-
মন কেমন করে ওঠে
প্রতিবার করিম যখন মাকে ছেড়ে বাবার সঙ্গে থাকতে আসে। মায়ের জন্য তার এতো মন খারাপ হয় যে সে ভাবে বাবার সঙ্গে বেশিদিন থাকবে না। বাবাকে ছেড়ে যায় যখন তখন বাবা’র জন্য এতো মন খারাপ হয় যে কয়েক দিন মনমরা হয়ে থাকে। এবার সে প্রায় তিন মাস পরে বাবার বাসায় আসলো। মা তাকে গেটের কাছে নামিয়ে দিল। গেটের কাছের বটগাছটা’র পাতায় এতো ময়লা জমেছে যে করিমের ইচ্ছে করলো এক্ষুনি বালতি বালতি পানি ঢেলে গাছটা পরিষ্কার করে ফেলে। মা আগেই বাবাকে ফোন করেছিল। গেট খুলে বাবা বের হয়ে এসে করিমকে এক হাতে ধরে মায়ের সঙ্গে কথা বললো। বাবা মা এমন ভাবে কথা বলছে যেন মা ঘন্টা খানেকের জন্য বাইরে গিয়ে ফিরে এসেছে। করিম সবকিছু ভালোভাবে খেয়াল করে। তার বাবা-মা এখনো আপনজনের মতো আচরণ করে। মা উইকএন্ডে বিরিয়ানি রান্না করলে বাবাকে ফোন করে। বিরিয়ানি বাবা’র খুব পছন্দের খাবার।
“চা খেয়ে যাও, রুপা ঘরে আছে।” বাবা বললো।
“না, আজ থাক। আরেক দিন খাব” মা বললো।বাবা আর জোর করলো না। মা রিকশা ঘুরিয়ে চলে গেল। করিমের বাবা আবার বিয়ে করেছেন। করিমের একটা বোন হয়েছে। বোনটির নাম আলিসা। করিম বসার ঘরে বসলো।
বাবা ডাক দিলেন, “রুপা, রুপা”
রুপা আন্টি আলিসাকে কোলে করে বসার ঘরে আসলো। করিম বোনকে কোলে নিতে চাইলো। রুপা আন্টি নিজে হাতে ধরে আলিসাকে করিমের কোলে দিলো। করিমের তখনো মায়ের জন্য মন কেমন করছে। আলিসা’র হাসি হাসি মুখ দেখে করিমের মন ভালো হয়ে গেল। করিমের পাশেই আলিসাকে নিয়ে বাবা বসলো। করিম বোনকে জড়িয়ে ধরলো।কিছুক্ষণের মধ্যেই দুইজনের এতো হুটোপুটি শুরু হলো যে বলার না। রাতের বেলা বাবা করিমের জন্য তার কম্পিউটারে “সিং” মুভিটা ছেড়ে দিলো কিন্তু আলিসা এক মুহূর্ত করিমকে স্থির থাকতে দিল না। করিমের কোলে তাকে বসতেই হবে না হলে আলিসা চিৎকার করে ওঠে। বাবা করিমের পাশে আরেকটা চেয়ারে বসে রইলো। রুপা আন্টি তখন বিরিয়ানি রান্না করছে। করিমের হাতে একটা লে’স এর প্যাকেট। সেটাতেও হাত ঢোকাতে চাইলো আলিসা। বাবা আলিসাকে ধরে রইলো। আলিসাকে যখন বেড রুমে নিয়ে শোয়ানো হলো তখন সে “মমভভ” এমন শব শব্দ করছিল। বাবার অনেক সময় লাগলো তাকে ঘুম পাড়াতে।
রাতের বেলা বাবা আর করিম এক বিছানায় শুলো। ততোক্ষনে আলিসা ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে। বাবা অনেকক্ষণ করিমের মাথায় বিলি কেটে দিল। কখন যে করিম ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে তা সে নিজেও জানে না।খুব ভোরে ঘুম ভাংগলো করিমের। বাড়ির সামনে একটা কাঠ গোলাপ গাছ। সেই গাছে সাদা আর ভিতরের দিকে হলুদ রংয়ের অনেক ফুল। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ফুল গুনতে শুরু করলো করিম। পঞ্চাশ, একান্ন, বায়ান্নো গুনেই তালগোল পাকিয়ে ফেললো। একটা থোকা গুনেছে কী গুনে নাই সে মনে করতে পারলো না। আসলে ফুল গাছে ফুল দেখলেই করিমের ফুলগুলো গুনে দেখতে ইচ্ছে করে। ছাদেও অনেক ফুল আর পেয়ারা ও আম গাছের বাগান আছে। যদিও সে এখনো ছাদে যায়নি। একটু পরে যাবে। এই বাড়িতে জন্ম তার। যদিও তার মনে হয় চিরকাল সে মোহাম্মদপুরে মায়ের সঙ্গেই ছিল। বাড়িটা একটু অচেনা অচেনা লাগে তার। সে দৌড়ে ছাদে উঠে গেল। দরজায় তালা ছিল না। এই বাড়িটা এখনো ছোট আছে একটু। মাত্র দোতালা। এই বাড়ির আশে পাশের বাড়িগুলো পাচতলা, চারতলা ও ছয়তলা। এক মনে সে নানা জাতের ফুল গাছের মধ্যে ঘুরে বেড়ালো। বাবা ও মা’র এই একটি বিষয়ে দারুন মিল। দুইজনেই গাছ খুব ভালোবাসে। একটু পরে বাবা তাকে ছাদ থেকে ডেকে নিচে নিয়ে আসলো।
সকালের খাবার বাবা বানিয়েছে পরাটা ডিম ভাজি আর খাটি খেজুরের গুড়ের পায়েস। অফিস না থাকলে বাবাই রান্না করে। বাবা ইউনিক সব রান্না করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। পরাটা, পায়েস খাওয়ার পরে তাকেও এক কাপ কফি দিল বাবা। বাবার এইসব বিষয় খুব ভালো লাগে করিমের। বড়দের মতো তাকেও এক কাপ কফি দিয়েছে বাবা। মা হলে কখনোই তাকে কফি কিংবা চা দিত না। ঘন্টায় ঘন্টায় চা খাওয়া চাই মায়ের কিন্তু তাকে কখনো চা খেতে দেয়না মা। এখন আর ছোট ছেলে না সে এ বছর স্ট্যন্ডার্ড সেভেনে উঠবে। বাইরে গেলে মাঝে মাঝে কোক স্প্রাইট খেতে দেয় মা কিন্তু কখনো চা খেতে দেয়না।
দুপুর পপর্যন্ত করিম আর আলিসা অনেক খেললো। আলিসা’র ঠোঁটের কাছে আংগুল নিয়ে গেলে সে খপ করে আংগুলটা ধরে ফেলে। তারপর তারা দুইজনেই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। আলিসা বিছানায় গড়াতে থাকে সে গিয়ে ধরে ফেলে।
বিকেলে সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখা হলো। চায়নিজ খাওয়া হলো আরো কতো যে আলিসার সঙ্গে খেলা ও মজা হলো তা বলার না। আলিসা ও করিমের জন্য কাপড় চোপড় কেনাকাটা করার পরে তারা গেল কফি খেতে। সবাইকে কফি খেতে দেখে আলিসা শুধু জিহবা নাড়ালো। কিন্তু আলিসাকে কেউ কফি দিল না।
যদিও মা বলেনি কতোদিন থাকতে হবে কারণ করিমের স্কুলে এখন উইন্টার ভ্যাকেশন চলছে। আর আলিসাকে পেয়ে করিমের এতো ভালো লাগছিল যে সে মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার নামও করলো না। এর মধ্যে একদিন বাবার সঙ্গে সে বাজার করতে গেল। বাজারে বড় বড় ফুল কপি, বাধা কপি আরও নানা ধরনের সবজি দেখতে পেল। বাবা গেল মাছের দোকানের দিকে। বড় বড় মাছ কিনতে পছন্দ করে বাবা। পাতিলের মধ্যে মাছগুলো নড়ছিল। বাবাকে জিজ্ঞেস করে জানলো সে যে ওগুলো রুই মাছ। একটা রুই মাছ কিনলো বাবা।
বাসায় ফিরে অনলাইনে গুড় অর্ডার করলো বাবা। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাটি গুড় দিয়ে গেল এক আংকেল। খাটি গুড় পেয়ে বাবা পিঠা বানানো শুরু করে দিল। প্রথমে বাবা ভাপা পিঠা বানাতে গিয়ে সব গোলমাল করে ফেললো। পিঠা শক্ত হলো, পিঠায় গুড় কম হলো। পরে সব ঠিক হয়ে গেল। বাবা আরেকদিন সবাইকে ভাপা ইলিশ রান্না করে খাওয়ালো। বাবার রান্না করা মানেই চিৎকার চেচামেচি। এটা ঠিক জায়গায় নাইতো ওটা আরেক জায়গায় কেন? বাবার চিৎকার ভালো লাগছিল না করিমেরর। শেষমেশ বাবার হাতের ভাপা ইলিশ অনেক মজা হলো।
একদিন পার্টি হলো। করিমের ফুপু, ফুপা আর চাচা চাচিরা আসলেন। ফুপুরা এসেই করিমকে অনেক ফল আর শার্ট প্যান্ট কিনে দিলেন। সেদিন বাবা বিরিয়ানি রান্না করলো। ফুপুরা অবশ্য বাবার বিরিয়ানি খুব একটা পছন্দ করলেন না। বাবাকে নানাভাবে বোঝালেন কিভাবে হায়দ্রাবাদের দম বিরিয়ানি, মাটন বিরিয়ানি ইত্যাদি রান্না করতে হয়। বাবা অবশ্য বুঝিয়ে ছাড়লো যে তার বিরিয়ানিই সেরা।
সাতদিন পরে মায়ের ফোন আসলে করিমের মনে হলো দিনগুলো কতো দ্রুতই না কেটে গেল। মা যখন বাসার সামনে আসলো তখনও করিম একটা মুভি দেখছিল। মা বসে চা খেল আলিসাকে কোলে নিয়ে আদর করলো। মুভি দেখা শেষে করিম যখন আগের দিন গুছিয়ে রাখা ব্যাগটা আনতে বেডরুমে ঢুকলো তখন তার মন কেমন করে উঠলো। আলিসাকে কোলে নিয়ে বাবা যখন তাকে রিকশায় উঠতে সাহায্য করলো তখন করিমের চোখে পানি এসে গেল। আলিসা, বাবা ও রূপা আন্টির জন্য তার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। সে ভাবলো খুব তাড়াতাড়ি সে আবার বাবার কাছে ফিরে আসবে।
5 Comments-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 06 September 2024 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
Friends
Rokter Sagor
@roktersagor
Promit Chowdhury
@promitchowdhury
Mahmudul Hasan
@mahmudulhasan1
Emran Hasan Najmul
@emranhasannajmul
Arif
@arif1
Dipankar Shuva
@dipu42dramagmail-com
Maizbhandari Sufi Academy
@maizbhandarisufiacademy
Sharmin
@sharmin1
Zahidul Islam Roni
@roni03



সুন্দর গল্প… 🖤🖤