Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • প্রলোভনের জাল
    ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা ছুঁই ছুঁই করছে। অন্ধকার ঘরে শুধু মোবাইল ফোনের পর্দা আলো ছড়াচ্ছে। বারো ক্লাসের ছাত্র অনিক নিঃশব্দে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। পাশেই ঘুমিয়ে আছেন তার মা রোজিনা বেগম, দিনের ক্লান্তি গায়ে মেখে। কিন্তু ছেলের চোখে ঘুম নেই, চোখজোড়া রক্তবর্ণ, মাথার ভেতর উত্তেজনার আগুন। তার দৃষ্টি আটকে আছে স্ক্রিনে—বলে এবার ছক্কা হবে না চার?
    মুহূর্তেই শোরগোল। মোবাইল স্ক্রিনের ভার্চুয়াল খেলোয়াড় চার হাঁকিয়েছে। অনিক হেসে ফেলে, যদিও হাসিটা নিঃশব্দ, যেন চুরি করা সাফল্যের আনন্দ। মায়ের পাশেই বসে সে অনলাইন জুয়ার মোহে আসক্ত এক জুয়াড়ি—মাত্র ১৭ বছর বয়সেই।
    সবচেয়ে ভয়ানক দিকটা হলো, রোজিনা কিছুই জানেন না। তিনি জানেন না, তার ছেলে অনলাইনে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা বাজি ধরছে। জানেন না, সে স্কুলে ঠিকমতো যাচ্ছে না। তিনি শুধু জানেন, অনিক এখন আগের মতো হাসে না, কথাও কম বলে।
    অনিকের এই পথে যাত্রা হয়েছিল মাত্র ছয় মাস আগে। পাড়ার এক বড় ভাই ইমরান তাকে একদিন বলেছিল, “চালাক হলে এক রাতেই মোটা অঙ্কের টাকা কামাতে পারবি!”
    প্রথম দিনেই জিতে গিয়েছিল তিনশো টাকা। মনে হয়েছিল—এ তো স্বর্গের দরজা। পরদিন হারলো, আবার খেললো, আবার হারলো। এরপর পড়লো ঋণের জালে।
    প্রথমে নিজের হাতখরচের টাকা, তারপর মা’র পার্স থেকে নেয়া পঞ্চাশ, একশো… পরে মায়ের গলার হার পর্যন্ত বিক্রি করলো সে। মা কিছুই বুঝতে পারলেন না।
    একদিন প্রতিবেশী রাহেলা খালা এসে বললেন, “ভাবি, তোমার ছেলেটা তো আজকাল সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। সাবধানে থাকো।”
    রোজিনা হেসে বলেছিলেন, “ওর বয়স তো এমনই। আজকাল সব বাচ্চাই ফোনে বসে থাকে।”
    এর মধ্যে স্কুল থেকে ফোন এলো—অনিকের অনুপস্থিতির খবর। মা ভয় পেয়ে গেলেন। তন্ন তন্ন করে ছেলের খাতাপত্র খুঁজে বের করলেন, চোখে পড়লো খাতার ভেতর লুকানো একটা কাগজ, যেখানে লেখা—“ডিপোজিট করুন বিকাশ নম্বরে…” আর পাশে ছিল কিছু কোড।
    সেদিন রাতে রোজিনা ছেলের পাশে বসে বললেন, “তুই কি বাজি খেলিস?”
    অনিক ঘাবড়ে গেল, চোখ নামিয়ে বলল, “না মা, বন্ধুদের সঙ্গে একটু মজা করতাম।”
    রোজিনা বললেন না কিছুই। শুধু চুপচাপ চলে গেলেন বারান্দায়। অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই রাতেই তাঁর ঘুম ভেঙেছিল বারবার। মাথার মধ্যে শব্দ করছিল—“বাজি, টাকা, হার, লোভ…”
    পরদিন থেকে রোজিনা ছেলের মোবাইল চেক করা শুরু করলেন। কিন্তু অনিক ছিল আরও এক ধাপ এগিয়ে। সে মোবাইলে লুকানো ফোল্ডার বানিয়ে জুয়ার অ্যাপ লুকিয়ে রাখতো। মা বুঝতেই পারতেন না—তার চোখের সামনেই বসে ছেলে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
    এর মধ্যে অনিক একটা বড় জুয়ায় হেরে বসে বিশ হাজার টাকা। পাড়ার মহাজনের কাছে ধার নেয়। সেই টাকা তুলতে না পারলে মহাজনের হুমকি আসে ফোনে—“বাড়িতে জানিয়ে দেবো।”
    অনিক অস্থির হয়ে ওঠে। একদিন মা’র আলমারির লকার ভেঙে তাঁর শেষ সম্বল, বাবার স্মৃতিতে রাখা আংটি বিক্রি করে দেয়। সেদিন রোজিনা হঠাৎ দেখে ফেলেন ছেলের হাতে বেশকিছু টাকা। জিজ্ঞাসা করলে অনিক বলল—“বন্ধু ফিরিয়ে দিয়েছে।”
    রোজিনা যেন বুঝেই গিয়েছিলেন। আর কিছু না বলে নিজের ঘরে গিয়ে বসে থাকেন। চোখের কোনে পানি জমে। নিজের কাছেই প্রশ্ন করেন, “আমি কি ব্যর্থ মা?”
    এরপর একদিন, হঠাৎই সবকিছু ভেঙে পড়ে। অনিক জুয়ায় হেরে এক ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতে চায়। সে নিজেকে ঘরে বন্ধ করে রাখে। সে রাতেই সুমন নামে এক স্বেচ্ছাসেবী তরুণ এসে তাদের বাড়িতে হাজির হয়।
    সুমন নিজেও এক সময় জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। এখন তিনি “আলোর পথ” নামে এক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন, যারা তরুণদের অনলাইন জুয়া থেকে ফেরাতে সচেষ্ট।
    সুমন অনিককে নিয়ে যান কাউন্সেলিং সেন্টারে। ধীরে ধীরে তার ভেতরে পরিবর্তন আসে। সে নিজের ভুলগুলো বুঝতে শেখে, নিজেকে ঘৃণা করতে শেখে। রোজিনা ছেলের এই পরিবর্তন দেখে আবার বাঁচতে শেখেন।
    তিন মাস পর অনিক নিজের স্কুলে গিয়ে ছেলেমেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গল্প শোনায়। বলে, “জুয়া একটা এমন নেশা, যা ধীরে ধীরে নিজের ভেতর থেকে আত্মাকে মেরে ফেলে। আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু অনেকেই বাঁচে না।”
    তার কথা শুনে অনেক ছেলেমেয়ে কাঁদে। শিক্ষকরা এগিয়ে আসেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ “ডিজিটাল আসক্তি বিরোধী সপ্তাহ” আয়োজন করে, যেখানে অনিক বিশেষ অতিথি হয়ে অংশ নেয়।
    মা আবার হাসতে শেখেন।
    অনিক আবার বইয়ে ফিরেছে। এখন সে স্বপ্ন দেখে, সমাজকর্মী হবে।
    কিন্তু শহরের অন্যপ্রান্তে হয়তো আরেক অনিক, হয়তো আরেক রোজিনা, একই গল্পের নতুন চরিত্র হয়ে উঠছে—যাদের পাশে সময় মতো কেউ দাঁড়ায় না।

    3
    4 Comments
    • আপনার অনলাইন আসক্তি বিষয়ক এই সিরিজটা একটা চমৎকার কাজ হচ্ছে। এর ব্যপক প্রচার প্রয়োজন।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 25 June 2025 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Skip to toolbar