Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • শেষ জানালার আলো
    ঢাকা শহরের গলিগুলোয় সন্ধ্যার আলো নেমে আসছে। রাস্তায় হালকা যানজট, হর্নের ভিড়, মানুষের ভিড়। তবে সেই কোলাহলের মাঝেও লাবণ্যের মনে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা।
    লাবণ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বাংলায় মাস্টার্স করছে। বয়স বাইশ। ছোট চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হালকা বাদামি রঙের শাড়ি তার পরিচিত সাজ। চারপাশে সবাই বলে, সে অনেকটা ভিন্ন ধরনের মেয়ে। কেউ তাকে বলে সাহসী, কেউ বলে বিদ্রোহী। আবার কেউ বলে, সে আসলে ভিতরে ভিতরে ভীষণ কোমল, ভীষণ ভঙ্গুর।
    তার জীবনের কেন্দ্রে এখন শুধু একজন—অরূপ।
    অরূপ তার সিনিয়র। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই দু’জনের পরিচয়, তারপর বন্ধুত্ব, তারপর অদ্ভুত এক টান, যা লাবণ্য বুঝতেই পারেনি কখন প্রেমে পরিণত হলো।
    অরূপ শান্ত প্রকৃতির ছেলে। সাহিত্য নিয়ে ভীষণ আগ্রহ। মাঝে মাঝে কবিতা লিখে লাবণ্যকে শোনায়। আর লাবণ্য শোনে, মুগ্ধ হয়ে, চোখের ভেতর এক অদ্ভুত আলো নিয়ে।
    কিন্তু এই প্রেমটা শুধু কবিতা, গল্প কিংবা স্বপ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি। লাবণ্যের ভেতর কোথাও যেন এক আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিলো—অরূপকে ছুঁতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তার হাত ধরে থাকতে ইচ্ছে করত দীর্ঘ সময়, কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করতে ইচ্ছে করত। কখনো কখনো মনে হতো, যদি অরূপের ঘামের গন্ধ সে নিজের চুলে মেখে নিতে পারত, যদি তার ঠোঁটে একবার চুমু খেতে পারত, তবে জীবনটা পরিপূর্ণ হতো।
    একদিন বিকেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের নির্জন বটগাছের নিচে দু’জন বসেছিল। বাতাসে হালকা কাশফুলের গন্ধ, আকাশে ম্লান হয়ে আসা আলো।
    —“অরূপ,” লাবণ্য হঠাৎ বলল, “তুমি কি কখনো ভেবেছ, আমাদের প্রেমটা কোথায় গিয়ে থামবে?”
    অরূপ একটু অবাক হয়ে তাকালো। —“মানে?”
    লাবণ্য চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলল, —“আমি শুধু তোমার কবিতা শুনে, তোমার হাত ধরে, তোমার সঙ্গে চা খেয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। আমি তোমাকে চাই—পুরোপুরি। তোমার শরীরটাও।”
    অরূপ থমকে গেল। মেয়েরা সাধারণত এমন কথা মুখে আনে না। সমাজের হাজার নিয়ম-রীতি, বাঁধাধরা ভদ্রতার নিয়ম মেনে মেয়েরা সবসময় এড়িয়ে চলে। কিন্তু লাবণ্য বলল। একেবারে খোলাখুলি।
    অরূপের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ঢেউ বয়ে গেল। সে লাবণ্যের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর আস্তে বলল—
    —“আমি তো তোমাকেই চাই, লাবণ্য। মন দিয়ে, শরীর দিয়ে, সবকিছু দিয়ে। কিন্তু সমাজ কি আমাদের মেনে নেবে?”
    লাবণ্য মৃদু হেসে উত্তর দিল—
    —“সমাজ মেনে নেবে কিনা সেটা আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আমি তোমাকে চাই। আমার শরীরও তোমাকে চায়। আর শরীর চাওয়াটা লজ্জার কিছু নয়।”
    তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ছিল। অরূপ অবাক হয়ে গেল। এতখানি স্পষ্টতা, এতখানি সাহস তার চোখে আগে দেখেনি।
    কিন্তু লাবণ্যের মনেও একটা ভয় ছিল। সে জানত, সমাজ পুরুষের চাওয়াকে প্রশ্রয় দেয়, কিন্তু নারীর আকাঙ্ক্ষা উচ্চারণ মানেই কুৎসা, অপবাদ, অসম্মান।
    তবু লাবণ্য ভেবেছিল, অরূপকে না বললে সে হয়তো ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে যাবে। প্রেম যদি সত্যি হয়, তবে শরীরের স্পর্শ ছাড়া তা অসম্পূর্ণ।
    দিন কেটে যেতে লাগল। তারা নিয়মিত দেখা করত, গল্প করত, বই পড়ত। কিন্তু লাবণ্যের মনে একটা আকুলতা প্রতিদিন আরও বেড়ে উঠছিল। সে অরূপের হাত ধরত, আর ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠত। মাঝে মাঝে মনে হতো, তার ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে চুমুর জন্য।
    একদিন অরূপ বলল, —“চলো লাবণ্য, আমরা শহরের বাইরে কোথাও যাই। নদীর ধারে। যেখানে কেউ আমাদের দেখবে না, কেউ আমাদের আটকাবে না।”
    লাবণ্য সম্মত হলো।
    সেদিন ছিল শুক্রবার। তারা শহরের কোলাহল পেরিয়ে ট্রেনে উঠল। জানালার পাশে বসে লাবণ্য বাইরের মাঠ-ঘাট দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, এ যাত্রা কেবল ঘুরতে যাওয়ার নয়, এ যাত্রা এক নতুন দিকের সূচনা।
    তারা নেমেছিল একটা ছোট্ট স্টেশনে। চারপাশে ধানক্ষেত, সবুজ মাঠ, নদীর ধারে কাশবন।
    অরূপ নদীর দিকে নিয়ে গেল লাবণ্যকে। বাতাসে নৌকার পাল কাঁপছিল, নদীর জলে আলো ঝিকমিক করছিল।
    হঠাৎ লাবণ্য থেমে গেল। তার চোখে জল এসে গেল।
    —“অরূপ, আমি তোমাকে ভয় পাচ্ছি না। কিন্তু সমাজকে ভয় পাচ্ছি। যদি কেউ জেনে যায়, যদি কেউ আমাদের দেখে ফেলে…”
    অরূপ তার হাত ধরল শক্ত করে। —“লাবণ্য, প্রেম যদি সত্যি হয়, তবে কাউকে ভয় পেতে হয় না। আমি আছি তোমার পাশে।”
    সেদিন বিকেলে নদীর ধারে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। প্রথমবার লাবণ্য অনুভব করল, শরীরও আসলে এক ভাষা। শুধু মন দিয়ে সবকিছু বলা যায় না। সেই স্পর্শে, সেই আলিঙ্গনে, সেই চুম্বনে লাবণ্যের চোখ ভিজে উঠল। সে মনে মনে বলল, —“এই তো শেষ জানালাটা খুলে গেল।”
    কিন্তু জীবন সবসময় এত সরল নয়।
    ফিরে এসে তারা আবার পড়াশোনায়, ব্যস্ততায় ডুবে গেল। কিন্তু সমাজের কড়া দৃষ্টি তাদের ছেড়ে দিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে কিছু ফিসফাস শোনা যেত। কারও কারও চোখে কটুকথা, কারও মুখে বিদ্রুপ।
    লাবণ্য ভীষণ কষ্ট পেত। সে ভাবত, কেন শুধু মেয়েরাই দোষী হয়? কেন শুধু মেয়েরাই শরীর চাইলে কলঙ্কিত হয়? পুরুষ তো সহজেই পার পেয়ে যায়।
    একদিন সে অরূপকে বলল—
    —“শোনো, আমি আর লুকিয়ে থাকতে চাই না। আমি চাই, সবাই জানুক আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি তোমাকে শুধু মন দিয়ে নয়, শরীর দিয়েও চাই।”
    অরূপ চুপ করে রইল। হয়তো সে জানত, এ সত্য সমাজ সহজে মেনে নেবে না।
    কিন্তু লাবণ্য ভয় পেল না। সে বুঝেছিল, তার প্রেম লুকিয়ে রাখার মতো নয়। নারীর শরীরও ভালোবাসার দাবিদার, নারীর আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশের অধিকার রাখে।
    সমাজ যতই বাঁধা দিক, লাবণ্য তার মনের সত্যিটা লুকালো না। সে বলল স্পষ্ট করে, সে দেখাল স্পষ্ট করে—প্রেম শেষমেশ শরীরেই পূর্ণতা পায়। আর শরীরের সেই চাওয়াটা অশ্লীল নয়, বরং ভালোবাসার সবচেয়ে পবিত্র প্রকাশ।
    সেই নদীর ধারের বিকেলের মতোই, লাবণ্যের চোখে তখনও এক অদ্ভুত আলো জ্বলত—শেষ জানালার আলো।
    ________________________________________

    5
    4 Comments
Skip to toolbar