-
ইনবক্সের ওপার
ঢাকার এক জনবহুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী রুনা। সমাজবিজ্ঞানে পড়ছে, ভবিষ্যতে সমাজকর্মী হতে চায়। তার কথাবার্তা সংযত, পোশাকে মার্জিত, চোখেমুখে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস—যা তাকে আলাদা করে তোলে।
রুনার ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে আড়াই হাজারের মতো মানুষ। প্রতিদিন নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে। কিছু ছেলে তার প্রতিটি পোস্টে লাভ ইমোজি দিয়ে কমেন্ট করে, কেউ ইনবক্সে কবিতা পাঠায়, কেউ আবার স্টিকার দিয়ে “hi” বলে শুরু করে।
শুরুর দিকে রুনা এসবকে উপভোগ করত। নিজেকে আকর্ষণীয় মনে হতো। কলেজের দিনগুলোতে সে আত্মবিশ্বাসে খুব দুর্বল ছিল, বন্ধুরা তাকে খুব একটা পাত্তা দিত না। কিন্তু ভার্চুয়াল দুনিয়া যেন হঠাৎ তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিল। এখন সে জানে, সে সুন্দর, মেধাবী এবং… চাহিদাসম্পন্ন!
কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করল, এই “চাহিদা” কোনো সত্যিকারের ভালোবাসার নয়। বেশিরভাগ ছেলে প্রথমেই বলত, “তোমাকে দেখে ভালো লেগেছে”, “কখন দেখা যাবে?”, “একটু সময় দিবা?”, “সিঙ্গেল আছো তো?”… এরপর আসত অফার—চা খাওয়ার, রেস্টুরেন্টে বসার, বারে যাওয়ার।
রুনা একদিন একটা ছোট পরীক্ষা করল।
একজন ছেলে, নাম রাফি, বেশ কিছুদিন ধরে ইনবক্সে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছিল। রুনাকে “রানী” বলে ডাকে। প্রায়ই বলে, “তোমার জন্য মরে যাই, একটা সুযোগ দাও!”
রুনা তাকে বলল,
— “ঠিক আছে, যদি সত্যিই পছন্দ করো, তাহলে আমার বাবার সাথে দেখা করো। আমি একা কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। বাবার সম্মতি লাগবে।”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল,
— “তোমার মাথা খারাপ? আমি তো মজা করছিলাম। এত সিরিয়াস কেন?”
তারপর সেই রাফি আর কখনও ইনবক্সে ফিরল না।
একদিন সন্ধ্যায় রুনা ফেসবুক পোস্ট করল:
“তোমাকে দেখেই ভালো লেগেছে” বলার আগে একবার ভাবো, তুমি কি আমার মনকে চিনেছো? আমার স্বপ্ন, সংগ্রাম জানো? শুধুই শরীর পছন্দ করে কেউ ভালোবাসা দাবি করতে পারে না।”
এই পোস্টে কেউ কেউ প্রশংসা করল, কিন্তু বেশিরভাগ ছেলে কটাক্ষ করল। কেউ লিখল, “ওভার থিংকার”, কেউ বলল, “ফেমিনিস্ট ভাব নেয়ার দরকার নাই।”
সেই রাতেই রুনা তার মা-বাবার কাছে গিয়ে বলল,
— “আমি বুঝতে পেরেছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীরা যেন এক ধরনের ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়। পছন্দ করা, না পছন্দ করা—সবই বাইরের চেহারার ভিত্তিতে। আমার জীবনটা আমি এভাবে নষ্ট করব না।”
তার বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— “তোমার উপলব্ধি সত্যি, মা। কিন্তু এটা থেমে থাকবে না, তুমি চাইলে কিছু করতে পারো।”
সেই রাতেই রুনা সিদ্ধান্ত নেয়—সে একটি ছোট্ট অনলাইন ক্যাম্পেইন চালু করবে, নাম “চিনে ভালোবাসো”। যেখানে মেয়েরা নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবে—কীভাবে ফেক অ্যাটেনশন তাদের জীবনকে বিভ্রান্ত করেছে, আর কীভাবে তারা সেটার বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
প্রথমেই সে একটি লাইভ করে তার অভিজ্ঞতা বলে। কয়েক হাজার মানুষ দেখে, শত শত মেয়েরা ইনবক্সে তাকে ধন্যবাদ জানায়। কেউ লিখে, “আমিও ভেবেছিলাম, এত অ্যাটেনশন মানেই ভালোবাসা… ভুল বুঝেছিলাম।”
দিন যেতে লাগল। এই ক্যাম্পেইনের সাথে যুক্ত হল আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। তাদের মধ্যেই ছিল এক ছেলেও—তানভীর।
তানভীর ছিল সমাজবিজ্ঞানেরই ছাত্র, অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তার চিন্তা ছিল গভীর, কথায় পরিপক্বতা। রুনার লাইভ দেখে সে একটি ম্যাসেজ করে:
— “তোমার সাহসের প্রশংসা করি। আমরা অনেকেই বুঝি, কিন্তু বলতে পারি না। তুমি বলেছো। পাশে থাকতে চাই।”
রুনা প্রথমে ভেবেছিল, এটাও হয়তো স্রেফ আরেকটা ‘ভদ্র’ ফ্লার্ট। কিন্তু তানভীর ছিল আলাদা। সে কখনো “তুমি সুন্দর” দিয়ে শুরু করেনি। বরং বলত, “তুমি যে সামাজিক ব্যাখ্যায় বলেছিলে নারীদের ইনবক্সের উপরে তৈরি বিভ্রম, সেটা নিয়ে আমি গবেষণা করতে চাই।”
তাদের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল—সততার, চিন্তার, সম্মানের ভিত্তিতে। কখনো দেখা না করেও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া গড়ে উঠল।
রুনার একটি শর্ত ছিল—প্রেমের শুরু যদি হয়, সেটা হবে পরিবারের জানায়। কোনো লুকোচুরি নয়।
একদিন তানভীর বলল,
— “আমি আমার মাকে তোমার কথা বলেছি। তোমার কাজের প্রতি তারও শ্রদ্ধা। যদি তুমি চাও, আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারকে যুক্ত করতে পারি।”
রুনার চোখ ভিজে গেল। এতগুলো ইনবক্সের ভিড়ে, এতগুলো “তোমাকে চাই”র ভান—একজন এসে বলল, “তোমার দায়িত্ব নিতে চাই”।
বছরখানেক পর, রুনা ও তানভীর মিলে “চিনে ভালোবাসো” ক্যাম্পেইনকে একটি ছোট্ট সংগঠনে রূপ দেয়। তারা স্কুল-কলেজে গিয়ে কথা বলে, মেয়েদের আত্মসম্মান নিয়ে সচেতন করে, ছেলেদের শেখায়—ভালোবাসা চাওয়া মানে শুধু চেহারা নয়, মন বুঝে তার পাশে দাঁড়ানো।1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যানে এমন নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা সামনে আসছে, আরো অনেক সমস্যা লোখচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গিয়েছে। এমন একটি সামাজিক বাস্তবতায়, আপনার লেখাটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী। লেখাটির বহুল প্রচার দরকার।