-
আ ম্যাথ ফর লাইফ
মৃদুলদের বাড়ি এই ছোট গলিটা ধরে সামনে একটু গেলেই। রাস্তার দুই পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছ। হলুদ বোটা আর লাল ফুলে ভরে আছে গাছগুলো। ভীষণ ভালো লাগছে সামি’র। সামি চোখ তুলে গাছ দেখতে দেখতে এগুচ্ছে। একটুখানি পথ হেটেই মৃদুলদের ঘর। চারপাশে গাছে ছাওয়া একটি টিনশেড ঘর। আলগোছে দরজার কড়া ধরে নাড়া দেয় সামি। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে মৃদুলের মা দরজা খুলে দিল। সামি সালাম দিয়ে ঘরে ঢুকলো।
“এদিকে এসো” বলে সামিকে মৃদুলের ঘরে নিয়ে গেলেন।
মৃদুল একটা বালিশের উপর কাত হয়ে শুয়ে আছে। মৃদুলের গায়ে জ্বর। দুইদিন স্কুলে যাচ্ছে না। স্কুলে মৃদুলকে না আসতে দেখে সামি খবর নিয়ে জেনে মৃদুলকে দেখতে এসেছে। মৃদুল তার বেস্ট ফ্রেন্ড। মৃদুল আর সামি দুইজনই বই পড়তে খুব ভালোবাসে। এখনো মৃদুলের বালিশের পাশে অনেকগুলো বই। সামি খাটে বসে বইগুলো তুলে নেয়। ট্রেজার আইল্যান্ড আর লিটেল মারমেইড খুলে একটু পড়ে নেয় সামি। ততক্ষণে মৃদুল সোজা হয়ে শুয়ে সামি’র দিকে তাকায়। দুইজনে হাসি বিনিময় করে।“কী অবস্থা?” সামি জিজ্ঞেস করে
“এইতো।”সামি আবার বই পড়ায় মন দেয়। একটু পরে মৃদুলের মা দুটো কাপে চা আর মোয়া দিয়ে যায়। মোয়ায় কামড় বসাতেই কুড়মুড় শব্দ হয়। সেই মজা! মৃদুল একটা মোয়া খেয়ে দ্রুত চা’য়ে চুমুক দিয়ে কাপটা রেখে দিয়ে আবার শুয়ে পরে। একটু পরে আবার উঠে চা’য়ে চুমুক দেয়। সামি দুটো মোয়া খেয়ে চা খেয়ে বই দুটোয় চোখ বুলিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
“লাইব্রেরি থেকে কিছু বই এনে দিও তো।”
সামি মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে দরজার দিকে এগোয়। মৃদুলের মা দরজা বন্ধ করে দেয়।পরের দিনটা ছিল শনিবার। সকাল থেকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তাড়া অনুভব করে সামি। যদিও তার পড়া হয়নি। সব পড়া সে ক্লাসে করে নিবে। লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে বসবে সে। স্যার পড়া নিতে নিতে পড়া হয়ে যাবে তার।
স্কুলে যাওয়ার পথটা খুবই মজার। চৌরাস্তার পরে একটু হাটলেই অক্সফোর্ড মিশন স্কুল। প্রথমে প্রাইমারি স্কুল তারপরে হাইস্কুল। ছেলে মেয়ে দুই দলের গায়ে অরেঞ্জ শার্ট ও অরেঞ্জ কামিজ বা ফ্রক। ছেলেরা সাথে পরে নেভিব্লু প্যান্ট আর মেয়েরা সাদা সালোয়ার। রাস্তার দুই আশেই তখন অরেঞ্জ আর গোলাপি রংয়ের খেলা দেখা যায়। গোলাপিটা সদর গার্লস বালিকা বিদ্যালয়ের। অক্সফোর্ড মিশনে কোএডুকেশন চলে।
স্কুল গেট দিয়ে ঢুকলেই এক বিরাট দীঘি। দীঘির শান্ত পানির পাশটা বাধানো। সেই বাধানো পাশটা ধরে হাটতে থাকে সামি। আসেম্বলিতে তাকে শপথ পাঠ করতে ডাকা হয়। সামি’র শান্ত গলা মাইকে বেজে ওঠে ‘আমি ওয়াদা করিতেছি যে…। এরপরে ছেলে মেয়েরা জাতীয় সংগীত গায়। দরাজ গলার জাতীয় সংগীত ছড়িয়ে পরে বিশাল চত্বরে।
চারটা ক্লাস কোনভাবে শেষ করে সামি। টিফিনে একটা সিংগারা খাবে সে। স্কুলের মধ্যেই দাদুরা সিংগাড়া ও চাটনি বিক্রি করে। সামি দৌড়ে গিয়ে একটা সিংগাড়া কিনে লাইব্রেরি’র দিকে ছুটতে থাকে। হোস্টেলের ছেলেরা অনেকে পুকুরে গিয়ে গোসল করে এসময়। সামি একদিন শার্ট প্যান্ট নিয়ে এসে দীঘির পানিতে গোসল করবে বলে মনে মনে ভাবলো। সামি’র সাতার কাটতে খুব ভালো লাগে। তাদের বাসার পিছনেও একটা বড় পুকুর আছে। সামি তাদের পাড়ার কোন পুকুরেই সাতার কাটতেই বাকি রাখে নাই। ছোট বেলায় তাকে পুকুর থেকে ওঠাতে তার বাবাকে প্রায়ই বেত নিয়ে বসতে হতো পুকুর পাড়ে। এখন সে সুযোগ পেলে কীর্তনখোলা নদিতে গিয়ে সাতার কাটে। সবাই যখন স্কুল থেকে বনভোজনে যায় তখনও সামি সেখানকার দীঘিতে সাতার কাটে।
সামি’র কাছে থাকা সব বই মৃদুলের পড়া হয়ে গেছে। পরের দিন টিফিন ছুটির সময় সামি লাইব্রেরি’তে যায় বই আনতে। লাইব্রেরিয়ান সামিকে দেখে হাসে।
“নতুন কিছু কী এসেছে?” সামি জিজ্ঞেস করে।লাইব্রেরিয়ান মাথা নেড়ে হাসে। লাইব্রেরিয়ান আংকেল জানেন সামি বই পড়তে অনেক ভালোবাসে। মৃদুলের জন্য বেস্ট একটা বই খুঁজতে থাকে সামি। পুরো লাইব্রেরি খুঁজতে খুঁজতে “লিটেল প্রিন্স” আর “দি ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি” বই দুটো খুঁজে পায়। অনেক দিন ধরে “দি ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি” বইটা খুঁজছিল সামি, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিল না। এবার মৃদুলের জন্য বই খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গেল প্রিয় বইটা।
ক্লাসে ব্রাদার স্টিফেন যখন ম্যাথের জটিল নিয়ম কানুন শেখাচ্ছিলেন তখন সামি মিটিমিটি হাসছে। কেউ জানে না সামি জীবনের একটি সরল নিয়ম শিখে ফেলেছে ‘অন্যের জন্য বেস্টটা খুঁজলেই নিজের প্রিয়টা খুঁজে পাওয়া যায়।’
বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সামি তততোক্ষণে অন্য মানুষ হয়ে গেছে। রাস্তার দুই পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো পাতা নাড়িয়ে হাসছিল যেন তারা জেনে ফেলেছে সামি কী ভাবছে।
2 Comments
Friends
Rokter Sagor
@roktersagor
Promit Chowdhury
@promitchowdhury
Mahmudul Hasan
@mahmudulhasan1
Emran Hasan Najmul
@emranhasannajmul
Arif
@arif1
Dipankar Shuva
@dipu42dramagmail-com
Maizbhandari Sufi Academy
@maizbhandarisufiacademy
Sharmin
@sharmin1
Zahidul Islam Roni
@roni03


তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 25 September 2024 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!