Profile Photo

হাসনাত সৌরভOffline

  • Hasnat21
  • Profile picture of হাসনাত সৌরভ

    হাসনাত সৌরভ

    3 years, 4 months ago

    মাখদুম
    হাসনাত সৌরভ
    —————————————–
    (প্রকাশিতব্য উপন্যাস, বইমেলা ২০২৩)

    গ্রামে মাঝে মাঝে দেখা দেয় দরবেশ। তাকে কেউ বলে হিন্দু, কেউ বলে মুসলমান। কেউ কেউ বলে, দরবেশের আবার জাত কি? সিদ্ধপুরুষের জাতের বালাই নাই। কেউ কেউ আবার তত্ত্বকথাও বলে। কিন্তু যে সে পাগল নয়! পরশমণির পরশ পেয়েছে, তাই পাগল হয়ে গেছে। সোনাদানার কোনো মূল্য তার কাছে নেই। আর জাতকুল তো তার কাছে সবই অলীক। সবই মায়ার খেলা।

    সকলেই তাকে ভয় পায়। ছেলেবুড়ো সকলের কাছে তার একটাই পরিচয়, পাগলা দরবেশ। কেউ কেউ বলে ‘রজত দরবেশ’। তার কোনো পরিচয় নেই, কোথায় বাড়ি, কোথায় ঘর কেউ জানে না। অথচ রজত নামটি কারা দিলো, কিংবা কি করে জানলো, সেটাও কেউ বলতে পারে না।
    এই নিয়ে মাঝে মাঝে তর্ক ওঠে। পঞ্চাশ বছরের বুড়োও বলে, সেই ছোটবেলা থেকে আমি তাকে একই রকম দেখে আসছি। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে যায় পঞ্চাশ বছর ধরে কেমন করে একই রকমের রয়ে গেছে!

    কেউ জানে না, নিজের পরিচয় দরবেশ নিজেই ভুলে গেছে। কেউ জিজ্ঞেস করলে মাঝে মাঝে এড়িয়ে যায় সে, মাঝেমধ্যে আনমনা হয়ে ওঠে। নামের একটা আওয়াজ কানে ভেসে আসে। কোনো এক সুদূর অতীতের ছবি ভেসে ওঠে চোখে। কিছুই মনে পড়ে না। অনেকক্ষণ কান খাড়া করে চুপ করে বসে থাকে । তারপর মাথাটা ঝাড়া দিয়ে ওঠে।

    হ্যাঁ, নাম একটা ছিল বৈকি! ওরা যার যা খুশি তাই বলে ডাকে- দরবেশ, আউলিয়া, পাগলা ফকির, সাধুবাবা। সকলেরই নাম আছে। নাম? এ যে এক একটা ছাপ! নামের ছাপেই মানুষের পরিচয়। তার কি কোনো নাম নেই! নাম আছে বলেই সুনাম আর দুর্নাম।

    বিকট শব্দে হাসে দরবেশ, বেশ হয়েছে। তার কোনো নাম নেই। জাগতিক সুনাম আর দুর্নামের বাইরে সে! তাতেই ভালো হয়েছে। আপন মনে ভাবতে থাকে দরবেশ, সত্যি কি সে সিদ্ধপুরুষ? লোকগুলো বড় বিরক্ত করে। এক একবার রাগে ফেটে পড়ে দরবেশ। ওরা তার দয়া চায়! তার দয়ায় না কি সব বিপদ কেটে যায়?

    “দূর! দূর! সব হট্ যাও!”

    রাতের অন্ধকারে তার হুঙ্কার শোনা যায়। নদীর বাঁকে বড় শহর। শহর থেকে মুরারিচাঁদ কলেজের দিকে একটা সড়ক চলে গেছে। সেই সড়কের দুপাশের বাড়িগুলোর লোকজন রাত্রে দরবেশের চিৎকার শুনতে পায়, “সব ঝুট্ হ্যায়, সব ঝুটা হ্যায়! গর্দান লেয়েঙ্গে, হাম দুনিয়াকা মালেক, দিল্লীর বাদশা, খবরদার! খবরদার!”

    ঘুমন্ত শিশু আঁতকে ওঠে। মায়েরা হাত জোড় করে প্রণতি জানায়। মুসলমানেরা হাত তুলে খোদার দয়া ভিক্ষা করে। দরবেশের আগমনবার্তা এই হুঙ্কার। বিশ্বাসীরা বলে, জবরদস্ত সাধু, সিদ্ধপুরুষ। অমঙ্গল দূর করতেই দেখা দিয়েছে দরবেশ। কোথায় থাকে আর কোথা থেকে আসে কেউ জানে না। মাঝে মাঝে আসে, মাস দুয়েক থাকে, আবার কোথায় উধাও হয়ে যায়।

    দরবেশের সম্পর্কে নানা জনে নানা কথা বলে, অবিশ্বাস্য-আজগুবি সব গল্প।

    সুবহান উকিলের মুহুরি গিরিলাল সরকার দরবেশের নাম শুনলেই হাত জোড় করে প্রণাম জানায়, “ওরে বাবা! যে সে মানুষ নয় এই দরবেশ! বহু ভাগ্যে এমন মহাপুরুষের দর্শন মেলে! সেবার কী হলো, জানো? সুনামগঞ্জে লাগল ওলাউঠার মড়ক। ঘরে ঘরে লোক মরছে। বৈঠাখালি ঘাট আর টেকেরঘাটে নদীর ধারে চিতার পর চিতা জ্বলে। মড়ার পর মড়া। শেষকালে এমন ছাড়াল যে কোনো কোনো বাড়িতে রোগীর মুখে জল দেবার পর্যন্ত লোক নেই। মড়া দেখতে দেখতে সবাই কাঠ মেরে গেছে। এমন কি ছেলে চোখের সামনে মরে যাচ্ছে, মায়ের চোখে জল নেই। কাঁদবে কি করে? ডাক্তার কবিরাজ সব নাজেহাল। কোর্ট কাছারি বন্ধ। স্কুল মক্তব বন্ধ। এমনি এক নিশুতি রাতে রজত দরবেশের জিগির শোনা গেল, হুশিয়ার! সব ঝুটা হ্যায়, বিলকুল সব ঝুটা হ্যায়, হাম দুনিয়াকা মালেক! আজব কাণ্ড! অমনি পরদিন থেকেই মড়ক বন্ধ হলো। চিতার আগুন নিভলো। লোকের মুখে হাসি ফুটলো।”

    হাটবাজারে-মজলিসে এমনই গল্প চলে। গিরিলালের গল্প দিনে কম করে তিনবার করে সবাই শোনে আর ভয়ে বিস্ময়ে তাদের গা যেন কাঁটা দিয়ে ওঠে।

    কোন ভূতকে কোন দিন জব্দ করেছিলো, কোন ব্রহ্মদৈত্যর সঙ্গে তার হাকালুকি হাওরে নিশীথ রাতে মুলাকাত হয়েছিল, তার গল্প ফাঁদে। সেই নৌনিহাল রায় গিরিলালের গল্প শুনে মন্তব্য করে, “যা বলেছো সরকার মশাই! দরবেশবাবা যে সে মানুষ নয়। এক্কেবারে পরমহংস, কিছুতেই ধরাছোঁয়া দেন না।”

    গিরিলাল সরকার বলেন, ‘তা আর কি বলবো। সুনামগঞ্জের ঘটনা তো আমার স্বচক্ষে দেখা। সুকমল ডাক্তারের জোয়ান ছেলেটা তো একপ্রকার মরেই গিয়েছিলো, শুধু ঘর থেকে বের করা বাকি! অমনি শোনা গেল, দরবেশের জিগির! আর যায় কোথায়? সেই মরা ছেলে তৎক্ষণাত ধড়মড় করে উঠে বসলো। নিজের চোখে দেখলাম নৌনিহাল! সে তো অবিশ্বাস করতে পারব না হে!”

    নৌনিহাল রায় গদগদ হয়ে মাথা নাড়ে।

    গিরিলাল সরকার আরো বলতে থাকেন, “আর এক কথা। জানো তো, দরবেশ কিন্তু বেশিদিন এক জায়গায় থাকে না। আজ হয়তো জিন্দাবাজারে, কাল দেখবে হাওয়াপাড়ায়। পরশু শ্রীমঙ্গল, এরপর কলকাতায়, তার পরের দিন দিল্লি। হিল্লিদিল্লি উনি চোখের নিমেষে পরিক্রমা করে আসতে পারেন।”

    নৌনিহাল রায় মাথা নেড়ে সায় দেয়, “আমার ভায়রাভাইও একথা বলে। কলকাতার সাহেবরাও দরবেশকে দেখলে মাথার টুপি খুলে সেলাম জানায়।”

    “তা জানাবে না? রেসের টিপ বলে দেয় যে! জানো শীতকালে দরবেশ কলকাতায় উধাও হয়। সেখানে বড়দিনে রেস খেলা হয় কিনা?”

    “রেস? সে আবার কি সরকার মশাই?”

    “আরে ঘোড়দৌড়। যে ঘোড়া জিতবে তার নাম বলে দেয়।” উত্তেজিত গলায় বলে গিরিলাল।
    দেখতে দেখতে আরো দুচারজন জমায়েত হয়। আড্ডা বড় হয়। ব্যবসায়ী মতিলাল বাড়ুয্যে বলে, “হ্যাঁ শুনেছি বটে, ঘোড়দৌড় খেলে অনেকে ফতুর হয়। আবার অনেকে একদিনে রাজা হয়ে যায়।”

    এমনি কত কথা কত গল্প কাহিনি চলে দরবেশের নামে! দরবেশকে কেউ তার নাম জিজ্ঞেস করলে হো-হো করে হেসে ওঠে। তারপর ক্ষেপে গিয়ে গায়ে থু-থু দেয়, ধুলোবালি তুলে ছুঁড়ে মারে, “কী বললি আমার নাম? নাম কীরে হতভাগা? নামটা কি তোর সঙ্গে যাবে? দেখবি, সব ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে।” রাগে গরগর করে ওঠে সে। তারপর সেই বিকট হাসি হাসে, রজত দরবেশ! আচ্ছা নাম দিয়েছে সব হারামির দল!

    দিনের বেলায় দরবেশ বড় রাস্তায় তেমন বের হয় না। কোথায় লুকিয়ে থাকে কেউ জানেও না। সকলেরই ধারণা টিলাগড়ের জঙ্গলে দরবেশের আস্তানা। কোনো কোনো দিন ছায়াবীথির রাস্তার ধারে যে বটগাছটা আছে তার তলায় তাকে বসে থাকতে দেখা যায়। তারই খানিকটা দূরে সাদা রঙের একটা পাকা বাড়ি। ওই বাড়িটার দিকে দরবেশ এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। আর আপন মনে বিড় বিড় করতে থাকে। দরবেশের কাছে বড় কেউ ঘেঁষে না। সকলে ভয় করলেও ভয় করে না শুধু এক বুড়ি, দীপনের মা। কিন্তু দীপন বলে কেউ ছিল কিনা কেউ জানে না। বুড়িই দরবেশকে ভাত এনে দেয়, কাছে বসে খাওয়ায়।

    শহরের উত্তর অঞ্চলে নতুন নতুন ঘরবাড়ি উঠেছে। এখানে আগে একটা জঙ্গল ছিল। ওটা সোজা টিলাগড়ের দিকে চলে গেছে। জঙ্গলের পরই টিলার পর টিলা। ফাঁকে ফাঁকে ঘর। ছায়াবীথিপল্লী নাম দেওয়া হয়েছে এর।

    ঠিক মাঝখানে সাদারঙের একটা বাড়ি। তার আশেপাশে আরো কয়েকখানি বাড়ি গড়ে উঠেছে। এক সময়ে বনেদি জমিদার কল্লোল রায়বাহাদুর এই পল্লীর পত্তন করেছেন। এখানে বাড়ি করা বড় গর্বের কথা। যে সে লোক এখানে বাড়ি করতে পারে না, পয়সাকড়ি আর হিম্মতওয়ালা হতে হয়। সত্যিই ছায়াবীথির বাহার আছে! আয়তক্ষেত্রের মত চারপাশে চওড়া রাস্তা। রাস্তার পাশে কদম, নিম আর দেবদারু গাছ। ঠিক দক্ষিণ ঘেঁষে মিউনিসিপ্যালিটির বড় পাকা রাস্তা।

    সাদারঙের বাড়িটার একটা ইতিহাস আছে। এক বিধবার পুরনো বাড়ি ভেঙে তৈরি করা হয়েছে এই রাজকীয় ভবন। বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায় এর আভিজাত্য। শহরতলীতে এরকম বাড়ি সহজে চোখে পড়ে না। চারপাশে অনেকখানি খোলা জায়গা, নানা ফলফুলের গাছভর্তি বাড়ির প্রশস্ত আঙিনা, বিলেতি কায়দায় সাজানো। মাঝখানটায় ত্রিকোণ ক্ষেত্রের ভেতরে নানারঙের গোলাপের টব বসানো। নানা ধরনের মোটর গাড়ি প্রায়ই এ বাড়ির আঙিনায় এসে থামে।

    দরবেশ সমস্ত শহরটায় উন্মত্তের মত ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এখানে এলেই তার উগ্র কঠিন চোখদুটো কেমন যেন শান্ত ও সজল হয়ে পড়ে। রাস্তার ধারের বিরাটকায় বটগাছের কাছে এসেই থেমে যায় সে। বাড়িটার দিকে তাকায়, তারপর গাছের তলায় বসে পড়ে। বাড়ির ভেতর থেকে কখনো রেডিও, কখনো পিয়ানোর মূর্ছনা ভেসে আসে। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দরবেশ কখনো বা হাসে, কখনো বা বিড়বিড় করতে থাকে। তাকে এমন শান্তভাবে অন্য কোথাও বসে থাকতে দেখা যায় না।

    অবশ্য আরেকটি জায়গা আছে, পীরের দরগা। তীর্থস্থানের মতই পুণ্যভূমি। নদীর ধার থেকে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেছে একটা বড় রাস্তা। রাস্তার পাশে বড় বড় গাছ, একপাশে খেলার মাঠ। মাঠ পেরিয়ে সরকারী স্কুল, তারপরই পীরের দরগা। বড় বড় ঝোঁপঝাড় দরগাকে গ্রহরীর মত ঘিরে রয়েছে। সাদা চৌকোণা উঁচু পাকা চত্বরের উপর সাদা পাথরের তৈরি মস্ত বড় বেদি। পাঁচটা বেদি। ছায়াঘেরা বনের মাঝখানটা আলো করে যেন পাঁচজন সাধু ধ্যানমগ্ন। দিনের বেলায়ও এখানে কেমন নির্জনতা।

    পীরের দরগায় সন্ধ্যা থেকেই জ্বলে আলো। সারি সারি মোমবাতি জ্বেলে দেয় খাদেম ইছাদ মিয়া। পাশেই তার দোকান। তারই দোকানে মোমবাতি কিনতে পাওয়া যায়। অনেকেই মোমবাতি কেনে, জ্বেলেও দিয়ে যায়, কেউবা পয়সা জমা দিয়ে যায়। যারা বাতি দেয় তাদের মনে ভক্তির চেয়ে আতঙ্কই বেশি। এখানে এলেই গা ছমছম করে। অজানা আতঙ্কে শিউরে ওঠে গা। অনেকেই একথা বলে। তবে সেখানেও দরবেশ এমন চুপ করে বসে থাকে না। দরগার বেদির চারদিকে উন্মাদের মত ঘোরে হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে।

    লোকের ধারণা, পীরের দয়ায় সাফল্যমণ্ডিত হবে জীবন। সবারই যে কামনা-বাসনা কিংবা প্রার্থনা থাকে তা নয়, অনেকে ভয়েও মোমবাতি জ্বেলে দেয়, পাছে পীর তাদের অনিষ্ট করেন! এ যেন ভাবে নয়, ভয়েই ভক্তি। হিন্দু-মুসলিম কেউ বাদ যায় না। বড় সাহেবরা পর্যন্ত দরগার সামনে মাথার টুপি খুলে হাতে নেয়। জবরদস্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাস বিলেতি সিভিলিয়ান, তিনিও নাকি পীরের দরগার পাশ দিয়ে যেতে মাথা নুইয়ে সেলাম জানাতেন। তাঁর মেমসাহেব তো রোজ দশটা করে মোমবাতি নিজের হাতে জ্বেলে দিতেন, যদিও ভক্তিতে না, ভয়ে। স্বামীর মঙ্গলের জন্য।
    এমনি কত গল্প শোনা যায়। হয়তো এখানে এককালে কোনো পীরের আস্তানা ছিল, কিংবা সমাধি। তারই যদি এতো মাহাত্ম্য হয়, তাহলে রায়েক দরবেশের অলৌকিক শক্তিকে উড়িয়ে দেবার উপায় নেই। ইনি মহান পীর, আউলিয়া। পাগলের ভান ধরে লোকের চোখে ধুলো দিয়ে বেড়ান।

    সাধারণত কেউ দরগায় ঢুকতে সাহস করে না। যারা বাতি দিতে আসে, ইছাদ মিয়ার হাতেই বাতি জ্বেলে দিয়ে চলে যায়। দরগার গাছে গাছে ভূতপ্রেতের আখড়া। তারাই নাকি পাহারা দেয়। কিন্তু দরবেশের ভয়ডর নেই। গভীর রাত পর্যন্ত বড় বকুল গাছটার তলায় বসে থাকে সে। আর মাঝে মাঝে হাতে মোমবাতি নিয়ে চক্কর দেয়।

    রাত বাড়লে লোকজনের যাতায়াত কমে যায়। ঝপাঝপ পটাপট আওয়াজ শোনা যায় গাছের পাতায় পাতায়, ডালে ডালে। ঝুপঝাপ করে কারা যেন এগাছ-ওগাছ লাফিয়ে বেড়ায়। জ্যোৎস্নারাতে কেউ কেউ তালগাছের মাথায় ধবধবে দাড়িওয়ালা মূর্তিও নাকি দেখেছে। কচি ছেলের কান্না তো প্রায়ই শোনা যায়।

    জিন্দাবাজারের যুকিতন মহাজনের অগাধ ভক্তি পীরের প্রতি। তার এই জমজমাট কারবারি নাকি পীরেরই কৃপায়! সেখানে প্রায়ই এই দরগার বিস্তৃতি নিয়ে আলোচনা বা তর্কবিতর্ক চলে। একজন বলে ওঠে, কচি শিশুর কান্না নয়, ওটা প্যাঁচার ডাক। আর একজন উত্তেজিত হয়ে উত্তর দেয়, কে বলে প্যাঁচার ডাক? আমার যে স্বচক্ষে দেখা। তালগাছের মাথা থেকে বাচ্চাগুলোকে ছুঁড়ে দেয়।

    যুকিতন মহাজন হঠাৎ হাতজোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলতে থাকেন, “এ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলে না। শরনপালের বেত্তান্তটা মনে করে দেখুন। তার এ অবস্থা কেন? আজ তাকে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখছেন, পঙ্গু, অন্ধ, ভিক্ষা চাইছে। কিন্তু আসল বেত্তান্ত সকলে জানে না। এই এলাকার কুখ্যাত ডাকাত ছিল সে। এক রাতে ডাকাতি করে বাড়ি ফেরার সময় দরগার সামনে আসতেই শুনল দরবেশের হুঙ্কার। তৎক্ষণাৎ মূর্ছা গেল সে। ভোরবেলায় বেহুঁশ অবস্থায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ল। সেই থেকে কেমন যেন পঙ্গু হয়ে গেল শরনপাল, মুখে আর রা নেই। কেমন যেন বোবা-কালা হয়ে পড়েছে। এখন চোখেও আর দেখতে পায় না।”

    শরনপালের গল্প শুনে অনেকেই আঁতকে ওঠে। যুকিতন আরো বলেন, “ন্যায় অন্যায় কোনো কিছুই দরবেশ বাবার চোখ এড়ায় না! শাস্তি পেতেই হবে। শরনপাল গর্হিত কর্ম করেছে, তাই তার এ শাস্তি।”

    সামান্য মুদির দোকান ছিল যুকিতনের। যুদ্ধের সময় সৈন্যদের জন্য চাল সরবরাহ করতেন। পাঁচশো মণ চালের জন্য বিল তৈরি হতো পাঁচ হাজার মণের। তার উপর সেই পঞ্চাশের মন্বন্তর, মহা আকাল। তার চালের কণা সোনার দামে বিক্রি হয়েছে। সবই দরবেশ বাবার কৃপায়। বারবার কপালে করজোড় ঠেকিয়ে চেহারায় কৃতজ্ঞতা ফুটিয়ে আনেন যুকিতন মহাজন।

    এখন তার ব্যবসার ভোল পাল্টে গেছে। নানামুখী কারবার। আছে কফি হাউজও। সেখানে কলেজের ছাত্রদের ভিড় জমে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলে। শহরে সিনেমা হল ছিল না। যুকিতন মহাজন সে অভাবও পূরণ করে দিয়েছেন। তার সিনেমার ঘর “ছায়াছবি” সন্ধ্যায় ঝলমল হয়ে ওঠে।

    মাঝেমধ্যে এক পাগলকে দেখা যায়। লোকে বলে এটা যুকিতন মহাজনেরই চাচাতো ভাই। চাচা মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভাইকে ঠকিয়ে যুকিতন মহাজন সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে করে নেয়। ছেলেটাকে লেখাপড়া ছাড়িয়ে দোকানের কাজে লাগায়। দিনরাত অমানুষিক অত্যাচার আর নির্যাতনে সে এমন পাগল হয়ে গেছে।

    দরবেশ শহরের পথে টহল দিতে দিতে যুকিতন মহাজনের গদির সামনে এসে দাঁড়ান। গায়ে তালি দেওয়া লম্বা আলখাল্লা। হাতে ত্রিশূলের মত একটা লাঠি। মাথায় জটাজটা চুল। মুখে লম্বা গোঁফদাড়ি। দেখলে ভয়ই হয়। হুঙ্কার ছাড়েন তিনি, “হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার!” যুকিতন মহাজন ঠকঠক করে কাঁপতে থাকেন।

    ——————————————————–
    #উপন্যাসের টুকরি
    @হাসনাতের হস্তাক্ষর

    5
    5 Comments
Skip to toolbar