-
পাহাড়ের বুকের আলো
পাহাড়ের গায়ে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে নামছিল। কুয়াশার চাদরে মোড়া বনভূমির ভেতর থেকে ভেসে আসছিল পাখির ডাক, আর পাতার ফাঁক গলে রোদের সোনালি রেখা। এই পাহাড়, এই বন, এই বাতাস—সব মিলিয়ে যেন একটি জীবন্ত সত্তা। এখানেই গড়ে উঠেছে খাসিদের পুঞ্জি, প্রকৃতির কোলে মাথা রেখে থাকা এক অনন্য জনপদ। মানুষের ঘরগুলো বাঁশ, কাঠ আর পাতায় তৈরি, যেন মাটির সঙ্গে, গাছের সঙ্গে কোনো দূরত্ব না থাকে। প্রকৃতি এখানে শুধু পরিবেশ নয়, আত্মীয়—মা, বন্ধু আর আশ্রয়।
পুঞ্জির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বড় আমগাছটির নিচে বসে ছিলেন কা লিংডোহ। বয়সে তিনি প্রবীণ, কিন্তু চোখে ছিল পাহাড়ের মতো স্থির দৃঢ়তা। এই পুঞ্জিতে তিনিই মাতৃবংশের প্রধান উত্তরাধিকারী। খাসি সমাজে মেয়েরাই বংশের বাতিঘর, সম্পত্তির ধারক, পরিবারের সিদ্ধান্তের কেন্দ্র। কা লিংডোহ জানতেন, এই দায়িত্ব শুধু রক্তের সূত্রে আসে না; আসে প্রকৃতিকে বোঝার ক্ষমতা থেকে, মানুষকে আগলে রাখার মন থেকে। তাঁর মা যেমন তাঁকে শিখিয়েছিলেন, তেমনি তিনিও তাঁর কন্যা কা মেরিয়ামকে শেখাচ্ছিলেন পাহাড়ের ভাষা, বনের নিঃশ্বাস।
কা মেরিয়াম তখন তরুণী। ভোর হলেই সে উঠে পড়ে কাজে—ধানের জমিতে নজর, পানলতার বাগানে পানি দেওয়া, মৌচাকের পাশে দাঁড়িয়ে মধুর অবস্থা দেখা। মধু সংগ্রহ তাদের জীবনের এক গভীর অংশ। এটি শুধু খাদ্য নয়, পাহাড়ের আশীর্বাদ। মৌমাছির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল সম্মানের—অকারণে কেউ কখনো চাক ভাঙে না। নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট নিয়মে, প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মধু তোলা হয়। কা মেরিয়াম যখন প্রথম মধু তুলেছিল, তখন তার মা বলেছিলেন, “প্রকৃতি থেকে যা নেবে, তার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা ফিরিয়ে দেবে।”
পুঞ্জির মানুষদের জীবনধারা ছিল ধীর, কিন্তু গভীর। ভাত রান্না হয় কাঠের চুলায়, সঙ্গে পাহাড়ি মাংস, শুঁটকি মাছ আর মধু। খাবারের সময় সবাই একসঙ্গে বসে—শিশু, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ। এখানে খাবার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়; এটি গল্প, স্মৃতি আর সম্পর্কের উৎস। খেতে খেতে কা লিংডোহ গল্প করতেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের কথা—কিভাবে একসময় তাঁরা যাযাবর ছিলেন, বন থেকে বনে ঘুরে বেড়াতেন, প্রকৃতির সংকেত বুঝে পথ ঠিক করতেন।
বছরের এক বিশেষ সময়ে পুরো পুঞ্জি বদলে যেত উৎসবের আলোয়। ‘সেং কুটস্নেম’ আসলেই পাহাড় যেন আরও সবুজ হয়ে উঠত। নতুন বছরের আগমনে সবাই নেচে উঠত আনন্দে। নারী-পুরুষের রঙিন পোশাক, ঢোলের তালে তালে নাচ, আর গানের সুরে পাহাড়ের বুক কেঁপে উঠত। কা মেরিয়াম নাচতে খুব ভালোবাসত। নাচের ভেতর সে অনুভব করত পূর্বপুরুষদের ছায়া, প্রকৃতির স্পন্দন। এই নাচ যেন তাদের ভাষারই আরেক রূপ—যেখানে শব্দ নেই, তবু সব বলা যায়।
কিন্তু পাহাড়ের এই শান্ত জীবনে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছিল অন্য এক স্রোত। নিচের সমতল থেকে আসছিল পাকা রাস্তা, মোবাইল টাওয়ার, বাইরের মানুষের কোলাহল। কিছু তরুণ পুঞ্জি ছেড়ে শহরে যেতে শুরু করেছিল কাজের খোঁজে। কা মেরিয়ামের মনেও প্রশ্ন জাগত—এই পরিবর্তন কি ভালো, না পাহাড়ের নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে দেবে? একদিন শহর থেকে ফেরা তার বন্ধু কা রিনেট বলল, “শহরে সুযোগ আছে, কিন্তু সেখানে কেউ পাহাড়ের কথা শোনে না।” কথাটি কা মেরিয়ামের মনে গভীর দাগ কাটল।
এক সন্ধ্যায় কা মেরিয়াম তার নানির সঙ্গে বসে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছিল, আকাশে লাল-কমলার মিশ্রণ। নানি বললেন, “সময় বদলায়, মানুষও বদলায়। কিন্তু যদি আমরা আমাদের শিকড় ভুলে যাই, তবে আমরা শুধু ছায়া হয়ে যাব।” এই কথা কা মেরিয়ামের ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দিল। সে ভাবল, আধুনিকতার সঙ্গে লড়াই নয়, বরং তাকে বোঝা দরকার—কিভাবে নিজের পরিচয় রেখে এগোনো যায়।
এরপর কা মেরিয়াম উদ্যোগ নিল। সে পুঞ্জির শিশুদের নিয়ে নিয়মিত গল্পের আসর বসাতে শুরু করল, যেখানে খাসি ভাষায় গল্প বলা হতো, গান শেখানো হতো। উৎসবগুলোকে আরও সংগঠিতভাবে পালন করা শুরু হলো, বাইরের মানুষদেরও আমন্ত্রণ জানানো হলো—তবে শর্ত একটাই, প্রকৃতির প্রতি সম্মান। মধু আর পান চাষে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি আরও জোরদার করা হলো। ধীরে ধীরে পুঞ্জি বুঝতে পারল, আধুনিকতা মানেই শিকড় ছেঁড়া নয়।
কা লিংডোহ দূর থেকে সব দেখছিলেন। একদিন তিনি কা মেরিয়ামকে কাছে ডেকে বললেন, “তুমি শুধু আমার কন্যা নও, তুমি এই পাহাড়ের ভবিষ্যৎ।” তাঁর কণ্ঠে ছিল গর্ব, চোখে ছিল নিশ্চিন্তি। কা মেরিয়াম জানত, পথ সহজ নয়। পরিবর্তনের ঢেউ আরও আসবে। কিন্তু সে এটাও জানত, যতদিন পাহাড়ের বুকের আলো জ্বলবে, ততদিন খাসিদের গল্প হারাবে না।
রাত নামলে পুঞ্জিতে নীরবতা নেমে আসে, কিন্তু সেই নীরবতা শূন্য নয়। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পাতার মর্মর, দূরের ঝর্ণার শব্দ—সব মিলিয়ে এক গভীর সুর। কা মেরিয়াম শুয়ে শুয়ে ভাবল, এই সুরই তাদের পরিচয়। সময় বদলাবে, পৃথিবী বদলাবে, কিন্তু যদি তারা এই সুর ধরে রাখতে পারে, তবে খাসিদের জীবনধারা শুধু ইতিহাসে নয়, বর্তমানেও বেঁচে থাকবে। পাহাড়ের বুকের আলো নিভবে না, বরং নতুন দিনের দিকে পথ দেখাবে।1 Comment
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


পাহাড়ের কুয়াশা, পানের লতা আর খাসি সমাজের মাতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা অত্যন্ত শৈল্পিক এবং গভীর