-
# আকাশ পাতাল ভাবনা
(গল্প না কল্পনা)মুনীর সকাল থেকে ইতিহাস বই মুখের উপর ধরে আছে। দুপুরের দিকে মা একবার ডাকতে এসেছিলো। বললো, গোসল করে খেতে আয়। আর পর্দা তুলে জানালা খুলে দে। ঘরের মত মুখটাও এমন গুমট করে বসে আছিস ক্যানো? মুনীরের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই মা চলে গেল। চুলায় তখনো তরকারী টগবগ করে ফুটছে!
মুনীর অবশ্য তার মায়ের কথা ঠিকমত শুনতেই পায়নি! সে তখন এক গভীর চিন্তায় ডুব মেরে আছে। ইতিহাস পড়ে তার মনে হচ্ছে যুদ্ধ-বিগ্রহ চিরকাল ছিল, আছে, থাকবেই। এর থেকে মুক্তির কোন পথ নেই। শান্তির জন্য অশান্তি করাটাই যেন বাঞ্ছনীয়। এই শিক্ষা বোধহয় প্রকৃতি’ই আমাদের দিয়েছে। তাইতো বারবার শান্তির জন্য অশান্ত হয়ে ওঠে পৃথিবী। যেমন, চৈত্রের অসহ্য গরমের পর কালবৈশাখী ঝড় হয়, সমুদ্র বারবার উত্তাল হয় হারিকেন, টাইফুন ঘূর্ণীঝড়ে, সারাদিনের উত্তাপের পর হীমশীতল হয় মরুভূমি।
তারপরেও মুনীর ভাবে, আচ্ছা! যদি আকাশ থেকে টুপটাপ বোমা না ফেলে কিছু ফুল-ফলের বীজ ফেলত মৃত্যুদূতের মত ধেয়ে আসা যুদ্ধবিমানগুলো, গোলা-বারুদের পরীবর্তে উড়ে আসত অসংখ্য পাখী! আমরা না হয় পাল্টা আক্রমণ করতাম সকাল-বিকাল চারাগাছে পানি দিয়ে। মুঠীভরে ধান-গম খেতে দিতাম ভিনদেশী পাখিগুলোকে। যুদ্ধের পরিণাম হত এক সবুজ পৃথিবী! ঘন বন-জঙ্গলে দেখা যেত বাঘ-ভাল্লুক! মানুষের আর তখন কষ্ট করে হায়েনার মত হানাদার বাহিনী হবার প্রয়োজন হত না। বন্য জন্তুগুলোই তখন আমাদের শিশুদের চুরী করে নিয়ে যেত। শক্তিশালী যুবকেরা মারা পড়তো কালাজ্বরে আর শত্রুপক্ষ নোবেল পুরষ্কার পেত শান্তির জন্য।
ধুর… যত সব উদ্ভট চিন্তা! নিজের উপর বিরক্ত হয় মুনীর। কেন সে এসব ভাবছে। সে জানে তার এসব ভাবনায় কিছুই হবেনা। এমনকি একটা পিঁপড়াও প্রভাবিত হবেনা। তবুও নিজের ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা মুনীর। তবে, তার ভাবনার গতিপথ বদলেছে…
যুদ্ধ জয় করে কি স্বাধীনতা আসে? না মনে হয়। স্বাধীনতা আসলে মানুষ মানুষের কাছ থেকে চাইছে। এক দেশ তো আরেক দেশকে বন্দী করে রাখেনি। মানুষ মানুষকে বন্দী করে রেখেছে। মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রানী এমনটা করেনা। ইতিহাসে এক বাঘ কখনো অন্য বাঘকে বন্দী করে রাখে নাই। লড়াই করেছে খাবারের জন্য, সঙ্গিনীর জন্য অথবা আশ্রয়ের জন্য। লড়াই না করে উপায় কি প্রকৃতি এর জন্য ভীষণ ভাবে দায়ী। তাইতো স্বাধীনতা পাবার পরেও আমরা লড়াই করছি আমাদের সাথেই, এতে দোষের কিছু নাই। এই লড়াই চলছে, চলবে…
আমরা মানুষ সবসময় নিজেদের আলাদা করে দেখতে পছন্দ করেছি। তাই বন্য জন্তুদের মত লড়াই না করে আমাদের লড়াই করার পদ্ধতিটা একটু ভিন্ন হলে ভালো হত। যেমন, রাগ করে একজন আরেকজনকে গালি না দিয়ে দুই-একটা কবিতা শুনিয়ে দেয়া যেতে পারে। কবিতা শুনে বিমর্ষ মনে যে যার বাড়ি ফিরে যেত।
মারামারি না করে এক কাপ চা আর অর্ধেক সিগারেট অফার করা যেতে পারে। চা-সিগারেট খেতে খেতে গল্প অথবা রাজনৈতিক আলাপ জমে উঠলে তখন আরো দুই এক কাপ চা সাথে গরম শিঙাড়া। এতে অবশ্য কেউ আহত না হয়ে আলসার ক্যান্সার বাধিয়ে বসত আর সবথেকে বেশী লাভবান হত দোকানী।মানুষ চিরকাল নিজেকে এবং অপরকে অবিশ্বাস করে গেছে। কিন্তু দ্বিধা নিয়ে বাঁচা যায়না তাই চার হাজার বছর আগে মিশরীয়রা আবিষ্কার করে তালা-চাবি। কিন্তু গুপ্তঘাতক তার আগে থেকেই লুকিয়ে ছিল ঘরের ভেতরে। ষড়যন্ত্র করে রাজার খাবারে মিশিয়েছে বিষ। ছুরী ব্যাকডেটেড হয়েছে তাই নেতার পাঁজরে বিধিয়ে দিয়েছে বুলেট। শেষমেষ ভালো থাকার জন্য করেছে শান্তিচুক্তি। তবুও শান্তি মরীচিকা হয়েই রয়ে গেছে।
মা আবার এলো, এবার হাতে ঝাড়ু! মুনীর খেয়াল করে নাই ব্যাপারটা! খেয়াল করলে এক লাফে বিছানা ছেড়ে বাথরুমের দিকে দৌড় দিত। কিন্তু সে তখনো অন্যমনস্ক হয়ে আকাশ -পাতাল ভাবছে। ছেলের এমন আনমনা ভাব দেখে ঝাড়ুর উল্টা পিঠ দিয়ে কষে এক বাড়ি মারলো মা! বলল, কোনো কাজ নাই! সারাদিন গবাদি পশুর মত শুয়ে বসে থাকবি না মানুষের মত একটু আচরণ করবি?
14 Comments-
-
ভালোবাসা নেবেন মঞ্চবন্ধু! লেখাটা আপনি পড়েছেন জেনে আমারো খুব ভালো লাগছে। একটা নতুন ভাবনা মাত্র মাথায় এলো, মানুষ মানুষকে যেমন বন্দী করে রেখেছে আবার মানুষ মানুষকেই কিন্তু সেই বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে এসেছে। প্রকৃতি আসলে আমাদের নিয়ে এক মজার খেলা খেলছে। আমাদের ঘৃনা করতে শিখিয়ে বলছে ভালোবাসো! আর এই খেলায় আমরা কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়ে ভালোবাসতে গিয়ে মনের মধ্যে ঘৃনা পুষে রাখছি। তাই এইসব আকাশ পাতাল ভাবনা নিয়ে বেশী সিরিয়াস হবার কিছু নেই! কাছ থেকে দেখলে দেখা যাবে প্রতিটি মানুষ ভালোবাসা চায়, ভালোবাসতে চায়। শুভ রাত্রি!
-
-
উদাসীনতার উপমাটি সুন্দর হয়েছে গবাদি পশুর মত জাবর কাটা মানুষ গুলি মুক্তি খুঁজছে ভিন্ন ভিন্ন পন্থায়। কিন্তু মুক্তি শব্দটি আমার কাছে বরাবরই অস্পৃশ্য।
-
RIGHT NOW
মুক্তি সেতো আকাশ জুড়ে ভাসমান নীলের খেলা, এর রুপ কখনও চৈতালি দুপুর কখনও অস্তমিত গোধূলি বেলা। মুক্তি সেতো অনন্য রূপবতী আমার যেমন আমার ছেলেবেলা, আবার সেতো উল্লাসে উৎসাহে বড় হওয়া আমার পিছনে ফেরা। মুক্তি সেতো আমার মায়ের কাছে হাজারো আবদার, আবার আমার চোখে লেগে থাকা মায়ের হাহাকার। মুক্তি সেতো আমার সামনে যাওয়ার এক অদম্য প্রয়াস, আবার সেতো স্মৃতির ভীরে মৃত্যুর অভিলাষ। এজন্যই এ বড় অদ্ভুত ও অষ্পৃশ্য কবি। মন্তব্য টি আপনার প্রশ্নের উত্তর কবি।
-
অনেক অনেক দিন পর আপনার লেখা পড়লাম… খুব ভালো লাগলো যুদ্ধ, স্বাধীনতা,
ব্যক্তিক ইউটোপিয়া, অনধিত পার্থিব ভবিতব্যের অতুলনীয় বিশ্লেষণ… সত্যিই কত অভাবনীয় সুন্দরতম নীলগ্রহ এই পৃথিবী, আর মানুষের মনে সেই অসীম সৌন্দর্য ধ্বংসের কি বিস্ময়কর আগ্রহ…!-
ভালোবাসা নেবেন কবিপ্রিয়। অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম আপনাদের সাথে মন খুলে একটু আড্ডা দেই! মানুষ সম্পর্কে আপনি যথার্থই বলেছেন। কিছুক্ষণ আগে একটা ডকুমেন্টারি ফ্লিম দেখছিলাম “Seven Worlds, One Planet”। শেষ পর্বে দেখলাম আফ্রিকার মোটামুটি অর্ধেক হাতী মেরে ফেলেছে গুটি কয়েক মানুষ শুধুমাত্র তাদের দাঁত দিয়ে অলংকার বানাবে তাই। বুঝলাম, মানুষের পেট হাতির মত বড় নয় তবে আমাদের ক্ষিধের কাছে এই পৃথিবী কিছুই না। যদি চাঁদটাকে ব্যাসন দিয়ে ভেঁজে দেয়া হত আমরা কপাকপ চাঁদটাকেও খেয়ে ফেলতাম।
-
-
-
ছেলের এমন আনমনা ভাব দেখে ঝাড়ুর উল্টা পিঠ দিয়ে কষে এক বাড়ি মারলো মা! বলল, কোনো কাজ নাই! সারাদিন গবাদি পশুর মত শুয়ে বসে থাকবি না মানুষের মত একটু আচরণ করবি? এমন মা আজ ঘরে ঘরে দরকার, দরকার এই রকম ঝাড়ুর বাড়ি! চমকার লেখক ভাই আমার।
-
Friends
মো. আবু মোহাদ্দেস
@mohaddesh1967
Kishor Kanok
@kishorkanok-2
Shahajahan Tapu
@shahajahantapu
জুলহাজ আলী জীবন
@julhaj
গোলাম রাব্বানী
@rabbi-2
Reazul Kabir
@reazul-kabir
পিপীলিকা
@abujubair
আজহারুল ইসলাম তালহা
@ajharul
Rashed Rahman Abir
@rashed-rahman-abir


দীর্ঘ দিন পর আপনার লেখা পেয়ে আনন্দিত হলাম।
মানুষ মানুষকে বন্দী করে রেখেছে। অসংখ্য শুভকামনা।