Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • খিলক্ষেতের গোল্লা
    গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে যে অনাবাদি জমিটাকে সবাই “খিলক্ষেত” বলে ডাকত, সেখানে বিকেল নামলেই আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত খেলা শুরু হতো। দিনের শেষে সূর্যটা যখন তালগাছের মাথার আড়ালে ঢলে পড়ত, তখন সেই খিলক্ষেত আমাদের জন্য হয়ে উঠত একমাত্র রাজ্য—যেখানে কোনো পরীক্ষার ভয় নেই, কোনো বড়দের শাসন নেই, নেই জীবনের হিসাব-নিকাশ। শুধু ছিল দৌড়, হাসি, হাঁপানো শ্বাস আর গোল্লাছুটের উত্তেজনা। আমি, রঞ্জু, গেদি আপা, আলেক ভাই আর হাসি আপা—এই পাঁচজনই ছিলাম সেই বিকেলের অঘোষিত সৈনিক।
    খিলক্ষেতটা আসলে ছিল চাষের অযোগ্য জমি। বর্ষায় হাঁটু পানি জমত, শীতকালে ফেটে যেত মাটি। মাঝখানে একটু উঁচু জায়গা, সেখানেই আমরা গোল্লা পুঁততাম। শুকনো বাঁশের টুকরো বা পুরোনো লাঠিই হতো গোল্লা। সেটাকে ঘিরেই আমাদের সমস্ত উত্তেজনা, সমস্ত কৌশল, সমস্ত জয়-পরাজয়। দূরে একটি কাঁঠালগাছ ছিল—সেটাই বাইরের সীমানা। ওই গাছটা আমাদের কাছে ছিল যেন মুক্তির প্রতীক; সেখানে হাত ছোঁয়াতে পারলেই সব ভয় উধাও।
    রঞ্জু ছিল আমাদের দলের সবচেয়ে চঞ্চল। দৌড়াতে ওস্তাদ, চোখে সবসময় একধরনের দুষ্টুমি। গোল্লা থেকে ছুটে গিয়ে কাঁঠালগাছ ছুঁয়ে আবার ফিরে আসার সময় সে এমন ভঙ্গি করত, যেন বাতাসের সঙ্গে তার চুক্তি আছে। আলেক ভাই ছিল লম্বা আর শক্তপোক্ত, সাধারণত ‘রাজা’ দলে পড়ত। গোল্লা আঁকড়ে ধরে সে এমনভাবে দাঁড়াত যে মনে হতো, ওই লাঠিটাই তার অস্তিত্বের কেন্দ্র। গেদি আপা ছিল হিসেবি—কখন ছুটতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন কাউকে ফাঁদে ফেলতে হবে—সব বুঝত চোখের ইশারায়। আর হাসি আপা… নামের মতোই ছিল তার হাসি। খেলতে খেলতে সে যখন হেসে উঠত, তখন আমাদের দৌড়ের ক্লান্তি অর্ধেক কমে যেত।
    খেলা শুরু হতো দল ভাগাভাগি দিয়ে। কখনো আমরা পাঁচজনই দুই দলে ভাগ হতাম, কখনো আশপাশের বাড়ির আরও ছেলেমেয়েরা এসে যোগ দিত। ‘রাজা’ দল গোল্লা ধরে রাখত, হাত ধরে শিকলের মতো ঘুরত, যেন এক জীবন্ত দেয়াল। আর ‘ছুট’ দল অপেক্ষা করত সুযোগের—একটা ছোট ফাঁক, একটুখানি অসতর্কতা, আর সঙ্গে সঙ্গে ছুট। সেই দৌড় ছিল শুধু পায়ের নয়, ছিল বুকের ভেতরের সাহসেরও।
    অনেক বিকেলে আমি নিজেই ‘ছুট’ দলের খেলোয়াড় হয়ে দাঁড়িয়েছি গোল্লার একটু দূরে। সামনে আলেক ভাইয়ের কঠিন চোখ, পাশে রঞ্জুর চাপা হাসি। মাটিতে পা রাখলেই ধুলো উড়ছে, শ্বাস টানলেই শুকনো ঘাসের গন্ধ। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাজটা আমি করতে যাচ্ছি—গোল্লা ছেড়ে সীমানা ছোঁয়া। দৌড় শুরু হতো হঠাৎ, কোনো সংকেত ছাড়াই। চারদিক থেকে চিৎকার—“ধর! ধর!”—আর বুকের ভেতর ঢাকঢোল।
    কখনো ধরা পড়েছি, কখনো অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। ধরা পড়লে হতাশা থাকত ঠিকই, কিন্তু সেটাও ছিল আনন্দের অংশ। আউট হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে অন্যদের দৌড় দেখা—সেটাও কম রোমাঞ্চকর ছিল না। গেদি আপা যখন কৌশলে আলেক ভাইকে ভুল পথে ঘুরিয়ে দিয়ে সীমানা ছুঁয়ে ফেলত, তখন আমরা সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠতাম। সেই চিৎকারে ছিল বিজয়ের উল্লাস, আবার ছিল শৈশবের মুক্ত আনন্দ।
    খেলার মাঝখানে কখনো কখনো ঝগড়াও হতো। “তুমি আগে ছুঁয়েছো!”, “না, তুমি ধরেছো!”—এইসব নিয়ে তর্ক। কিন্তু সেই তর্ক দীর্ঘস্থায়ী হতো না। একটু পরেই আবার হাসি, আবার দৌড়। খিলক্ষেত আমাদের শিখিয়েছিল কীভাবে ঝগড়া ভুলে যেতে হয়, কীভাবে দল হয়ে থাকতে হয়।
    বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামত। দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, বাড়ির দিক থেকে মায়েদের ডাক—“এই যে, কখন আসবি?”—তবু আমরা শেষ একটা রাউন্ড খেলতে চাইতাম। সূর্যের আলো কমে এলে ছায়াগুলো লম্বা হয়ে যেত, গোল্লার পাশে দাঁড়ানো আলেক ভাইয়ের ছায়া যেন আরেকজন প্রহরী। শেষ দৌড়টা হতো সবচেয়ে তীব্র, সবচেয়ে স্মরণীয়।
    সময় বদলেছে। খিলক্ষেতে এখন বাড়ি উঠেছে, কাঁঠালগাছটা কেটে গেছে। আমরা সবাই ছড়িয়ে পড়েছি জীবনের নানা পথে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখি—একটা লাঠি, একটা সীমানা, আর পাঁচজন ছেলেমেয়ে দৌড়াচ্ছে ধুলো উড়িয়ে। গোল্লাছুট শুধু একটা খেলা ছিল না; সেটা ছিল আমাদের শৈশবের ভাষা, আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধন। খিলক্ষেতের সেই বিকেলগুলো আজ নেই, তবু তারা রয়ে গেছে মনে—অমলিন, অক্ষয়, ঠিক গোল্লার মতোই কেন্দ্র হয়ে।

    1
    1 Comment
    • শৈশবের নির্ভেজাল আনন্দ, স্বাধীনতার অনুভূতি এবং সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া এক সরল পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি

Skip to toolbar