Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • রিপোর্টকার্ডের মিষ্টি হুল
    বছরের পরীক্ষার ফল বেরোতেই গ্রামে যেন উৎসব লেগে গেল। ছেলেমেয়েরা যার যার রিপোর্টকার্ড নিয়ে বাড়ি ফিরছে, আবার বাজারে, চায়ের দোকানে, আড্ডার আসরে সেটা দেখাতে গিয়ে কে কত নম্বর পেল তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। কিন্তু রহিমের রিপোর্টকার্ড পড়েই সবাই চমকে উঠল। তার শিক্ষক মন্তব্যে লিখেছেন—
    “ছেলেটি পড়ায় ভালো, খেলাতেও। একমাত্র দোষ—নারীর দোষ, বড্ড মেয়ে ঘেঁষা আপনার ছেলে।”
    এই লাইনটা পড়তেই রহিমের মা প্রথমে মাথা চুলকালেন। তিনি ভেবেছিলেন, শিক্ষক হয়তো লিখবেন—“ছেলেটি পড়ায় অমনোযোগী” বা “কথা বেশি বলে।” কিন্তু না, মন্তব্যটা একেবারেই অভিনব। তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে রিপোর্টের নিচে লিখলেন—“আপনাকে ধন্যবাদ। সংশোধনের উপায় বার করতে পারলে আমাকে জানাবেন। তবে মনে রাখবেন, পদ্ধতিটি ছেলের বাবার ওপরও প্রয়োগ করতে হবে।”
    বাড়িতে রহিম তখন লাফাচ্ছে। তার কাছে বিষয়টা একেবারেই অন্যরকম। সে বলে বেড়াচ্ছে, “স্যার লিখেছেন আমি মেয়ে ঘেঁষা। মানে, আমার চারপাশে মেয়ে আছে। এতগুলো ছেলে আছে, তাদের রিপোর্টে তো লেখা হয়নি। আমি আলাদা হয়েছি। নায়ক হলে যা হয়!” বন্ধুরা হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। রহিম খুব সিরিয়াস হয়ে যুক্তি দিল—“মেয়ে যদি কাছে আসে, সেটা কি ছেলের দোষ? মধু থাকলে মৌমাছি আসবেই।”
    এদিকে রহিমের বাবা তখনো অফিসের কাজে ঢাকা শহরে। মা ঠিক করলেন, বাবাকে ফিরেই খবরটা জানাবেন। কয়েকদিন পর বাবার আগমন ঘটল। তিনি দরজা দিয়ে ঢুকতেই মা হাতে রিপোর্ট ধরিয়ে দিলেন। বাবা পড়তে পড়তে হাসি আটকাতে পারলেন না। “আরে, এটা তো আমার ছেলেই! আমি ছোটবেলায়ও ঠিক এমনই ছিলাম। শিক্ষকরা আমার নামও এই অভিযোগে লিখতেন।”
    মা ভুরু কুঁচকে বললেন, “এই হলো তোমাদের সমস্যার মূল। ছেলে তোমার গুণই পেয়েছে। তাই আমি স্যারের কাছে লিখেছি, সমাধান পেলে তোমার উপরও প্রয়োগ করতে হবে।” বাবা গম্ভীর মুখ করে বললেন, “তাহলে তো আমাকে আগে চিকিৎসা নিতে হবে। তবে সতর্ক করে দিচ্ছি, এই রোগের কোনো ওষুধ নেই।”
    এবার শিক্ষককে ডাকা হলো। তিনি এলেন, বসে রিপোর্টটা পড়লেন, আর মায়ের মন্তব্য পড়ে এত জোরে হেসে উঠলেন যে চেয়ার কেঁপে উঠল। বললেন, “বাবা যদি মেয়ে ঘেঁষা হয়, ছেলে যে তারই অনুসারী হবে—এ আর আশ্চর্যের কী!” বাবা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “স্যার, তবে এর সমাধান কী?” শিক্ষক মুখ গম্ভীর করে বললেন, “ছেলেকে মেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখতে চাইলে আপনাকেই আগে দূরে থাকতে হবে।”
    এই কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। মা খেপে গিয়ে বললেন, “তাহলে কি ওকে গ্রামছাড়া করতে হবে নাকি?” বাবা এবার লজ্জার হাসি হেসে বললেন, “গ্রামছাড়া করলে তো অফিসে বেতন কেটে যাবে।”
    খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামে হুল্লোড় পড়ে গেল। চায়ের দোকানে সবাই আলোচনা করছে—“দেখো দেখি, বাবা যেমন, ছেলে তেমন। এ একেবারে পারিবারিক ঐতিহ্য।” বৃদ্ধ আজিজ মিয়া মজা করে বললেন, “আগে শিক্ষকরা লিখতেন—‘পড়াশোনায় মন নেই, গরু চরায়।’ এখন লেখেন—‘মেয়ে ঘেঁষা।’ এ কালে অভিযোগও আধুনিক!”
    শেষমেশ গ্রামে বৈঠক বসল। মাতবর কাশেম সাহেব ঘোষণা করলেন, “এখন থেকে রহিম মাঠে খেলবে, পড়বে, নাটক করবে, তবে মেয়েদের সামনে দাঁত বেশি বের করলে জরিমানা দিতে হবে। আর বাবার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।” বাবা দম ফাটানো হাসি দিয়ে বললেন, “আমার হাসি ছাড়া অফিস চলে না। তাহলে আমার পদোন্নতি কে দেবে?” এই কথায় আবার হুল্লোড় উঠল।
    শেষ পর্যন্ত মা হাল ছেড়ে দিলেন। তিনি বললেন, “আচ্ছা, তোমরা যা আছো তাই থাকো। তবে মনে রেখো, মধু যত মিষ্টিই হোক, মৌমাছির হুল কিন্তু ভয়ানক।” বাবা আর ছেলে দুজনেই মুখ নামাল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হেসে মরছে।
    এরপর থেকে গ্রামের লোক রহিমকে নতুন নামে ডাকতে শুরু করল—“বাবার মতো ছেলে।” আর রহিমও সেটা গর্ব করে নেয়। কারণ তার কাছে এর মানে—সে শুধু পড়ালেখায় ভালো, খেলায় সেরা নয়, বাবার ঐতিহ্যও সুন্দরভাবে রক্ষা করছে।

    3
    2 Comments
Skip to toolbar