-
অবান্তর
হাসনাত সৌরভ
=================মায়মুনা জানত আজ না হয় কাল হবেই। যখন সাবানটা কনুই থেকে কাঁধের দিকে টানছিল, তখনই টের পেয়েছিল, ভাঙবে, আজ না হয় কাল। সাবান ভাঙার আগে সাবান জানান দিয়ে যায়। মাঝখানটা দুর্বল হয়। আঙুল বলে, ভাঙবে। ভাঙার পর দুটো টুকরো। তারপর কখন কিভাবে হারিয়ে যায় মায়মুনা হিসাব পায় না। দুটো টুকরো, অসম্পূর্ণ টুকরো, আধখানা, একে অন্যের দিকে তাকিয়ে। নির্বাক।
মায়মুনা ভাঙা সাবান দুটো সোপকেসে রেখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। সারা গায়ে ভাঙা সাবানের ফেনা। জলের অপেক্ষায়। জল ঢালল। সব ধুয়ে গেল। সোপকেসের ঢাকাটা বন্ধ করে রাখল। জানে থাকবে না বেশিদিন। ভিতরে চিড় ধরলে কোনো ঘরই বেশিদিন একসাথে রাখতে পারে না কাউকে। তারাও পারেনি। এক শহরেই দু’জনে থাকে। তবু চায় না দেখা হোক। তবু অপেক্ষায় থাকে দেখা হোক। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কোনো একজনের বাইকের অপেক্ষা। সব বাইকই চমকে দেয়। সব নীল টি-শার্ট চমকে দেয়। চমক ভালো লাগে না আর যদিও। এবার স্থিতি আসুক, চায়। কিন্তু পারে না।
মায়মুনা দাঁড়িয়ে ব্যাংকের সামনে। রিকশা বা টেক্সি এলেই চলে যাওয়া যায়। ব্যাংকে এসে খবর পেয়েছে, শোভন এ শহরে নেই। বদলি হয়ে এখন অন্যশহরে। দাবিহীন অভিমান রাস্তার ফেলে যাওয়া বিস্কুটের টুকরো খাওয়া কুকুরের মতো মায়মুনা মুখের দিকে তাকিয়ে। আস্কারা চাইছে। নিজের মন যখন নিজের কাছে আস্কারা চায় নিজেকে বড় অসহায় লাগে। ভয় করে। কার সঙ্গে বাস করে একলা মানুষ? এ কোন মনের সঙ্গে!
দুটো টেক্সি চলে গেল। ডাকাই যেত। তবু না ডাকার ইচ্ছাটুকুকে সরানো গেল না। বেলা বারোটা বেজে কুড়ি। রোদে শীতের আবেশ। কারোর কিছু আসে যায়নি সংসারে। মানুষই নিজের জালে নিজে আটকে যায়। হৃদয় জাল বোনে। ঝড়ের পর জালে ধুলোবালি, ঝরাপাতা, মড়াকাঠি সব আটকে যায়। মাকড়সাটা নিজেকে গুটিয়ে একপাশে পড়ে থাকে। একা। শিকার নেই। সব নষ্ট।
মায়মুনা হাঁটতে শুরু করল। স্টেশন হাঁটাপথ। কানদুটো গরম হয়ে যাচ্ছে। মাথার ভিতর অনেকে একসঙ্গে কথা বলছে। মা, বাবা, ছোটোবেলার বন্ধু তমা, আরমান… আরো অনেকে। সবাই যুগ যুগ ধরে কথা বলেছে। মায়মুনাও বলেছে। শুনেছে। সব হারিয়ে গেছে। মনের অধ্যায় থাকে। এক অধ্যায়ের ভাষা আরেক অধ্যায়কে ছোঁয় না।
মায়মুনার ঘাম বগল বেয়ে গড়িয়ে নামছে। ঠাণ্ডা হিমেল স্রোত। শ্বাস দ্রুত। কপালে হাত ঠেকালে জ্বর। স্টেশনে এসে বসল। নীলসাগর এক্সপ্রেস বেরিয়ে গেল। পরবর্তী লোকালের ঘোষণা হলো। বগি সাত। সব শব্দ কানে আসছে। মায়মুনা কাউকে পাবে না জেনেও তাকাচ্ছে। কত অবান্তর মানুষ। চোখ ফেটে জল আসবে মনে হচ্ছে। এলো না। মাথা ঘুরে পড়ে যাবে মনে হচ্ছে। কিছু হলো না।
মনের অনেকগুলো অধ্যায় থাকে। মায়মুনা বসে বসে পুরোনো অধ্যায়গুলোর পাতা উল্টালো। টাটকা শব্দগুলো মাছের কানকো সরানো রক্তের মতো লাল। দগদগে। মায়মুনার মাথা, ঘাড়, পিঠ, কোমর, পা বেয়ে বিষাদ নামছে। অবসন্ন শরীর। যেন এখনই একটা ঝড়ে উড়ে গিয়ে পড়বে সামনের রাস্তায়।
ঘাম শুকিয়ে গেছে। খিদে পাচ্ছে। মায়মুনা উঠে দাঁড়ালো। স্টেশনের বাইরে এসে একটা মুদির দোকানের সামনে দাঁড়ালো। মন, শরীর কেউ আসেনি সঙ্গে। একা দাঁড়ালো।
নতুন সাবানের প্যাকেট ব্যাগে ভরে টেক্সিতে উঠল। একটু পর শরীর, মন ফিরে আসবে। ওরা সময় নিক। মায়মুনার নিজেরও সময় দরকার কিছুটা। একা। এমনকি নিজের থেকেও একা।
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
6 Comments-
আজকে খুব কাছের একজনের জীবনে এমন পরিস্থিতি চলছে। হয়তো এখন দু’জন আলাদা হওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় আছে। আর ঠিক তখন আপনার এই লেখা! জীবন বড় কাকতালীয়।
-
@prithula জীবন আমাদের সব হিসেবকে বেসামাল করে দেয়
-
Friends
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Prithula Zaman
@prithula



চলতে থাক