-
দা হাতে সখিনা
নিকলী উপজেলার গুরুই গ্রামটি যেন হাওরের বুকের মাঝে গোপন এক দ্বীপ। কুয়াশায় মোড়া ভোর, পানিতে ঝকমকে বিকেল আর রাতের নিস্তব্ধতায় এখানে যেন ইতিহাসের বাতাস বয়ে চলে। এই গ্রামেরই এক ঘরোয়া বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন সখিনা বেগম। বাবা সোনাফর মিয়া ছিলেন কৃষক, মা দুঃখী বিবি নিঃশব্দ সংগ্রামের প্রতীক। গরিবি ছিল, কিন্তু আত্মমর্যাদা ছিল অনেক বেশি।
সখিনা ছিলেন সংসারী, কিন্তু সংসার তাঁকে বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেনি। স্বামী কিতাব আলী মুক্তিযুদ্ধের আগেই মারা যান। নিঃসন্তান সখিনা একা হয়ে গেলেও, তার বুকজুড়ে ছিল আরেক রকম এক সন্তান—এই দেশ, এই মাটি। শৈশব থেকেই তিনি বড়দের মুখে শোনতেন দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন আর পাকিস্তানিদের শোষণের গল্প। কিশোর বয়সে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত এসব শুনে। মনের ভেতর জন্ম নিয়েছিল প্রতিরোধের বীজ।
১৯৭১ সালের মার্চে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, তখন সখিনার বয়স ছিল প্রায় ৩০। সেই বয়সেই তিনি শপথ নেন—এই যুদ্ধ তাঁরও। প্রথম দিকে তিনি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনার খবর রাখতেন, আর ঘরের উঠোনে বসে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতেন। তাঁর কণ্ঠে ইতিহাসের বারুদ থাকত, চোখে থাকত অদ্ভুত এক আগুন। গ্রামের যুবকরাও তার কথায় অনুপ্রাণিত হতেন।
কিন্তু এপ্রিলের মাঝামাঝি যখন পাকিস্তানি সেনারা হেলিকপ্টারে করে হাওরপাড়ে নামে, তখন শান্তি চিরতরে নষ্ট হয়। রাজাকারদের দালালি আর সেনাদের বর্বরতায় গ্রাম এক বিভীষিকায় পরিণত হয়। তখন সখিনার ভাগ্নে মতিউর রহমান যুদ্ধে যোগ দেয় বসু বাহিনীর ক্যাম্পে। সে সাহসী, তরুণ এবং দারুণ লক্ষ্যভেদকারী ছিল। কিন্তু একদিন খবর আসে, সে আর নেই—ধরা পড়ে গেছে, রাজাকাররা এবং পাকসেনারা মিলে তার চোখ বেঁধে গুলি করে মেরেছে। তার মরদেহও পাওয়া যায়নি।
এই খবর যেন সখিনার ভেতরের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। ভেঙে পড়েন না, বরং আরও শক্ত হন। তিনি গৃহবধূর পরিচয় সরিয়ে এক অদ্ভুত পরিণতির দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। তিনি বসু বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে যোগ দেন। রাঁধুনির কাজ করেন ঠিকই, কিন্তু তার মূল দায়িত্ব ছিল খবর জোগাড় করা। রাজাকারদের কে কোন পথে যাচ্ছে, কোথায় সেনারা ক্যাম্প করেছে, কোথায় অস্ত্র আসছে—সব খুঁটিনাটি খবর সে সংগ্রহ করত কৌশলে।
একদিন ঠিক বিকেলের দিকে, সে ধরা পড়ে যায়। দুই রাজাকার তার গতিবিধি দেখে সন্দেহ করে, পরে পাকসেনারা এসে ধরে নিয়ে যায়। তাকে মারধর করা হয়, প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করা হয়। কিন্তু মুখ খোলে না সখিনা। পাকসেনারা ভাবে, হয়ত এ তো শুধু একজন নারী, কী আর জানবে! এক রাতে তিনি সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন। পালিয়ে আসার সময় সেনা ক্যাম্প থেকে একটি ধারালো দা নিয়ে আসেন। কাঁধে ঘা, গায়ে দাগ, কিন্তু চোখে তখন শুধু একটাই দৃশ্য—মতিউরের রক্তাক্ত মুখ।
এরপর সখিনা পাল্টে যান। তিনি আর শুধু খবরদাতা ছিলেন না। তিনি হয়ে ওঠেন এক প্রতিশোধ স্পৃহায় জর্জরিত সৈনিক। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এক গভীর রাতে তিনি একে একে পাঁচজন রাজাকারকে টার্গেট করেন। তারা ছিল নিকলীর চিহ্নিত রাজাকার—স্থানীয়ভাবে পরিচিত চাঁদু রাজাকার, গফুর, সুলতান, মোশারফ ও রউফ। এদের প্রত্যেকেই গ্রামের মানুষদের ধরিয়ে দিয়েছিল, মতিউরকেও। সখিনা জানতেন কে কোথায় থাকে, কীভাবে ঘুমায়।
এক রাতে তিনি প্রথমে চাঁদু রাজাকারের ঘরে ঢোকেন। ঘরে ছিল শুধু চাঁদু আর তার বউ। বউকে কিছু না বলে সখিনা দা তুলে এক কোপে শেষ করে দেয় তাকে। গফুরকে সে খালের পাড়ে একা দেখে, মুখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে মারে। সুলতান ও মোশারফকেও একইভাবে ফাঁদে ফেলে হত্যা করে। রউফ ছিল সবচেয়ে ভয়ানক। সে বন্দুকধারী ছিল, পাকিস্তানি সেনাদের ঘনিষ্ঠ। তাকে মারতে সখিনা অপেক্ষা করে চাঁদের রাতে, যখন সে হাট থেকে ফিরে ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে হাঁটে। সেখানেই সখিনা তাকে থামায়, তার চোখে চোখ রেখে বলে—”মতিউরের জন্য!” তারপর দা চালিয়ে দেয়।
এই খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে গ্রামের মানুষ ভয় পায়। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে, এই নারী আসলে এক নীরব প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সখিনাকে কেউ পুলিশে দেয় না, কেউ ধরিয়ে দেয় না। বরং গ্রামের মেয়েরা তার সাহসের গল্প ফিসফিসিয়ে বলে, কিশোররা তার নাম মনে রাখে। বসু বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারাও তাকে আর শুধু রান্নাবান্নার লোক মনে করে না—তাকে স্যালুট জানায়।
যুদ্ধ শেষে দেশে স্বাধীনতা আসে। কিন্তু সখিনা ফিরে যান না পুরনো জীবনে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলেন শিশু-কিশোরদের, গ্রামের পাঠশালায়, গাছতলায়, পুকুরঘাটে। তাঁর গল্পে ছিল যন্ত্রণার লাল কালি, প্রতিরোধের আগুন। অনেকে জানত না তিনি খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, তিনি নিজেও বলেন না সহজে। শুধু কোনো শিশু যদি প্রশ্ন করত, “তুমি কি যুদ্ধ করেছিলে?”—তাহলে তিনি নরম গলায় বলতেন, “যুদ্ধ কেবল বন্দুক নিয়ে হয় না, বুক দিয়েও হয়। আমি শুধু দা নিয়ে ছিলাম।”
তার কণ্ঠে ছিল না উল্লাস, ছিল না গর্বের অহংকার। ছিল এক দৃঢ় শোকের ছায়া।
এইভাবেই গুরুই গ্রামের ইতিহাসের পাতায় সখিনার নাম লেখা থাকে না—কিন্তু হাওরের বাতাসে, শিশুর মুখে, আর নৌকার গানে তার গল্প ভাসে। মানুষ বলে, “এই যে এই গ্রামটায় আমরা আজ শান্তিতে আছি, সেটা ওই সখিনা দিদির দা-র জোরে।”
আর সখিনা? তিনি তার বারান্দায় বসে, এক হাতে ছেঁড়া চাদর গায়ে জড়িয়ে, আরেক হাতে পুরনো সেই দা-টা ধরে বসে থাকেন। চোখে কোনো জল নেই, শুধু দূরের হাওরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন সেখানে এখনো মতিউরের হাসিমুখ ভেসে আসে।
সখিনা জানেন, ইতিহাস তাকে হয়তো বইয়ের পাতায় লিখবে না। কিন্তু যাদের জন্য তিনি লড়েছিলেন, তাদের হৃদয়ে তিনি রয়ে যাবেন—আজীবন।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


দেশের আনাচে-কানাচে, গ্রামে-গঞ্জে এমন অনেক সখিনার গল্প লুকিয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় তাদের ঠাই না হলেও হৃদয়ে লেখা হয়ে থাকবে।