-
“নামিবের দৃষ্টি”
________________________________________
রোদে পুড়ে তপ্ত হয়ে থাকা সোমালিয়ার বালুময় মাটি, সেখানে হাঁটছিল নামিব। বয়স বিশ। পা রেখেছে সেই লজ্জার সীমানায়, যেখানে বিয়ের ঘন্টা না বাজলে পুরো গ্রাম তাকাবে ভ্রুকুটি করে। পেছনে থাকলো মায়ের দীর্ঘশ্বাস, সামনের পথে শুধুই সমাজের চাপ।
নামিব একান্তেই চেয়েছিল তার জীবনসঙ্গী হোক এমন কেউ, যাকে সে ভালোবাসবে, যার চোখে সে নিজেকে খুঁজে পাবে। কিন্তু ভালোবাসা এখানে বিলাসিতা—তাকে শেখানো হয়েছে, ‘পুরুষ হওয়ার মানেই চারটি স্ত্রীর অধিকার, চারটি দায়িত্ব, চারটি ছায়া—যা তোমার সম্মানের স্তম্ভ।’
প্রথম স্ত্রী হিসেবে নামিব বেছে নিয়েছিল সাহরা-কে। সাহরা ছিল অন্য রকম। সে গল্প বলত, চোখে চোখ রেখে কথা বলত, এবং জিজ্ঞাসা করত, “তুমি কি নিজেকে খুঁজে পেয়েছো?”—এই প্রশ্নটা কাঁপিয়ে দিত নামিবকে।
বিয়ের ছয় মাস পর সাহরা গর্ভবতী হয়। পুরো গ্রাম খুশি হয়, আর নামিবের মা, হিবাক, মুখে মুচকি হাসি নিয়ে বলে, “তুমি এখন একজন পুরুষ। এবার তোমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পালা।”
নামিব চমকে ওঠে। “আমি তো কাউকে চাইনি মা। সাহরা তো আছে।”
“তুমি একা চাইলেই হবে না। সমাজ চায়, নিয়ম চায়। আমি তোমার জন্য একজনকে বেছে রেখেছি। ফারিয়া। সে আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। সুশীলা, কর্মঠ, নিঃশব্দ।”
নামিব জানে এই আলোচনা বৃথা। হিবাক কখনও নিজের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেন না। ফারিয়া আসে, নীরব পায়ে সংসারে ঢুকে পড়ে। সাহরা কাঁদে না, কিন্তু তার চোখে জমে থাকে অব্যক্ত অভিমান।
নামিবের জীবনে যেন দুটি জগৎ তৈরি হয়—একটা জগতে সাহরা আছে, যেখানে কথা বলা যায়, হাঁসা যায়, ভালোবাসা যায়। অন্য জগতে ফারিয়া আছে, যেখানে দায়িত্ব আছে, নীরবতা আছে, নিয়ম আছে।
কিন্তু সময় কারও জন্য দাঁড়ায় না। নামিবের বয়স এখন ত্রিশ। তৃতীয় স্ত্রী নেওয়ার সময়। এবারও সিদ্ধান্ত আসে হিবাকের পক্ষ থেকে। “এইবার কেউ ব্যতিক্রম নয়। তোমার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। হালিমা রাজনীতিক পরিবারের মেয়ে। তোমার নাম উঁচু হবে।”
নামিব প্রতিবাদ করে না। মুখে শুধু বলে, “হ্যাঁ মা।”
হালিমা আসে এক ঝলমলে ঝড়ে। সে আত্মবিশ্বাসী, আধুনিক, এবং নামিবকে দেখে বলে, “তুমি কি নিজের জীবনের মালিক?”
নামিব কাঁপে—এই প্রশ্নটা সে তো নিজেকেই করতে ভয় পায়।
এই তৃতীয় বিয়েতে সাহরার কোল তখন খালি। তাদের মেয়ে, জোহরা, পাঁচ বছর বয়সে জ্বরে মারা যায়। সেই শোকের পর সাহরা যেন পাথর হয়ে গেছে। ফারিয়া নিজের সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত, আর হালিমা রাজনীতি, সোশ্যাল মিডিয়া আর সভা-সেমিনারে।
নামিব ধীরে ধীরে এক শূন্যতার মধ্যে প্রবেশ করে। সে ভাবে—এই জীবনটা কার জন্য? কার কাছে সে নিজের বলতে পারে কিছু?
চারিদিকে উৎসব চলছে—যেহেতু নামিব এবার চল্লিশের দোরগোড়ায়, তাকে চতুর্থ স্ত্রী গ্রহণ করতেই হবে। না হলে সমাজ বলবে, “পুরুষ হতে পারলে তো চারজন স্ত্রী জোটাতে পারতে!”
কিন্তু এবার নামিব সিদ্ধান্ত নেয়—এবার আর না।
সে তার মাকে ডাকে, সাহরাকে পাশে বসিয়ে বলে, “আমি আর বিয়ে করবো না মা।”
হিবাক বিস্ময়ে চোখ বড় করে বলে, “কি বললে? তুমি কি চাও, পুরো গ্রাম হাসুক তোমার উপর?”
নামিব মাথা নত করে বলে, “আমার আত্মা ক্লান্ত মা। আমি ঘর করেছি, সন্তান পেয়েছি, দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু আমি ভালোবাসা পাইনি। সাহরা ছিল, কিন্তু আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি নিয়মের চাপে। আমি আর কাউকে চাই না। আমি নিজেকে চাই।”
এই ঘোষণা পুরো গ্রামে তোলপাড় ফেলে দেয়। লোকেরা বলে, “নামিব পাগল হয়েছে! একজন পুরুষের গর্ব তো তার স্ত্রীর সংখ্যা!”
কিন্তু নামিব জানে, পুরুষত্ব গঠিত হয় ভালোবাসা, সম্মান, এবং আত্ম-সচেতনতার ভিতর দিয়ে। স্ত্রীর সংখ্যা নয়।
সাহরা ধীরে তার হাত ধরে। বহুদিন পর আবার বলে, “তুমি কি নিজেকে খুঁজে পেয়েছো?”
নামিব চুপ করে থাকে। তারপর ফিসফিস করে, “হয়তো এখনও পাইনি। কিন্তু এবার শুরু করেছি। তোমার হাত ধরে, সাহরা।”1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

পুরুষত্ব গঠিত হয় ভালোবাসা, সম্মান, এবং আত্ম-সচেতনতার ভিতর দিয়ে। স্ত্রীর সংখ্যা নয়।……………………………চমৎকার কথা। মুগ্ধ হলাম।