-
রঙিন চিৎকারের ভেতরে জীবন
ভোরের আলো ফুটে উঠতেই নগরীর ভেতর থেকে ভেসে আসে এক অচেনা কণ্ঠস্বর—“সবজি নিন, টাটকা সবজি…”। সেই কণ্ঠস্বর শহরের গলিঘুঁজি পেরিয়ে মানুষের ঘুম ভাঙায়। কণ্ঠটি নিতাইয়ের। বয়স ত্রিশের কোঠায়। সে মাথায় বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে চলে, ঝুড়ি ভরা কাঁচা সবজি—পটল, শসা, ঢেঁড়স, টমেটো। নিতাইয়ের চোখেমুখে ক্লান্তি থাকলেও তার ডাকে এক ধরনের দৃঢ়তা মিশে থাকে। মানুষ যেন বুঝতে পারে—সে কেবল ক্রেতার দয়া নয়, বরং শ্রমের বিনিময়ে নিজের জীবন চালায়।
একই সময়ে অন্য এক গলিতে রহিমের হাঁক শোনা যায়। সে প্লাস্টিকের খেলনা বিক্রি করে—ছোট গাড়ি, বাঁশি, রঙিন পুতুল। শহরের শিশুদের জন্য সামান্য স্বপ্ন বিক্রি করে বেড়ায় রহিম। কিন্তু স্বপ্ন বিক্রি করেও নিজের পরিবারের জন্য বড় কোনো স্বপ্ন গড়তে পারে না। তার ছেলে স্কুলে যেতে চায়, কিন্তু প্রতিদিনের আয়ে তা সম্ভব হয় না। তবুও রহিম ভাবে—আজ যদি কিছু বেশি বিক্রি হয়, তবে ছেলেকে অন্তত একটি খাতা-কলম কিনে দেবে।
কাশেম ভিন্ন ধাঁচের ফেরিওয়ালা। সে পুরোনো বই আর খবরের কাগজ বিক্রি করে। শহরের বড়বাজারের আশপাশে ঘুরে বেড়ায়, মাটিতে পসরা বিছায়। লোকজন আসে, পাঁচ টাকার বই দশ টাকা দিয়ে কিনে নেয়, আবার অনেকেই দর কষাকষি করে। কাশেমের চোখে এক ধরনের স্বপ্ন থাকে—সে ভাবে, যদি বই বিক্রি ভালো চলে, তবে হয়তো একদিন নিজের ছেলেকে কলেজে পড়াতে পারবে। কাশেম নিজে উচ্চশিক্ষা পায়নি, কিন্তু বইয়ের গন্ধ তাকে আজও টানে।
এই শহরে ফেরিওয়ালাদের জীবন শুধু দারিদ্র্যের নয়, সংগ্রামেরও। কখনো পুলিশ হানা দেয়। একদিন ভোরবেলা রহিম রাস্তার মোড়ে খেলনা সাজাচ্ছিল। হঠাৎ পুলিশ এসে দাঁড়াল। “এই, এখানে বসতে কে বলেছে? সব গুটাও।” পুলিশ কড়া গলায় বলল। রহিম কাকুতিমিনতি করল—“স্যার, বিক্রি না করলে আজ বাচ্চারা না খেয়ে থাকবে।” কিন্তু পুলিশের চোখে করুণা নেই। তারা বোঝে না, এই মানুষের ভাঙা হাঁড়ি-ভাতের পেছনে কতটা ঘাম জমে আছে। পুলিশের তাড়ায় রহিম অনেক সময় পসরা ফেলে পালায়। কখনো খেলনা গড়িয়ে পড়ে ড্রেনে, কখনো ক্রেতার চোখের সামনেই ভেঙে যায় তার আশা।
তবুও এই মানুষগুলো হাল ছাড়ে না। শহরের অভিজাত গৃহিণীরা ফেরিওয়ালাদের ডাক শুনে বারান্দায় বের হন। নিতাইয়ের ঝুড়ির সবজি তারা বেছে নেন। কেউ কেউ দাম কমানোর জন্য তর্ক করেন, কেউ আবার হেসে বলেন—“আজ টাটকা এনেছো তো?” নিতাই বিনীত হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে। সে জানে, এই গৃহিণীরাই তার আয়ের একমাত্র ভরসা।
কখনো গৃহিণীরা তাদের দয়ার দৃষ্টিতে দেখে, আবার কখনো তুচ্ছ করে। একদিন এক গৃহিণী নিতাইয়ের কাছে সবজি কিনে দেরি করে টাকা দিল। নিতাই ভদ্রভাবে অপেক্ষা করছিল। গৃহিণী বিরক্ত হয়ে বললেন, “তুমি লোকজনকে বিরক্ত করো না, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ভালো লাগে না।” নিতাই চুপচাপ সরে গেল, কিন্তু ভেতরে কেমন এক ব্যথা জমে রইল।
কাশেমের কাহিনী আলাদা। সে বই বিক্রি করতে গিয়ে অনেক সময় অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। একবার এক কলেজছাত্রী তার কাছ থেকে একটি পুরোনো উপন্যাস কিনল। মেয়েটি বলল, “চাচা, বইটা অনেক দিন খুঁজছিলাম।” কাশেমের মুখে তখন আনন্দ ফুটে উঠেছিল। সে ভেবেছিল, এই শহরে এখনও কিছু মানুষ বই ভালোবাসে, আর সেই ভালোবাসাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
ফেরিওয়ালাদের জীবনে আনন্দ-বেদনার মিশেলই তাদের আসল গল্প। নিতাই একদিন বেশি সবজি বিক্রি করে খুশিতে বাড়ি ফিরে যায়। তার স্ত্রী সেদিন তরকারিতে ইলিশের ঝোল রান্না করে। বাচ্চারা খুশিতে হইহই করে। কিন্তু অন্যদিন বিক্রি না হলে, নিতাই ঘরে ফেরে হাত খালি নিয়ে। সেদিন তার ঘরে নীরবতা নেমে আসে।
রহিম কখনো কোনো বাচ্চার মুখে হাসি ফুটাতে পারলে সুখী হয়। একটি ছোট ছেলে তার কাছ থেকে পাঁচ টাকার গাড়ি কিনে খেলতে থাকে। ছেলেটির হাসি দেখে রহিম ভাবে—তার নিজের ছেলেও যদি এমনভাবে নির্ভার হয়ে হাসতে পারত! কিন্তু বাস্তবতা তাকে সেই সুখ দেয় না।
শহরের ভেতর দিয়ে এভাবে চলতে থাকে এক অদৃশ্য স্রোত—ফেরিওয়ালাদের জীবনস্রোত। তারা কেবল পণ্য বিক্রি করে না, তারা শহরের নিত্যদিনের অংশ। তাদের ডাক ছাড়া সকাল অসম্পূর্ণ, তাদের উপস্থিতি ছাড়া শহর নিস্তেজ। তবুও সমাজে তারা উপেক্ষিত। কেউ তাদের পরিশ্রম দেখে না, শুধু দেখে অস্থির ভিড়ের ভেতর কিছু ঘুরে বেড়ানো মানুষ।
রাত হলে ফেরিওয়ালারা একে একে বাড়ি ফেরে। কেউ ক্লান্ত শরীর টেনে নিয়ে যায়, কেউ মনের ভেতর নতুন দিনের আশায় বাঁচে। নিতাই ভাবে, কাল হয়তো বেশি বিক্রি হবে। রহিম ভাবে, কাল ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারবে। কাশেম ভাবে, কাল আরও কিছু বই বিক্রি করবে।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


ফেরিওয়ালাদের শুধু বিক্রেতা নয়, তাদের স্বপ্ন, কষ্ট আর ছোট ছোট সুখগুলোও চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। অসাধারন মানবিক একটা গল্প।