Profile Photo

Md. Nur Alam (এইচ. এম নুর আলম)Offline

  • nuralam
  • স্রষ্টার পরিচয় ও তাঁর গুণকীর্তন
    কাউকে মূল্যায়ন করতে হলে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করতে গেলে তার পরিচয় জানার প্রয়োজন বোধ হয়। স্বাভাবিকভাবেই কারো পরিচয় জানা না থাকলে হয়তো তাঁর মর্যাদার অবমূল্যায়ন হতে পারে।
    কোনো জিনিসের ব্যবহার করতে হলে তার ব্যবহারবিধি, প্রয়োগবিধি জানা একান্ত প্রয়োজন। তা নাহলে সেটির অপব্যবহার বা সঠিক ব্যবহার ব্যাহত হতে পারে। কোনো জিনিসের বিশদ পরিচয় জানলে, ব্যবহারবিধি জানলে তার সঠিক ব্যবহার করা যায়; যথাযোগ্য মূল্যায়ন করা যায়। যেমন কেনো জিনিস ব্যবহার করতে হলে তার অবশ্যই ব্যবহারবিধি জানা প্রয়োজন।
    কারো ব্যাপারে বিশদ পরিচয় জানলে তাঁর যথাযোগ্য মূল্যায়ন করা যায়। ব্যক্তির ব্যবহার, কৃষ্টি-কালচার অবগত হবার পর তাঁর সেই ব্যবহার কৃষ্টি অনুযায়ী গুণকীর্তন করা যায়। সুতরাং কাউকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন, গুণকীর্তন করতে গেলেও তাঁর পরিচয় জানা আবশ্যক। সম্মান ও গুণকীর্তনের বিষয়টি অনেকখানি পরিচয়ের উপরও নির্ভর করে।
    মহান আল্লাহ আমাদের ¯্রষ্টা। সুতরাং এই বিশ্বজাহানের মালিক কে? আমাদের ¯্রষ্টাই বা কে? এই সম্পর্কিত পরিচয় না জানলে আমরা তাঁর যথাযোগ্য মূল্যায়ন তথা দাসত্ব বা গুণকীর্তন করতে পারব না। তাঁর পরিচয় জানবার আগে তিনি তাঁর বান্দাদের উপর গুণকীর্তণের তথা দাসত্বের বোঝা চাপিয়ে দেননি। তিনি নির্মম- নিঠুর নন।
    মহান ¯্রষ্টা আল্লাহকে বিশ্বাস-অবিশ্বাস, স্বীকার-অস্বীকার করতে গিয়ে এই নশ্বর জগতে দুটি দলের সৃষ্টি হয়েছে- আস্তিক ও নাস্তিক। যারা বিশ্বাস করেন, স্বীকার করেন বিশ্বজাহানের একজন ¯্রষ্টা আছেন, নিয়ন্তা আছেন; যিনি এই আসমান-জমীন এবং এই দুইয়ের মাঝে যা আছে সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন। যিনি এই প্রশস্ত যমিনের বাদশাহ, আমাদের পালনকর্তা, খাদ্যদাতা- এদের বিশ্বাসগত দিক থেকে আস্তিক বলা হয়।
    আবার যারা বিশ্বাস করেন-¯্রষ্টা বলতে কোনো কিছু নেই। এই ধরিত্রী-আকাশলোক তার আপন শক্তিতে সৃষ্টি হয়েছে; যাদের বোধ হয় বেহেশত-দোযখ বলতে বৃথা সত্যের সৈনিকদের হৈ- হুল্লোড়, নির্ভীক আহ্বান; যারা তার নিজ সৃষ্টি সম্পর্কে মতবিরোধী। যারা বিশ্বাস করেন- আসমনান-যমিনের সকল জিনিসই আপন শক্তিতে বেগবান, মনুষ্য সেবায় রত; চিরজাগ্রত আপন মহিমায়- তারাই নাস্তিক। তাদের ধর্ম নাস্তিক্যবাদ, তারা নাস্তিক্যবাদ মতাদর্শে বিশ্বাসী।
    নাস্তিকরা বলে, যা দেখা যায়না তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারাই আবার কিছু কিছু বিষয় না দেখেই বিশ্বাস করে থাকেন। যেমন: তারা দেখেন না বাতাস, ফুলের মনমাতানো সৌরভ, মন জুড়ানো বায়ু; যার প্রবাহই সৃষ্টির প্রাণ। তিনি বা তারা কি এগুলো না দেখে বিশ্বাস করবেন? তিনি বা তারা এই পৃথিবীতে যার মাধ্যমে এসেছে সেই গর্ভধারিনী মায়ের প্রসবের সময় কি দেখেছেন কার উদর হতে তার বহির্গমন? তবুও না দেখেই, শুনেই তিনি তার জন্মদাতা মাকে বিশ্বাস করেন। তা নাহলে তার জন্ম নিয়ে সংশয় উপস্থিত হবে যে?
    পিতামাতা ছাড়া সন্তানের জন্ম যদি না হয় তাহলে এই বিশ্বজাহানের সৃষ্টি কীভাবে সম্ভব? বায়ু আছে বলে আমরা অক্সিজেন গ্রহণ করে বেঁচে থাকি, পানি আছে বলেই জীবন ধারণের উপায় খুঁজি, সূর্যেও আলো আছে বলে আমরা প্রাত্যহিক কাজকর্ম সুসম্পন্ন করতে পারি। এই জৈবনিক বিষয়কে নিশ্চয় কেউ অবিশ্বাস, অস্বীকার করবেন না: বিশ্বাস করবেন, স্বীকৃতি দিবেন।
    কোনো যন্ত্রের চালনে যদি ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয়, বিদ্যুৎ সরবরাহে যদি সুইচ এবং পরিচালকের দরকার হয়, কোনো যন্ত্র যদি আবিষ্কর্তা, মিস্ত্রী ব্যতীত তৈরি না হয়, কোনো নষ্ট যন্ত্র সারাতে যদি ম্যাকারের প্রয়োজন হয়, কোনো রোগ সারাতে যদি ডাক্তার- হেকিমের দরকার হয়। কোনো পার্থিব জিনিস যদি মিস্ত্রী- বিজ্ঞানী ছাড়া তৈরি-আবিষ্কার সম্ভব না হয় তাহলে এই বিশ্বজগৎ বিনা মিস্ত্রী- আবিষ্কারক বা পরিচালক ছাড়া আবিষ্কার- তৈরি বা পরিচালনা সম্ভব কি? মোটেই না।
    একটি বাড়ি বানাতে, ঘর তৈরি করে আটকিয়ে রাখতে খুঁটির প্রয়োজন। বিনা খুঁটিতে কোনো ঘর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে কি? অবশ্যই না। ঘর তৈরিতে অবশ্যই বেড়া, দেয়াল নির্মাণ প্রয়োজন তা সবাই একবাক্যে মেনে নিবেন। খুঁটি, সিঁড়ি, বেড়া বা দেয়ালই ঘরটির শক্তি। তোমরা আসমান-যমিনের দেয়াল বা খুঁটি, সিঁড়ি দেখতে পাও কি? তাহলে কোন শক্তির বলে আসমান-যমিন দাঁড়িয়ে আছে? নিশ্চয়ই কোনো শক্তি ব্যতীত এটি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। সেই শক্তিমান আল্লাহর শক্তি অর্থাৎ নির্দেশেই তারা দাঁড়িয়ে আছে, থাকবে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত। [ খুঁটি সম্পর্কিত আয়াত]
    মহান ¯্রষ্টাকে চিনতে হলে তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে গবেষণা করতে হবে, গবেষণা করতে হবে নিজ সৃষ্টি নিয়ে। গবেষণা করতে হবে প্রকৃতিকে নিয়ে। তাহলেই তাঁর যথার্থ পরিচয় মিলবে।
    আসমান থেকে যে বৃষ্টি বর্ষিত হয় তা এমনি এমনি হয়না। সূর্য যে আলো ছড়ায় তা এমনিতেই আপন হেঁয়ালিপনায় ছড়ায়না, চাঁদ যে আলো দেয় তা আপন মহিমায় নয়। পৃথিবীর কোনো জিনিস যদি কারো সাহায্য ব্যতীত চলতে না পারে, তৈরি হতে না পারে তা হলে এগুলো কীভাবে চলে?- বহে? সুতরাং অনেক কিছুই মানুষ দেখতে পায়না ঠিক বায়ু, ফুলের ঘ্রাণের মতো তবুও সে এর কার্যকারিতা অনুভব করতে পারে, অনুধাবন করতে পারে। সুতরাং এই বিশ্বজাহান সৃষ্টির একজন যে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা বা নিয়ন্তা আছেন তা নির্দিধায় না দেখেই তাঁর সৃষ্টির কলাকৌশল, কার্যক্রম দেখেই বিশ্বাসযোগ্য।
    মহান আল্লাহ বলেছেন, আর আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেন যা সম্পর্কে তোমরা কিছুই অবগত নও এবং তিনি তোমাদের কান, চোখ এবং অন্তর তৈরি করেছেন । আশা করা যায় তোমরা গুণকীর্তনকারিদের অন্তর্ভুক্ত হবে [ সূরাহ নাহল- আয়াত: ৭৮]।
    আল্লাহ আরো বলেছেন, এবং তিনি সেখান থেকে তৈরি করেন খেজুর এবং আঙ্গুরের বাগান এবং প্রসারিত করেন ঝর্নাধারাসমূহ যাতে তারা এর ফলমূল হতে আহার করতে পারে। অথচ তাদের হাত এটা তৈরি করেনি। তবুও তারা গুণকীর্তন করবে না? [সূরাহ ইয়াসীন, আয়াত: ৩৪-৩৫]
    তোমরা যে পানি পান করো তা সম্পর্কে চিন্তা করেছ কি? সেই পানি তোমরা কি মেঘ থেকে নামিয়ে আনো না আমি বর্ষণ করি? আমি যদি ইচ্ছা করতাম তাকে লবনাক্ত করে দিতে পারতাম। এরপরেও কি তোমরা (তাঁর) গুণকীর্তন করবে না? [সূরাহ আল ওয়াকিয়াহ, আয়াত:৬৮-৭০]। আমরা অবশ্যই তাঁকে (দুটো) রাস্তা দিয়েছি-হয় সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে নয়তো অস্বীকার করবে [আল কুরআন]।
    উপর্যুক্ত প্রত্যেকটি আয়াতের শুরুতেই এই বিশ্বজাহানের মালিক আল্লাহর পরিচয় নিহিত আছে। অতঃপর তাঁর গুণকীর্তনের বিষয়টি রয়েছে। সুতরাং মহান আল্লাহ তাঁর বিশদ পরিচয় প্রদান করেই তাঁর গুণকীর্তন, দাসত্ব করতে বান্দাদের উপর অবধারিত করেছেন মঙ্গলার্থে।
    ¯্রষ্টার গুণকীর্তন বা শুকরিয়া জ্ঞাপন দুইভাবে সম্পন্ন হতে হবে- মৌখিক ও মানসিক এবং শারীরিক বা দৈহিক। মৌখিক এবং মানসিক দিক হতে গুণকীর্তন হলো প্রশংসাসূচক কথা দিয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন, তাঁর সৃষ্টির বিস্ময় দেখে তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন আর শারীরিক দিক হতে গুণকীর্তন বা ধন্যবাদ জ্ঞাপন হচ্ছে মৌলিক বিষয়াদি পালনসহ সকল ভালো, কল্যাণকর কাজ করা। অর্থাৎ তাঁর গুণকীর্তনের অর্থ হচ্ছে মানসিক দিক হতে হবে- তাঁর পুরোপুরি দাসত্ব করা, তাঁর হুকুম যথাযথভাবে তামিল করা।
    কেউ যদি শুধু তাঁর মৌখিকভাবে শুকরিয়া আদায় বা গুণকীর্তন করেন আর শারীরিকভাবে গুণকীর্তন যেমন: নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাত (সামর্থ থাকলে)সহ সকল কল্যাণকর কাজ না করেন তবে পুরোপুরি গুণকীর্তন তথা দাসত্ব হবে না।
    আল্লাহ বলেন, তোমরা যদি আমার শুকরিয়া আদায় বা গুণকীর্তন কর তবে আমি তোমাদেও উপর আমার নিয়ামতকে বাড়িয়ে দিবো আর যদি অস্বীকার করো (তবে জেনে রাখো) আমার শাস্তি বড়ই কঠিন [ সূরাহ আল ইবরাহীম]।
    সুতরাং যিনি আসমান-যমিন, বায়ু, খাদ্য, পানি, জীবন-মরন সৃষ্টি করেছেন’ সৃষ্টি করেছেন বান্দার জন্য সুখ-শান্তির উপকরণ তিনি কি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য নয়? তাঁর গুণকীর্তন কি প্রয়োজন নেই? অবশ্যই প্রয়োজন এবং তিনি তা পাবার যোগ্য।

    10
    5 Comments
Skip to toolbar