-
সলিটারি সেলের চিঠি
হাসনাত সৌরভ
——————————-
প্রিয় আলোকলতা,
শোনো, কাল আমার ফাঁসি। সুতরাং আজ আমি তোমায় এরকম একটা অতিকাব্যিক নামে ডাকব, যাতে তুমি বাকি জীবনটা মনে রাখতে পারো যে ছেলেটা কিছু উদ্ভট ছিল বটে! যাই হোক, এ চিঠি তোমার হাতে ওঠার আগেই আমার ফাঁসিকাঠে ওঠা হয়ে যাবে। তাছাড়া এ চিঠি তোমার হাতে ওঠার আগে আরো কয়েকজনের হাতে উঠবে; কারণ নিশ্চই তোমার মনে আছে সেই সহজ সংজ্ঞাটা – দুটো মানুষের মাঝে যখন রাষ্ট্র ঢুকে পড়ে তখন তাকেই ফ্যাসিবাদ বলে।আচ্ছা আজ আর তত্ত্বকথা কপচাবো না। হাজার হোক, শেষ চিঠি তো, একটু অন্যরকম কিছু লিখে যাই। ‘আজকে দাদা যাবার আগে/ বলব যা মোর চিত্তে লাগে/ নাইবা তাহার অর্থ হোক/ নাইবা বুঝুক বেবাক লোক।’ শোনো না, একটা অদ্ভুত খেলা শিখেছি জানো। মাঝেমধ্যেই বেশ স্পষ্ট উচ্চারণে ‘ভালোবাসি’ বলি। আর দেখি চারপাশটা কেমন বদলে যাচ্ছে। মানে কী রকম বলো তো, ধর এই একটু আগে দুপুরের খাবারটা গেটের নিচের ছোট কুঠুরি দিয়ে ওরা দিয়ে যাওয়ার পর বলে উঠলাম ‘ভালোবাসি।’ সাথে সাথে নাকে আলুভাজার গন্ধ এল। কড়া কড়া করে আলু ভাজছে মা। সাথে ময়দার রুটি। টিফিন নিয়ে যেতাম আমি। টিফিন বক্সের হালকা ভ্যাপসা গন্ধ আর আলু ভাজার তেল মেখে থাকা ফরসা রুটিগুলোর ভেতর স্কুলটা রয়ে গেল জানো। ‘ভালোবাসি’ বলামাত্র সব একদম স্পষ্ট দেখতে পেলাম।
আসলে হয়েছে কী, বহুদিন তো এই সলিটারি সেলে বন্দী; আস্তে আস্তে ভয় করছিল, যা যা দেখেছি সব ভুলে যাব না তো! রিসেন্ট স্মৃতি বলতে তো শুধু ইন্টেরোগেশনের নামে ধর্ষন, নুনছাল, ঘাম, রক্ত আর মাথার একটু ওপরে ঝুলতে থাকা বেল্ট। এর বাইরে যে স্মৃতিগুলো, ফাঁসির আগে সব ভুলে যাবো না তো! মৃত্যুর পরে তো আর মেমরি তৈরি হবে না বলো!
তাই টুক করে একদিন ‘ভালোবাসি’ বলে ফেললাম। আমার সেলের বাইরের সিকিউরিটিগুলো ভাবলো এইবার আমি পুরোপুরি পাগল হলাম। অথচ আমি ভালোবাসি বলামাত্র তোমায় দেখতে পেলাম জানো। দেখলাম আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছো তুমি, তোমার কপালে বসন্তের ছোট্ট দাগটা মজা পুকুরের মতো জেগে আছে, তার ওপর ছায়া পড়েছে আমার। নিজের ছায়াকে জোছনা মনে হয়েছে কখনো তোমার? আমার তখন মনে হয়েছিল জানো। আর তোমায় কী অজ পাড়াগেঁয়ে শীতকাল মনে হয়েছিল। তোমার তো আমায় দেখতে আসা বারণ, ভাগ্যিস সাহস করে ‘ভালোবাসি’ টুকু বলে পেরেছিলাম!।
তারপর থেকে ব্যাপারটা বেশ লেগে গেল। একদিন তোমাদের ঠিক করে দেওয়া উকিল এসে শেষবারের মতো দেখা করে যাওয়ার পর আমি আবার বলে উঠলাম, ‘ভালোবাসি।’ ওমা! দেখি বাবা আসছে অফিস থেকে! বাবার হাতে মোরব্বা। তুমি জানো আমি চালকুমড়োর মোরব্বা খেতে দারুণ ভালোবাসতাম ছোটবেলায়। বাবা অফিস থেকে ফেরার পথে রোজ নিয়ে আসত আমার জন্য। ওরা যেদিন বাবাকে কুপিয়ে খুন করল, আর আমরা সবাই ছুটে গেলাম খবর পেয়ে, আমি না বাবার ডেডবডিটার পাশে একটা মোরব্বার প্যাকেট খুঁজছিলাম।
আমি সেদিন বাবাকে চোখ ভরে দেখেই যাচ্ছিলাম জানো। আমার বাবার হাইট তো বেশি না, কিন্তু কেন জানি না, ছেলে মেয়ে বাবার চেয়ে মাথায় লম্বা হয়েও বাবাকে কখনো বেঁটে হিসেবে কল্পনা করতে পারে না।
আমার হাত অবশ হয়ে আসছে এইবার। আজ রাতে একটু ঘুমোবো শান্তি করে। কাল ভোর ভোর ফাঁসি। কী শান্তির ঘুম হবে ভাবো! আর কোনো দায় নেই, এই পৃথিবীর কী হবে তাতে আর কোনো মাথাব্যথা নেই আমার। আমি এখন থেকেই কেমন মৃতের মতো চিন্তা করতে আরম্ভ করে ফেলেছি দেখ! এই জন্যই মাঝেমাঝে ‘ভালোবাসি’ বলাটা দরকার। ‘ভালোবাসি’ বলব আর আমার অন্ধকার কুঠুরির জানলাটা বড় হতে হতে ঘরটাকে ছেয়ে ফেলবে আলো, হাওয়া দেবে, পাতা উড়ে এসে পড়বে পায়ের সামনে, পাখিরা ভুল করে ঢুকে আসবে হঠাৎ, তারপর বাসা বানাবে কিনা চিন্তা করতে করতে উড়ে যাবে দিগন্তের দিকে। আমি ‘ভালোবাসি’ বলব, আর শাসক হাসতে হাসতে নিজের উর্দি খুলে নেমে যাবে ফুল বাগানে, শরীর ছেড়ে দেবে মাটির ওপর, আমি দেখব আমার হত্যাকারি কাঁদছে মাটিতে উপুর হয়ে। আমি ‘ভালোবাসি’ বলব আর তুমি, তোমরা, আমরা সব্বাই এমন ভীষন যুদ্ধ জিতে যাব যে পৃথিবীতে আর যুদ্ধই থাকবে না।
এই শেষকটা লাইন আলাদা করে রেখো। বেশ লিখলাম। যাই হোক, এইবারের মতো এতটাই। কাল ঠিক করেছি শেষবারের মতো ‘ভালোবাসি’ বলব। ঠিক যখন ফাঁসির মঞ্চে তুলবে আমায়। সামনে অনেকদিন পর মানুষ দেখতে পাবো, ওদের শুনিয়ে শুনিয়ে চিৎকার করে বলব, ‘ভালোবাসি।’ দেখি কী দেখতে দেখতে মরি।
বিদায়,
ভালোবাসি।ইতি
তোমার আমি10 Comments-
সত্যি এই একটা শব্দ অনেক দেয়াল ভেংগে দিতে পারে, মনের আগল খুলে দিতে পারে। প্রিয় লেখক অনেকদিন পর আপনার লেখা পড়লাম। আবার হারিয়ে যাবেন না তো!?
-
-
তেমন একটা ভালো নেই। মা অসুস্থ। আপাতত দেশের বাহিরে @drako
-
Friends
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
AdabenTatali
@adabentatali


শীতের রাত, মন খারাপ, তবুও আপনার লেখা পড়ে একবার বলেই ফেললাম ভালোবাসি।