Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • “মাঠের ধারে পাঠশালা”

    পান্নাগাঁওয়ের বিকেলটা ছিল শান্ত। মাঠের ধারে বটগাছের নিচে বসে রোহান দূরের আকাশে উড়ন্ত শালিক দেখছিল। সে জানত না, আজকের এই দিনটিই তাকে জীবনের এমন কিছু পাঠ শিখিয়ে দেবে, যা কোনো বইতে লেখা নেই।
    দূরের খালপাড়ে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হলো। বাঁধে ফাটল ধরা পড়েছে—যদি তা ভেঙে যায়, গ্রামের সারা বছরের ধান ভেসে যাবে। মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ বালি আনছে, কেউ বাঁশ কেটে দিচ্ছে। রোহান দাঁড়িয়ে থাকতেই তার বাবা এগিয়ে এসে বললেন, “চল, তুইও কাজে লাগ।” প্রথমে দ্বিধা হলেও, রোহান ছোট বালতি হাতে নিয়ে বালি ভরতে শুরু করল। বুঝল, সমস্যার সামনে দাঁড়াতে বয়স বা শক্তি নয়, ইচ্ছাই আসল।
    কয়েকদিন পর স্কুলে বিতর্ক প্রতিযোগিতা হলো। রোহান লাজুক, কিন্তু শিক্ষক তাকে বক্তা বানালেন। প্রথমে তার গলা আটকে গেল, হাত কাঁপল। পরে অনুশীলনে শিখল, শুধু নিজের কথা বলাই নয়, অন্যের কথা শোনা ও বুঝে উত্তর দেওয়া—এই দুই মিলে যোগাযোগ পূর্ণ হয়। প্রতিযোগিতার দিনে সে আত্মবিশ্বাস নিয়ে মঞ্চে দাঁড়াল, এবং সবার প্রশংসা পেল।
    শীতের ছুটিতে মামা ডাক দিলেন শহরে ক্রিকেট খেলতে। কিন্তু ঠিক তখনই বিজ্ঞান মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ এল। একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে শেখার সুযোগ। অনেক ভাবনার পর রোহান মেলাকে বেছে নিল, আর প্রথম পুরস্কার পেল। তখন বুঝল, সিদ্ধান্ত নিতে মাথা ঠান্ডা রাখা কত জরুরি।
    এর কিছুদিন পর পরীক্ষার চাপ, প্রজেক্টের কাজ, আর টিউশনের বোঝায় সে অস্থির হয়ে পড়ল। রাতে ঘুম আসত না। মা বললেন, “চাপকে ভয় করিস না, বন্ধু বানাস। সময় ভাগ করে খেলবি, পড়বি, বিশ্রাম নিবি।” কথা মতো চলতে গিয়ে সে দেখল—মন হালকা হলে কাজও সহজ হয়।
    বার্ষিকী উপলক্ষে স্কুলের দেয়াল রঙ করা হচ্ছিল। সবাই ফুল-পাতা আঁকতে চাইছিল, কিন্তু রোহান প্রস্তাব দিল—জীবনের বিভিন্ন দক্ষতা নিয়ে ছবি আঁকা হোক। সবাই মিলে কাজ করল, আর শেষমেশ দেয়াল হয়ে উঠল শেখার এক উজ্জ্বল চিত্রপট।
    শীতের শেষে পাশের গ্রামে বন্যা হলো। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা এক ছেলে—সালাম—সবসময় চুপচাপ থাকত। রোহান তাকে খেলায় ডাকল, গল্প করল, হাসাল। কয়েকদিন পর সালাম বলল, “তুমি না থাকলে আমি এখানে একেবারেই একা হয়ে যেতাম।” রোহান বুঝল, সহানুভূতি মানে শুধু সাহায্য নয়, কারো একাকীত্ব ভাঙা।
    বছরের শেষে সে নিজের ডায়েরিতে লিখল—সে খেলাধুলায় দ্রুত, ছবি আঁকায় ভালো, কিন্তু গণিতে ধীর আর ধৈর্যের অভাব আছে। নিজের এই শক্তি আর দুর্বলতাই তার আগামী পথ ঠিক করল।
    বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় রিলে দৌড়ে অংশ নিল সে। নিজের অংশ শেষ করে ব্যাটন পরের জনকে দিল, আর দল একসাথে জয় পেল। সেদিন বুঝল, একা জেতার চেয়ে একসাথে জেতা অনেক বেশি আনন্দের।
    সন্ধ্যায় বটগাছের নিচে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল রোহান। বাবা পাশে এসে বললেন, “দেখেছিস, বইয়ের বাইরে একটা বড় স্কুল আছে—যার নাম জীবন। সেখানে শেখা শেষ হয় না।” রোহান হাসল। তার মনে হলো, আজ থেকে প্রতিদিনই সে সেই পাঠশালার একজন ছাত্র হয়ে রইল।

    4
    6 Comments
Skip to toolbar