Profile Photo

Sheikh Muhammad FarhadOffline

  • Kuhok-Pahun
  • Profile picture of Sheikh Muhammad Farhad

    Sheikh Muhammad Farhad

    2 years, 7 months ago

    পুঁজিবাদ, অদৃশ্য জীবাণু অথবা শুধুই কিছু অনুভূতির গল্প ৩
    ২৫.০৪.২০২০
    .
    প্রতিক্রিয়াশীলতার সদ্ব্যবহার
    .
    ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে মেডিসিন বিভগের ১৪ নং ওয়ার্ডে আমি ইন্টার্নী করেছি। আমাদের সময় মেডিসিন বিভাগে মোট ৬টি ইউনিট ছিলো। ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার যে রোগীদেরকে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি দিতেন, তাদেরকে সপ্তাহের ৬ দিন পালা করে ৬টি ইউনিটের ডাক্তাররা চিকিৎসা দিত আর শুক্রবার টা প্রতি ৬ সপ্তাহে একটা ইউনিটের ভাগে পড়ত। আমাদের ইউনিটের ভাগে সপ্তাহের যে দিন পড়ত তাকে আমরা বলতাম অ্যাডমিশন ডিউটি আর রাতের ডিউটিকে বলতাম অ্যাডমিশন নাইট।
    .
    অ্যাডমিশন নাইটগুলোতে পুরুষ ওয়ার্ডে একজন ও মহিলা ওয়ার্ডে আরেকজন মোট ২ জন ডাক্তারের ডিউটি পড়ত। একজন সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার থাকতেন, আমরা চিকিৎসা দিতে কোন রূপ দ্বিধায় পড়লে তার কাছে সাহায্য চাইতাম। প্রতি রাতে রোগীর গড় সংখ্যা হত ১০০-১৫০ জন। কোন কোন রাতে ২০০ জন রোগীও আমি receive করেছি।
    .
    রোগীরা কখনই একা আসতো না। তাদের সাথে আসতো মিনিমাম ৫-১০ জন মানুষ, যাদের মধ্যে বেশির ভাগই আসতো “ডাক্তার কী করে” এ ব্যাপারে অসীম কৌতূহল বুকে নিয়ে। তাদের সে কৌতূহল মেটাতে গিয়ে রোগীর রোগ বুঝে চিকিৎসা দেয়া হয়ে উঠত বড়ই দুস্কর।
    .
    কয়েকটি নাইট এই দুঃসহ বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাটানোর পর ভর্তি হতে আসা রোগীদের উপসর্গগুলোর কিছু নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আবিষ্কার করি আমি। ঐ প্যাটার্নগুলো ফলো করে প্রতিটা প্যাটার্নের জন্য আলাদা করে কিছু ওষুধের লিস্ট, কিছু প্রসিডিওরের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের লিস্ট আর কিছু ইনভেস্টিগেশনের লিস্ট সাজালাম। সেই লিস্টগুলো আবার কয়েক খন্ডে বিভক্ত করে ছোট ছোট চিরকুট বানালাম। এরপরের নাইটেই এরকম এক ঝাঁক ক্ল্যাসিফাইড চিরকুট নিয়ে গেলাম। রোগী আসার পর প্রথম এক নজরে প্যাটার্ন ধরে ফেলতে পারলেই দেয়া শুরু হত চিরকুট। একটা চিরকুট একটা রোগীর লোককে দেয়া মানেই তাকে মিনিমাম ১৫-২০ মিনিটের জন্য ব্যস্ত করে ফেলা। যেহেতু ওষুধ এবং ইনভেস্টিগেশন কয়েকটা কিস্তিতে দেয়া হচ্ছিলো, সব কিস্তি শেষ হতে হতে রোগীর লোক আর কেউ ব্যস্ত হতে বাকী থাকলো না। ফলে সামনে থেকে ভীড় কমলো এবং রোগীটা ভালো করে দেখার সুযোগ তৈরী হলো সহজেই।
    .
    রোগীর কাউন্সেলিং এও আমি এই “Divide and Rule Policy”. অনুসরণ করে খুবই ভালো ফল পেলাম। রোগীর লোকদের মধ্যে যাদেরকে অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত ও কম ইমোশনাল মনে হতো তাদেরকে আলাদা করে “mainly” negative counselling করা শুরু করতাম। আর যারা বেশি ইমোশন দেখাতো, তাদেরকে আলাদা করে “mainly” positive counselling করতাম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুই তিন লাইনের ঐ counselling ঘুরে ফিরে একই হতো কিন্তু তাও এক এক গ্রুপের কাছে এক একটা দিক গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরতাম। ফলে যেটা হতো, তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনাটা হতো যথেষ্ট দীর্ঘ। রোগীর ব্যাপারে কোন critical decision নিতে দেয়া হলে দেখা যেত রোগীর লোকরা নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া বাজিয়ে ফেলছে। আমাকে ঘাঁটানোর কথা আর মনে নেই তাদের। উল্টো ঘটনাও ঘটেছে অবশ্য, তবে কখনই তা সৌভাগ্যবশত মাত্রা ছাড়ায় নাই।
    .
    মেডিসিন বিভাগে ভীড় কমাতে এত কীর্তি-কান্ড দরকার হলেও, গাইনী আর সার্জারি অ্যাডমিশনে একটা শব্দ উচ্চারণই ছিলো যথেষ্ট। আর তা হলো “রক্ত লাগবে”!.. কেন জানি রক্তের কথা উচ্চারণ করার সাথে সাথে রোগীর মা-বাবা ছাড়া আর সবাই মুহূর্তের মধ্যেই উধাও হয়ে যেত। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদেরকেই রক্তের ব্যবস্থা করতে হত। এমনও হয়েছে যে, ওটির মাঝখানে ব্লাডব্যাংকে রোগীর জন্য রক্ত দিয়ে আবার ওটিতে এসে দাঁড়িয়েছি…
    .
    এসমস্ত ক্ষেত্রে আসলে রোগীর লোকদের যে দুর্বলতাটি আমি রোগীর চিকিৎসার স্বার্থেই সদ্ব্যবহার করেছি সেটা হলো তাদের দুর্দমনীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা। আমাদের দেশের মানুষ প্রত্যেকটা ইস্যুতেই সীমাহীন রকমের প্রতিক্রিয়াশীল। প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য বা প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখাতেই তারা ক্রমাগত বিভিন্ন দলে বিভক্ত হতে থাকে। প্রতিক্রিয়া দেখাতে তারা এতই মগ্ন থাকে যে, তার প্রতিক্রিয়াশীলতার সুযোগ নিয়ে অন্য কেউ যে তাকে অনলাইনে দশ বার বেচে ফেলছে, তার কোন “নোটিফিকেশন” সে পায় না।
    .
    আমাদের সমাজে ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার এই যে ভারসাম্যহীনতা, তার উৎসমূলে আমাদের সমাজের পেশাভিত্তিক শ্রেণিসংঘাত, আমাদের চিন্তা-বিমুখতা এবং শিক্ষিত হওয়ার হাস্যকর সব মানদন্ড। গণমাধ্যম যতই সহজলভ্য হোক না কেন, মানুষ সব জায়গাতে সব সময় তা-ই খুঁজবে যা সে খুঁজে পেতে চায়। যদি সে তা খুঁজে পায়, তাহলে সে তার খুঁটি নাটি বিশ্লেষন করবে এবং একটা খুঁত পেয়ে তাকে অবমূল্যায়ন করবে। আর যদি না পায়, তাহলে পুরো সিস্টেমের ওপরে ঘৃণা ছড়াবে, নিজে হতাশ হবে, অন্যকে হতাশ বানাবে আর এই হতাশা দিয়ে নিজের সমস্ত ভুল legalise করবে। প্রতিক্রিয়াশীলতার এই যে শৃঙ্খল, এটা ভাঙার জন্য কোন যুগের প্রগতিশীলতাই যথেষ্ট ছিলো না.. আর হবে বলে মনেও হয় না..

    3
    1 Comment
Skip to toolbar