-
ছায়ার আড়ালে
গ্রামের প্রান্তে ছোট্ট একটি পরিবার বাস করত। বাবার নাম আলম, মা সেলিনা, আর দুই সন্তান—রিমা আর রাজু। গ্রামটি ছিল উজ্জ্বল সবুজ মাঠ আর নদীর তীরবর্তী ছোট্ট বসতি, কিন্তু মানুষের মনে লুকানো এক অদৃশ্য ভয়ময় ছায়া তার সঙ্গে সঙ্গম করত।
সেলিনা প্রতিদিন সকালে উঠে নদীর পাড় দিয়ে পানি আনত। কিন্তু আজ তার মুখে চিন্তার রেখা। গ্রামের এক প্রবীণ মহিলা তার কাছে এসে বলেছিলেন, “সেলিনা, আজ শুক্রবার নদীর পানি বের করা যাবে না। এতে নাকি সন্তানদের ভাগ্য নষ্ট হবে।” সেলিনা জানত, এই ধরনের কথা পূর্বপুরুষদের অযৌক্তিক বিশ্বাস। তবে ভয়ের সুরে পূর্ণ, তিনি তবু হাত ঢোকালেন না নদীতে।
অলঙ্কৃত চুলোর পাশে বসে রিমা রাজুকে বলল, “দেখছ, মা কিছুই করছে না। আমি জানি এটা অযৌক্তিক।” কিন্তু রাজু বলল, “আমরা তো গ্রামে থাকি। সবাই তাই বলে। যদি কিছু ঘটে?” রিমা চোখ মেলে বলল, “কিছু ঘটবে না। এটা শুধু মানুষ তৈরি করা ভয়।”
এই ভয়, যা গ্রামবাসী একে কুসংস্কার বলে চিহ্নিত করত, প্রতিদিনের জীবনকে আবদ্ধ করে রেখেছিল। কেউ শাপমুক্ত হবার জন্য নির্দিষ্ট দিনে কিছু খেতে পারত না, কেউ নির্দিষ্ট সময়ে ঘর থেকে বের হতে পারত না। বাবা আলম যাই বলুক, মানুষ কখনো তার যুক্তি শোনার পক্ষে ছিল না।
একদিন, গ্রামের স্কুলের শিক্ষিকা মিনা চক্রবর্তী এলেন। তিনি শহর থেকে এসেছেন, নতুন বই নিয়ে। বইগুলোতে বিজ্ঞান, প্রকৃতি, যুক্তি—সবই ছিল স্পষ্টভাবে চিত্রিত। মিনা গ্রামের ছোট্ট শিশুদের শিক্ষার জন্য নতুন পাঠ দিতেন।
একদিন মিনা গ্রামে একটি পাঠশালা করে বললেন, “দেখো, ডিম খাওয়া পরীক্ষা ভালো হওয়ার জন্য ক্ষতিকর নয়। আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য এটি প্রয়োজনীয়। যা বলা হয়েছে, তা কুসংস্কারের ছায়া।” গ্রামের মানুষ প্রথমে অবাক। তারা বলল, “কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষরা…” মিনা হেসে বললেন, “পূর্বপুরুষরা ভালো চেয়েছিলেন, কিন্তু তারা জানত না বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। আমরা এখন জানি, সত্য ও যুক্তির পথে চললে জীবন সহজ হয়।”
সেলিনা ঘরে ফিরে রাজু আর রিমাকে বললেন, “শুনছ, আমাদের ভয় ভুল। আমরা আর না-খাওয়া ডিমের জন্য সন্তানদের জীবন সীমাবদ্ধ করব না। আমাদের শিশুদের শক্তি আর জ্ঞান চাই। ভয়ের জন্য সীমাবদ্ধ না করে তাদের স্বাধীন হতে দেব।”
কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামের মানুষ পরিবর্তন দেখতে পেল। রাজু এবং রিমা আনন্দে ডিম খেতে লাগল। সেলিনা নদীর পানি খোলার কাজ শুরু করলেন, নির্দ্বিধায়। গ্রামে ধীরে ধীরে অজানা ভয়, অযৌক্তিক বিশ্বাস কমতে শুরু করল। মানুষ বুঝতে পারল, কুসংস্কারের ছায়া শুধু তাদের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল।
একদিন মিনা গ্রামের একটি সাধারণ আড্ডায় বললেন, “জ্ঞান আমাদের মুক্তি দেয়। যুক্তি আমাদের পথ দেখায়। কুসংস্কারের ভয় শুধু আমাদের মেধা আর স্বাধীন চিন্তাকে শিকলবন্দি করে। বিজ্ঞান, শিক্ষা আর জ্ঞানই আমাদের দেশকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাবে।”
গ্রামের মানুষ কেবল শুনল না, তারা বুঝল। আলম নিজের হাতে রিমা আর রাজুকে পড়ার বই দিলেন। “পড়, বুঝ, প্রশ্ন কর। যা জানা যায়, তা ভয় নয়। যা না জানা যায়, তা খুঁজে বের কর।”
সেই থেকে গ্রামের ছোট্ট শিশুদের দৌড়ঝাঁপ আর হাসি এক নতুন ছায়া পেল। তারা শিখল, ভয়কে না-মানলে জীবন সহজ হয়। কুসংস্কারের অন্ধকার ছায়া যদি থাকত, তবে তারা কখনো স্বপ্ন দেখত না। এখন তারা স্বপ্ন দেখছে, বড় হতে, জানতে, নতুন উদ্ভাবন করতে।
বছর পেরিয়ে, গ্রামের মানুষ বোঝল—কুসংস্কার শুধু জীবনের জন্য হুমকি নয়, এটি মানুষকে অজ্ঞতার কূপে আটকে রাখে। শিক্ষা ও যুক্তি হলো সেই চাবিকাঠি, যা দিয়ে তারা মুক্তি পেতে পারে। আর সেই মুক্তি শুধু তাদের জন্য নয়, গ্রামের ভবিষ্যতের জন্যও।
সেলিনা আর আলম একদিন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখল। সেলিনার চোখে আনন্দের জল, আলমের মনে শান্তি। তারা জানত, তাদের শিশুদের হাতে এখন জ্ঞান আর যুক্তির বীজ। তারা জানত, কুসংস্কারের ছায়া এখন আর তাদের জীবনকে বাঁধতে পারবে না।
রাজু নদীর পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার মা, আমরা ভয়কে হারিয়েছি।”
রিমা হাসতে হাসতে বলল, “এবার আমরা জানি, অজানা ভয়কে না মেনে সত্যিকারের জ্ঞান অর্জন করতে হবে।”
গ্রামটি ধীরে ধীরে নতুন আলোর দিকে এগোল। অন্ধকার কমল, জ্ঞানের আলো জ্বলে উঠল। শিক্ষার বীজ ছিল জীবন্ত, কুসংস্কারের ছায়া হার মানল। মানুষ শিখল—ভয় নয়, জ্ঞান ও যুক্তি তাদের প্রকৃত শক্তি।2 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


কুসংস্কারের শিকল ছিঁড়ে জ্ঞান ও যুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা আছে আপনার গল্পতে।