-
বাংলার স্থাপত্য চর্চার বিশেষত্ব
বাংলার স্থাপত্য চর্চার সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল। এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। যিশু খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে অর্থাৎ প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে। এক সময় এই বাংলায় বৌদ্ধরা জ্ঞান অর্জনের জন্য গড়ে তোলে এই বিহার। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ধারণা তৈরি হবার হাজার বছর আগে। আমি আমার লেখায় বাঙালি সভ্যতার আলচনায় যাব না। আমার উদ্দেশ্য বাংলার স্থাপত্য রীতির বিশেষত্ব। এখানে বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল মুলত ইট, কাঠ এবং বাঁশ। পলিমাটির দেশ, অজস্র নদী। তাই খুব সহজেই এই পলি মাটিকে ছাঁচে ফেলে রোদে শুকিয়ে বা পুড়িয়ে ইট তৈরি করা যায়, যা প্রধান বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল। কনক্রিট আমাদের নিজস্ব বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল নয়। তাছাড়া সিমেনট এবং কনক্রিট তৈরির প্রক্রিয়া পরিবেশ বান্ধব নয়। তারপর আছে কাঠ। আমরা কাঠ বলতে বুঝি সেগুন বা মেহগনি। কিন্তু এটিও বাংলার বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল নয়। এখানকার কাঠ শাল এবং জারুল। যা বৃষ্টির পানিতে সহজে নষ্ট হয়। অন্য কাঠ পানিতে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। শাল বা জারুল কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি করা হয় কারণ পানি সহনীয়তা। তারপর সবচেয়ে বেশি সুলভ বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল হল বাঁশ। অল্প দিনে বড় হয়। টেনসাইল ক্ষমতা অনেক বেশি। মাটি আরেকটি বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল ।
যাই হোক মর্টার হিসেবে এখানে ব্যবহার করা হত নদীতে পাওয়া শামুকের খোল , চুন, খয়ের এসবের মিশ্রণ। যা সিমেন্টের থেকে বেশি পরিবেশ বান্ধব। আমাদের এখানে যে পাকা বাড়ি হত তা হত মুলত ইটের। তার মর্টার ছিল চুন সুরকি। বাংলাদেশের পরিবেশ চিন্তা করলে এক্সপোসড ব্রিক কোন ভালো সমাধান নয়। প্লাস্টার করাটাই স্বাভাবিক। যেহেতু চুন সুরকির প্লাস্টার তাই ভবনের রং ছিল শাদা। অন্য দিকে বাংলায় মোঘলরা শাসন করেছে। ভারতে তাদের অধিকাংশ স্থাপত্য কর্ম রেড স্যান্ড স্টোনের। বাংলায় পাথর নেই। তাই প্লাস্টারে মিশিয়ে দেয়া হত ইটের গুঁড়ো। ফলে প্লাস্টার লাল রং ধারণ করত। তাই বলা যায় বাংলার স্থাপত্যের বিশেষত্ব শাদা বা লাল ভবন।
আমরা অনেক প্রাচীন স্থাপত্যে দেখতে পাই উত্তল বা বাঁকা দেয়াল। ফলে বৃষ্টির পানি সহজেই গড়িয়ে পড়ত।
এখন আসি ছাদ প্রসঙ্গে। প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার গুলোতে সমতল ছাদ ছিল। তাহলে বৃষ্টির পানির কি হবে? তাদের ছিল অত্যাধুনিক আন্ডার গ্রাউনড ড্রেন সিস্টেম। যা বর্তমান ঢাকায় নেই। তাই সেখানে সমতল ছাদ সমস্যা নেই। ডোম বা গম্বুজ শুধুমাত্র ব্যবহার করা হয়েছে বড় স্প্যান ধরতে। এটি প্রকৌশলী কৌশল। আমরা ডোমের সর্বাধিক ব্যাবহার দেখি মসজিদে। তাই আমাদের একটা ধারণা তৈরি হয়েছে, মসজিদ হলেই গম্বুজ থাকতে হবে। কিন্তু এটি মুলত বড় একটি হকলাম বিহহেন হল রুম তৈরি করার প্রযুক্তি। বাংলাদেশের মসজিদে মিনার নেই। কারণ বাংলাদেশ মোটামুটি সমতল। তাই খুব বেশি দূরে থেকে কিছু দেখার সম্ভাবনা নেই। কারণ মিনার তৈরি করলে তা গাছ পালায় ঢেকে যাবে। এটি বাংলার মসজিদের বিশেষত্ব। এখানে অনেক সময় ছাদ তৈরি করা হত ইট দিয়ে। এই কৌশল এখান কার কারিগরেরা শিখেছিল। যদিও এখন এর ব্যবহার নেই।।
টাইলসের বদলে ব্যাবহার করা হত পোরসেলিনের তৈজস পত্র। যা দিয়ে ক্ল্যাডিং করা হত।
ঘরের নকশা ছিল সাধারণ। একটি উঠোন ঘিরে ঘর তৈরি করা হত। হাজার বছর আগে বাস্তু শাস্ত্র নামক শাস্ত্রে, ঘরের নকশা কেমন হবে তার বিস্তারিত বর্ণনা করা ছিল। কিন্তু আমাদের বর্তমান একাডেমিক শিক্ষায় তার কোন নাম গন্ধ নেই।
আপ্যারচার সাধারণত ছোট। কারণ গ্রীষ্মের উত্তাপ। আজ কাল ঢালাও ভাবে আমরা গ্লাস ব্যবহার করি। রোদের এবং উত্তাপের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য বারান্দার ব্যবস্থা ছিল। যা একটি বাফার জোন তৈরি করত।
এসব কথা বলার উদ্দেশ্য আমরা বিশ্ব বিদ্যালয়ে পাশ্চাত্য এর মডার্ন আর্কিটেকচার শিখি। সেখানে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গ্রীন কনটেক্সটুয়াল বিল্ডিং। গত কয়েক দিন ধরেই ভাবছি, আমাদের স্থাপত্য কেমন? পাশ্চাত্যের স্থাপত্য কেমন তা আমরা ভার্সিটি তে শিখি। ওরা কনটেক্স, স্টাইলকে গুরুত্ব দেয়। আমরা অন্ধের মতো ওদের অনুকরণ করি। কারণ আমাদের শেখানো হয় পাশ্চাত্যের স্থাপত্য। আমাদের নিজস্ব বিশেষত্ব সম্পর্কে আমরা গভীর ভাবে জানি না, শিখি না। তাই আমাদের যা শেখানো হয় তারই প্র্যাকটিস করি। আমাদের গবেষণার খুবই অভাব। হিসট্রি অফ বেঙ্গল সাবজেক্টটি বুয়েটের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৯২-৯৩ সালে। এবং ছাত্র ছাত্রীদের জন্য তা ছিল আতঙ্কের ওপর নাম। আমিও বেশ কয়েকবার ফেল করে এসেছি এই সাবজেক্টে।
কিন্তু আমাদের কাজ দেখলে মনে হয় এই বিল্ডিং তো ইউরোপে, আমেরিকায় আছে। আমাদের বিশেষত্ব কোথায়? তখন মনে হয় আমরা শেকড় থেকে বিচ্যুত। কারণ আমরা দীর্ঘ দিন পরাধীনতার ছায়ায় ছিলা। তাই নিজেদের ভুলে গেছি। আমাদের স্থাপত্য তো আমাদের মতো হওয়া উচিত ইউরোপিয়ানদের মতো না হয়ে। আমি নিজেও প্র্যাকটিসে নেই। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে বিষয়টি ভাবাচ্ছে। ওপরে যা বললাম বা লিখলাম তা শিক্ষকদের কাছ থেকে ধার করা। ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সকলের জন্য শুভকামনা।2 Comments
Friends
Nadia Rifat ritu
@ritu
Taposh Kumer dey
@taposhkumerdey
হুসেন মোহাম্মদ সারোয়ার সাঈদ
@hm-saroar-saied
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
মো: নাজমুল আখতার
@faith
জান্নাতুল ফেরদাউস
@ferdawsejannatul343gmail-com
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
প্রাপ্তি রোজারিও
@praptirozario
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com


শেকড়ের কাছে ফেরাটা জরুরী। ইউরোপীয় রীতি অনুসরণ, অনুকরণ করতে গিয়ে প্রকৃতি-প্রতিবেশ বিষিয়ে তুলছি। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। আপনার লেখা থেকে বাংলার স্থাপত্য বিষয়ে অনেক কিছু জানা হলো।