-
অবসান
বাড়ির নাম্বার মিলিয়ে নিশ্চিত হয়ে এবার ডোর বেলে পরপর দুটো চাপ দিয়ে মিনা আর মেঘ মুখোমুখি দাঁড়ায়। চোখে চোখ রাখে।
– মেঘ
– হুঁউ
– তোমার কি খুব নার্ভাস লাগছে ?
– একটু একটু।
ঠিক এমনি সময় ঘরের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন স্নিগ্ধ সুন্দর মায়াবী চেহারার পঞ্চাশ পেরুনো এক মহিলা। নীল পেড়ে ঘিয়ে রঙের টাঙ্গাইল শাড়ি পরনে। দুহাতে দুগাছি চুড়ি, গলায় হালকা চেইনের সাথে ছোট্ট লকেট ঝোলানো। ঢেউ খেলানো কোঁকড়া চুলগুলোতে মাঝে মাঝে রূপালি আভা। ছিপছিপে গড়ন, বয়সের বাড়তি মেদের বাহুল্য নেই এতটুকু। বিস্ময়মাখা চোখের দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন
– কে ? কাকে চাই ?
মিনার সালাম জানিয়ে বললো
– এখানে কি সিতারা বেগম থাকেন ?
– আমিই সিতারা
দুকদম এগিয়ে এলো মিনার
– আমরা ঢাকা থেকে আসছি। শুধু আপনার সাথে দেখা করবো বলে।
– কোনো প্রয়োজন ?
আমতা আমতা করে বললো মিনার
– ভেতরে বসে বলি ?
আর একবার তাকালেন সিতারা মিনারের দিকে। দৃষ্টি নিবন্ধ রেখেই বললেন
– আসুন।
সাজানো গোছানো ছোট্ট ঘরটির দেয়াল ঘেসে
এক সেট সোফা আর অনতি দুরে একটা ডিভান। সেন্টার টেবিলে রাখা ছোট্ট ফুলদানিতে কয়েকটি সাদা ফুলের গুচ্ছ।
ওদের মুখোমুখি বসলেন সিতারা বেগম। মিনার অবাক বিস্ময়ে মেঘের নীরবতা দেখছে। মাথা নিচু করে ওড়নার কোনে আঙ্গুল জড়িয়ে চলেছে। অথচ এই সিতারা বেগমকে খুঁজে পাওয়ার জন্য কি ব্যতিব্যস্তই না করেছে মিনারকে প্রতিটা দিন। এবার চোখ তুলে চাইলো মেঘ।
সিতারা বেগমও যেন বাকহারা হয়ে পড়েছেন। মেঘের সামনে বসে একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে দেখছেন শুধু। মিনার মৌনতা ভেঙ্গে বললো মেঘকে উদ্দেশ্য করে
– সময় কিন্তু হাতে বেশি নেই। ফিরতি ট্রেনেই আমরা যাবো।
ঘোরটা কেটে যায় সিতারা বেগমের। ভ্রু কুঁচকে তাকান মিনারের দিকে কথার জের লক্ষ্য করে। মিনার আবার বলে
– ঠিকানাটা খুঁজতে বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। তাই সময়ের কিছুটা অপচয়। আমার ভুমিকা এপর্যন্তই। এবার মেঘের পালা। সিতারা বেগমের মলিন নিস্প্রভ চোখদুটি মুহুর্তে ঝলমল করে উঠলো।
– মেঘ !!!
একাধারে নিশ্চুপ থাকা মেঘের ঠোটের কোনে এবার বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। ধীর কন্ঠে বললো
– হ্যাঁ মেঘ, ইমরান কন্যা মেঘ, মীর্জাপুরের মেঘ। অনেক অনেক বছর আগে যাকে পায়ে মাড়িয়ে চলে এসেছিলেন। সন্তানকে বিসর্জন দিয়ে কতটা সুখে আছেন দেখার বড্ডো সাধ ছিল। দেখলাম।
সিতারা বেগমের চোখদুটো মেঘের ভর্ৎসনায় ম্লান হবার বদলে আনন্দে চকচক করে উঠলো। ত্বরিতে উঠে দাঁড়িয়ে মেঘের চিবুক তুলে অপার আনন্দে বলতে লাগলেন
– মেঘ, এসেছিস। আমি তো এদিনটির অপেক্ষাতেই ছিলাম। এতো বড়টি হয়ে গেছিস।
মেঘের বুকের ভেতরের জমানো কষ্টগুলো যেন গলে গলে পড়তে চাইছে সিতারা বেগমের স্নেহের স্পর্শে। লুটিয়ে পড়তে চাইছে মুখটি সিতারা বেগমের বুকের মধ্যে। অনেক কষ্টে সংবরণ করলো নিজেকে। না, এতো অল্পতে হেরে গেলে চলবে নাতো। তার পঁচিশ বছরের বিড়ম্বনা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য এক নিমিষেই উবে যেতে দেয়া যাবেনা। মেঘ কিছেুতেই ভুলবেনা, ভুলতে চায়না। ঠোঁটে দাঁত চেপে ঢোক গিলে গলায় অটকে থাকা কষ্টের দলাটাকে আবার বুকে ভেতর রেখে দিল। চিবুক থেকে সিতারা বেগমের হাতটি সরিয়ে দিতে দিতে বললো
– এমন স্নেহের স্পর্শে আমি অভ্যস্ত নই।
এরপর হাত ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে মিনারকে তাড়া দেয়
– এবার চলো ফিরতি ট্রেনটা ধরতে হবে যে।
সিতারা বেগমের দুচোখে অঝোর ধারা নামে। কাঁপা কন্ঠে অনেক কষ্টে উচ্চারণ করেন
– এই কটি মুহুর্তে আমার সুখের পরিমাপ কি সত্যি করতে পারলি মেঘ ? ভিতর থেকে ঠেলে আসা উত্তেজনায় ঘেমে নেয়ে উঠেছে মেঘ ততক্ষণে। সিতারা বেগমের প্রশ্নকে পিছনে ফেলে বেরিয়ে আসে দ্রুত। তারচে দ্রুত গতিতে এসে পথ আগলে দাঁড়ালেন সিতারা বেগম কান্না ভেজা কন্ঠে বললেন
– প্রশ্ন যখন করেছিস তার জবাব না নিয়েই চলে যাবি ? আমি তো তা হতে দিতে পারিনা মেঘ।
মেঘ কিছু বুঝে উঠবার আগেই এক রকম হ্যাঁচকা টেনেই ভেতরের ঘরে নিয়ে গেলেন সিতারা বেগম। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে মিনারও তাদের অনুসরণ করলো উপায়ান্তর না দেখে। হালকা চাদর গায়ে শুয়ে আছেন বিছানায় কোনো একজন। চারপাশের পরিস্থিতি দেখে সহজেই ধারনা করা যায় তিনি অসুস্থ। শরীরের বিভিন্ন অংশে নলের সংযোগ। পাশের সেলফগুলিতে বিভিন্ন ডাক্তারি সরঞ্জাম সাজানো যেন ছোটখাটো একটি ক্লিনিক। সিতারা বেগম নিশব্দে চোখ মুছলেন শাড়ির আঁচলে। সামনের সোফাটা দেখিয়ে বসতে ঈশারা করলেন। বললেন
– মেঘ তুই আমার কাছে আজ যে কৌতুহল নিয়ে ছুটে এসেছিস আমিও একদিন এই মানুষটির জন্য ছুটে এসেছিলাম অন্তরের তাড়নায় আর কর্তব্যবোধে। পঁচিশটা বছর তোর অপেক্ষা আর আমার অপেক্ষা একই। শুধু প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন।মিনার মন্ত্রমুগ্ধের মত সিতারা বেগমের ফেলে আসা দিনগুলির কথা শুনতে শুনতে নিজেও ফিরে যায় সেই দিনগুলিতে যখন থেকে সে মেঘকে চিনতে শুরু করেছিল।
ভার্সিটিতে ফাইনাল ইয়ার তখন আর দশটা ক্লাশমেটের মত মেঘও ছিল একজন। ভার্সিটির নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যে প্রকৃতিকে ভালবেসে দল বেধে উঁচু টিলা বা শাপলা ফোটা পুকুরের ঘাটলায় হামেসা আড্ডায় মেতে উঠতো ওরা। কখনো বা মুক্ত মঞ্চের বিশাল খোলা আঙিনায় বন্ধুদের সাথে বাদামের খোসা ভাংতো কোলাহলে মুখরিত হতে হতে।
ফাইনাল পরীক্ষার আগের কটি মাস ক্লাশ সাসপেন্ড। দল ছুট হয়ে মুখ বুজে পড়া আর পড়া। গ্রুপের সবচেয়ে ফাঁকিবাজ ছিল মিনার। নোট আর প্রশ্ন সিলেকশান করতে গিয়ে দেখে অগোছালো, অসম্পূর্ণ। সিলেবাস মিলাতে গিয়ে টের পায় ফোর্থ পেপার তো বেমালুম হাওয়া। একটা নোটও তেমন ভাবে তৈরি নেই। চাঁদির চুল খাড়া হবার জোগাড়। পরদিন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী। বই ঘাটতে ঘাটতেই দিন পার। চোখে সরষের ফুল। অনুপ, শাহিদ, রত্না, জয়ন্ত কাউকেই পাওয়া গেলনা হলে। সবাই নোট পত্র গুছিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান নিয়েছে। মায়ের হাতের রান্না আর যত্ন আত্তিতে আয়েস করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিবে বলে। মিনারের মেজাজটা খিচিয়ে ওঠে –
ধুত্তোরি তার কপালে হলের প্লেট ধোয়া ডাল আর কড়কড়ে ভাতই বরাদ্দ। ঐ খেয়ে খেয়েই পেটে চড়া ফেলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে, নাহয় সব ছেড়ে ছুড়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে গ্রামের বাড়ি রওনা। এসব ভাবতে ভাবতেই আনমনে হলের দিকে যাচ্ছিল মিনার।
– এই মিনার, দাঁড়া।
পেছন থেকে চেনা ডাক এবং হাতে চাঁদ পাওয়ার মতই তড়াক করে ঘুরেই চিৎকার।
– মেঘ তুই ? এখনো হলে আছিস, বাড়ি যাসনি ?
– কেন দেখে চিনতে পারছিসনা ?
– কথা পেঁচাসনা মেঘ, খুব বিপদের মধ্যে আছি।
ভ্রু বাঁকিয়ে মেঘ তাকায় মিনারের মুখের দিকে। এবার সত্যি সত্যি সিরিয়াস হয়। লাল সুরকি বিছানো পথ থেকে সবুজ গালিচা মোড়া ঘাস মাড়িয়ে আর একটু এগোয়। ছায়া সুনিবিড় গাছ গাছালির এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে জুটিরা কিংবা বন্ধুদের নিয়ে অনেকে। কড়ই চাতালটা ফাঁকা দেখে নিজে বসে পড়লো মেঘ।
– মিনার বস। এবার শুনি কি সব বিপদ টিপদ বলছিলি।
মিনার বাধ্য ছেলের মত পাশে বসে হাতের ফাইল খুলে সিলেবাসটা মেলে ধরলো। যার বেশির ভাগ চ্যাপ্টারের পাশে লেখা “অসম্পূর্ণ”। মেঘ দুচোখ কপালে তুলে বললো
– করেছিস কি এতদিন ?
– জ্ঞান দিবিনা মেঘ। পারলে নোট পত্র দে। ফটো কপি করে নেব। নাহলে চল্লাম গ্রামে চাষাবাদ করে খেতে হবে।
মিনারের বলার ভঙ্গি দেখে মুখটিপে হাসে মেঘ
– আহা কি আবদার।
এরপর প্রায়ই ওদের দেখা হয়, কখনোবা প্রতিদিনই। মেঘের রুমমেট দুজন চলে যাবার পর পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে যে একাকিত্বে মেঘের দিনগুলি কাটছিল, মিনারকে পেয়ে তা যেন পুষিয়ে গেল। শুধু পুষিয়েই গেলনা, এক সময় ওরা দুজনেই আবিস্কার করলো – দিনে অন্তত একবার দেখা না হলে মনটা বড় উচাটন থাকে। আর কি আশ্চর্য একটানা খাটাখাটুনির পর মিনার কিছুদিনের মধ্যে পড়াশোনার গতিটা মেঘের কাছাকাছি করে ফেললো। যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি বিষয়ের ওপর নতুন নোটগুলি পেল চমৎকার আঙ্গিকের ধারা।
সেদিন লাইব্রেরীর সিঁড়িতে বসে একটা বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মিনার হঠাৎ উল্লসিত হয়ে বললো
– আর ভবনা নেই। মেঘ চল বাড়ি ঘুরে আসি। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলে তো ম্যারাথন চলবে। মেঘ ব্যাগের নোটগুলো গুছাতে গুছাতে বললো
– এমন ভাবে বলছিস যেন তোর আমার একটাই বাড়ি।
– কথাতো সেটা নয়। যে যার বাড়ি গিয়ে গুরু জনের দোয়া নিয়ে আসি।
– তুই ঘুরে আয় মিনার।
– আশ্চর্য তুই যাবিনা ?
– নাহ্ , দোয়া ছাড়াই যখন এতোদুর এসেছি বাকিটাও যেতে পারবো।
পরে মিনার সব জেনেছে মেঘের কাছ থেকে একে একে। মেঘের বাড়িতে আছেন বাবা, বিমাতা আর বৈমাত্রেয় দুটি ভাই বোন। সেই ছোট্টটি থেকে সৎ মায়ের অবহেলা বিরক্তি আর অযত্ন সাথে করে বড় হয়েছে মেঘ। বাবা সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান করে এড়িয়ে চলেছেন। মাস শুরুতে টাকা পাঠান আর মাস শেষে মেঘ চাহিদার কথা জানায়। বাবা মেয়ের সম্পর্ক এতেই সীমাবদ্ধ। ঈদ পার্বনে কিংবা অঘোষিত ছুটির ঘন্টায় হল ভ্যাকেন্ট হয়ে গেলে মেঘ বাড়ি যেতে বাধ্য হয়। গাত্র দাহ শুরু হয় সৎ মা এবং ভাই বোনদের। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সময়গুলো অতিবাহিত করে মেঘ। এক সময় ফিরেও আসে তার একার ঠিকানায়। এই হল মেঘের বর্তমান জীবন নামচা। ধীরে ধীরে মিনার দূর্বল হয়ে পড়ে মেঘ নাকি মেঘের কষ্টের জীবনটার প্রতি। এক সময় অনুভব করে মেঘও পরম নির্ভরতায় তাকে আঁকড়ে ধরেছে অবচেতনে।
পরীক্ষা শেষ হয়। এবার ফেরার পালা। না, ঐ যন্ত্রনা পুরিতে আর ফিরতে চায়না মেঘ। ফিরতে দেবেনা মিনারও। খুব সাধারণ ঘরের ছেলে মিনার। টিউসনি করে নিজের খরচ চালায়। গ্রামে মামাদের সংসারে থাকা বিধবা মায়ের হাতে কিছু গুঁজেও দেয় উদ্বৃত্ত থাকলে। মিনার মেঘের সম্পর্কটা বন্ধু মহলে রাষ্ট্র হয়ে গেলে ওদের সহায়তায় একটা বিদেশি কম্পানিতে চাকরি জুটে যায় মিনারের পরীক্ষার পরপরই। কোর্ট ম্যারেজটাও চট জলদি সেরে ফেলে। আবাসনের সমাধান হয়ে যায় একই ছাদের নিচে। রেজাল্টের পর চাকরিতে আর এক ধাপ উন্নতি। আরও একটু বাড়তি সুখ আরও স্বাচ্ছন্দ্য। একটু একটু করে সংসারটা সেজে ওঠে। তারপর একদিন আরও নতুন কিছু নতুন খবর। রিপোর্টটা হতে নিয়ে মিনার খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। মেঘের কানের কাছ মুখ অথচ চিৎকার করে বলে ওঠে
– “মেঘ তুমি মা হচ্ছো !”
মেঘও মিনারের কানটা টেনে ফু দিয়ে বলে
– আর তুমি বাবা।
হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়ে দুজনে। “নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়” এভাবেই কাটছিল দিন। কিন্তু নতুন খবরের আগমনে মেঘের শরীরটা আজকাল ভাল থাকেনা, তার চেয়েও ভাল থাকেনা মন। মিনার যতটুকু পারে শাসনে সোহাগে সঙ্গ দিয়ে মেঘের কষ্টগুলো শেয়ার করতে চেষ্টা করে। কিন্তু মেঘ বদলে যেতে থাকে একটু একটু করে। ছুটির দুপুরে পাশ ফিরে মেঘ শুয়েছিল চুপচাপ। বালিশে ছড়ানো কালো কোকড়ানো চুলগুলির ফ্যানের বাতাসে উড়াউড়ি দেখতে দেখতে মিনার টের পায় মেঘের দীর্ঘশ্বাস চাপা কান্না। মিনার ব্যস্ত হয়ে মেঘের দুবাহু চেপে নিজের দিকে ফেরায়
– মেঘ কি হয়েছে দুঃস্বপ্ন নাতো ?
মেঘ উঠে বসে। মুখটা তুলে ধরে মিনার
– শরীর বেশি খারাপ লাগছে ?
না সূচক মাথা নাড়ে মেঘ। ওর কান্না ধোয়া ফুলো চোখ দুটি জানান দিচ্ছে অনেকটা সময় ধরে কান্নার উপস্থিতি। নিজের কাছে টেনে নেয় মেঘকে।
– কি হয়েছে মেঘ আমাকে বলবে না ? বাবার কথা মনে পড়ছে ? বাবা আমাদের বিয়েটা মেনে নেননি বলে কষ্ট পাচ্ছো।
– না মিনার, ফলাফল তো এমন হবে জানাই ছিল। অনেক আগেই ওবাড়ির দরজা আমার জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটা শুধু ঘোষনা মাত্র।
– তাহলে মন খারাপ করছো কেন এসময়ে ?
– এসময় বলেই তো। তুমি যেদিন রিপোর্টটা জানালে সেদিনই যেন আমি আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে মা হবার পুরো অনুভুতিটাই অর্জন করে নিলাম। আমার মধ্যে আমার মাকে অনুভব করলাম। মায়ের নাজানা সুখ গুলো দুঃখগুলো আমাকে অহরহ তাড়িত করছে। আমার মানস চোখে সারাক্ষণ মায়ের অদেখা অবয়ব দেখতে পাচ্ছি।
– মায়ের কোনো ছবিও তুমি দেখোনি কখনো ?
– দেখবো কি করে, মা চলে যাবার পর আমি ছাড়া তার সমস্ত অস্তিত্ব, জিনিস পত্র কাপড় চোপড় ছবি সমস্ত স্মৃতি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন বাবা।
– অদ্ভুত তো ! একটা মানুষ মারা যাবার পর সাথে সাথে নিশ্চিহ্ন করে দিলেন ?
– হ্যাঁ নিশ্চিহ্ন করে দিলেন আমার বাবা। কিন্তু নিশ্চিহ্ন হননি আমার মা। তিনি বেঁচে আছেন।
দুহাতে মুখ ঢেকে আবার হু হু করে কাঁদতে থাকে মেঘ। মিনার যেন বিশাল একটা শক খেয়ে সামলে নিলো নিজেকে। কন্ঠে রাজ্যের বিস্ময় ঢেলে বললো
– মেঘ তুমি ঠিক আছ তো ?
– হ্যাঁ এটাই সত্যি। বাবা সব মুছে দিয়ে আবার নতুন মা আনেন। আমি জ্ঞান হবার পর থেকে এটাই দেখেছি, আর বাবার কাছে জেনেছি আমার মাও দ্বিতীয় সংসারি। শুধু ঘৃণা ক্ষোভ আর মন্দ টুকুই অন্তরে নিয়ে ছিলাম। এতটা বছর কখনোই আগ্রহ বা সাহস হয়নি মায়ের কথা জানবার বা মাকে দেখবার। আর তাই তোমার কাছেও এ প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেছি। কিন্তু এখন বাবার অবহেলার কারনে হোক কিংবা তোমার ভালবাসার উষ্ণতার কারনেই হোক কেন জানি বার বার নিজেই বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি এই যে এতটা অপেক্ষা, এতটা অধীরতা, কষ্ট, আনন্দ সব সামলে একটা মা তার জঠরের ধনকে ফেলে কেন চলে যায়। কোন সুখের আশায় ?
মিনার নির্বাক স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মেঘের কষ্টবিদ্ধ নত মুখটার দিকে। ধীরে ধীরে বললো মিনার
– মেঘ তুমি কি চাও প্রশ্নগুলি মাকে সরাসরি করতে ?
মুখ তুলে চাইলো মেঘ।
– তুমি কি বলছো মিনার আমি কিছুই বুঝছিনা
– তবে সহজ করেই বলি। মায়ের সাথে দেখা করতে চাও ? আমি তোমাকে নিয়ে যাবো।
– কিন্তু আমিতো ঠিকানা জানিনা।
– মায়ের নামটা জানো তো ? বাকিটা আমি খুঁজে নিব।
মেঘের এই প্রতিক্ষাও একদিন শেষ হয়।
মিনারের অদম্য চেষ্টায় চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এঘাট ওঘাট ঘুরে অবশেষে সিতারা বেগমের সন্ধান মেলে। তারপর একদিন ঢাকা থেকে দুঘন্টার ট্রেন জার্নি শেষে ওরা সিতারা বেগমের বাড়ি পৌঁছে।
শুরু হয় নতুন প্রেক্ষাপট। সিতারা বেগম আর ইমরানের গল্প। মাতৃহারা সিতারা ছিলেন বাবার বড় আদরের একমাত্র সন্তান। পারিবারিক উদ্যোগেই ব্যাবসায়ী ইমরান চৌধুরীর সাথে বিয়ে হয়। কয়েক দিনের মাথায় টের পায় সিতারা ভীষণ একগুয়ে আর জেদি মানুষের সাথে সে ঘর বেঁধেছে। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হলেও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে নিজের মধ্যে অন্য প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করার পর। এরই মাঝে মেঘের জন্ম। ওর আধো আধো বোল আর মধুর ব্যস্ততায় সিতারা এক নতুন জগৎ খুঁজে পায়। হঠাৎ এক দুপুরে খবর আসে সিতারার বাবা সড়ক দূর্ঘটনায় মরনাপন্ন অবস্থায়। ব্যবসার কাজে ইমরান তখন শহরের বাইরে। সিতারা ফোনে জানালে আদেশজারি হয় তিনি না ফেরা পর্যন্ত কোথাও যাওয়া যাবে না। অধৈর্য্য আর অস্থিরতায় বারন শোনার মত মানসিক অবস্থা ছিলনা সিতারার। মেঘকে নিয়ে এক কাপড়েই গাড়িতে উঠে বসে। যমে মানুষে টানাটানির এক পর্যায়ে বাবা প্রাণে বেঁচে যান তবে পঙ্গুত্বকে মেনে নিয়ে। স্থিরতার এক পর্যায়ে সিতারা খেয়াল করে এরই মধ্যে বাইশ দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ একটা খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি ইমরান। ফোন করলেও রিং বেজে বেজে থেমে যায়। একবার, দুবার, বহুবার। কোনো অঘটন ঘটলোনাতো। অজানা আশংকায় ছুটে যায় সিতারা।
মানুষ যে কত নির্মম আর নিষ্ঠুর হতে পারে জানা ছিলনা তার। চরম পরিনতি অপেক্ষা করছিল। সিতারা যখন বাসায় গিয়ে ঢুকলো, ইমরান খুব স্বাভাবিক ভাবে মেঘকে কোলে টেনে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় সিতারাকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। সিতারা রাগের মাথায় তার বিবেকের দিকে অঙ্গুল তুলে বেশ কয়টি কথা বললেন। মারমুখি হয়ে উঠলো ইমরান। সত্যি সত্যি গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। কল্পনাতীত এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলনা মোটেও সিতারা। লজ্জায় অপমানে সন্তানকে না নিয়েই ফিরে এলো বাবার বাড়ি আবার। এক দিকে অসুস্থ বাবা আর একদিকে দুধের শিশু। দিন কতক পরেই পাগল প্রায় হয়ে আবার ছুটে গেল সিতারা তার সংসারে। বিশাল এক চপেটাঘাত অপেক্ষা করছিল সিতারার জন্য। ইমরান মেঘের জন্য নতুন মা এনেছেন। হায়রে ঠুনকো সংসার। নিজ হাতে সাজানো ঘরদোর আসবাবপত্র এমন কি পেটের সন্তানও কেড়ে নেয়া যায়। ফিরে আসে সিতারা। আত্মীয় স্বজনেরা পরামর্শ দেয় আইনের আশ্রয়ে যেতে। কি করবে মনস্থির করতে করতেই সিতারার চারিত্রিক কুৎসার কারন দর্শিয়ে ইমরানের ছাড়পত্র এসে পৌঁছে। আইনি লড়াইয়ের যথেষ্ট কারণ থাকলেও মন সায় দেয়নি ঐ ঘৃন্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের। অপমান লাঞ্ছনা পুষে অপেক্ষার প্রহর পার করেছেন দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে।
মেঘের ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দে মিনারের চিন্তাচ্ছেদ ঘটে। দেখে সিতারা বেগম মেঘকে বিছানায় অবস্থানরত রোগীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন
– ইনি আমার বাবা। গত পঁচিশটা বছর যাকে আগলে রেখেছি জীবনের সাথে বহু সংগ্রাম করে।
সংসার মানুষ একবারই সাজায়। আমার সাজানো সংসারের একমাত্র সন্তান আজও তুই। এবার তোর প্রশ্নের জবাব কি তুই পেয়েছিস।
এতক্ষণে মিনারের দিকে মনোযোগী হলেন সিতারা বেগম। বললেন
– দুঃখিত, ট্রেনটা বোধহয় তোমাদের মিস্ হয়েই গেল।
মেঘ কিছু না বলে সিতারা বেগমের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে। সিতারা বেগমের চোখের অঝোর ধারাও মিশে যায় সেই সাথে।
আর মিনারের মনটা পরম তৃপ্তিতে ভরে যায়। স্বগতোক্তি করে
– একটা ট্রেন মিস্ করে পঁচিশ বছরের অপেক্ষার অবসান তো ঘটলো।****************
ফাহমিদা রিআ
*****************1 Comment
Friends
Fahmida Akter
@fahmida420
র. জামিল
@r-jamil
Diponkor Sharma Partho
@parthodip218
মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
@ashraful710
Tapan Debbarma
@tanu48
Rahnuma Nira
@tamannahtasneem90
Nahian Hasan
@hasan009
Zahidul Jamy
@zahidul
AdabenTatali
@adabentatali


একটানে পড়ে গেলাম। দারুণ লিখেন আপনি।