Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • প্রিয় তুহিন,
    কেমন আছো তুমি? আমাদের সব্বাইকে ছেড়ে?
    তোমার ছেলেদের কথা কি মনে পড়ে তোমার? আমার কথা?
    কেনো সেদিন আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে? আমি তো তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম, খুব দ্রুত সময়ে, ঠিক সেই সময়েও আমি চিন্তা করছিলাম- কোন ড্রেস পড়বো? পাঠভাংগা ড্রেস না পড়লে তুমি রাগ করো, তাই সেই মুহুর্তেও আমি চিন্তায় পড়েছিলাম, কোন ড্রেস পড়বো। এমন সময় তোমার আদিব এসে বললো – আম্মু, আব্বুতো আর জোড়ে জোড়ে শব্দ করে শ্বাস নিচ্ছে না। আমি তখন ছুটে গেলাম, ভাবলাম এবার ডাকলে তুমি হু, হু করে উত্তর দিবে না, এবার ডাকলে তুমি স্পষ্ট করে আমার ডাকে সাড়া দিবে।
    কিন্তু আমার ডাকে, তোমার ছেলেদের ডাকে, চিৎকারে যে তুমি কিছুই বললে না। ভোরের স্নিগ্ধ সকাল আমাদের তিনজনের চিৎকারে সব নিঃশব্দতা ভেংগে খান, খান হয়ে গেলো। আমাদের চিৎকারে সব কম্পিত হয়ে যাচ্ছিলো,আমরা প্রাণ পণে ডাকছিলাম তোমাকে, আমাদের চিৎকার কারো ঘুম ভাংগায় নি, আমাদের চিৎকার কারো ঘুম ভাংগাতে পারেনি, তোমার খোঁজ নিতে কেউ ই আসেনি।
    ভালোই হয়েছে তুহিন তুমি আর ফিরে আসোনি তোমার বাড়িতে। যদি আসতে তবে তোমাকে ঢুকতে দিতো না কেউ। তোমার মাহিন, শিহাব, আর আমি তোমাকে নিয়ে ৫ম তলা থেকে নামছিলাম, কাঁদছিলাম, চিৎকার করছিলাম, তবু সাহায্যের জন্য কেউ দরজা খুলে বের হয়নি।
    তোমার আদিত্য, আদিব, ছুটে এম্বুলেন্স এর দরজা খুলে তোমাকে উঠিয়ে দিচ্ছিলো। আর আমি – যে কিনা তোমার ভয়ে পাঠ ভাংগা ড্রেস খুজছিলাম সে খালি পায়ে, মুখে মাক্স না দিয়েই তোমাকে জড়িয়ে ধরে ই এম্বুলেন্স এ বসে ছিলাম।
    সারাটা রাস্তা তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, ঠিক মত তুমি অক্সিজেন নিচ্ছো কিনা? আর চোখ খুলে আমাকে বকা দিবে এই জন্য যে আমি খালি পায়ে, মাক্স ছাড়া, বাড়ির কাপড় পড়ে আছি তাই।
    দ্রুত ছুটছে এম্বুলেন্স, আমি তোমাকে ধরে রাখতে পারছিলাম না, তুমি গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিলে, আমি চিৎকার দিচ্ছি, এম্বুলেন্স এর ড্রাইভার এর সাথে যে ছেলেটা ছিলো, সে চলন্ত অবস্থায় সামনে থেকে পিছনে চলে এসে তোমার সাইডের রেলিঙ তুলে লক করে দিলো। আমি তবুও তোমার শরীরে হাত দিয়ে আছি,অপেক্ষায় আছি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাকে আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাবো, তুমি ঠিক হয়ে যাবে, আল্লাহ কে ডাকছিলাম।
    এরপর তোমাকে বাড়িতে নিয়ে এসে অনেক বকা দিবো। কেন আমাদেরকে ভয় পাইয়ে দিলে!, কেন তোমার ফ্লাটের সবার জন্য তুমি এত চিন্তা করতে!? দিন নেই, রাত নেই ওদের সাথে, ওদের জন্য আমাদেরকে সময় না দিয়ে ওদের কথা চিন্তা করতে? সবাই নাকি এক পরিবার?! তাই কি তুহিন? তাহলে আমাদের চিৎকার কেন ওদের কানে গেলো না, কেন ওরা এগিয়ে এলো না? ওদের জায়গায় তুমি এবং আমি হলে কি দরজা বন্ধ করে থাকতে পারতাম?
    এরপর আমরা হাসপাতালে পৌছালাম, কেউ তোমাকে নামাতে রাজি হলো না, তোমার যে করোনা টেস্ট করানো হয়নি!, তোমার কি করোনা হয়েছিলো তুহিন?
    আমি তো জানিনা।
    যদি করোনাই হতো তবে কি আমি আক্রান্ত হতাম না? আমিতো কোনো দূরত্ব রাখিনি তোমার সাথে, সেটা শারীরিক ই হোক আর মানসিক ই হোক। তোমার ছেলেরাও তো ছুটে যেতো তোমার কাছে, তোমার প্রিন্টারের সমস্যা বা কম্পিউটার এর সমস্যা হলেই তো তারা ঠিক করে দিতো, আমি রান্না করতে গেলেই চুপিচুপি তোমার কাছে চলে যেত তোমার আদি, আদিব। তোমার মোবাইল নিয়ে খেলতো। তোমার তো কাশি সবসময় ই হতো, ডাক্তারতো আগেই বলেছিলো তোমার ডাস্ট অ্যালার্জি আছে, সর্দি সেটাও তো ছিলো না, তাও কি বলবো তোমার করোনা হয়েছিলো??
    তুমি ভ্যাপার নিতে গিয়ে বিশ্রী ভাবে পুড়ে গিয়েছিলে। এত ভয়ংকর ভাবে পুড়ে গেয়েছিলে এবং সেই পোড়ার ছবিটাও আমাকে দিয়ে তুলেছিলে, কেন তুললে তুহিন??
    আমি যে কষ্ট পাচ্ছিলাম তোমার পোড়া জায়গার ছবি তুলতে, তাও তুমি বললে – “তুলো আমি দেখবো”!
    খুব কষ্ট পাচ্ছিলে তাই না? এত শক্ত কেন তুমি? কষ্ট, ব্যাথা এগুলো কখনোই কাউকে বলতে চাইতে না, যেন অসুখের কথা বলাটাই লজ্জার।
    হাসপাতালে যাওয়ার পরের আর কিছুই আমার মনে নেই তুহিন। শুনেছি আমি হাসপাতালের মেঝেতে ই শুয়ে পড়েছিলাম। কিচ্ছুই মনে করতে পারিনা আমি তুহিন।
    কি হলো? কি ভাবে সময়গুলো গেলো, আমি জানি না।
    তুমি ছাড়া ছয়টি মাস কেটে গেলো। না ভুল বললাম, তুমি ছাড়া না, তুমি আছো আমার সাথে প্রতিটি মুহূর্তে। তুমি পৌঁছে গেছো তোমার গন্তব্যে, আর আমি অপেক্ষায় আছি তোমার জন্য,আমরা আবারও একসাথে থাকবো। আমার বিশ্বাস তুমিও আমার জন্য অপেক্ষা করছো।
    হ্যাঁ তুহিন, তুমি আমাকে ছেড়ে যাও নি, আর আমিও তোমাকে ছেড়ে নেই।

    ইতি
    তোমার আদরের হেনা
    ৩০/১১/২০

    4
    7 Comments
    • একটা খুব কঠিন সময় গেছে এবং আরো একটা পার করছেন বুঝতে পারি। একা সন্তানদের বড় করার পথটা মসৃন না। স্রষ্টা আপনার সহায় হোন সব সময়।

    • এই ব্যাথার জানি অবসান নাই তবু পার্থনা রইল সুন্দর আগামীর!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 22 May 2024 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

      • ধন্যবাদ তুলট কে। আমার অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারছি , সম্পূর্ণ অপরিচিত , প্রতিভাবান লেখকদের সাথে ।আমার খুব ভালো লাগছে ,তুলটের সাথে যুক্ত হয়ে

    • ভেঙে যাওয়া মানে সব শেষ নয়। সেখানে থেকেই নতুনত্বের সুচনা হয়। দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে চলে যায় মানুষ, আমাদের উপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু সব থামিয়ে দিতে পারে না। একজন চলে গেছে, কিন্তু বাকিদের আপনিই আগলে রাখতে হবে। শুভ কামনা আপনার জন্য।

Skip to toolbar