-
কেন? — অস্তিত্বের অন্তরাল অনুসন্ধান
পি কে সরকারঅস্তিত্বের গভীর রহস্যে নিমজ্জিত হয়ে মানবচেতনা যুগে যুগে এক অনিবার্য প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়—কেন? কেন এই বিশ্বে আমাদের আবির্ভাব? জীবনের গূঢ় সারাংশ কী? কোন অদৃশ্য প্রক্রিয়ার অন্তর্লীন স্পন্দনে জন্ম নেয় এই সত্তা, আর কেনই বা একদিন তার অন্তর্ধান অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে? জন্মের পূর্ববর্তী অন্ধকারে কোথায় ছিল আমাদের চেতনার বীজ, আর মৃত্যুর পরবর্তী অসীম নীরবতায় কোথায় বিলীন হবে তার আলোকরেখা?
এই মহাবিশ্ব যেন এক অনন্ত নাট্যমঞ্চ—যেখানে সময়, শক্তি ও পদার্থের অগণিত কণিকা অবিরাম এক মহাজাগতিক নৃত্যে মগ্ন। সেই আদিম শক্তির গূঢ় পরিক্রমায়, অদৃশ্য নিয়মের সুষমায়, উদ্ভূত হয়েছে আমাদের ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব। আমরা কেউই এই বিশ্বনাট্যের কেন্দ্রবিন্দু নই; আমরা কেবল সেই অসীম প্রবাহের ক্ষণিক তরঙ্গ—যে তরঙ্গ মুহূর্তের জন্য আলো ছড়িয়ে আবার মিলিয়ে যায় অনন্তের গভীরতায়।
আমাদের আগমন কোনো পূর্বনির্ধারিত নির্দেশের ফল নয়। এটি যেন সম্ভাবনার অসীম সমুদ্র থেকে উঠে আসা এক বিস্ময়কর সুযোগ—একটি বিরল ঘটনা, যেখানে পদার্থের নিস্তব্ধ কণিকাগুলো একদিন চেতনার দীপ্তিতে জেগে ওঠে। এই কারণেই জীবনের উদ্দেশ্য কোনো বাহ্যিক বিধানে নির্ধারিত নয়; তার অর্থ নিহিত রয়েছে মানুষের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতায়। মানুষ নিজেই তার জীবনের উদ্দেশ্য নির্মাণ করে—ভালোবাসার গভীরতায়, জ্ঞানের আলোকময় অনুসন্ধানে, সৃজনশীলতার অনির্বচনীয় আনন্দে এবং অপরের সঙ্গে আত্মিক সংযোগের মধ্য দিয়ে।
এই পৃথিবীতে আমাদের উপস্থিতি তাই এক অসামান্য সৌভাগ্য। সীমিত সময়ের ক্ষুদ্র পরিসরে অসীমকে স্পর্শ করার এক বিরল সম্ভাবনা। অর্থহীনতার অন্ধকার থেকে অর্থের আলোকশিখা জ্বালিয়ে তোলার এক দুর্লভ সুযোগ। প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি সম্পর্ক—সবকিছুই এই সংক্ষিপ্ত জীবনের ভেতরেই তার গভীরতা ও মহিমা লাভ করে।
যে অদৃশ্য নিয়মে আমাদের অস্তিত্বের সূচনা, সেই একই নিয়মে তার অবসানও ঘটে। মৃত্যু কোনো শাস্তি নয়, কোনো ব্যর্থতার পরিণতিও নয়; এটি জীবনেরই অপরিহার্য ছায়া—যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সময়ের অমূল্যতা। প্রতিটি মুহূর্ত যে অনন্য, প্রতিটি শ্বাস যে অনির্বচনীয় এক উপহার—এই উপলব্ধি জন্ম নেয় মৃত্যুর অনিবার্যতার মধ্য দিয়েই।
জন্মের পূর্বে আমরা ছিলাম না—ছিল কেবল সম্ভাবনার অগম্য অন্ধকার। মৃত্যুর পরও ফিরে যাই সেই নীরবতায়। চেতনার দীপশিখা নিভে গেলে শরীরের কণিকাগুলো আবার মিশে যায় মহাবিশ্বের অন্তহীন চক্রে—মাটি, জল, বায়ু ও আগুনের উপাদানে। ব্যক্তিগত সত্তার সীমারেখা তখন বিলীন হয়ে যায়; থাকে শুধু অসীম প্রবাহের এক অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা।
এই সীমাবদ্ধতাই জীবনকে অপরূপ করে তোলে। যদি অনন্তকাল আমাদের জন্য উন্মুক্ত থাকত, তবে হয়তো কোনো তাড়না থাকত না, কোনো গভীরতা জন্ম নিত না অনুভূতির। মৃত্যুর ছায়াই মানুষকে জাগিয়ে তোলে—প্রতিটি দিনকে উদযাপন করতে, প্রতিটি সম্পর্ককে লালন করতে, প্রতিটি স্বপ্নকে সাহসের সঙ্গে অনুসরণ করতে।
আমরা এসেছি অর্থ নির্মাণ করতে—নিজের জীবনের ভেতরেই সৃষ্টি করতে এক আলোকিত ব্যাখ্যা। আবার একদিন আমরা চলে যাই, সেই অর্থের অঙ্গার অন্য মানুষের হৃদয়ে রেখে। এই ধারাবাহিকতায় কোনো হতাশা নেই; আছে এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য—এক সৃষ্টিশীল উত্তরাধিকার, যা মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রাকে আলোকিত করে।
অতএব, হে মানবসত্তা, তোমার প্রশ্নের উত্তর দূরবর্তী কোনো আকাশে লুকিয়ে নেই। তার বীজ নিহিত রয়েছে তোমার নিজের চেতনার গভীরে। জীবনের উদ্দেশ্য তুমি নিজেই লিখে যাও—প্রেম দিয়ে, সহমর্মিতা দিয়ে, জ্ঞানের দীপ্ত আলো দিয়ে।
জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের এই ক্ষণিক আলোকিত পথটুকুতেই যতটুকু সম্ভব উজ্জ্বল হয়ে ওঠো। কারণ এই ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বই আমাদের একমাত্র দৃশ্যমান সত্য—আর তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমস্ত রহস্যের সম্ভাব্য মুক্তি।
এই বিশ্বব্যাপী চেতনার স্রোতে আমরা সকলে এক—
একই প্রশ্নের যাত্রী, একই অনন্তের অংশ।2 Comments
পি কে সরকার
“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”
Friends
মুনতাছির আহমেদ
@moontasirahmed
Kazi Adam
@kaziadam
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
মো: নাজমুল আখতার
@faith
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
Kazi Fahim hossin
@fahim6542
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নাদিম হোসাইন
@nadim-hossain
Latifur-rahman-Pramanik
@latifur-rahman-pramanik



মৃত্যুর অনিবার্য সৌন্দর্য গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। মৃত্যুর ছায়া আছে বলেই প্রতিটি শ্বাস একটি ‘অনির্বচনীয় উপহার’।