-
অনুগল্প — খামবন্দি মফস্বল
লেখনীতে – অনন্যা_অরী ( ছদ্মবেশী )সাল ১৯৯৬
নব্বই দশকের মফস্বল শহরগুলো ছিল অদ্ভুত শান্ত। বিকেলের আকাশ জুড়ে কেবল মেঘেদের খেলা, আর বাতাসে ভেসে আসা দূরের কোনো বাড়ির রেডিওতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর। সেই শহরে সৌমিক ছিল এক মগ্ন যুবক, যার পৃথিবীটা আটকে ছিল লাইব্রেরির বইয়ের তাক আর মোড়ের মাথার ক্যাসেটের দোকানে।
সেদিন শ্রাবণ মাসের এক মেঘলা বিকেল। সৌমিক শহরের পুরনো সিন্ধু লাইব্রেরিতে লেখক সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ খুঁজছিল। সেই সময় হঠাৎ তার নাকে ভেসে এল বকুল ফুলের তীব্র অথচ মিষ্টি একটা সুবাস। সে পেছনে ফিরে তাকাতেই থমকে গেল। হালকা আকাশি রঙের সুতির শাড়ি, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা আর দীর্ঘ বিনুনি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হৈমন্তী।
সৌমিক বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি? এখানে?”
হৈমন্তী একটু হাসল। সেই হাসিতে যেন এক নিমেষে শ্রাবণের সব মেঘ কেটে গিয়ে রোদের দেখা মিলল। সে নিচু গলায় বলল,
“কেন? এখানে কী শুধু আপনারই আসার অধিকার? আমি কি একটু কবিতার বই পড়তে আসতে পারি না?”
সৌমিক লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করল। কারণ নব্বইয়ের সেই দিনগুলোতে মেয়েদের সাথে কথা বলা মানেই তো ছিল এক বিরাট যুদ্ধ। সে কোনোমতে বলল,
“আসলে,মানে… আপনাকে তো সাধারণত এই সময়ে পাড়ার মোড়ে দেখা যায়। নীলু কাকিমার বাড়িতে যান বোধহয়।”
হৈমন্তী সৌমিকের দিকে এক কদম এগিয়ে এল। চারপাশটা নিঃঝুম, শুধু লাইব্রেরির পুরনো ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটুকু শোনা যাচ্ছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি খুব নজর রাখেন তো! গত সাতদিন ধরে আমাদের গেটের সামনে দিয়ে যে আপনি বারবার সাইকেল নিয়ে টহল দিচ্ছেন, সেটা কি নীলু কাকিমার বাড়িতে যাওয়ার জন্য নাকি অন্য কিছু ??”
সৌমিকের কপালে ঘাম জমে উঠল। ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জা আর ভালোলাগা মেশানো এক অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করল। সে আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে… ওই দিকে রাস্তাটা একটু ভালো তো, তাই…”
“থাক, আর অজুহাত দিতে হবে না,”
হৈমন্তী বাধা দিয়ে বলল।
“শুনুন, কাল বিকেলে আমাদের বাড়ির পেছনের যে বাঁশবাগানটা আছে, সেখানে আসবেন? ভাইয়েরা কেউ থাকবে না আর বাবা দাদুর বাড়িতে গিয়েছে ।”
কথাটা শেষ করেই হৈমন্তী পা টিপে টিপে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেল। সৌমিক সেখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে তখন বাজছে পাশের দোকানে চলতে থাকা কুমার শানু আর অলকা ইয়াগনিকের সেই অবিস্মরণীয় গান— ‘
মেরা দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায়…’।
পরদিন বাঁশ বাগান। রোদের রেশ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে মাটিতে। সৌমিক গিয়ে দেখল হৈমন্তী আগে থেকেই দাঁড়িয়ে। তার হাতে ভাঁজ করা একটা লাল রঙের খাম।
সৌমিক কাছে যেতেই হৈমন্তী সেই খামটা বাড়িয়ে দিল।
“এটা নিন। আর সাবধান, অন্যকারো হাতে যেন না যায়।”
সৌমিক খামটা হাতে নিল। কাগজের স্পর্শে এক অন্যরকম শিহরণ অনুভব করল সে। সেও পকেট থেকে একটা স্বচ্ছ কভারের অডিও ক্যাসেট বের করল। টিডিকে ডি-৯০ ক্যাসেট।
সৌমিক বলল,
“এটা আপনার জন্য। শহরের বড় এক স্টুডিওতে গিয়ে নিজের পছন্দের সেরা দশটা গান রেকর্ড করে এনেছি। আর হ্যাঁ,এক নম্বর আর পাঁচ নম্বর গানটা ভালো করে শুনবেন, কারণ ওগুলোতে আমার মনের না বলা কথা আছে ।”
হৈমন্তী ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি মাখা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“এক নম্বরে নিশ্চয়ই ‘তুঝে দেখা তো ইয়ে জানা সনম’ আছে, তাই না?”
সৌমিক লাজুক হাসল।
“কী করে বুঝলেন?”
“হয়তো আমার মনের মধ্যেও একই গান বাজছে তাই,”
বলেই হৈমন্তী থমকে গেল। নিজের মনের কথা এত সহজে বলে ফেলে সে নিজেও লজ্জিত।
সেই বিকেলে কোনো মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন ছিল না, ইন্টারনেটের গতির লড়াই ছিল না। ছিল শুধু দুজনের মাঝে এক গভীর নৈশব্দ্য, যা হাজারটা শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে দিচ্ছিল।বাড়ি ফিরে সৌমিক লাল খামটা খুলল। ভেতরে সযত্নে রাখা একটি শুকনো বকুল ফুল আর সুন্দর হাতের লেখায় এক দীর্ঘ চিঠি। চিঠির পড়তে শুরু করলো সে। পড়ার এক পর্যায়ে শেষের লাইনটি এসে থমকে গেল সৌমিক ।
শেষ লাইনটা ছিল ,
“সৌমিক, এই শহরটা বড্ড ছোট, কিন্তু আপনার জন্য আমার ভালোবাসা এই ছোট শহরের সীমা ছাড়িয়ে নীল আকাশের মতো অসীম।
আমাদের হয়তো পূর্ণতা পেতে আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে, অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবু বিশ্বাস রাখি এই ধীর, মন্থর প্রেমই একদিন আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে। তাই জানতে চাই, আপনি কি এই অপেক্ষার মধ্যে লুকিয়ে থাকা আমাদের ভালোবাসার গভীরতাকে ধরে রাখবেন? যতদিন না আমাদের আকাশ এক হয়।”চিঠিটা পড়া শেষ করে সৌমিক জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে শুরু হয়েছে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ঝাপসা কাঁচের ওপারে মফস্বল শহরের টিমটিমে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ভিজে ওঠা রাস্তাটাকে আজ বড় বেশি মায়াবী লাগছে। তার মনে হলো, ক্যাসেটের রিলগুলো এখন হয়তো হৈমন্তীর টেপরেকর্ডারে ঘুরছে। এক নম্বর গানের সুরটা যখন তার কানে পৌঁছাবে, সে কি বুঝবে সেই সুরের ভাঁজে কতটা ব্যাকুলতা লুকিয়ে ছিল?
সেই রাতে চিঠির পাতায় কলম ছোঁয়ালো সৌমিক। আবেগের ভারে অক্ষরগুলোও যেন একটু কাঁপছিল । সে লিখল,
“হৈমন্তী, অপেক্ষা যদি তোমার পাঠানো এই চিঠির মতো সুন্দর হয়, তবে আমি অনন্তকাল এই মন্থর সময়ের বালুচরে দাঁড়িয়ে থাকতে রাজি। প্রাপ্তি আমাদের ভাগ্যে থাকুক বা না থাকুক, তোমার দেওয়া এই লাল খাম আর শুকিয়ে যাওয়া বকুল ফুলের ঘ্রাণটাই আমার জীবনের সবচেয়ে দামী উপহার হয়ে থাকবে। তাই আমি কথা দিচ্ছি, আমাদের আকাশ এক না হওয়া পর্যন্ত আমি এই অসীম নীলিমার পাহারাদার হয়েই থাকব।”
নব্বই দশকের প্রেমগুলো এমনই ছিল—সহজে ছোঁয়া যেত না বলেই তার পবিত্রতা ছিল আকাশের মতো বিশাল। সেখানে কোনো ইনস্ট্যান্ট মেসেজ ছিল না, ছিল মাসের পর মাস অপেক্ষার প্রহর গোনা। নীল খাম আর অডিও ক্যাসেটের আড়ালে এক জোড়া হৃদয়ের সেই নীরব প্রতিশ্রুতি মফস্বল শহরের গলি ছাড়িয়ে অসীম নীলিমায় মিশে রইল। পূর্ণতা হয়তো সবার কপালে জোটে না, কিন্তু সেই শ্রাবণী বিকেলের ভেজা হাওয়া আর বকুল ফুলের গন্ধ সৌমিকের ধূসর জীবনে এক চিরস্থায়ী বসন্তের ছাপ রেখে গেল। সময় বদলে যাবে, শহরটা হয়তো একদিন ইট-পাথরের জঙ্গল হবে, কিন্তু ওই বাঁশবাগানের মায়া আর লাল খামের শব্দগুলো তার বুকের বাঁ-পাশে ঠিকই স্পন্দিত হতে থাকবে।
~সমাপ্ত~
8 Comments
Friends
শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান
@sharifmuhammadwahiduzzaman
Syed Farah
@syedfarah
Romana Rohomoti Shraboni
@romanarohomotishraboni
Jakaria Hossain
@jakariahossain
তুষার
@tusar
Adwit Kanti Routh
@adwit
Masum-Pantho
@masum-pantho
puraton 2010pata
@puraton2010pata
Riyansh Hasmi
@riyanshhasmi


সেই নব্বই দশোকের স্বাদই খুঁজে পেলাম পাঠক আমি। খুবই ভালো লাগল। মোবাইল ছিল না। ইন্টারনেটও এখকনকার মতো জাঁকিয়ে বসেনি। ফলে স্বাভবিক ভাবেই সময়টা ছিল অন্যরকম। ভালো ভাবে সেটা ধরেছেন, প্রকাশ করেছেন। শুভেচ্ছা নিবেন।