-
ভাঙনের ভিতরে আলো
শহরের নাম নক্ষত্রপুর। চারপাশে কোলাহল, ভিড়, গাড়ির হর্ণ, অগণিত মানুষের ছুটে চলা। কিন্তু এই শহরের মাঝেই আছে কিছু নিঃশব্দ গলিপথ, যেখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় দুঃখ আর যন্ত্রণা। এমনই এক গলিতে থাকে রাকিব। বয়স ষোল। ক্লাস টেনে পড়ে।
রাকিবের চেহারায় তীক্ষ্ণতা, দৃষ্টিতে ভয় ধরানোর মতো আগ্রাসন। স্কুলে যার নাম শুনলেই ছোটরা সরে যায়। সবাই বলে,
—“ওর থেকে দূরে থাকো। না হলে খারাপ কিছু হবে।”
রাকিবের হাতে সবসময় একটা লাঠি থাকে, আর মুখে থাকে অদ্ভুত দাপট। সহপাঠীদের খাতা ছিঁড়ে ফেলা, তাদের সামনে অপমানজনক কথা বলা, কিংবা হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া—এসব যেন তার প্রতিদিনের খেলা। শিক্ষকরা একাধিকবার তার বিরুদ্ধে অভিভাবকদের ডেকেছেন, কিন্তু ফল হয়নি।
কারণ, রাকিবের অভিভাবক—বিশেষ করে তার বাবা—ছিলেন ভীষণ রাগী ও নির্দয় মানুষ। প্রতিদিন ঘরে রাগ ঝাড়তেন, কখনও বেল্ট দিয়ে, কখনও লাঠি দিয়ে। মা অসহায়, প্রতিবাদ করার শক্তি ছিল না। রাকিব ছোটবেলা থেকেই মার খেয়ে খেয়ে বুঝে গেছে, দুর্বল মানেই নিপীড়নের শিকার। সে ভেবেছে, বাঁচতে হলে শক্ত হতে হবে, ভয়ংকর হতে হবে, যাতে আর কেউ তাকে আঘাত করতে না পারে।
কিন্তু শক্ত হওয়ার বদলে সে অন্যদের আঘাত করেই নিজেকে রক্ষা করতে শিখল। তার ভেতরে জমা হলো এক অদৃশ্য ক্ষত।
একদিন তাদের ক্লাসে নতুন ছাত্রী এল—নাম ফারজানা। চেহারায় উজ্জ্বলতা, কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাস। সে পড়াশোনায় ভালো, গানেও প্রতিভাবান। অল্প সময়েই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রিয় হয়ে উঠল। সহপাঠীরাও তাকে পছন্দ করল।
রাকিবের বুকের ভেতর হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। তার মনে হলো, “এই মেয়ে সবার ভালোবাসা কাড়ছে। আমার ভয়ের দাপট কেউ মনে রাখবে না। আমি যদি ওকে দমাতে পারি, তাহলে সবাই আবার আমাকে ভয় পাবে।”
এরপর থেকেই ফারজানার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। রাকিব তার ব্যাগ ফেলে দেয়, ক্লাসে গোপনে খাতা ছিঁড়ে ফেলে, আর কখনও মঞ্চে গান গাইতে উঠলে ইচ্ছে করে বিদ্রূপ করে। অন্যরা চুপ করে থাকে, কারণ রাকিবের ভয় সবার বুক জুড়ে।
তবে ফারজানা অন্যদের মতো নয়। সে মুখ খুলে দাঁড়াল। একদিন রাকিব যখন মাঠে তাকে ধাক্কা দিল, ফারজানা সোজা দাঁড়িয়ে বলল,
—“তুই আমাকে কেন বারবার কষ্ট দিচ্ছিস? কী লাভ হয় এতে? তুই কি খুশি হোস, যখন কাউকে কাঁদাতে পারিস?”
এই প্রশ্নে রাকিব থমকে গেল। জীবনে কেউ এমন করে তাকে প্রশ্ন করেনি। কিন্তু তবুও সে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—“আমার ইচ্ছে। যাকে খুশি, কাঁদাবো।”
কথাগুলো বললেও তার বুকের ভেতর হঠাৎ করে অদ্ভুত এক খোঁচা লাগল। যেন কেউ তার ভেতরের গোপন ক্ষত ছুঁয়ে দিয়েছে।
পরদিন স্কুলে ক্লাস টিচার এক আলোচনা সভার আয়োজন করলেন। বিষয়: “বুলিং ও তার প্রভাব।” শিক্ষক বোঝাতে লাগলেন,
—“যারা অন্যদের আঘাত করে, তাদের ভেতরেও থাকে অপূর্ণ চাহিদা। তারা অনেক সময় নিজেরাই নির্যাতনের শিকার হয়। সেই কষ্ট তারা সামলাতে পারে না, তাই অন্যদের উপর চাপিয়ে দেয়। আবার অনেকে ঈর্ষা বা নিরাপত্তাহীনতা থেকে বুলিং করে। কারও সাফল্য, সৌন্দর্য বা জনপ্রিয়তা দেখে তারা ভয় পায়—নিজেকে ছোট মনে হয়। তখন তারা আঘাত দিয়ে অন্যকে ছোট করার চেষ্টা করে। আর কেউ কেউ শুধুই ক্ষমতার নেশায় এটা করে, কারণ ঘরে বা সমাজে তারা অসহায়। অন্যদের দমিয়ে দিয়ে তারা সাময়িক আনন্দ পায়।”
সবাই মন দিয়ে শুনছিল, কিন্তু রাকিবের চোখ যেন হঠাৎ ভিজে উঠছিল। শিক্ষক থেমে তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“রাকিব, তুই কিছু বলতে চাইছিস?”
সে প্রথমে চুপ করে রইল। কিন্তু হঠাৎ যেন বুক ফেটে বেরিয়ে এলো তার জমে থাকা কষ্ট। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল,
—“স্যার, আমি জানি না কেন আমি এমন করি। কিন্তু ছোটবেলা থেকে বাবার মার খেয়ে খেয়ে আমি শিখেছি—দুর্বল হলে সবাই তোমাকে আঘাত করবে। তাই আমি কাউকে সুযোগ দিই না। আমি চাই না কেউ আমাকে ছোট করুক। তাই আমি ওদের আগে আঘাত করি।”
ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ফারজানার চোখে জল এসে গেল। শিক্ষক কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
—“তুই অনেক কষ্ট পেয়েছিস, রাকিব। কিন্তু মনে রাখিস, কষ্ট পাওয়ার মানে এই নয় যে তোকে অন্যদের কষ্ট দিতে হবে। তোর ভেতরের ক্ষত সারাতে পারিস অন্যদের ভালোবেসে। তুই যদি কারও পাশে দাঁড়াস, তবে তোর নিজের বুকের ব্যথাও কমে আসবে।”
সেদিন থেকে রাকিবের জীবনে এক ধরণের পরিবর্তনের শুরু হলো। প্রথমে সে ফারজানার কাছে ক্ষমা চাইতে কষ্ট পেয়েছিল, তবুও ধীরে ধীরে সে নিজের ভুল স্বীকার করল। শুরুর দিকে বন্ধুরা হাসাহাসি করলেও পরে তারা দেখল, রাকিব সত্যিই বদলাচ্ছে।
সে আর খাতা ছিঁড়ে না, বরং ক্লাসে কেউ সমস্যায় পড়লে সাহায্য করে। খেলার মাঠে আগে যে বল কেড়ে নিত, এখন সে অন্যদের খেলার সুযোগ দেয়। ধীরে ধীরে তার ভেতরের অন্ধকার ভেঙে আলো জ্বলে উঠল।
ফারজানার সঙ্গে বন্ধুত্বও গড়ে উঠল। সে-ই একদিন বলল,
—“তুই জানিস, আসল শক্তি হলো অন্যকে আঘাত করা না, বরং অন্যকে রক্ষা করা। তুই যদি সেটা শিখিস, তবে তুই আসলেই বড় হবে।”
রাকিব হাসল। তার চোখে তখন আর ভয়ংকর দৃষ্টি নেই, বরং আছে শান্তি।3 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


“আসল শক্তি হলো অন্যকে আঘাত করা নয়, বরং অন্যকে রক্ষা করা”—এই লাইনটি গল্পের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষণীয় মুহূর্ত।