Profile Photo

Taufiq al sadifOffline

  • 483-Taufiq-Al-Sadif-roll-483
  • Profile picture of Taufiq al sadif

    Taufiq al sadif

    2 years ago

    রহস্যময় পাণ্ডুলিপি
    ### **প্রথম পর্ব**###

    কলকাতার পুরনো শহরের একটি ছোট্ট বইয়ের দোকান, নাম “সাহা বুক স্টোর”। এটি একশো বছরেরও বেশি পুরনো, যেখানে বইয়ের স্তূপ আর ধুলোবালি মিশে এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মেঘলা সন্ধ্যায় বৃষ্টি ঝরছে। বইয়ের দোকানের জানালায় টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, আর তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পুরনো কাঠের টেবিলের শব্দ। মিঃ বিজয় সাহা, এই দোকানের মালিক, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ঝিরঝির শব্দ শুনছেন। তাঁর মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি কাজ করছে। তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে তার ঘড়ির দিকে তাকালেন; সন্ধ্যা ছয়টা বাজে। অথচ, তার মনে হচ্ছে সময় যেন থেমে আছে।

    মিঃ সাহা পাকা বয়সের একজন মানুষ। তার মুখে চিন্তার ভাঁজ, চোখের কোণায় অবসাদের ছাপ স্পষ্ট। তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন, যেন বৃষ্টির সাথে কথা বলছেন। কিন্তু তার মন আসলে অন্য কোথাও। গত কয়েকদিন ধরে তিনি এক অদ্ভুত শঙ্কায় আচ্ছন্ন। তার দোকানে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছে। তিনি দোকানের নিরাপত্তা নিয়ে আগে কখনোই চিন্তিত ছিলেন না, কিন্তু এবার তিনি অনুভব করছেন যে কিছু একটা খুবই ভুল হচ্ছে।

    মিঃ সাহা গতকাল সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল, একটা অমূল্য পাণ্ডুলিপি দোকানে রেখে এসেছেন। সেই পাণ্ডুলিপিটা ছিল বাংলার প্রাচীন এক লেখকের, যার কাজ এখনো সবার অজানা। সাহা ভাবলেন, পাণ্ডুলিপিটা দোকানে রেখে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। তাই তিনি তাড়াতাড়ি ফিরে এসে দেখেন, দোকানের দরজার তালা ভাঙা, কিন্তু ভিতরে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। সবকিছু ঠিকঠাক আছে, শুধু সেই পাণ্ডুলিপিটাই উধাও। এই ঘটনার পর থেকে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছেন।

    মিঃ সাহা বুকের মধ্যে একটা ভারী বোঝা নিয়ে তার পুরনো বন্ধুর কথা ভাবলেন। তার বন্ধু গোয়েন্দা শবরেশ মিত্র, কলকাতার একজন বিখ্যাত গোয়েন্দা। শবরেশের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং অপরাধীদের ধরার দক্ষতা তাকে শহরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাহা জানেন, শবরেশ মিত্রকে এ ব্যাপারে না জানিয়ে তিনি শান্তি পাবেন না।

    তিনি ফোনের দিকে হাত বাড়ালেন। কয়েকটি রিং বাজার পর অপর প্রান্ত থেকে শবরেশ মিত্রের গভীর গলা শোনা গেল। “হ্যালো, সাহা?”

    “শবরেশ, আমি খুবই বিপদে আছি। তুমি কি আজকের সন্ধ্যায় একটু সময় দিতে পারবে?” সাহার কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট।

    শবরেশ মিত্র, যিনি সেই মুহূর্তে একটি কফি শপে বসে কেসের নোটস ঘাঁটছিলেন, সাহার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পারলেন যে বিষয়টা সাধারণ নয়। শবরেশের কেসের সংখ্যা অনেক, কিন্তু সাহার ফোন পেয়ে তার মনোযোগ পুরোপুরি বদলে গেল।

    “অবশ্যই, মিঃ সাহা। আমি এখনই আসছি,” শবরেশ দ্রুত জবাব দিলেন। তিনি কফি শপ থেকে বেরিয়ে বৃষ্টির ছাতা নিয়ে রওনা দিলেন।

    বৃষ্টির মধ্যে শবরেশের ছাতা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। শহরের রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকা, বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ, আর দূর থেকে আসা ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি যেন সবকিছু আরও রহস্যময় করে তুলছে। তার অভিজ্ঞতা বলে দিচ্ছে, এই কেসটা সাধারণ কেস নয়। কিছু একটা খুব গভীরে লুকিয়ে আছে, যা পৃষ্ঠের উপরে আসে না। সাহা বুক স্টোরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তিনি চিন্তা করছিলেন, কী ঘটতে পারে।

    দোকানে পৌঁছে, শবরেশ চারপাশে একবার দেখে নিলেন। দোকানটা খুব পুরনো, অনেকদিন ধরে এখানে ব্যবসা চলছে। পুরনো ধাঁচের কাঠের তাক, মেঝেতে কার্পেটের উপর পুরনো বইয়ের স্তূপ, আর দেয়ালে কয়েকটা পুরনো ফ্রেমের ছবি ঝুলছে। দোকানের ভেতরে পুরনো বইয়ের গন্ধ মিশে আছে, যেটা মিষ্টি হলেও রহস্যময়। সেই গন্ধে যেন সময় থেমে আছে। চারপাশে ভৌতিক নীরবতা, শুধু ঘড়ির টিক টিক শব্দটাই শুনতে পাচ্ছেন। শবরেশ দোকানের সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন, তার চোখের সামনে যেন কেসের প্রতিটি সূক্ষ্ম দিক ধরা পড়ছিল।

    শবরেশ সোজা মিঃ সাহার দিকে তাকালেন। সাহা এখনো উদ্বিগ্ন, তার কপালে ঘাম জমে গেছে। শবরেশ মৃদু হাসলেন, “কি হয়েছে, মিঃ সাহা? এত অস্থির দেখাচ্ছে কেন?”

    মিঃ সাহা কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “গতকাল রাতে, আমি দোকান বন্ধ করার আগে একটা অমূল্য পাণ্ডুলিপি রেখে গিয়েছিলাম। এক শতাব্দী পুরনো, অত্যন্ত মূল্যবান। আজ সকালে এসে দেখি, পাণ্ডুলিপিটা উধাও।”

    শবরেশ গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। “পাণ্ডুলিপি? একটু বিস্তারিত বলুন।”

    মিঃ সাহা বললেন, “এই পাণ্ডুলিপি বাংলার এক প্রাচীন লেখকের, যে ইতিহাসবিদদের কাছে অজানা। এটার মূল্য কয়েক লক্ষ টাকা, কিন্তু শুধু অর্থের জন্য নয়, এই পাণ্ডুলিপিটা ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। আমি এটা একদিনের জন্যই এখানে রেখেছিলাম। আজ সকালে এসে দেখি দরজার তালা ভাঙা, কিন্তু দোকানে কোনো গোলমাল নেই। শুধু পাণ্ডুলিপিটাই হারিয়েছে।”

    শবরেশ মনোযোগ দিয়ে সাহার কথা শুনলেন। তার মাথায় একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছিল। “কোনো সাক্ষী ছিল? কেউ কি কিছু দেখেছে?”

    মিঃ সাহা মাথা নেড়ে বললেন, “না, আশেপাশে কেউ ছিল না। আমি একাই দোকানে এসেছিলাম। আর, আমার সহকারী অজয় তখন দোকানে ছিল না, সে আগেই বাড়ি চলে গিয়েছিল।”

    শবরেশ মৃদু হাসলেন। “মিঃ সাহা, এটা সোজাসাপ্টা চুরি নয়। এটার পেছনে অন্য কিছু থাকতে পারে। এটা শুধু অর্থের জন্য নয়, বরং ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপির জন্য চুরি হয়েছে। চোর এই জিনিসটার প্রকৃত মূল্য জানে।”

    মিঃ সাহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “আপনি কি বলছেন, মিঃ মিত্র?”

    “আমি বলছি,” শবরেশ ধীরে ধীরে বললেন, “আমাদের জানতে হবে, এই পাণ্ডুলিপির পেছনে কারা আছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কি।”

    শবরেশ দোকানটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। কোনো সাধারণ চোর হলে দোকানে আরো অনেক মূল্যবান বই ও সামগ্রী ছিল, যা নিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু চোর শুধুমাত্র পাণ্ডুলিপিটাই নিয়েছে। তাই শবরেশ নিশ্চিত ছিলেন, চোর কোনো সাধারণ অপরাধী নয়।

    “মিঃ সাহা, আপনার দোকানে কাজ করেন কারা?”

    মিঃ সাহা জবাব দিলেন, “আমার একমাত্র সহকারী অজয়। সে অনেকদিন ধরে আমার সাথে কাজ করছে। খুব বিশ্বস্ত ছেলে। এ ঘটনার সময় সে আমার সাথে ছিল না, দোকান বন্ধ করার সময় সে আগেই বাসায় চলে গিয়েছিল।”

    শবরেশ ভাবলেন, “অজয় কি এতটাই বিশ্বস্ত? না কি অন্য কোনো কারণ আছে? আমাদের এই রহস্যের সূক্ষ্ম দিকগুলো জানতে হবে।”

    শবরেশ মিত্র একটু সময় নিয়ে দোকানের ভিতরে এবং বাইরে ভালোভাবে ঘুরে ঘুরে সবকিছু খতিয়ে দেখলেন। তার তীক্ষ্ণ নজর দোকানের মেঝেতে, তাকের উপরে, এমনকি পুরনো বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোর মধ্যেও কিছু খুঁজছিল। তিনি লক্ষ্য করলেন যে দোকানের দরজা ভেঙে ফেলার জন্য খুব সূক্ষ্ম যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণ কোনো চোরের হাতে থাকা সম্ভব নয়।

    দোকানের পেছনে একটি ছোট্ট ঘর আছে, যেখানে মিঃ সাহা তার পুরনো বইগুলো রেখে দিয়েছেন। শবরেশ সেই ঘরে ঢুকে সবকিছু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। পাণ্ডুলিপি যে জায়গায় রাখা ছিল, সেখানে এখন একদম খালি তাক। কিন্তু তাকের পাশে একটি পুরনো কাগজের টুকরো পড়ে ছিল, যা মাটিতে পড়ার মতো অবস্থা। শ

    বরেশ সেই কাগজটা হাতে তুলে নিলেন।

    কাগজের উপরে কিছু লেখা ছিল, তবে লেখাগুলো প্রায় মুছে গেছে। শবরেশ সেই কাগজটা ধরে রাখলেন, এবং দোকানের নিচের ল্যাম্পের নিচে বসে দেখলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল। তিনি কাগজের লেখাগুলো পড়ে শিউরে উঠলেন। এই কাগজের লেখাগুলো ছিল পুরনো বাংলা হরফে লেখা। তিনি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন, এটি শুধুমাত্র পাণ্ডুলিপির অংশ নয়, বরং এই চুরির প্রমাণও হতে পারে।

    “মিঃ সাহা, আপনার দোকানে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে,” শবরেশ মৃদু হেসে বললেন।

    “আপনি কি কিছু পেয়েছেন, মিঃ মিত্র?” সাহা উদ্বিগ্নভাবে প্রশ্ন করলেন।

    “হ্যাঁ, আমি কিছু পেয়েছি। কিন্তু এটা এখনই বলা যাবে না। আমার আরেকটু তদন্ত করতে হবে। তবে এতটুকু বলতে পারি, এই চুরির পেছনে একজন বিশেষজ্ঞ আছে। এমন কেউ, যে জানে কীভাবে পুরনো তালা ভাঙতে হয়, এবং কীভাবে এই ধরনের পাণ্ডুলিপি চুরি করতে হয়।” শবরেশ খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন।

    “তাহলে, আপনি কি বলছেন, মিঃ মিত্র?” সাহা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন।

    “আমি বলছি, মিঃ সাহা,” শবরেশ চোখে এক রকমের দৃঢ়তা নিয়ে বললেন, “এই কেসটা আমরা যতটা সহজ মনে করছি, ততটা সহজ নয়। চোরের হাতে আরও অনেক কিছু আছে, যা আমরা এখনো জানি না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, আরও তদন্ত করতে হবে। এবং আমি নিশ্চিত, আমরা শীঘ্রই এই রহস্যের মূলটা খুঁজে পাব।”

    7
    3 Comments
Skip to toolbar