-
শেষ ভরসার ঘন্টাধ্বনি
মাছিমপুর গ্রামটি পদ্মার স্রোতের মতোই শান্ত, অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অশান্তির ঝড়। কলাকান্দি ইউনিয়নের এই গ্রামে মোসলেম উদ্দিনের সংসার যেন আজ জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। মোসলেম উদ্দিন এক সময়ে হালচাষ করতেন, দিনভর মাটির ঘ্রাণে ভেজা ঘামে নিজের সন্তানদের বড় করেছেন। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এসে জীবনের হিসাব-নিকাশ যেন উল্টে গেল।
তার একমাত্র ছেলে মাঈনুদ্দিন। একসময় পাড়ার মক্তবে পড়াশোনা করত, মুখে ভোরের শিশিরের মতো সরলতা ছিল। কিন্তু সময় বদলালো, বন্ধুত্বের আড়ালে মাদক ঢুকে পড়ল তার জীবনে। ধীরে ধীরে মাঈনুদ্দিন যেন এক অচেনা মানুষে পরিণত হলো। পরিবারের সবার কাছে সে হলো আতঙ্কের অন্য নাম।
প্রথমে মাদক চাইত লুকিয়ে, পরে প্রকাশ্যে। যখন না পেত, তখন বাবা-মাকে গালিগালাজ করত, কখনো মারধর করত। দরিদ্র সংসার, হাতে টাকা না থাকলে মাঈনুদ্দিন ঘর ভাঙচুর করত। মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী সারারাত কান্না করে ভোর করতেন। প্রতিবেশীরা দূর থেকে তাকাত, কেউ কাছে এসে এগোতে সাহস পেত না।
একদিন দুপুরে ঘরে খাবার নেই, মাঈনুদ্দিন তখনো টাকা চাইছে। তার চোখ রক্তাভ, শরীর কাঁপছে। মোসলেম উদ্দিন ভাতের থালা সরিয়ে রেখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। স্ত্রীর মুখ শুকনো, চোখ লাল। তখনই মনে হলো, জীবনের শেষ প্রহর হয়তো এসে গেছে। যন্ত্রণার বোঝা বইবার শক্তি তার নেই। ঘরের কোণে রাখা একটি দড়ি হাতে তুলে নিলেন।
ঠিক সেই সময় গ্রামের একজন লোক খবরটি ফোন করে দিল জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ—“মাছিমপুরে মাদকাসক্ত ছেলের যন্ত্রণায় বাবা আত্মহত্যার চেষ্টা করছে।”
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তিতাস থানা থেকে পুলিশ এসে হাজির হলো। নেতৃত্বে ছিলেন এস আই আবুল বাশার। ঘরে ঢুকে দেখলেন, মোসলেম উদ্দিনের হাতে দড়ি। তার চোখে ছিল নিস্তেজ দৃষ্টি, মুখে ভাঙা কণ্ঠে অনুযোগ—
“আমি আর পারছি না। আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে।”
পুলিশ তাকে শান্ত করল, দড়ি নামিয়ে নিল। তারপর মাঈনুদ্দিনকে ধরে নিয়ে এল থানায়। সেখানে তাকে বসিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা হলো। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে বোঝালেন, জীবনটা এভাবে নষ্ট করা যায় না। প্রথমে সে চুপ করে রইল, পরে কেঁদে ফেলল। অঙ্গীকার করল—সে আর মাদক নেবে না, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে, ভালো হয়ে যাবে।
তারপর শুরু হলো এক অদ্ভুত দৃশ্য। থানার আঙিনায় কাজ করতে লাগল মাঈনুদ্দিন। তাকে গোসল করানো হলো, মসজিদে নিয়ে নামাজ পড়ানো হলো। রাতের খাবারের পর তাকে রাখা হলো থানার এক আউটসোর্সিং কর্মীর পাশে। সবাই মনে করল, হয়তো ছেলেটা সত্যিই বদলে যাবে।
কিন্তু সকাল হলো ভিন্ন রঙে। ফজরের নামাজ শেষে সে অজুহাত খুঁজে ইমরানকে ফাঁকি দিল, আর সবার অগোচরে পালিয়ে গেল। বাড়িতে ফিরে আবার শুরু হলো একই চিত্র—গালিগালাজ, মারধর, নির্যাতন। মা-বাবার আর্তনাদ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। পুরনো প্রবাদ আবার সত্য হলো—“চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী।”
মোসলেম উদ্দিন এবার ভেঙে পড়লেন। মনে হলো, পুলিশও অসহায়, সমাজও অসহায়। তবুও পুলিশ হাল ছাড়ল না। তাদের সঙ্গে মোসলেম উদ্দিনের নিয়মিত যোগাযোগ হলো। একসময় তারা আবার মাঈনুদ্দিনকে আটক করল। এবার আর শুধু বোঝানো নয়, তাকে পাঠানো হলো আদালতে।
গ্রামের মানুষের মনে তখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলল, ভালো হয়েছে, অন্তত পরিবার কিছুটা শান্তি পাবে। কেউ বলল, ছেলেকে জেলে পাঠালে বাবা-মার বুক আরও ভাঙবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাঈনুদ্দিন নিজের জীবন ধ্বংস করার পাশাপাশি পরিবারের জীবনও অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছিল।
মোসলেম উদ্দিন আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে ছেলেকে দেখলেন। তার চোখে জল, বুকের ভেতর ভাঙা কণ্ঠ। তবু তিনি জানতেন, এই কঠিন সিদ্ধান্তই হয়তো একদিন তাকে ফিরিয়ে আনবে সঠিক পথে।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


আপনার এই লেখাটি পড়তে গিয়ে মনে হলো যেন একটা সংবাদপত্রের প্রতিবেদন আর ছোটগল্প মিলেমিশে তৈরি হয়েছে। বাস্তব জীবনের ট্র্যাজেডি, পরিবারের অসহায়তা, পুলিশ ও সমাজের ভূমিকা—সবই এখানে খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।