-
ইছামতীতে ভেসে যাই!
বেশ অলসতার সাথে বিভূতিভূষণ ববন্দ্যোপাধ্যায় লিখিত ইছামতী উপন্যাস পড়া শেষ করে কিছু বিষয় অনুধাবন করলাম। এটি ছিলো তার লিখা জীবনের শেষ উপন্যাস যা ১৯৫০ সালে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়। বিভূতির চরিত্রের কিছু অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর বৈশিষ্ট্য এই উনপ্যাসে দেখা যায়। এটা আমরা সবাই জানি কোন লেখক যা লেখেন তা তার কল্পনা, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এমন নিয়ামক গুলো থেকে নির্গত হয়। এ থেকে বুঝা যায় যে তার লিখার সাথে তার সত্তার এক মিলবন্ধন থাকে যা দৃষ্টিগোচর হয়। ইছামতী উপন্যাস পড়লে দেখবেন,
–বিভূতি নিজের ইচ্ছাকে বিশৃঙ্খল ভাবে সাজিয়েছেন,
–উপন্যাসের প্রবাহ কেন জানি একমূখী নয়, নানা প্রেক্ষাপটের সমণ্বয় ঘটেছে বিক্ষিপ্ত ভাবে, এমন লিখন শৈলী তাঁর ভেতর খুব একটা দেখা যায় না।
–মনে হয় লেখন অনেক কিছু বলতে চান, যা তিনি উপলব্ধি করেছে, তাই কোন ঘটনা মূখ্য হয় নাই, কখনো নীল শোষণ, কখনো প্রজা শোষণ, কখনো প্রসন্ন চক্কত্তির অবান্তর প্রেম, কখনো ভবানীর ধর্ম কথা, নীল শোষণের সূর্যাস্তের ইতিহাস ইত্যাদি।
–যতদূর আমার মনে হয় বিভূতি এখানে “ভবানী” বেশে রয়েছিলেন, আর তার যে ধর্ম দর্শন রয়েছে তা বার বার চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলেন। মানুষের ঈশ্বর নিয়ে অন্ধ বিশ্বাস কে ছুড়ে ফেলতে চাচ্ছিলেন।
–তার প্রকৃতি বর্ণনা এখানে এতটা মূখ হয়ে উঠে নাই বলেই মনে হয়। যদিও নাম থেকে এমন ধারণা আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃতি বর্ণনাকারী এ লেখক যে পুরোপুরি বের হয়ে আসেন নি এ লিখায় তা স্পষ্টভাবে বলা যায়।
–উপন্যাসের শেষাংশ অবশ্যই অপূর্ণ। যেন এক আবেশ তৈরী করে মনের মাঝে। কিন্তু শেষ থেকে বুঝা অনেক কষ্টের যে উপন্যাসে ভবানীর কি ভূমিকা। কারণ বিভূতি এখানে অন্য এক প্রেক্ষাপটের গুরুত্ব দিয়েছেন।
শেষে এটুক বলতে চাই এই উপন্যাস আমার কাছে মনে হয়েছে “এক বাল্যশিশুর খেয়ালী চিত্র”। যখন যে প্রবাহ ভালো লেগেছে তা সামনে এনে পাঠককে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে, রাগিয়েছে কখনো বা পীড়িত করেছে। কি এক অদ্ভুত সৃষ্টি!
আর বিভূতির লিখন কৌশল বড়ই অদ্ভুদ। আমি তাঁর লেখনীর সাথে খুব বেশি পরিচিত নয়। কারণ তাঁর রচনা আমি খুব বেশি পড়ি নাই। তবে তিনি খুব অল্প লিখেই যে কোন তুচ্ছ বিষয়কে পাঠকের মনের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারেন তা স্বীকার করতেই হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় “বিলুর মৃত্যু”। উপন্যাসের শুরু থেকেই এই চরিত্র এত বেশি তুচ্ছ ছিলো, যেন এর জন্মই হয়েছিলো পাঠক মনে একটু রস আর প্রমোদ বৃদ্ধি করার জন্য। কিন্তু কি ভেবে যে বিলুকে বিভূতিভূষণের এমন টুপ করে উপন্যাসের বৃক্ষ থেকে ফেলে দিলেই তা অজানা। কিন্তু যে দুই পৃষ্ঠা বিলু মৃত্যুর বর্ণনা ছিলো, কেউ যদি পুরো উপন্যাস না পড়ে শুধু সেই দুই পৃষ্ঠা পড়ে তো ভাববে শুরু থেকেই এই চরিত্র মনে হয় অনেক দামি আসনে বসে ছিলো, অনেকে তো কেঁদে দিতে পারেন। কোন কোন লেখক যেখানে এক চরিত্র সৃষ্টি করে তার মৃত্য পর্যন্ত, একটা উপন্যাস শেষ করে ফেলেন সেখানে বিভূতি দুই পৃষ্ঠাতে অঘটন ঘটিয়ে পাঠক কাঁদিয়েছেন। বিষয়টা কত জটিল তা হয়তো সহজেই আন্দাজ করা যায়।
যাই হোক পড়া শেষে সেই আবেশ থাকবেই যার খোঁজে লক্ষ লক্ষ পাঠক উপন্যাস পড়ে। তাই উপন্যাসটি পড়ে উপলব্ধি করতে পারেন উনবিংশ শতাব্দীর মধ্য ভাগের এক রোমাঞ্চকর ঘটনা।
9 Comments-
-
বাহ! খুব সুন্দর একটা রিভিউ দিলেন!
বই পড়ে যে অনুভূতিটা হয় একদম হুবহু তা মেলে ধরেছেন মনে হল! বইটা ইচ্ছা করছে এখনি পড়ে ফেলি বিশেষ করে বিলু আর ভবানী সম্পর্কে আরো জানতে ইচ্ছা করছে। সময় করে পড়ে ফেলব নিশ্চয়ই! শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন! -
-
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিত পথের পাঁচালি (১৯২৯) ও চাঁদের পাহাড় (১৯৩৮) ২টি উপন্যাস পড়েছি। এই ২টি উপন্যাস নিয়েই সিনেমা হয়েছে। পথের পাঁচালী নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায় সিনেমা করেছেন। ২টি উপন্যাসই অসাধারণ। পড়ে দেখতে পারেন।
-
Friends
Nilufar Ghani
@nilufar-ghani
Najmon Naher
@nahernajmon
Tasmin-Aziz
@tasmin-aziz
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Monirul Islam
@monirul9234
Maksuda Akter
@maksudashima
Azuma Heem
@azuma-heem-33
Hasina Rahman
@hasina-rahman
Nabanita Banik Mumu
@nabanita246



লিস্টে রেখে দিলাম বইটা। আরো আরো বইয়ের রিভিউ চাই…