Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • “নীল গ্রহে সবুজ পাঠশালা”

    শান্তিপুর গ্রামটা নামের মতোই শান্ত। এখানে গাছেরা কথা বলে, নদী বয়ে চলে নিজের ছন্দে, আর স্কুলঘণ্টা বাজলে শিশুরা দৌড়ে আসে আনন্দে। কিন্তু এই শান্তির আড়ালে এক অদৃশ্য ঝড় আসছে — পৃথিবীর বুকে তাপ বাড়ছে, বন হারাচ্ছে পাতা, নদী হারাচ্ছে পানি। এই পরিবর্তনের গল্প হয়তো শহরে কেউ কেউ বলছে, খবরের কাগজে ছাপা হচ্ছে, কিন্তু শান্তিপুরের শিশুরা জানে না তাদের ভবিষ্যত ঠিক কেমন হতে চলেছে।
    এমনই এক সকালে স্কুলের মাঠে পা রাখলেন শুভ স্যার — শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। কিন্তু তাঁর হাঁটার ভঙ্গিমা আর চোখে চোখ রাখার দৃষ্টিতে বোঝা যায়, তিনি যেন কোনো এক জাগরণের সংকেত নিয়ে এসেছেন। তিনি শিক্ষকের চেয়ে একটু বেশি — তিনি স্বপ্নদ্রষ্টা।
    শুভ স্যার আজকের ক্লাস শুরু করলেন অদ্ভুত এক প্রশ্ন দিয়ে,
    “তোমরা কি কখনো ভেবেছো, যদি পৃথিবীর গাছগুলো হঠাৎ করে কথা বলা বন্ধ করে দেয়?”
    শ্রেণিকক্ষে হঠাৎ নিস্তব্ধতা। ছোট্ট মুন্নি ফিসফিস করে বলে, “স্যার, গাছ কি কথা বলে?”
    শুভ স্যার মুচকি হেসে বলেন, “যদি মন দিয়ে শোনো, সবকিছুই কথা বলে।”
    এরপর ক্লাসের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী পেল এক জোড়া হেডফোন। পুরনো কিছু ফোন আর রেকর্ডারে লোড করে রাখা ছিল শব্দ। একটা ক্লিপে ছিল বরফ গলবার টুপটাপ শব্দ, আরেকটিতে বনজঙ্গলে আগুনের গর্জন, আরেকটিতে সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের নিচে ভাঙা ঘরের আর্তনাদ।
    শুনে সবাই স্তব্ধ। যে শিশুরা কিছুক্ষণ আগে রঙ পেনসিল নিয়ে দুষ্টুমি করছিল, তারাও চোখ বড় বড় করে শুনছে।
    “এসব কি বাস্তব?” — কেউ একজন প্রশ্ন করে।
    “এগুলো কোনো সিনেমা না। এগুলো আমাদের ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চিত্র,” — বলেন শুভ স্যার।
    এরপর তিনি ক্লাসরুমের দেয়ালে টানিয়ে দিলেন এক বিশাল পৃথিবীর মানচিত্র। কিন্তু সেটি সাধারণ মানচিত্র নয়। যেখানে তাপমাত্রা বেড়েছে সেখানে লাল রঙ, যেখানে বন কমেছে সেখানে বাদামী। আর যেখানে এখনো সবুজ আছে, সেখানে ছোট ছোট সবুজ হৃদয় চিহ্ন আঁকা।
    “তোমরা জানো, এই মানচিত্রটা কথা বলে। শুধু চোখ দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়েও দেখতে হয় একে,” তিনি বললেন।
    এরপর শুরু হলো অভিনয়ভিত্তিক শিক্ষা — ভূমিকাভিত্তিক এক অভিজ্ঞতা।
    তিনটি দলে ভাগ হলো ক্লাস।
    প্রথম দল — পরিবেশ বিজ্ঞানী,
    দ্বিতীয় দল — কৃষক পরিবার,
    তৃতীয় দল — সরকারি নীতিনির্ধারক।
    বিজ্ঞানী দলের ছোট্ট সজীব বোর্ডে দাঁড়িয়ে বলল,
    “আমরা গবেষণা করেছি, হিমবাহ গলে যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ছে। আমরা সতর্ক করছি সবাইকে।”
    কৃষক দলের রিতা বলল, “আমার ধান নষ্ট হয়ে গেছে, কারণ বৃষ্টি হয়নি। আমি জানতে চাই, আমার দোষ কোথায়?”
    সরকারি দলের রফিক বলল, “আমরা পরিবেশ রক্ষার জন্য আইন করছি। কিন্তু সচেতনতা ছাড়া কিছু হবে না।”
    শুভ স্যার পাশে দাঁড়িয়ে দেখেন, মুখে কিছু বলেন না — কিন্তু তাঁর চোখে আলো। কারণ তিনি জানেন, এই শিশুদের মুখে যে প্রশ্ন, যে দ্বিধা, আর যে প্রতিজ্ঞা ফুটে উঠছে — সেটাই প্রকৃত শিক্ষা।
    পাঠ শেষে প্রতিটি শিশুকে দেওয়া হয় ‘জলবায়ু কার্ড’। প্রতিটি কার্ডে লেখা ছোট্ট এক একটি কাজ — কেউ গাছ লাগাবে, কেউ পানির অপচয় রোধ করবে, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পরিবেশ নিয়ে কথা বলবে।
    পরের দিন থেকে বদলে যায় শান্তিপুর। ক্লাসের সামনে বানানো হয় এক ‘জলবায়ু কর্ণার’। শিশুদের আঁকা পোস্টার, গাছের ছবি, নদীর চিত্র আর হাতের লেখা ছড়া সেখানে ঝুলতে থাকে। “গাছ আমার বন্ধু”, “প্লাস্টিক নয়, কাপড় চাই”, “পানি ফেলো না, পৃথিবী বাঁচাও”— এ রকম স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে স্কুল।
    একদিন এক মা এসে বলেন, “স্যার, আমার মেয়ে তো এখন আমাকেই শেখায় — কীভাবে গ্যাস সাশ্রয় করতে হয়, কীভাবে ফ্রিজ কম খুলতে হয়!”
    শুভ স্যার মুচকি হাসেন, বলেন, “আপনার মেয়ে এখন শুধু ছাত্রী নয়, এই গ্রহের ছোট্ট অভিভাবকও বটে।”
    দিন যায়, সপ্তাহ যায়। একদিন একটি চিঠি আসে জেলা শিক্ষা অফিস থেকে — শুভ স্যারের ক্লাস মডেল নিয়ে প্রতিবেদন চায় সরকার। কারণ কোনো এক ভ্রাম্যমাণ পরিদর্শক তাঁর ক্লাস দেখে গেছে চুপিচুপি, আর মুগ্ধ হয়ে লিখেছে রিপোর্ট।
    কিন্তু শুভ স্যার তেমন কিছুতে গা ভাসান না। তিনি এখন ভাবছেন পরবর্তী ইমার্সিভ পাঠ কী হবে — হয়তো ‘পানির অধিকার’, কিংবা ‘বায়ুদূষণ ও আমাদের শ্বাস’।
    শান্তিপুর এখন আর নিছক এক গ্রাম নয়। এটি হয়ে উঠছে এক সবুজ পাঠশালা — যেখানে পাঠ শুধু বইয়ের নয়, জীবন আর ভবিষ্যতের।
    ________________________________________

    5
    4 Comments
    • শুভ স্যারের মত শুভবুদ্ধির মানুষের যে বড়ই অভাব

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 20 June 2025 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Skip to toolbar