-
আমি ঢাকার ছেলে। ঢাকায় জন্ম, ঢাকায় বেড়ে ওঠা। আমার প্রিয় শহর ঢাকা। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা। সেখানে মনোরম প্রকৃতি। নিজের বাড়ি আছে, ঢাকার ফ্ল্যাটের মতোই মাণ সম্পন্ন। ঢাকায় এখন প্রায় দুই কোটি মানুষ থাকে। সবুজের পরিমান কমে দুই শতাংশ। বাতাসে সীসার পরিমাণ অতিরিক্ত। এ শহরের ৬০ ভাগ শিশুদের রক্তে বিষাক্ত সীসা। বসবাসের অযোগ্য নগরী বলা যায়। ইট, কাঠ, কনক্রিটের জঙ্গল। কিছু করা যায় কিনা সে নিয়ে আজ কথা বলতে চাই না।
এই ঘিঞ্জি শহরে এখন তিন লাখের ওপর প্রাইভেট কার চলে, রিক্সার সংখ্যা দশ লাখের ওপর। সর্বত্র ব্যস্ততা।
তবু ঢাকা আমার প্রিয় শহর। এ শহরে আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবন। এ শহরের গলিতে গলিতে আমার দুঃখ, আমার ক্রোধ, আমার বিসর্জন, আমার ভালোবাসা, প্রত্যাখ্যান। এ শহরের রাস্তায় রাস্তায় আমি বৈরাগীর মতো হেঁটেছি। খুঁজেছি নিজের ভাষা। পেয়েছি বন্ধুত্ব।
আমরা পাঁচ ছয় জনের এক দল বন্ধু। বন্ধু তিন দশকের চেয়ে বেশি সময় ধরে। আমরা এই নগরের রাজপথে, গলিপথে। টি এস সি থেকে বসুন্ধরা, চানখারপুল থেকে গুলশান। সেই আজিমপুর কোয়ার্টারের খেলার মাঠ থেকে কৈশোরের নীলক্ষেত, সাইন্সল্যাব, ধানমণ্ডির মুক্ত মঞ্চ। ঢাকা কলেজের মাঠে ঝুম বৃষ্টিতে ফুটবলের ম্যাচ, স্কুল পালানো থেকে অগ্নিলার বিপ্রতীপ নাটকে নিজেকে খোঁজা। ডি জুস জেনেরেসনের নতুন ধারার বাংলা গানের রাজত্ব আবিষ্কার আর দুরন্ত কৈশোর। ভার্সিটির জীবনে বন্ধুত্ব হল আর প্রবল। চারু কলার ছাদে প্রথম সিগ্রেটে টান। পাঁচ বন্ধু কাল বৈশাখীর রাতে একাকী রাস্তায় আজিজের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তারপর আজ এর বাসা, কাল তার বাসা।
ঢাকার নাইট লাইফ নাই। কিন্তু কত রাত আমরা এখানে সেখানে ঘুরলাম। বন্ধুর সদ্য কেনা গাড়িতে উঠেই with or without ছেড়ে ঘুরে ঘুরে বেরানো এ শহরে। অথবা জহ্রুল হক হলের পুকুরে রাত দুইটায় গোসলে নামা।
মাঝে মাঝে একাকী রাতের রিকশায় শহর দেখা। গভীর রাতের টঙে এক কাপ চা। আর রাত ভোর নিশাচর কবিতা।
শহীদ মিনারের সামনে সারা রাত জেগে জেগে সকাল দেখা। মিছিলের স্রোতে নিজেকে খুঁজে ফেরা নতুন ভোরের স্বপ্নে। বইমেলায় তখন প্রতিদিন উপস্থিতি দেই নিয়ম করে। বইমেলা তখন শুধু বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গনে।
শহরের রাজপথে হেঁটে হেঁটে পায়ের নিচে কালো পলেস্তরা। বন্ধু তখন ভাই আর বন্ধুর বন্ধু হয়ে উঠেছে নিজের প্রিয় বন্ধু। বন্ধুর দুঃখে নিজেই বেদনা অনুভব করা। মা বাবার, ভাই বোনের মতন আপন হয়ে উঠেছে সে সব মানুষেরা।
গভীর রাতের কনসার্টে আমাদের আনন্দ। শিল্পকলার থিয়েটার, বলাকায় সিনেমার নাম, মেড ইন বাংলাদেশ।
রোজার মাসে ইফতারি করেই সিটি বাসে চড়ে বিউটির দোকানে। সে খানেই আড্ডা চলে। যারা তারাবী পড়ে তারা বিশেষ সিস্টেমে সাত দিনে তারাবী শেষে চায়ের আড্ডায়। ঈদ মানেই সব বন্ধুর এক হওয়া রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে [মুক্ত মঞ্চে ]। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুর ঘাটে মুক্ত আলোচনা, পেছনে বিয়ের অনুষ্ঠান। শাঁখারি বাজারের চারশো বছরের পুরনো আতিথেয়তা।
কখনো আবার পয়সার অভাবে রিকশা ওয়ালাদের সাথে রাস্তায় খাওয়া।
আর কত গুলো অভুক্ত দুপুর বেলায় এক কিশোরের অবাক অন্বেষণ। একা হেঁটে যাওয়া।
আবার এ শহরেই প্রিয় জন হারানোর বেদনা, সকল দুঃখ শোক।
আসলে শহরটার ইট, কাঠ, পাথরের দালানগুলো প্রাণ পেয়েছে মানুষের ছোঁয়ায়। এই সব অসংখ্য আনন্দ বেদনার স্মৃতি আছে দেখেই ঢাকা আমার মনের শহর। হয়তো স্থান নয় মানুষ গুলোই সময়কে রঙ্গিন করে তোলে।
এখনো রাতের ঢাকা দেখলে মনে হয় এই ইট, কাঠ, পাথরের জঙ্গলের জানালায়, জানালায় কত মানুষের এই সব দিন রাত্রি। এক জীবনের গল্প সে। লিখে শেষ করা বড় কঠিন।
আমরা আমাদের ভালো লাগার কথা গুলো কম বলি। সময় আর জীবন বড়ই অনিশ্চিত। সেজন্যই ভালো লাগার কথা গুলো ছড়িয়ে দিলাম।2 Comments
Friends
অরুণ কুমার গোস্বামী
@arunkumargoswami
জে এস এম অনিক
@00anik
আনিস কবির
@aniskabir
শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান
@sharifmuhammadwahiduzzaman
Nadia Rifat ritu
@ritu
Taposh Kumer dey
@taposhkumerdey
হুসেন মোহাম্মদ সারোয়ার সাঈদ
@hm-saroar-saied
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
মো: নাজমুল আখতার
@faith


ইট কাঠ আর পাথরে গড়া এই তিলোত্তমার একটা আলাদা জাদু আছে। আছে অন্যরকম এক টান। এর আকর্ষন উপেক্ষা করা কঠিন। আপনার ভালোলাগাগুলো আমাকেও ছুয়ে গেলো।