-
ভদ্রলোকের ব্রাশ
মূল- সাদাত হাসান মান্টো
অনুবাদ- অয়ন আবদুল্লাহ
♣
বিশ বছর আগে, তখন আমার বয়স ২১/২২ হইবো, কমও হইতে পারে। দিন-বয়স-মাস, এইসব আমার ঠিকঠাক স্মরণ থাকে না। আমার বন্ধু মহলের অনেকেই আমার থেকে বয়স্ক ছিলো, কিন্তু দেখলে মনে হইতো আমার ছোট।
হল বাজারের সাথেই বিদ্যুৎ চত্বরের বাম পাশে হাফিজ পেইন্টারের দোকানে আমরা সবাই বইসা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম। আমি লেখাপড়া ছাইড়া দিছিলাম, মোবারকও তার চাকরিতে লাথি মাইরা অমৃতসরে ফিরা আসে। ব্যাটা সরকারের গোলাম ছিলো। হাফিজ পেইন্টারের বাবার প্রতি রাগ ছিল, তাই সে একটা আলাদা বড় দোকান চালাইতো। দোকানটা আগে ছিলো এক কমিউনিস্ট শিখের, যে গ্রামোফোনের ডিলার ছিলো। খায়ের দ্বীন মসজিদের লগে ঘেঁষা দোকানটা হল বাজারে হইলেও ভালো জায়গাতেই ছিল। বলা যায়, হল বাজারের মাঝখানে এবং মসজিদের ছায়ার নিচে থাকা স্বত্তেও প্রচলিত নিয়মের ধার ধারা লাগতো না। সেই জন্যেই দোকানটা তাঁর এত পছন্দ হইছিলো। আজান হইলেও সেইখানে রেকর্ড বাজানো হইতো, কিন্তু এইটা নিয়া কোনো দাঙ্গা কখনো বাঁধে নাই। তবে ছোটখাটো বিষয় নিয়া রক্তা রক্তি বাইধা যাইতো।
মুসলমান আর হিন্দুদের দুইটা গুণ্ডাবাহিনী হুটহাট কইরাই মাঝেমাঝে হাজির হইয়া আবার ফেনার মতো মিলাইয়া যাইতো। তর্কাতর্কি, মাগিবাজি করার পাশাপাশি এরা নিজেদের মধ্যে খুনাখুনিও করতো। কেউ কারো ছায়া মাড়াইলেই অসহায় ভেড়ার মতো কাটা পড়তো। কিন্তু আমি বুঝি না, যখনই জীবনে একটু শান্তি আসে, তখনই এদের নিরীহ মানুষের কল্লা কাটার শখ ক্যান জাগে!
অমৃতশহর শহরটা ছিলো খুবই অদ্ভুত। সেই সময় সব ধরনের জিনিসই পাওয়া যাইতো। চলতো মদের কাড়াকাড়ি থেইকা শুরু কইরা সরকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি। পাবলিকও ছিলো সেইরকম ম্যান্দা। লালা তাঁর বাজারের দোকানগুলিতে হাঁইটা হাঁইটা তদারকি করতো আর তাঁর চেলাগুলা পাবলিকের একটু আনন্দ দিতে আতশবাজি ফুটাইতো। দাঙ্গাবাজির পাশাপাশি সে সমাজসেবা করতো, সে ছিলো ঈশ্বরের একান্ত অনুগত আবার সেই সঙ্গে এক নম্বরের দস্যু আর পাপি। মসজিদ আর মন্দির ছিলো। সেইগুলা পাপের পাশাপাশি পূণ্যও কামাইতো প্রচুর।
এইসবে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যে মধ্যে অনেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও সচল ছিলো। নিজেদের মধ্যেই অনেক বিদ্রোহী লড়াই করতো। মুসলমান আর কাদিনিদের মধ্যে বিবাদ হইতো, যার মধ্যে কিছু বিখ্যাত পণ্ডিতরাও থাকতো। মহিলারা ঝগড়া করতো, মহামারী হইতো। জালিয়ানালার বিখ্যাত সেই দুর্ঘটনায় বহু মুসলমান, শিখ আর হিন্দু মরলো, কিন্তু অমৃতসর তেমনই থাকলো।
হাফিজ পেইন্টারের দোকানে দুনিয়ার সব রাজনৈতিক, সামাজিক, আর অর্থনৈতিক বিষয় নিয়া অকথ্য আলাপ চলতো। যদিও তারা সবাই আর্টিস্ট ছিলো। রুসনিম যাও, গান বাজনায় তাঁর আগ্রহ ব্যাপক ছিলো । কেউ তাঁরে তবলা, সেতার, বাঁশি বা খঞ্জনী দিলে সে মিয়াঁ তোড়ি, মালকো বা ভাগড়া বাজাইতে শুরু করতো।
এইখানে গাঁজাও খাওয়া হইতো, সিদ্ধি ভইরা সিগারেট এর সঙ্গে প্রায়ই মদ খাওয়া চলতো। কারণ দিনটা এত বড় ছিল না। সাড়ে আট টাকায় আস্ত এক বোতল স্কচ হুইস্কি আসতো । হাফিজ সন্ধ্যায় তার দোকানের ভারী দরজা বন্ধ করলে আমরা মাদুরের উপর বইসা আস্তে আস্তে মদের মজা নিতাম। তারপর মাঝরাইতে আশেপাশের সব দোকানপাট বন্ধ হয়া গেলে শুরু হইতো গানের আসর।
(চলবে)8 Comments
Friends
Iqbal-Ahmad
@iqbal-ahmad
প্রদীপ্ত লুব্ধক
@shawon-sarkar
Balai-Karmokar
@balai-karmokar
কাব্য রঙ
@mahbuba-hasin
Unaysah-Jannat
@unaysah-jannat
Al-Haj-Abdur-Rouf
@al-haj-abdur-rouf
Ilmu-Jahan
@ilmu-jahan
Shubha-Jit-Datta
@shubha-jit-datta
সাদিক আহমদ সিয়াম
@sdik-5



অসাধারণ অনুবাদ হয়েছে। অভিবাদন জানবেন।