Profile Photo

Md Joynul AbedhinOffline

  • J.A.Sagor
  • Profile picture of Md Joynul Abedhin

    Md Joynul Abedhin

    3 years, 4 months ago

    গল্পঃ রঙের পুতুল

    গদাধর সেই ভোরে উঠে মাটির পুতুল বানানোর কাজে লেগে গেল। বান্নি মেলা কদিন পর। পুতুলগুলি শুকিয়ে নানা রঙ দেবে গদাধর। বছরের এই একদিন ভাল লাভ হয়। দিন রাত কাজ। উঠানে মিনতিকে আগের বানানো মাটির খেলনা, বাসন ও পুতুল বের করে শুকনো কলাপাতার উপর বিছিয়ে দিতে দেখল গদাধর। মিনতি তার সাথে সমান তালে কাজ করে। পুত্রবধুর জন্য কষ্টের শেষ নেই। এমন রুপ নিয়ে কেন যে এখানে জীবন শেষ করে দিচ্ছে গদাধর তার হিসাব মেলাতে পারেনা। কবছর আগে হাটের রাস্তায় ট্রাকের চাপায় ছেলেটা গেল। বৃদ্ধ গদাধর আর তার বৌ শান্তি মিলে কি কম বুঝ বুঝিয়েছে! কিন্তু ঐ এক গো, বিয়ে একবারই হয়, এ বাড়ি থেকে সোজা শ্মশানে যাব। এ কথা যে মিনতি কতবার বলেছে তার হিসাব নেই। তা তার ছেলে পরশ যখন বেঁচে ছিল কি মানাতো দুটিতে। একই আঙ্গিনার খুনসুটি মাঝে মাঝেই কি তার চোখে পড়ত না! গদাধরের বেশ আনন্দ হত। ভগবানের কাছে তারা দুইজন এই প্রার্থনাই করতেন- হরি ওদের সুখে রাখো। কিন্তু গরীবের সুখে ভগবানের পিত্তি জ্বলে। তিনি তখন মর্ত্যলোকে নেমে আসেন শাপ দিতে। শাপের আগুনে গরীব পুড়ে ছাই হয়, পুর্বজন্মের পাপ মোচন হয়।

    মিনতি চুলার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবল-আজ কি? কিছু ক্ষুদি চাল আছে, জঙ্গল থেকে তুলে আনা জংলা শাক, কাঁটা শাক আছে কিন্তু চুলায় আগুন দেবার পাতা নেই। কাল সময় পায়নি মিনতি। কিন্তু জঙ্গল মিনতি এড়াতে চায়। পরশ যাবার পর থেকে মিনতি রুপের হরিণ। সাজগোজ ছাড়াই মিনতি যেন আগের জন্মের মহারানী যার ঐশ্বর্য গেছে কিন্তু রুপ জন্মান্তরেও দুর্দান্তভাবে বহাল । এমন কি পরশের বন্ধুদের চোখেও আজকাল কেমন যেন খুশির ঝিলিক দেখে মিনতি। রাস্তাঘাটে দেখা হলে এমন স্বরে বৌদি ডাকে যাতে সন্মান নেই কিন্তু ইঙ্গিত আছে আর মুখের দিকে তাকালে ঠোটের কোনায় কামনার হাসি স্পষ্ট। পাড়ার অতনু ঘোষ তো উঠেপড়ে লেগেছে। অতনুর উচ্ছিষ্টভোগী নারীকুলের দুই একজন তার শ্বাশুড়ির কাছে এসে “ভাল একটা কাজের” প্রস্তাব দিয়ে গেছে। এর মানে শান্তি নিজেও জানেন। মিনতিকে তিনি আরো সাবধান করে দিয়েছিলেন।

    “বাবা আমি পুতুলে রঙ করি আপনি একটু পাতা নিয়ে আসুন। পাতা নেই”।

    গদাধর মিনতির গলার কন্ঠ চেনেন । উৎকণ্ঠার কারণও জানা। রঙের হাত রেখে কাস্তে নিয়ে জঙ্গলের দিকে পা বাড়ালেন গদাধর। এই জঙ্গল শুধু যেন জঙ্গল নয়, অন্নদাতা। হিন্দুপাড়ার একদম প্রান্তে অন্য অংশ থেকে এই জঙ্গল দিয়েই বিচ্ছিন্ন তার পরিবার। বিচ্ছিন্নতার অবশ্য ঐশ্বরিক কারণও আছে তবে সে সব নিয়ে তেমন চিন্তিত নয় গদাধর। শাঁক কচুঘেঁচুতে আর অন্য কেউ ভাগ নিতে আসেনা, কিন্তু ভয়ও আছে, মিনতিকে নিয়ে ভয়। গদাধর তাই এই জঙ্গলটাকে যেমন ভালবাসে কিন্তু পরশ যাবার পর থেকে তেমনি তার মনও ছমছম করে। শান্তিও একই শঙ্কায় ভোগে।

    মিনতি খুব যত্নে রঙ করে প্রত্যেকটি পুতুল। অন্তরে হরিনাম যপে চলে নীরবে। মনে মনে বলে ”ওকে তুমি ক্ষমা করে দিও হরি, না বুঝে ওমন অলক্ষুণে কথা বলতো’’। মিনতির মাঝে মাঝে মনে হয় ভগবান বুঝি রেগে গিয়েই তুলে নিল পরশকে । পরশের মাথা খেয়েছিল হামিদপুরের বাদশা মিয়া। লোকে বলে সে নাকি আল্লাহ ভগবান মানে না। পরশ তার কাছেই যেত আর সব অলক্ষুণে কথা শিখে আসত। কখনো পরশকে হরিনাম করতে দেখেনি মিনতি। বাজারের সেলুনে যেখানে কাজ করতো সেখানে নজরুলের একটা কবিতা ঝুলানো- সাম্যবাদী ।

    “ভগবানের আশির্বাদ মাথার উপর থাকতে হয়, লাগাও না একটা গনেশ ঠাকুরের ছবি”।

    নিরুত্তর ছিল পরশ। চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়েছিল।

    “আমি মাধবকে বলে দিই”?

    “দ্যাখ মিনতি ও আমি পারবো না, আর কারো ভক্তিতে আঘাত দেবার ইচ্ছে আমার নেই”।

    “কেন গো তোমার কি ভক্তি নেই”?

    “আছে মিনতি, ভক্তি আছে, মানুষে ভক্তি আছে, কারণ মানুষ সত্য”।

    “আর ভগবান বুঝি মিথ্যা? ভগবানে ভক্তি রেখে মানুষে ভক্তিতে অসুবিধা কি!

    মিনতির মনে আছে এই প্রশ্ন শুনে তড়াক করে উঠে বসেছিল পরশ কিন্তু খুব শান্তভাবেই বলেছিল,

    “ও ফাঁকির কথা। বাদশা ভাই বলে আল্লায় ভগবানে ভক্তি রেখে মানুষে ভক্তি হয়না, ভারতে বাবরী মসজিদ নিয়ে কি হল শুনিস নি? মানুষ মানুষকে গায়ের জোড়ে মারে নি, ভক্তির জোরে মেরেছে। লাশ হয়েছে হাজার হাজার জ্যান্ত মানুষ, তারা সবাই ভক্তির বলি মিনতি। তাকে ভক্তি করলে যেখান থেকে ভক্তি আসে সেখান থেকে হিংসাও আসে । এই হিংসা থেকে রাস্ট্রের জন্ম হয়, ট্রেন ভর্তি মানুষ লাশ হয়, করুক্ষেত্র হয়, ক্রুশেড হয়, জিহাদ হয়, দেশে দেশে সীমানা পড়ে, সামনের মানুষকে অন্য চোখে দেখি, মানুষ হিসেবে দেখিনা, তার টুপি আছে কিনা দেখি, পৈতা টিকি খুঁজি, ধর্ম স্রেফ কল্পনা কিন্তু মানুষ কল্পনা নয়, জলজ্যান্ত সত্য। কাল্পনিক এক সৃষ্টিকর্তার জন্য মানুষ তার মত দেখতে আর একজন মানুষকে ছুড়ি চালিয়ে দেয় – এ এক ভয়ঙ্কর কথা । থাক এ সব বলতে ভাল লাগেনা। এসব বলাস নে , তোর ভক্তির সাথে বিরোধ নেই, আমি কেন ভক্তি করিনা তাই বললাম মাত্র। তোর ভাল লাগে তুই ভক্তি কর। আমি পারবনা” ।

    মিনতির বুক কেঁপে উঠেছিল সেদিন । এসব বাদশা মিয়ার শেখানো বুলি তা জানে মিনতি। মিনতি সেদিন বাদশা মিয়াকে ইচ্ছেমত শাপ শাপন্ত করেছিল । এরপর আর তেমন ঘাটায় নি মিনতি। ঐ এক দোষ ছাড়া লোকটি একদম কাঁদা মাটির মানুষ ছিল । এত ভালবাসে যাকে, সে নরকে যাক তা মিনতি চায়নি। তাই এক রাতে সাহস করে বলেছিল তোমার ভয় করে না যদি নরকে যাও?

    “কোন অপরাধে? মানুষকে যবন বলে গালি দিইনি সেইজন্য, নাকি নিজেকে কাফির বলে মেনে নিইনি সেইজন্য”?

    পরশের এমন উত্তরে কোন কথা খুঁজে পায়নি মিনতি। বাদশা মিয়া তাকে সব প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করিয়ে দিয়েছে যেন।

    মিনতি শুনেছে বাদশা মিয়ার কথার জন্য তার বাড়িতে কারা যেন আগুন দিয়েছিল। পরশ মারা যাবার পর ঢাকা না কোথায় চলে গেছে আর আসেনি।

    গদাধর পাতা কুড়িয়ে আনলে মিনতি চুলায় আগুন দিল।

    বান্নি মেলার দিন আঁধার ভোরে উঠে ভারে সব সাজিয়ে দিল মিনতি। আগে পরশ বয়ে নিয়ে যেত; গদাধর শুধু মেলায় বিক্রি করত। পরশ নেই । বাঁশের ভারের দুইপাশে সব তুলে দেওয়া হলে; কাঁধে নিয়েই গদাধর দেখলেন চোখের সামনে কেমন ঝাপসা হয়ে গেল। কাঁধের বুড়ো হাড্ডি যেন দেবে গেল।

    ‘’বাবা, কষ্ট হচ্ছে বুঝি?’’ নিজের আশঙ্কা যাচাইয়ের জন্যই মিনতির এই জিজ্ঞাসা।

    ‘’না রে মা, আগেও তো বয়ে নিয়ে গেছি।’’ বলেই কাঁপা শরীরে পথ ধরলেন গদাধর।অতিকষ্টে তিনি মিনতির নজর এড়াতে চাইলেন। বুড়ো কাহিল শরীর মনের আদেশ সেভাবে মানেনা। ভোরের আবছা আঁধার তাকে বাঁচিয়ে দিল নাহলে মিনতি তাকে মেলায় যেতে দিত কিনা সন্দেহ আছে।

    বান্নি পাঁচ কিলোর পথ। এই পথ পেরুতেই গদাধর মৃত্যুর নিঃশ্বাস শুনতে পেলেন কতবার-একটু যেতেই বুকের ভিতর ধপ ধপ শব্দ হয়; ডানেবামে টলে যান; দম ফুরিয়ে আসে। ভগবানের লীলাখেলায় মর্ত্যে অবিন্যাসের নৃত্য চলে । এই ভার তার নেবার কথা নয় কিন্তু ভগবান যেন নিজ হাতে পুর্ব জন্মের সাজা দেন। সন্তান সরিয়ে দিয়ে ভগবান যেন ক্রুর হাসি দিয়ে বলছেন-কেমন লাগছে গদা? দেখি তোমার ভক্তিতে চির ধরে কি না- কিন্তু হরি ভক্তিতে অবিচল গদাধর। ভার বইতে গিয়ে বুড়ো হাড় কচকচ করে উঠলেও তাতে ভক্তি কমেনা। যেমন খেলাই খেল হরি, তোমার নাম যপেই কাঙ্গাল হব।

    গদাধর যখন মেলার প্রান্তরে, ততক্ষনে রঙ বেরঙের তাবু খাটিয়ে যে যার মত বসে গেছে। বান্নি মেলার এই এক নিয়ম, যে আগে আসবে সে তার ইচ্ছেমত বসে যাবে। পরে আসলে তাই লোকসানের শেষ নেই। বান্নি মেলায় বর্গাকার খোলা মাঠের চারদিকে যে যার পসার সাজায় কিন্তু মাঝ মাঠ ফাঁকা রাখতে হয়। নিরুপায় হয়ে মেলার মুলস্থান থেকে একটু তফাতে বসে গেল গদাধর। মানুষ মেলার মাঠে বর্গাকারে ঘুরছে। গদাধর কিঞ্চিত দৃষ্টির অন্তরালে। মিনতি তাবুর জন্য কাপড় দিয়েছে কিন্তু দুই কাঁধই যেন আর নাড়ানো যাচ্ছেনা। ভাবলেন একদিনের রোদে কি কাবুই আর হবেন! বেচাবিক্রিতে একটু তফাৎ অনেক কিছু। দুপুর গড়িয়ে গেলেও গদাধরের বিক্রি তেমন হলনা কিছুই, মোটে দুটি রঙের পুতুল আর কিছু মাটির খেলনা বাসন। এখনো কিছু আশা আছে। মেলা বিকেলে জমে বেশি। বিক্রি নেই তাই নড়াচড়ার ভরসা পেলেন না গদাধর পাছে কেউ ফিরে যায়। বিকেল হলেও দুই চারটি পুতুল আর খেলনাই বিক্রি হল শুধু। শুধু কৌতূহলবশত কেউ কেউ হয়তো আসে কিন্তু তাদের সবাই তো ক্রেতা নয়। বিকেল গড়িয়ে গেলে মেলায় শিশু কিশোরের সংখ্যা কমে, বড়দের ভীর বাড়ে । গদাধরের ক্রেতারা শিশু কিশোর। তাই শেষ বিকেলে গদাধরের চোখে শুন্যতা ভর করে এল। কি পরিশ্রমই না তিনি আর মিনতি করেছেন। মাটিকে পুতুল, বাসনে রুপ দিয়েছেন কত যত্ন করে আর শুধু একটু হেরফেরে এই পরিনাম। ঘরে চাল নেই কদিন ধরে। চালের কুড়ো জঙ্গলের কাটা শাঁক দিয়ে একবেলা দুইবেলা একটু আধটু খাওয়া চলছে। মিনতির সামনে কি করে দাড়াবেন গদাধর তাই ভাবছেন। শরীরের শক্তি ক্ষুধায় আর অভিমানে যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। উঠে দাড়াতেই তিনি বুঝলেন জ্বরের একটা ভাব আছে । অতি যত্নে গড়া মাটির বাসন পুতুল ফেলে সন্ধ্যার একটু পর ধীর পদে হাটতে শুরু করলেন তিনি। রুনিপুরের জঙ্গলের ধারে আসতেই অশ্বথ গাছের নীচে এসে গদাধর দেখলেন তার পা চলে না, শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। উপর হয়ে পড়ে গেলেন গদাধর। সময় শেষ তা যেন নিজেই বুঝে গেলেন; গদাধর তাই যাবার আগে শুধু বলে গেলেন- ‘’হরি, আমার মিনতি মাকে দেখে রেখ’’।

    ****

    যে শান্তি গদাধর থাকতে বাড়ির চৌহদ্দিতেই বসে কাজ করতেন, এখন বাতের পা নিয়ে তাকেও পাতা কুড়ানো, শাঁক তোলার কাজে মিনতির সাথে থাকতে হয়। তপন ঘোষের স্ত্রী শিল্পার সাথে একটু খাতির থাকায় কুঁড়ো চাল অথবা মিনতি গিয়ে একটু গৃহস্থালির কাজে হাত দিলে কিছু পাওয়া যায়। তবে শান্তি মিনতিকে একা ছাড়েন না। শিল্পা তাতে বরং খুশিই হোন। হাজার হোক মিনতি সুন্দরী, বাড়ির পুরুষে ভরসা কি? কুপিতে তেল না থাকলে সন্ধ্যার পর পরই শুয়ে পড়তে হয়। শান্তি রাতের বেলা শিসের শব্দ পান, দিনের বেলা মিনতির সাথে সাথে থাকেন কিন্তু তিনি ভয় পান , একজন তো হঠাত গেলেন তারই বা ভরসা কি। মিনতির আর যাবার কোন জায়গা নেই।বাপ-মা মরা মেয়েটার শুধু এক দিদি আছে যার নিজের সংসার নিয়েই টানাটানি । অন্ধকারে মিনতির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কোন খেই খুঁজে পাননা শান্তি । মনে মনে বলেন একটা উপায় দাও হরি।

    “মিনতি,মা, বলি তুই বিয়ে করে নে না আরেকটা। কি আর বয়স তোর?’’

    ‘’এ বাড়ি থেকে আমি কোথাও যাবো না মা, এখান থেকে সোজা চিতায়’’।

    “তা আমি গেলে একা থাকবি কেমন করে, তুই কি কিছু টের পাস না”?

    “পাই মা, এ বাড়ি থেকে হরি আমাকে শ্মশানে নেবেন এই বিশ্বাস আমার আছে”।

    আর কথা বাড়ান নি শান্তি । এ কথা তাকে বহুবার শুনতে হয়েছে।

    রাত গভীর হলে শান্তির উতকন্ঠা বাড়ে। যেসব শব্দ আগে কখনো শোনেন নি সেসব কানে আসে। এত রাতে মানুষের পায়ের ধুপধাপ আগে ছিলো না। ফিসফাস শব্দ হয় তাও কানে আসে। বিছানার মাথার নীচে একটা হাঁসুয়া রাখেন শান্তি , মিনতির বালিশের নীচে ছোট ছুড়ি কিন্তু তার আর শক্তি কি, সাথে বেতো পা। অসহায় বোধ করেন শান্তি। হরি এ কি বিপদে ফেললে! রাত জেগে পাহারা দিয়ে কদ্দিন মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখবো?

    সকালে ঘুম থেকে উঠে মিনতি দেখল তার শ্বাশুড়ি ঘুমিয়ে আছে। নিজের ঘুমকাতুরে স্বভাবের জন্য মাঝে মাজে লজ্জা লাগে মিনতির। ঘুম আসলে সহজে ঘুম ভাঙ্গেনা তার অথচ শ্বাশুড়ি জেগে থাকে। বেশ সকাল হলেও মিনতি একা একা জঙ্গলে ঢুকতে ভরসা পায়না আর । হাজার হোক নারী আর পুরুষের মধ্যে আদিম সম্পর্ক শিকারী আর শিকারের। নিজের অসহায়ত্বের কথা জানে বলেই মিনতি কোমরে ছুড়ি গুঁজে, কাস্তে আর ঝুড়ি নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। শ্বাশুড়ি ওঠার আগেই যদি কিছু রেঁধে দেওয়া যায় । বাশ আর লতাপাতার ঝোপে বেশ ঘন গ্রামের জঙ্গল। কিছু বুনো কলার গাছ আর ফাঁকে ফাঁকে কাটা শাঁক বা জংলা শাঁক। মাঝে মাঝে চোখ ঘুরিয়ে সতর্কভাবে শাঁক তুলছে মিনতি। ছোট ঝুড়ি যখন শাকে ভরে এল, ফেরার জন্য পিছনে তাকিয়ে দেখতেই মিনতি কেঁপে উঠল- পাড়ার বখাটে চারজন ছেলে নিয়ে অতনু দাঁড়িয়ে। এখানে শুধু শুধু আসার মত লোক অতনু নয়, তবে? ইঙ্গিত পরিষ্কার। হাতে কাস্তেটা শক্ত করে ধরে সামনের দিকে উচিয়ে ধরলো মিনতি।

    “ও বাবা, কাস্তেতে অনেক ধার মনে হয় বলে নিজের এক চ্যালার দিকে তাকিয়ে খিক করে হেসে দিল অতনু। কাস্তে দেখে যে ওরা দমে যাবেনা সে অতনুর হাসিতে স্পষ্ট। কোমরের ছুড়িটাতে হাত দিতেই ডাক এল,

    “মিনতি, ও মিনতি”।

    নিজের শ্বাশুড়ির গলা শুনে গায়ের সমস্ত জোড় দিয়ে মিনতি জবাব দিল,

    “এখানে মাআআআআআআ”।

    ঝুড়ি ফেলে এক হাতে কাস্তে আরেক হাতে ছুড়ি উচিয়ে পাশ কাটিয়ে শ্বাশুড়ির কাছে আসলেও শান্তি দেখলেন মিনতি ভীষনভাবে কাঁপছে। জংলার ভিতর দিয়ে অতনুদের যেতে দেখে মিনতির কাঁপনের কারণ বুঝে গেলেন শান্তি । মিনতির দিকে তাকাতেই মিনতি চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল অল্পের জন্য রক্ষা। নিথর হলেন শান্তি, এই ভয়েই সিটিয়ে থাকেন তিনি। একটা ভয়ের তীব্র স্রোত শরীর বেয়ে ওঠানামা করছে যেন, এই ভয়েই ঘুমাতে পারেন না। মিনতির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কুটিরে ফিরে এলেন। সারাদিন সারা রাত ভাবলেন । কখনো গালে, কখনো মাথায় হাত দিয়ে বিশ্ব সৃষ্টি রহস্য ভেদ তিনি করতে পারলেন না। যিনি হরিণ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কেন সিংহ সৃষ্টি করেছেন তা শান্তির মাথায় আসেনা। শাঁক পাতা খেয়েও তার শান্তিতে ঘুমানোর কোন উপায় নেই। মানুষ এত অসহায়- হরি, কোন পথ যে দেখিনা।

    পরের দিন তপন ঘোষের বাড়িতে মিনতিকে রেখে সারা দিন ধরে শান্তি অনেক ডালপালা এনে ঘরে জড়ো করলেন। ছোট ঘরের ফাঁকা জায়গা ও চৌকির নীচ শুকনো পাতা ডালে ভরিয়ে ফেললেন ।

    সন্ধ্যায় মিনতিকে যখন ফিরিয়ে আনলেন তখন সে এসে জিজ্ঞ্যেস করলো,

    ‘’মা, এত ডাল পালা কেন?’’

    ‘’নিত্য জঙ্গলে ঢোকার চেয়ে একদিনে নিয়ে আসাই ভাল।’’

    “চুলার পাশে রাখতেন”।

    ‘’শুনলাম বৃষ্টি হতে পারে, সেই জন্য ঘরেই আনলাম”।

    সন্ধ্যায় শান্তি নিজেই রান্না করলেন। জোড় করেই করলেন। শিল্পার কাছ থেকে নিয়ে আসা তেল দিয়ে কুপি জ্বালিয়ে রাতে মিনতিকে খাবার তুলে দিলেন। খেতে খেতেই শান্তির জিজ্ঞাসা-

    “তোর কি মনে হয় পর জনমে আবার পরশকে পাবি”?

    “এই জন্যই তো হরিনাম যপি মা, শুধু তাকেই যেন পাই, বারবার পাই”।

    “আমারও কেন জানি বিশ্বাস হরি তোকে ঠকাবেন না।

    ভাত হাতে আনমনা মিনতিকে দেখে শান্তি আবার জিজ্ঞ্যেস করলেন,

    কি রে খাচ্ছিস না কেন?

    মা, ও যে অলক্ষুনে কথা বলত,হরি যদি রেগে যায়?

    কি যে বলিস, তাকে কেউ স্বীকার করুক আর না করুক তাতে হরির কিছু যায় আসেনা। সবাই তার,তিনি সবার। কারো কথায় তিনি কেন কিছু মনে করবেন? তুই কিছু ভাবিস না।

    খাওয়া শেষ করেই মিনতি বলল- মা আমার ঘুম পাচ্ছে, খুব ঘুম পাচ্ছে। এমন তো হয়না।

    আজ তুই সারাদিন কাজ করেছিস,ঘুমিয়ে যা।

    রাত গভীর হয়। খুব শান্তিতে ঘুমাচ্ছে মিনতি। এত সুন্দর মায়া মুখে। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন শান্তি । ওরে তোর এত রুপ কেন রে মা, কেন এত মায়া তোর মুখে। বিছানার পাশ থেকে কুপিটা নিয়ে হাতে শক্ত করে ধরলেন শান্তি । চিত হয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে মিনতি। শান্তির হাত একটুও কাপলোনা। একটুও না। কাঁপার কথা নয়। এ যে মুক্তি দেয়া;মুক্তি পাওয়া । গুন গুন করে হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ হরে রামো করেই চলেছেন । অদ্ভুতভাবে এই নামযপ তাকে শান্ত আর ভাবলেশহীন রাখছে।

    কুপিটা বিছানার একপাশে রেখে মিনতিকে বুকে নিলেন শান্তি । নিথর কিন্তু মুখের মায়া একটুও কমেনি। মিনতির মাথাটা কাঁধের উপর নিয়ে হরে কৃষ্ণ হরে রাম যপে যাচ্ছেন আর মিনতিকে দোল দিচ্ছেন। শেষ কাজের আগে মিনতিকে একবার দেখে নেওয়ার সাধ হল শান্তির । নিজের দুইহাত মিনতির মাথার পিছনে দিয়ে নিজের মুখের নীচে নিলেন। “মা, ওমা , আমাকে ক্ষমা করে দিস,” বলে মিনতির গালে কপালে চুমু এঁকে দিলেন। শেষে মিনতিকে বুকে জড়িয়ে আকাশে থাকা হরির দিকে মুখ উচিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে বললেন,

    “যতবার জন্ম নেব, ও হরি, আমার মিনতিকে আমি যেন আমার বুকে বারবার পাই”।

    ০০০০

    ‘’মা আমি এ বাড়ি থেকেই সোজা শ্মশানে যাব।’’

    শান্তি মিনতির ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন।

    5
    4 Comments
    • গল্পের শুরুতেই চোখের কোনে একটু একটু জল জমতে শুরু করেছিল শেষটায় আর ধরে রাখতে পারলাম না! এই কান্নায় এক ধরনের সুখ আছে গল্পকার! এমন ব্যাথা আরো হাজার পেতে চাই! ভালোবাসা নেবেন!

    • গল্প হচ্ছে বাক্যের নিপুন খেলা; লিখে যাও; মজা পাবে।

    • হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া একটা গল্প। কান্নার বাষ্প জমা হচ্ছে চোখের কোলে।

Skip to toolbar