Profile Photo

রাহুল চন্দ্র দাসOffline

  • শিল্পী, কোচিং, গাইডবই ও তার বন্ধুরা

    পাহাড়পুর। একটি গ্রাম। জেলে, কৃষক আর কৃষিজীবী দিনমজুরের বাস।
    একটি হাইস্কুল আছে। আছে বাজার। আশেপাশের দশ-বিশ গ্রামের লোকজন এখানে কেনাবেচার জন্যে আসে। বাজারের এক পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কালনী নদী। বর্ষায় ভয়ঙ্কর রূপ নিলেও শীতকালে কোন কোন বছরে গলাপানি পর্যন্ত থাকে। বর্ষার ঘোলা জল তখন ঘূর্ণিপাক খায় না। স্বচ্ছ টলটলে আর শ্যাওলা পড়া জলধারায় পরিণত হয়।
    শিল্পী হাইস্কুলে পড়ে। তার বাবা সামান্য কৃষক। অভ্যাসবশত বাপ-দাদার ধারাবাহিকতায় ফসল বোনে, ফসল তোলে। সমৃদ্ধি বা স্বাচ্ছন্দ্য নেই। তাই জমিজমা চাষবাসের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝেই নৌকা নিয়ে মাছ ধরে। তাতে করে কোনদিন বিক্রিবাট্টা করার মতো কিছু মাছ কিছু মাছ পায়। কোনদিন কেবল নিজেদের খাওয়ার মতো মাছ নিয়ে ঘরে ফিরে।
    শিল্পী হাইস্কুলে পড়ে। নামেমাত্র সরকারি বইপত্র পায়। এলাকায় সারা দেশের মত কোচিং আর গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য। স্কুলের শিক্ষকদের ক্লাস করে আর নিজে নিজে পড়ালেখা করে চলতে হয় তাকে। প্রয়োজনে প্রয়োজনেই তাকে অন্যদের মত টাকা খরচ করে করে প্রচুর গাইডও কিনতে হয় না। এবং স্কুলের মাস্টারদের কোচিং সেন্টারে পড়ালেখা করতে হয় না সকাল আর চমৎকার বিকেলবেলাটি নষ্ট করে করে। পরিবারকে শিল্পীর সময় দিতে হয়; সময় নষ্ট করে প্রাইভেট পড়ার সঙ্গতি ওর নেই। মাকে সাহায্য করতে হয় নানা গৃহস্থালি কাজে। প্রায়শই বাবাকে সাহায্য করতে হয় টুকিটাকি নানান কাজে। অর্থাৎ, শিল্পীদের এত সামর্থ্য নেই।
    কিন্তু তাতে করে কিছু সমস্যাতেও পড়তে হয় শিল্পীকে। স্কুলের শিক্ষকদের কোচিঙে গিয়ে না পড়লে তারা, শিল্পী বরাবরের মত ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও , বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেন না। শিক্ষকদের অনেকেই আজকাল এমন।
    শিল্পী ভাল ছাত্র। আশৈশব নিজে নিজে পড়ালেখা করে করে ভাল রেজাল্ট করে এসেছে। আর ওর মত হতে চায় ওর বন্ধুদের অনেকে। এই বিষয়টিই অনেক শিক্ষকের জন্যে অস্বস্তিকর। ও কোচিঙে পড়ে না। ও ব্যাগ ভরে ভরে বাজার থেকে কেনা অহেতুক নোট আর গাইড বই পড়ে না। কিনে না। তাই ওর বন্ধুদেরও অনেকেই তা করে না। শাস্তিস্বরূপ, যে সকল শিক্ষক বিভিন্ন কোচিঙে পড়ায়, কিংবা স্কুলটিকেই কোচিং সেন্টার করে ফেলেছে, তারা নানা অজুহাতে শিল্পী ও তার দলবলকে ক্লাসে হেনস্থা করার চেষ্টা করে থাকে। মার্কস কম দিয়ে থাকে। অনেকের কাছে শিল্পীর লেখা উত্তরপত্রের উত্তর পছন্দ হয় না। অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবেও ফেল করিয়ে থাকে।
    কিন্তু, মাঝেমাঝে, স্নেহবশত, শিক্ষকসুলভ দুর্বলতাবশত, শিল্পীকে ওর প্রাপ্য নাম্বার দিয়ে দিতে হয়। এ সমস্ত ক্ষেত্রে আমরা একে শিক্ষকসুলভ দুর্বলতা বলেই মনে করতে পারি।
    ওর উত্তরপত্রের লেখার গুণে এবং আশেপাশের মানুষের সাথে ওর আচরণ বিবেচনা করেও অনেক শিক্ষকের মার্কসই ও পুরোপুরি পায়। শিক্ষকদের সাথে ওর আদবকেতা যথেষ্ট স্নেহ-জাগানিয়া। এসব ক্ষেত্রে ওর প্রতি মুগ্ধতা থেকেও প্রাপ্য নাম্বার না দিয়ে পারা যায় না। তবে এই সমস্ত ব্যাপারকে আমরা স্বাভাবিকের বিচ্যুতি হিসেবেই দেখব। শিক্ষকসুলভ দুর্বলতাকে এ গল্পে প্রশ্রয় দেয়া হয় না।
    শিল্পীকে কোচিং-পড়ানো, মুখস্থ-করানো শিক্ষকদের অনেকেই কোন টাকা ছাড়াই তাদের নিজ নিজ কোচিঙে গিয়ে পড়তে যেতে বলে। যাতে করে শিল্পীর বন্ধুরাও ওর সাথে যায়। কিন্তু ও কোচিঙে যায়ই না। ও যেন পণ করে আছে, গাইড আর কোচিঙের প্রতি কোন দুর্বলতা দেখাবে না মরে গেলেও। মহোদয়েরা অনেকবার ধমক-ধামকও দিতে কসুর করে নি। শিল্পীর বাবাকে রাস্তায় পেয়ে বেশ কয়েকবার বলে দিয়েছে ওকে যেন ওদের কোচিঙে পাঠিয়ে দেয়। নইলে রেজাল্ট আশানুরূপ হওয়ার আশা নেই। আরো ধর্তব্য, প্রায় প্রত্যেকেই বলে দিয়েছে এর জন্যে শিল্পীর বাবাকে কোন টাকা দিতে হবে না। শিল্পীর বাবা বার দুয়েক এ বিষয়ে একরকম রাগ করেই শিল্পীকে বলে কোন ফল পায় নি। মেয়েটির ঐ এক জেদ।
    প্রতাপপুর থেকে নদী পার হয়ে শিল্পীকে বাজারের পথ ধরে পাহাড়পুর গ্রামে আসতে হয়। স্কুলে আসতে আসতে বিভিন্ন স্থানে বন্ধুদের সাথে ওর দেখা হয় এবং একসাথে সকলে স্কুলে গিয়ে পৌঁছে। ওদের অনেকের হাতে বা ব্যাগে মোটা মোটা নোট আর গাইড বই থাকে। কিন্তু শিল্পীর হাতে কোনদিন এসব কেউ দেখে নি। তা না থাকাটা অভ্যাসবশত কেউ খেয়াল করে না বা কেউ দেখলেও বিশেষ অবাক হয় না।

    তবে সময় বদলায়। স্কুলের আইন-কানুন বদলায়। পুরাতন শিক্ষক আর ছাত্রেরা বিদায় নেয়, নতুন শিক্ষক আর ছাত্রেরা আসে। তারা আসে দল বেঁধে।
    নতুন শিক্ষক যারা আসে তারা অনেকেই আরো বেশি গাইড আর আরো বেশি কোচিঙের কথা বলে। নবপ্রবর্তিত সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের ব্যাপারে ধারনা থাকে না। ধারনা থাকে অভিনব কোচিং বাণিজ্যের। পাঠদানে কৌতুহলের নিবৃত্তি ঘটে না। শিল্পীকে তার জেদি মনোভাব থেকে অনেকটা সরে আসতে হয়। সে-ও বাধ্য হয়ে গাইড ইত্যাদি কিছু কেনে। দলভুক্ত হয়ে কোচিঙে পড়তে যায়। প্রতিযোগিতা বেড়ে চলে। ক্লাসের আনন্দ আরো কমে যায়।
    শিল্পী এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। বিজ্ঞানের শিক্ষকের অভাব। একজন থাকলেও ক্লাসে মনোযোগী নন এবং যথেষ্ট সময় ছাত্রদের দিতে পারেন না। সময়ের অভাবগ্রস্ত এই শিক্ষকের নাম অরবিন্দু। অরবিন্দু স্যরের কোচিং সেন্টারের এলাকায় ব্যাপক সুনাম।
    তো, অরবিন্দু স্যার একদিন ডেকে পাঠালেন শিল্পীকে। তিনি আবার পণ্ডিত ধরনের ছাত্রদের পছন্দ করেন না। ধমক-ধামকের পর তিনি মূল প্রসঙ্গে এলেন। তরুণ শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও পান খাওয়ার অনর্গল বাতিক আছে তার। থুক করে দেয়ালের এক পাশে পানের পিক ফেলে শিল্পীকে শুধোলেনঃ
    “কোচিঙে নিয়মিত দেখি না কেন?”
    “কালকা থাইক্যা আসমু নে স্যর। বাড়িতে কিছু কাজকাম আছিল।“
    ভয়ে ভয়ে মিথ্যা করে বলে শিল্পী। আসলে সে চেষ্টা করছিল বরং আগের মত হয়ে যেতে। কোচিঙে যাতায়াত ক্রমে ক্রমে একেবারে ছেড়ে দিতে। প্রথম প্রথম যখন সে আর তার দলবল কোচিঙে আসা-যাওয়া শুরু করে, তখন কোন টাকা না লাগলেও এখন লাগে। এটাও একটা বিবেচ্য বিষয় শিল্পীর কাছে। আর কাজের প্রসঙ্গ? বাড়িতে কাজ গ্রামের অন্য আর দশটি মেয়ের মত বারো মাসই ওর থাকে। পারিবারিক দায়িত্বের প্রতি ওর অবহেলা শূন্য। পড়ালেখার চেয়ে কম গুরুত্ব দিয়ে সে পরিবারকে দেখে না।
    “যাও। কাল থেকে যেন মিস না হয় আর। একা একা অ্যারিস্টটল হওয়া যায় না।“
    শিল্পী কোনরকমে ‘আচ্ছা’ উচ্চারণ করে সক্রেটিসের নাগাল থেকে পালিয়ে বাঁচল।
    কিন্তু তাতে করে শিল্পীর রুদ্ধ জেদ আরো মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যায় কোচিঙে আর কোনদিন না যাওয়ার প্রতি। পরদিন থেকে ওকে আর অরবিন্দু স্যরের কোচিঙে দেখা যায় নি। এর শাস্তি অবশ্য তাকে পেতে হয় ক্লাসে। নানাভাবে বন্ধুদের সামনে অপদস্থ হয় সে। ক্রমে শিল্পীর বন্ধুরাও ক্ষেপে যায় এবং ওদেরও অনেকে কেউ পাঁচদিন, কেউ সাতদিনের মধ্যে যেকোন ধরনের কোচিঙে যাওয়া বাদ দিয়ে দেয়। দলবেঁধে সবাই ক্লাসে শাস্তি পায় এবং দলবেঁধে সবাই প্রতিবাদ করে। ব্যাপারটি হেডস্যরকে বিচলিত করে এবং তিনি প্রথমে শিল্পী ও পরে অরবিন্দু স্যরকে একান্তে ডেকে পাঠান। তিনি অরবিন্দু স্যর আর তার কোচিং নিয়ে কথা বলেন পরিচালনা কমিটিতে। আশাতীত ফল পাওয়া যায়। অরবিন্দু স্যর কোচিং বন্ধ করে দেন প্রায় রাতারাতি। সে রহস্য আর এক দিন বাতলে দেয়া যাবে।
    আর গাইড বই? নোটবই?
    সে আর এক কাহিনি।
    তখন বর্ষাকাল। নদীতে বান ডেকেছে। জল খুব ঘোলা আর ধূসর। প্রবল স্রোত । নৌকার মাঝি প্রাণপণে বৈঠা চালিয়ে যাত্রী পারাপার করছিল। নৌকায় ছিল শিল্পী আর তার বন্ধুরা। প্রচণ্ড গরম আর রোদের উত্তাপ। সবাই খুব ঘামছে।
    মাঝির পেশিগুলো স্বাভাবিক কারণেই আর আগের মতো সমর্থ নয়। বৃদ্ধ ওসমান আলির মাথায় মাথাল। গায়ের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে সর্বত্র। এত পরিশ্রম করে নৌকা চালাতে দেখে লোকটির প্রতি মায়া হয়। ওসমান আলির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শিল্পীর মনে হয় ওসমান আলিও শিল্পীর বাবার মতই। ওর বাবাও তো এমনি করে পরিশ্রম করে করে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে আসছে। এবং শিল্পীকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে দেখে, শিল্পীর পড়ালেখার যৎসামান্য খরচ চালিয়ে, শিল্পীকে বিরাট পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছে। ওসমান আলি তখন সমস্ত পিতার মুখচ্ছবি হয়ে ধরা দেয় শিল্পীর কাছে। মেয়েকে নিয়ে শিল্পীর বাবার কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। ও দেখে , ওসমান আলির প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে নৌকাটি চালিয়ে নিতে। পারলে নিশ্চয়ই ও বৃদ্ধ মাঝিকে সাহায্য করত।
    শিল্পী ভাবে, তার বাবাও এমনি কষ্ট করে কিছু টাকা পরিবারের জন্য সংগ্রহ করে চলেছে। জীবনের কোন এক অপূর্ণ সাধ মেয়ের মধ্য দিয়ে পূরণের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছে। আর ওর হাতের বইগুলোও এমনি ওসমান আলিদের মত শ্রমের টাকায় কেনা, রক্ত জল করা পরিশ্রমের টাকায় কেনা। যা বস্তুত আবর্জনাবিশেষ।
    শিল্পীর প্রথমে নিজের ওপর রাগ হয়। বাবার শ্রমের টাকা এতগুলো গচ্চা দিয়ে ফেলেছে বলে। মাঝিকে দেখে বাবার কথা ভেবে ওর কান্না আসে বুকের ভেতর থেকে। সে কাউকে কিছু না বললেও একটি যৌথ বোধ দ্বারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে নৌকার সকলে আক্রান্ত হয়। ওর বন্ধুরাও সংক্রমিত হয় তাতে।
    নৌকা যখন মাঝ নদীতে, তখন এক কাণ্ড করে বসল শিল্পী। সমস্ত নোট আর গাইডের অতিরিক্ত ভার থেকে ওসমান আলিকে কিছুটা মুক্ত করে দেয় ও। নিজেকেও ওর কেমন ভারমুক্ত লাগে।
    সবাই দেখে, কিছু মোটা মোটা কাগজপত্রের তাড়া ঘোলা ঘূর্ণিপাকে পাঁক খাচ্ছে। কিছু দলছুট কাগজ তখনো বাতাসে উড়ছে নদীর জলের ওপরের হাওয়ায় ইতস্তত। অবাক হয়ে ওর দিকে সবাই তাকায়।
    শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন চোখ একজোড়া ওর।
    বন্ধুরা ওর অনুসরণ করে। শিল্পীকে অনুসরণ করে ওর বন্ধুরা আনন্দিত হয়। সম্ভবত তারা তাদের সহমর্মিতা প্রকাশ করে শিল্পীর কোচিং বাণিজ্যের আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে। সবার কেমন ভারমুক্ত লাগে।
    ভাবার্থে তো বটেই; আক্ষরিক অর্থেও।
    ওসমান আলি তাতে মনে হল বেশ বিরক্ত। তবে মেয়েরা আর তার বিরক্তিতে পাত্তা দেয়ার পরিস্থিতিতে নেই। তারা হাসে এবং সেই হাসিকে একসময়ে বৃদ্ধ ওসমান আলিও আর পাত্তা না দিয়ে পারে না। তাকেও এক সময়ে অকারণেই বলা যায় বেশ আনন্দিত দেখায়।

    9
    6 Comments
Skip to toolbar