-
প্রতিবিম্বের ভিতর আমি
রাত সাড়ে দশটা।
ঢাকার ধানমণ্ডির এক আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টে বসে ছিল অনিন্দ্য। একটা ঝকঝকে কাচের আয়নার সামনে, নিজের মুখটা দেখছিল সে অনেকক্ষণ ধরে। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি, জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, আর তার ভেতরেই প্রতিফলিত হচ্ছে অনিন্দ্যের মুখ—চশমার কাচের পেছনে চিন্তিত দুই চোখ, কপালে দুশ্চিন্তার রেখা, ঠোঁটের কোণে হালকা বিরক্তির রেখা।
আজ ছিল তার অফিসের বড় প্রেজেন্টেশন। অনিন্দ্য, কর্পোরেট দুনিয়ায় বেশ পরিচিত নাম। এক আন্তর্জাতিক কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের স্ট্র্যাটেজি লিড, যে সহজেই মিটিংরুমে শব্দ দিয়ে প্রতিপক্ষকে থামিয়ে দিতে পারে। কথা বলতে জানে, দল চালাতে জানে, কিন্তু আজকের দিনটা তার মনমতো হয়নি।
সহকর্মী লাবণী একটা যুক্তি দিয়েছিল ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে, এবং সেই যুক্তি অনিন্দ্যের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু সেটা সে মেনে নিতে পারেনি। প্রকাশ্যে কিছু বলেনি বটে, কিন্তু সবার সামনে লাবণীর আইডিয়াটাকে “অবাস্তব ও বেশি আদর্শবাদী” বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। মুখে হাসি থাকলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে জ্বলছিল সে। কারণ, শ্রেষ্ঠত্বের জায়গাটা সে কাউকে দিতে রাজি ছিল না।
ঘরে ফিরে আয়নার সামনে বসে নিজের মুখটা দেখতে দেখতে হঠাৎ সে থমকে গেল। কেন সে এতটা বিরক্ত? কেন এমন লাগছে যেন তার ভেতর কেউ লড়াই করছে?
মুঠোফোনে নোটিফিকেশন এলো—
“Today is World Ego Awareness Day. Take a moment to reflect.”
একবার পড়েই হেসে ফেলল অনিন্দ্য।
“আহা, আবার কী দিবস!” — এই বলে ফোনটা পাশে রেখে দেয়। কিন্তু আয়নার সামনে বসা মানুষটা যেন জিজ্ঞেস করল, “তুই ভয় পাচ্ছিস কেন, অনিন্দ্য? একটু চিন্তা কর তো, আজকের ক্ষোভটা আসলে কোথা থেকে এল?”
আবার ফোনটা হাতে নিল সে। গুগলে সার্চ করল—“Ego in workplace behavior”। কিছু লেখা পড়ল। তারপর একটা লাইন তার মনে গেঁথে গেল—
“Ego thrives where insecurity hides.”
অনিন্দ্য নিজের ভেতর তাকানোর চেষ্টা করল। ক্লাস এইটের কথা মনে পড়ল। ক্লাসে যখন তাকে কেউ থামিয়ে দিয়ে সঠিক উত্তর বলত, সে ক্ষেপে যেত। কলেজে কেউ তার তুলনায় ভালো স্কোর করলে সে মুখে হাসলেও অন্তরে ঈর্ষায় জ্বলে যেত। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কোনো প্রেমিকাকে কেউ প্রশংসা করলেই তার মনে হতো, “তুমি শুধু আমার!”
অনিন্দ্য জানে, এই যে নিজের সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা, এই যে সব সময় শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার তাগিদ—সবই আসলে তার ইগো।
সে জানে, ইগো কখনো চিৎকার করে বলে না, “আমি এসেছি!”
ইগো নীরবে ঢুকে পড়ে, তখন যখন কেউ তাকে উপেক্ষা করে, অথবা কারও উপরে একটু প্রশংসা বেশি যায়। ইগো তখনি রাগে মুখ লাল করে না—ইগো তখন চুপ করে যায়, কিন্তু মনে রাখে, তারপর সুযোগ মতো প্রতিশোধ নেয়।
________________________________________
অনিন্দ্য ঠিক করল, সে আজ কিছু পরিবর্তন আনবে। ছোট ছোট পদক্ষেপে।
সে একখানা ডায়েরি খুলে লিখল:
২০১৮ সাল থেকে প্রতিবছর ১১ মে ‘ইগো সচেতনতা দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। কীভাবে নিজের ও অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ককে পরিচালনা করতে হবে। ব্যর্থতার মুখে পড়লে কীভাবে ঠান্ডা মাথায়, মেজাজ ও ব্যক্তিত্ব না হারিয়ে সেই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা যায়, তার গুরুত্ব তুলে ধরা এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য।
আজ আমি আমার ইগোকে মুখোমুখি দেখলাম।
আমি বুঝতে পেরেছি, আমি সব সময় সেরা হতে চাই, কারণ আমি ভয় পাই—অন্যরা যদি বুঝে ফেলে আমি আদতে অতটাও অসাধারণ না!
আমি আজ নিজের ভেতরে থাকা সেই ভয়, সেই অহংকারকে চিহ্নিত করলাম। এই শুরু।
এরপর সে নিজের ল্যাপটপ খুলে একটা মেইল লিখল লাবণীকে—
Subject: About Today’s Meeting
Hey Laba,
I realized your idea in today’s meeting actually had a lot of merit. I was too quick to dismiss it, and I’m sorry about that.
I think we should revisit your strategy and see how we can integrate that in our next proposal. Thanks for standing by your vision.
Best,
Anindya
এই একটা ছোট মেইল লিখেই যেন তার বুকটা হালকা হয়ে গেল।
________________________________________
পরদিন সকালে অনিন্দ্য একটু আগে অফিসে এল। ক্যান্টিনে দেখা হয়ে গেল জুনিয়র সহকর্মী রবিনের সঙ্গে।
সে সাধারণত রবিনের সঙ্গে বেশি কথা বলে না। কিন্তু আজ হঠাৎ বলল, “তোর গত সপ্তাহের রিপোর্টটা খুব ভালো ছিল, বিশেষ করে ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশনটা। আমি অনেক কিছু শিখলাম।”
রবিন যেন থতমত খেয়ে গেল, “স্যার! ধন্যবাদ… আমি ভাবিনি আপনি খেয়াল করেছেন।”
“সব সময় খেয়াল করি না, তবে এখন থেকে করব”—হেসে বলল অনিন্দ্য।
________________________________________
সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফিরে সে পাঁচ মিনিটের মেডিটেশন করল। চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, ছাড়ছে। মাথায় আবার ভেসে উঠছে সেই আয়নার প্রতিবিম্ব।
কিন্তু এবার আয়নার প্রতিফলনে সে দেখতে পাচ্ছে এক নতুন অনিন্দ্যকে—যে আর একা লড়ছে না নিজের ছায়ার সঙ্গে, বরং তাকিয়ে আছে গভীরভাবে নিজের ভেতরে।
ইগো এক শত্রু নয়, বরং এক অচেনা সঙ্গী।
যাকে চিনলে, সে আর শাসন করে না—বরং সহযাত্রী হয়ে ওঠে।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


যাকে চিনলে, সে আর শাসন করে না—বরং সহযাত্রী হয়ে ওঠে।…………………………শিক্ষনীয় লেখা