-
রজনি ফুরায়ে যায়
মা, ও মা খেতে দাওতো খুব খিধে পেয়েছে। ঘরে ঢুকেই বলে ওঠে উসমান। সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষ এ ক্লান্ত সে। ভিতর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে উসমানের মা, চোখে মুখে বিস্তর চিন্তার ছাপ। এত রাত করে বাড়ি ফিরলি যে, প্রতিদিন এত রাত করে বাড়ি ফিরিস বাবা চিন্তা হয়তো। অনুযোগের সুরে কথা গুলো বলে উঠে উসমানের মা।
কি করবো মা বলো, আজকাল কাজের চাপ বেশি থাকে, তাছাড়া রাতের বেলা কাজ করলে টাকাটাও বেশি পাওয়া যায়, তুমি চিন্তা করো না, এইতো মাত্র কয়েকটা দিন তারপর আর রাতে কাজ করবোনা।
এবার কিছু খেতে দাওতো খুব খিদে পেয়েছে।
আচ্ছা বাবা যা তুই হাত মুখ ধুয়ে নে, খাবার তোলাই আছে গরম করে দিচ্ছি।
বাবাহীন এক পংগু সংসার উসমানদের, এই তো কয়েক মাস আগেই মারা গেলো তার বাবা। সংসারের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেনি মানুষটা। তাইতো বাধ্য হয়ে কলেজের পাট চুকিয়ে কাজে নেমে পরেছে উসমান। সারাদিন হাড় ভাংগা খাটুনি আর দিনশেষে বাসায় এসে মায়ের সাথে খেতে খেতে খানিকটা গল্পগুজব। এইতো দিন পার হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে মাঝে মাঝে কোনো বিজ্ঞানির ল্যাব এ থাকা রোবট এর মত মনে হয় উসমানের। সকালে উঠে সুইচ অন করে দাও সারাদিন চলবে রাতের বেলা সুইচ অফ ব্যাস। মাকে যে একটা শাড়ি কিনে দেবে সেই উপায় ও নেই, সেই কবে থেকে এক জরাজীর্ণ শাড়ি একমাত্র সম্বল তার মায়ের। মায়ের দিকে তাকালে দুঃখে মন কেদে উঠে তার, জীবনের সমস্ত রস যেনো শুষে নেওয়া হয়েছে তার মায়ের মুখ থেকে, কেমন যেনো প্রানহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সবসময়। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা কেমন যেনো নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন, নিজের চারিধারে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব এক জগত। খ্যাতা পুরি শালা এমন জীবনের। মুখ ধুতে ধুতে কথা গুলো বিড় বিড় করে বলে উঠে উসমান।খাবারের আয়োজন খুব বেশি নয়, আটাশ চালের ধোয়া উঠা ভাত, আলু ভাজি, কলমি শাক। সারাদিনের পরিশ্রমের কারণেই হোক অথবা মায়ের হাতের জাদুর কারণেই হোক। ভাতের প্রথম নলা মুখে দিতেই উসমানের মনে হলো সে অমৃত খাচ্ছে। আহা। অপুর্ব। মনে মনে বলতে থাকে সে।
কিরে খাওয়ার সময় ওমন কি বিড় বিড় করছিস বাবা, মন দিয়ে খা তো।
উসমান হতচকিত হয়ে পরে। বিষয় টা সামাল দিতে সে বলে উঠে, মা তুমি খেয়েছো? কই তোমার প্লেট তো দেখছিনা।যাও প্লেট নিয়ে এসো দুই মা ছেলে মিলে একসাথে খাই।
নারে বাবা তুই খেয়ে নে, আমার টা তোলা আছে আমি পরে খাবো এখন তুই আরাম করে খা তো, তুই আরাম করে খাচ্ছিস সেটা দেখতে খুব ভাললাগে বলেই মিটি মিটি হাসতে থাকেন উসমানের মা।
সন্দেহের ছোট্ট দানা উকি দেই উসমানের মনের কোণে। তার স্পষ্ট মনে হলো মা তার থেকে কিছু লুকাচ্ছে। কথা গুলো বলার সময় মায়ের চোখের পলক গুলো খুব দ্রুত উঠানামা করছিলো। বিষয় টা চোখ এড়ায়না উসমানের।
মা, সত্যি তোমার খাবার তোলা আছে তো।
আরে হ্যা রে বাবা, তুই চিন্তা করিসনা তো অনেক বেলা হয়ে গেলো, খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যা কাল সকালে উঠে আবার কাজে যেতে হবে।
উসমান আর কথা না বলে, খাওয়া শেষ করে উঠে পরলো, তবে একটা চিন্তা তার মাথায় বার বার খোচা দিয়েই যাচ্ছিলো।
গভীর রাত,
উসমানের ঘুম ভেংগে গেছে, তবে কি কারণে তার ঘুম টা ভাংলো এখনো বুঝে উঠতে পারছেনা সে। হঠাৎ তার কানে আসে কিছু শব্দ কেও যেনো কিছু একটা চাবাচ্ছে, একটু ভালো করে কান পাতলো উসমান, হ্যা তাইতো চাবানোর শব্দ। ব্যাপার টা কি দেখতেই বিছানা থেকে সন্তপর্ণে নেমে, এগুতে থাকে সে শব্দের উৎস লক্ষ করে। শব্দ টা রান্না ঘর থেকে আসছে। রান্না ঘরে ঢুকে তাকাতেই সে থমকে গেলো, তার মা রান্নাঘরের মেঝে তে বসে কিছু একটা চিবোচ্ছে, পাশেই একটি গ্লাসে পানি ও দেখতে পেলো সে। উসমান তখন রিতীমত হতভম্ব, ব্যাপার টা কি এই রাতের বেলা মা রান্নাঘরে এসে কি চিবোচ্ছে। আর সহ্য করতে পারলোনা উসমান।
মা ও মা, কি ব্যাপার বলোতো, তুমি এতরাতে এখানে কি করছো।
চমকে উঠে উসমানের মা, ছেলের এমন আচানক উপস্থিতি আশা করেননি তিনি। খানিক্ষন নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে বললেন, খুব খুধা লাগসে রে বাবা, আইজ সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি, পেটে টান দিতাসে। তাই একটু কয়টা শুকনা চাল চিবাইয়া পানি খাইতেসি, এতে খুধা মিটে ভালো। একমুঠ চাল আর এক গেলাস পানি ব্যাস পেট ঠান্ডা।
উসমান কি বলবে বুঝতে পারছিলোনা, তার হাটু কাপছে। মা এসব কি বলছে। অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে সে, ক্যান মা তুমি যে বললা তোমার জন্য ভাত তোলা আছে পরে খাইবা। ভাত খাইলেই তো পারতা। চাল খাইতেসো কেন। অমন শক্ত চাল।
মাথা নিচু করে থাকেন উসমানের মা, ছেলের প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই। ভাত খাবে কি করে তিনি, ভাত তো যা ছিলো সবই ছেলের পাতে তুলে দিয়েছেন, চাল ও ছিলো অল্প। অল্প এক মুঠ চাল রেখে দিয়েছিলেন রাতে পানির সাথে খাবেন তাই। ছেলেটা সারাদিন বড্ড পরিশ্রম করে, খুধার্ত থাকে খুব। ছেলে জানলে তখন আর সবটা ভাত খেতোনা। তাই ইচ্ছে করেই মিথ্যে বলতে হয়েছে উসমানের মা কে। তিনি ধারনাই করেননি ছেলে এত রাতে এসে উপস্থিত হবে রান্নাঘরে।মায়ের জবাবহীন জবান দেখে সবটা বুঝে নিতে আর কষ্ট হয়না উসমানের। বুক ফেটে কান্না আসতে থাকে তার। তার মা এত সুন্দর অভিনয় শিখলো কিভাবে। চিৎকার করে কাদতে ইচ্ছে হয় তার। আর সহ্য করতে পারেনা সে, ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাদতে থাকে উসমান। মা তুমি আমারে বলনাই কেন মা, তুমি এভাবে না খাইয়া কষ্ট পাইতাসো আমারে বলোনাই কেন। তীব্র অভিযোগ ফেটে পরে উসমানের গলায়।
পরম মমতায় উসমানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে থাকেন উসমানের মা, আরে বোকা ছেলে কানতাসোস ক্যান, আমার তো প্যাট ভইরা গেছে রে। একদিন না ভাত খাইলে কিচ্ছু হয়না। তুই অত কষ্ট করিস সারাদিন তোর তো ভাত খাওয়া দরকার। আমার আর কি এতটুকুন একটা প্যাট। বলতে বলতে চোখের কোণে জল চলে আসে উসমানের মায়ের ও।রজনীর অন্ধকার গভীর থেকে গভীর তম হচ্ছে। অন্ধকার রজনীর মাঝে যেনো এক সর্গীয় দৃশ্যের অবতারনা হয়েছে। মা-ছেলে দুজন দুজনাকে জড়িয়ে ধরে ক্রমাগত কেদে যাচ্ছে। অভিমান টা যে বড্ড তীব্র। মৃদু বাতাস বয়ে যায় প্রকৃতির কোল বেয়ে টিপ টিপ বৃষ্টি পরছে। কে জানে বিধাতা ও হয়তো তার দুঃখ প্রকাশ করলেন।
লেখাঃ উসমান।4 Comments
Friends
নন্দিনী
@nandini-chowdhuri
Mahmuda Sultana
@mahmudamahi
Prithula Zaman
@prithula
Shaikh-Mohidul-Islam
@shaikh-mohidul-islam
Md Tashnim Rahman
@wire-taseen
Reza e Rabbi
@rabbi121
Mesbah-Ahmed
@mesbah-ahmed
Rafiq-Ullah
@rafiq-ullah



ভাল লিখেছেন। মায়েরা এমনই হয়। নিজেরা অভুক্ত থেকে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন। আপনার লেখার হাত ভাল। এভাবে চালিয়ে যান। তবে গল্পকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে লেখার শুরুতে টান টান টান একটা আমেজ সৃষ্টি করবেন। যাতে পাঠক লেখার পরবর্তী ঘটনাগুলে পড়তে আরো আগ্রহ বোধ করেন। এখানেই মুন্সিয়ানা করতে পারলে আপনি পাঠকনন্দিত হতে পারবেন। শুভকামনা রইল আপনার প্রতি।