে কেউ কোনদিন প্রশ্ন করতে পারেনি,ভবিষ্যতেও পারবে না।ভীষণ সাহসি আর কেয়ারিং।আর ওর চরিত্র? আমারতো মনে হয় চরিত্রের দিক থেকে ও মানুষ নয়,অন্য কিছু।কেন? কিছু হয়েছে?”
———- নাহ্,তেমন কিছু না।তবে গতকাল ওকে নিয়ে বেরিয়েছিলাম।ওর একটূ কাজ আমাকে ভাবাচ্ছে।ভাবনাটা দূর করতেই তোমার কাছে আসা।ওর একটা কাজ আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
নীলাদ্রি স্মিত হাসি হেসে বললেন,”বুঝতে পেরেছি।রাস্তায় গাড়ী থামিয়ে রাস্তার পাশে পাগলীকে যত্ন করার কথা বলছিসতো?”দেবস্মিতা বিস্মিত হয়ে নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে বললো,”তুমি জান এটা?” নীলাদ্রি একটা দীর্ঘাশ্বাস ছেড়ে বললেন,”ওর এই কাজটা আমাদের কাছেও অস্বাভাবিক ঠেকতো।তবে অনেকটূ সময় ওকে দেখতে দেখতে এখন আর লাগে না।তোর বাবাও ওর এ বিষয়টা অবগত।তবে ঠিক কি জন্য ও এ কাজটি করে,এটা আমরা কেউ জানি না।”দেবস্মিতা একটা দীর্ঘাশ্বাস ছেড়ে বলে,”ওকে তুমি কবে থেকে চেন আঙ্কেল?”নীলাদ্রি কিছুটা সময় চুপ থেকে বললেন,”ওর বয়স এখন আটাশ।আমি ওকে গত সতের বছর থেকে চিনি।ওর বাবা আবুল হাসেম আমার ছোট বেলার বন্ধু।ও যখন প্রাইমারী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে শহরে আসে,তখনি ওর মেধায় মুগ্ধ হই।তখনই সিদ্ধান্ত নিই আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনে কিছুটা ছন্দ আনতে ওর দায়িত্ব নেব।যদিও হাসেম প্রথমে রাজী হচ্ছিলো না।পরে আমার স্ত্রী রেহনুমার অনুরোধে রাজী হয়।আর তখন থেকেই আদি আমার এখানে থেকে পড়াশোণা করে।মাঝে মাঝে গ্রামে যেত।থাকতো কিছুদিন।”
দেবস্মিতা উঠতে যাবে,এসময় চা-নাস্তার ট্রে নিয়ে ড্রয়িংরুমে ডুকলেন রেহনুমা রহমান।দেবস্মিতা তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করে বললো,”আন্টি,তুমি কখন এলে? কাল যখন আঙ্কেলকে ফোন করলাম,বললো তুমি অর্পিতার বাসায়।সে জন্যইতো আমি আঙ্কেলের সাথে কথা বলতে বসে গেলাম।নাহলেতো আগে তোমার কাছেই ছুটে যেতাম।”রেহনুমা স্মিত হেসে বললেন,”হুম,বুঝতে পেরেছি।কাল তোর ফোন করার পর তোর আঙ্কেল আমাকে ফোনে তোর আসার কথা জানায়।শুণে অর্পিতাই জোর করে আমাকে পাঠিয়ে দেয়।রাতেই এসেছি।”
——— কেমন আছ তুমি?
——— ভালো।আদির কথা কি যেন বলছিলি?
——— তেমন কিছু না।এই তোমরা যে নিজে থেকে উপযাচক হয়ে আদির সাথে আমার বিয়ে দিলে,কোন রকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কেবলমাত্র কিছু ধর্মীয় রীতি মেনে।এটা কেন করলে,তাই জানতে চাইছিলাম।
——— ওওওও।আসলে এতটা বছর ধরে ছেলেটাকে লালন পালন করে,কাছে থেকে দেখে আমাদের মনে হয়েছে তোর জন্য এর থেকে ভালো পাত্র হয়তো আমরা পাব না।তার উপর ——
———- হ্যাঁ,আন্টি।আমি জানি।গত তিন মাস ধরে আদিকে দেখে বুঝতে পেরেছি,ওর মত মানুষ হয় না।আমার জীবনে ওর মত মানুষ পাওয়া সত্যি ভাগ্যের।তবে আমাকে বিস্মিত করেছে আমাকে বিয়ে করতে ওর রাজী হওয়া।সব জেনে শুণে আমার মত কলঙ্কের কালো দাগওয়ালা একটা মেয়েকে ও কি করে বিয়ে করতে রাজী হলো?আচ্ছা আণ্টি,আমার অতীতটা তোমরা ওকে বলেছিলে?”রেহনুমা মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,”বলেছি।তোর জীবনের এত বড় একটা ঘটনা চাপা দিয়ে সম্পর্ক করতে রাজী হন নি তোর বাবা।”
———- আমার সব কথা শুণেও আদি আমাকে বিয়ে করতে রাজী হলো?
———- হুম।আমার হাত ধরে বলেছে,মা,তুমি যদি মনে কর দেবস্মিতাকে আমার সাথে মানাবে,তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই।ওর অতীত নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।
দেবস্মিতা চা-নাস্তা শেষ করে বললো,”আসলেই ও এক মহান মানুষ।কিন্তু আন্টি ওর কালকের আচরণটা আমাকে ভাবাচ্ছে।মানসিক ভাবে ও সুস্থতো?”রেহনুমা বললেন,”এমনটা আমারও মনে হত।কিন্তু এতটা বছর দেখে এখন আর মনে হয় না।”বাসয় ফিরে কলিং বেল টিপতেই আদি এসে দরজা খুলে দিলো।মৃদু হেসে বললো,”এসেছ? আমিতো ভেবেছিলাম আজ আসবে না।”দেবস্মিতা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত দশটা পেরিয়ে গেছে।কথায় কথায় সারাটা দিন নীলাদ্রি আর রেহনুমা র সাথে কাটিয়ে বিকেলে ফেরার পথে বাবার বাসায় গিয়েছিলো দেবস্মিতা।বাবা-মা আর একমাত্র বোনটার সাথে কথা বলতে বুঝতেই পারেনি,কখন এতটা সময় কেটে গেছে।”আদির দিকে তাকিয়ে বললো,”সরি,আসলে স্বরমিতার সাথে কখা বলতে বলতে একটু দেরী হয়ে গেলো।তোমার কোন সমস্যা হয়নিতো?”আদি মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,”আরে নাহ্,সমস্যা হবে কেন? তুমি চাইলে রাতটা থেকে আসতে পারতে।”
——— খেয়েছ?
——— নাহ্,এখনো খাইনি।তুমি আসছ শুণেই তোমার অপেক্ষা করছি।
——— আমিতো তোমাকে খেয়ে নিতে বলেছিলাম।খাওনি কেন?
——— তোমার সাথে একসাথে খাব বলে।
বিছানা ঠিক করে শুয়ে পড়েছে দেবস্মিতা।আদি পাশে শুয়ে বললো,”কালকের বিষয়টা নিয়ে তুমি খুব চিন্তায় আছ,তাই না?” দেবস্মিতা কোল বালিশটা বুকে চেপে বললো,”কিছুটা চিন্তাতো ছিলোই।তবে আজ অঙ্কেল-আন্টির সাথে কথা বলে সে চিন্তাটা এখন আর নেই।তোমার মত একজন মানুষকে চিয়ে চিন্তা করাটাই ভুল।তুমিতো মানুষ নও।তার থেকেও বেশী কিছু।”আদি দেবস্মিতার গায়ে হাত দিয়ে বললো,”আরে নাহ্।বাবা-মা একটু বাড়িয়েই বলেছেন।আমিও মানুষ।রক্তে মাংশে গড়া মানুষ।”দেবস্মিতা উঠে বসলো।বললো,”আমার তা মনে হয়না।একজন মানুষ রাস্তার একটা পাগলীকে পরম যন্তে খাইয়ে দিতে পারেনা।একজন মানুষ জেনে শুণে কলঙ্কের কালির দাগে পূর্ণ একটি মেয়েকে জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে পারেনা।”
দেবস্মিতার চোখ ছলছল করছে দেখে আদি উঠে ওর মুখোমুখি বসে বলে,”এসবই প্রমাণ করে আমি মানুষ।মানুষ বলেই এ সব করতে পারি আমি।নাহলে পারতাম না।”দেবস্মিতা আদিকে জড়িয়ে ধরে বলে,”আমাকে তুমি মাপ করে দাও।আমি তোমাকে চিনতে পারিনি।তোমার মত মহান মানুষ সম্পর্কে না জেনেই আমি…।”আদি দেবস্মিতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো,”পাগলি।তোমার এই কিউরিওসিটি ইতো মানুষের সহজাত।এটাইতো তোমাকে মানুষ চেনাতে শেখাবে।এটাতো দোষের কিছু নয় যে ক্ষমা চাইতে হবে।আর কি বললে কলঙ্কের কাল দাগ? দাগটা কেবল কালোই হয় না।লাল দাগও হয়।মানুষের জীবনে এমন দাগ থাকাটা স্বাভাবিক।এটা নিয়ে ভাববারতো কিছু নেই।তোমার জীবনের দাগটি তোমার কাছে দৃশ্যমান বলেই তুমি এ নিয়ে ভাবছ।কিন্তু আমার জীবনেওযে এমন দাগ থাকতে পারে তা তোমার মাথায় আসছে না।কারণ আমার জীবনের দাগটা তোমার কাছে অদৃশ্য।কিন্তু আমিতো জানি আমার জীবনেও দাগ আছে।রক্তের মত লাল দাগ।যে দাগটা অনেকের কাছে অদৃশ্য।কেন অদৃশ্য জান? কারান আমার মানুষ হয়ে উঠা।আমি যদি মানুষ হতে না পারতাম তবে আমার জীবনের দাগটিও দৃশ্যমান হতো।”দেবস্মিতা বিস্মিত কণ্ঠে বলে,”তোমার জীবনে দাগ?আমি বিস্বাস করি না।”আদি অন্যমনস্ক হয়ে বলে,”তুমি বিশ্বাস না করলেও এটা সত্য।আমার জীবন জুড়ে রয়েছে এক অদৃশ্য লাল দাগ।যে দাগ আমাকে মানুষ হতে সাহায্য করেছে।”4 Comments
Friends
Ashik Mokami
@ashikmokami
Drako Shajib
@drako
Dipankar Shuva
@dipu42dramagmail-com
Hridoyesh Nashit
@hrnashit
bithy 123 bithy
@bithy123bithy
সারোয়ার -ই-কায়নাত
@mohammadsarwar-ekaynat
মো: নাজমুল আখতার
@faith
Poly Alam
@butterflywords
Masfi K
@masfi-mohammad



অসম্পূর্ণ রয়ে গেল ।