Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • যখন সারা বিশ্ব আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছিলো, অর্থাৎ লকডাউন তুলে নেওয়ার পরে, আমি তখন যেন শ্বাস নিতে পারছিলাম না। চারিদিকে এত অক্সিজেন, আর আমি যেন অক্সিজেন খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। আমার অবচেতন মন চাচ্ছিলো না সব কিছু স্বাভাবিক হোক। আমার মাথায় তখন অসংখ্য চিন্তা। আমাকে এখন অফিস ট্যুরে যেতে হবে,বাচ্চাদের স্কুল খুলে যাবে, ওদেরকে স্কুলে বাবা সম্পর্কে জানতে চাইলে কিভাবে ওরা উত্তর দিবে, বাচ্চাদেরকে নিয়ে কিভাবে একা একা আমি রাজশাহী, নওগাঁ যাবো?কি করবো আমি?
    স্কুল খোলার সময় যত এগিয়ে আসছিলো, তখন প্রায় রাতে আমি ছটফট করছিলাম অক্সিজেন এর জন্য। উঠে বসে থাকতাম, হাঁটাহাঁটি করতাম। অফিস চলাকালীন সময় সব ঠিক ই থাকতো, কিন্তু বিপত্তি বাঁধতো অফিস থেকে ফেরার সময়। দুই দিন আমি রিক্সাওয়ালাকে বাড়ির ঠিকানা বলেছি- মোহাম্মদপুর, চাঁন মিয়া হাউজিং। যেখান থেকে আমরা প্রায় চারবছর আগেই চলে এসেছি। চাঁন মিয়া হাউজিং এর ১ নং গেটের কাছে যাওয়ার পরে আমার মনে পড়তো – এটাতো আমার ঠিকানা না! ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টার থেকে বের হয়ে সিএনজি নিবো, কিন্তু দেখা গেলো – আমি শুধু হাঁটছি তো হাঁটছিই। কোথায়, কোন রাস্তায় যাচ্ছি, কিছু মনে করতে পারতাম না, লোকজন কে জিজ্ঞেস করতাম আমি কোন দিক দিয়ে গেলে মেন রোডে উঠতে পারবো?
    এই ঘটনা গুলো আমাকে খুব চিন্তায় ফেলতো, কিন্তু ছেলেদেরকে বলতাম না, ওরা যদি ঘাবড়ে যায়,তাই। স্কুল খুললে ছেলেরা কিভাবে যাবে?
    ট্যুরে যেয়ে প্রায় আমার হোটেলে ফিরতে রাত হতো, কারণ অনেক দূরে দূরে যেতে হতো। রাতে যতক্ষণ আমি রুমে ফিরতাম না, ততক্ষণ তুহিন আমার সাথে ফোনে কথা বলতো। তাছাড়া যশোর থেকে ফিরতে প্রতিবারই ১.৩০, ২ টা বেজে যেত, তুহিন আমাকে নিতে বাসস্ট্যান্ডে যেত। আমি আমিন বাজার এসে ওকে ফোন দিতাম, তখন ও বাড়ি থেকে বের হতো।
    স্কুল খুললে ছেলেদের ওদের আব্বুর কথা বেশী মনে পড়বে সবার আব্বুকে দেখে, তখন ওদের অনুভূতি কেমন হবে, এসব চিন্তা করে আমি যেন দিশেহারা থাকতাম।
    স্কুল খোলার কিছুদিন পরে আমার ছোট ছেলে আমাকে এসে বললো- আম্মু, ইংরেজি মিস আমাকে প্রাইভেট পড়াতে চেয়েছেন। জানতে চাইলাম – কেন, তুমি ক্লাসে পড়া করে যাওনি? সে বললো- পড়া তো আমি পেরেছি। তাহলে কেন তোমার মিস তোমাকে পড়াতে চাইলো? সে উত্তর দিলো- আজ মিস ক্লাসে জিজ্ঞেস করেছিলন – কাদের, কাদের বাবা নেই, তারা উঠে দাঁড়াও।
    কথাটা শুনে আমার ছেলের মনের অবস্থা চিন্তা করুন,আমার অবস্থাটা একবার ভাবুন।এই ভয় গুলোই যেন আমাকে তাড়া করছিলো, আমি অক্সিজেন এর অভাব বোধ করছিলাম।
    সেই সময় আমাদের গ্রুপের কেস সুপারভেশন চলতো, অনলাইনে। আমি আমার সমস্যা গ্রুপে বললাম। গ্রুপের সাপোর্ট এ আমি ধীরে ধীরে আমার সমস্যা কাটিয়ে উঠলাম, তাছাড়াও সার্বক্ষনিক ভাবে ম্যাডামের সাপোর্ট পেয়েছি।
    নিউ নর্মাল পরিবেশে যখন প্রথম অফিসিয়াল ট্যুরে খুলনা, যশোর গেলাম, তখন যেন আমি অনেকটাই স্বাভাবিক। এরপর বাচ্চাদের নিয়ে ওদের বাবার কবর জিয়ারত করার জন্য দেশের বাড়িতে যাবো, কিন্তু কিভাবে সব ম্যানেজ করবো? টিকেট কেটে ঈদে আর বাড়িতে যাওয়া সম্ভব নয়, এটা আমরা সবাই মেনেই নিয়েছি। আগামী ২৩ তারিখে ওদের আব্বুর ২ বছর পূর্ণ হবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা কেউ যেতে পারিনি ওদের বাবার কাছে। এই কষ্ট টা যে কত বড় সেটা আমরা তিনজনই জানি, আর কেউ কখনো বুঝতে পারবেনা, বোঝার কথাও না।
    সাহস সঞ্চয় করে অফিসে ছুটির দরখাস্ত দিলাম। সাহস সঞ্চয়ের কথা এই জন্য বললাম যে- ছেলেদেরকে নিয়ে আমাকে যেতে হবে। কোথাও যাওয়ার আগে থেকেই তুহিন লাগেজ প্যাক করতো, আমি কখনো দেখতামনা, কি কি লাগেজে ঢুকিয়েছে তুহিন, আমার বা বাচ্চাদের জন্য। তবে বেড়াতে গিয়ে কখন কোনটা আমি পড়বো, আর ছেলেরা কোনটা পড়বে সব ঠিক মতই নিয়ে আসতো তুহিন। লাগেজ এ প্রচুর ড্রেস নিয়ে আসতো। আমি রাগ করতাম – এত ড্রেস নেওয়ার দরকার কি?এত বড় লাগেজ তোমাকেইতো টানতে হবে। তাছাড়া রাজশাহী আমার জন্মস্থান,এখানে আমি যেই ড্রেস ই পড়ি না কেন, তাও সবাই আমাকে রুনা ই জানবে। আর নওগাঁ তোমার শহর,তোমার সাথেই আমি বাহিরে যাবো, সবাই আমাকে তোমার বউ হিসেবে ই জানে। তাই শুধু শুধু এত ড্রেস কষ্ট করে টানতে হবে কেন?
    এবার আমি আমার লাগেজ প্যাক করেছি, আর ছেলেরা ছেলেদের। ট্রেনে উঠা, লাগেজ উঠানো সবকিছু আমিই করলাম।
    যে ভয়ে আমি কুঁকড়ে ছিলাম তা কাঁটিয়ে আমরা তিনজনই যেন স্বাভাবিক। সম্পূর্ণ রাস্তায় পুরনো স্মৃতি মনে করতে করতে আসলাম আমি, জানি ছেলেরাও ঠিক এগুলো ভাবতে ভাবতে ই এসেছে। কিন্তু আমরা কেউ এই বিষয় টা নিয়ে কোন কথা বলি নি। প্রায় তিনবছর পরে আমরা আসলাম।
    ২১/০৫/২০২২

    3
    3 Comments
    • কিছু স্মৃতি কাঁদায়, কিছু স্মৃতি নতুন করে বাঁচতে শেখায়!
      জীবন মৃত্যুর মাঝে আমাদের এই বেঁচে থাকা খুব একটা সহজ হত না যদিনা পৃথিবীতে ভালোবাসা বলে কিছু না থাকত। যদি মায়ার বাঁধন না’ই থাকত তবে হয়ত কবেই ছন্নছাড়া হয়ে চাঁদ, সূর্য পৃথিবীকে একা করে হারিয়ে যেত অতল কোন গহ্বরে। আমরা অনেকেই হয়ত এই ভালোবাসার সন্ধানেই পাগল হই, যাযাবর হয়ে ঘুরে বেড়াই।

Skip to toolbar