-
গীতি নকশা :এল নতুন দিন গ্রীষ্ম ঋতু ও নববর্ষ
রচনা : আবুল হাসান তুহিনগ্রন্থনা নারী:
নারী : চৈত্রের খরা বুকের মাঝে, মুখে কালো মেঘ চুপচাপ বসে আছে আমার মহাদেব
পুরুষ : চুপ করে বসে আছি বলেই তো তুমি হয়ে গেলে কবি!
নারী : হাহাহাহা (হাসি) কিছুতেই একটা করতে হবে একটা কবিতা না হয় তোমার জন্য লেখা হলো দমকা বাতাসে মেঘ কন্যা হয়ে তোমার পাশে বসে আছি অথচ তুমি উদাসী।
পুরুষ :তুমি আমার চৈত্রের রোদ্দুর সূর্যমুখী ফুল সবুজ মাঠে বাতাসের ঢেউ। তুমি আমের মুকুল।
নারী : মেঘ কন্যা হয়ে তোমার পাশে। দু’চোখের পাতায় বৈশাখী কামনা। প্রেমের রোদ নিয়ে আপন করে নাও না। কী নেবে না?
পুরুষ : ঋতু চক্রের পালা বদল করে দিতে হয় বর্ষ বিদায় আসে নতুন বছর। বরণ করতে হয় নতুন দিনকে সেই সাথে তোমাকে বরণ করলাম।
নারী : আজ চৈত্রের শেষ দিন আগামীকাল পহেলা বৈশাখ নতুন বছরকে ঘিরে কত আয়োজন। ব্যবসায়ীরা পুরাতন খেরো খাতা রেখে নতুন খাতা খোলে লাল মলাটের হালখাতা সারা মাস জুড়ে চলে হালখাতার উৎসব । মুছে ফেলে জীর্ণতা যত হাহাকার।গান ।।০১।। আধুনিক ।। পুরুষ।।
মুছে ফেলে জীর্ণতা যত হাহাকার
নতুনের আহ্বানে খুলে যাবে দ্বার ।।বুকে জমা যত গ্লানি দূর হয়ে যাবে
এসো অগ্নিস্নানে দিশা খুঁজে পাবে
রুচি হবে এ ধরা ভরবে সম্ভার।।বুকে জমা যত আশা প্রাণ ফিরে পাবে
বৈশাখী আয়োজনে মন ভরে যাবে
খুশি হবে বসুন্ধরা পাবে অধিকার।।গ্রন্থনা পুরুষ:
পুরুষ : বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস আমাদের দেশে গ্রীষ্মকাল শীতের শেষে আম কাঁঠাল লিচু জাম জামরুল আশ ফল গাছে ফুল ফোঁটে সেই ফুল থেকে ফল হয়। জৈষ্ঠ মাস কে বলে মধুমাস। বৈশাখ মাসে গাছে গাছে ফলের সমাহারও সেই সাথে মাঠে ধানের শীষে বাতাসে দোলে। কৃষক কয়েকদিন পর ধান কাটবে পাকা ধানের গন্ধে মন ভরে যায় কৃষকের। তরমুজ বাঙ্গি ফুটিয়ে রসালো ফল গরমের তৃষ্ণা মিটায়।
নারী :ঝকঝকে রোদ চারিদিকে গাছে গাছে পাখিদের কল কাকলি। হাওয়ায় ভাসে বনফুলের গন্ধ।
পুরুষ : বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেতে দেখি বাতাসের ঢেউ, মাঝে মাঝে আকাশে মেঘ রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। বৈশাখী ঝড়ের আভাস। গ্রীষ্মকাল একদিকে বৈরী হিংস্র ঋতু সেই সাথে মধুভরা মাস একই অঙ্গে দুই রূপ। বৈশাখ মাসে গাছে গাছে লিচু কাঁঠাল ঝুলছে আমের গুটি।গান ।। ০২।।পল্লীগীতি ।। নারী একক।।
গাছে গাছে লিচু কাঁঠাল ঝুলছে আমের গুটি,
বৈশাখী আওলা বাতাস মনটা নিল লুটি।।মেঘ রোদের লুকোচুরি ফসল ভরা মাঠে,
শ্যামল ছায়ায় দুচোখে জুড়ায় ক্লান্ত সময় কাটে।
গরম তাপে তৃষ্ণা মেটাই তরমুজ আর ফুটি।।মেঘ কালো ইশান কোণে ঝড়ো বাতাস ছোটে
ধুলো উড়া পথের বাঁকে মনটা আঁতকে উঠে
জামের ডালে মৌমাছির চাক করছে ছোটাছুটি।।গ্রন্থনা নারী:
নারী : ঐতিহাসিক গবেষক বিভিন্ন পণ্ডিতগণ বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে নানা রাজা বাদশাহ বা সুলতানের নাম হাজির করেছেন ।ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহের বিচারে বিবেচনায় সম্রাট আকবর প্রবর্তিত এলাহী সনের আদলে মুঘল সুবাদার পরে নবাব মুর্শিদকুলি খান বাংলা অঞ্চলের কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন এমন ধারণা পাওয়া যায়।পুরুষ :যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে সম্রাট আকবর পরোক্ষভাবে এই সনের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
নারী : মোগল সম্রাটরা কর আদায়ের জন্য সুবেদার মুর্শিদ কুলি খানের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে নির্দেশ জারি করেন, কৃষিভিত্তিক বাংলায় “হিজরী সন” কৃষকের কাজ থেকে খাজনা আদায়ের জন্য প্রতি কুল।
পুরুষ : কারণ প্রতিবছর হিজরী সন সাড়ে দশ বা ১১ দিন পিছিয়ে যায়।
নারী : এ বিবেচনায় রেখে মুর্শিদকুলি খান সম্রাট আকবরের তারিখ- এ-এলাহী সূত্রের অনুসরণ করেই বাংলা হিজরী চন্দ্র এবং ভারতীয় সূর্য সনের সমন্বয়ে বাংলা সন চালু করেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।পুরুষ: মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক মুন্সি সলিমুল্লাহর ফারসি ভাষায় লেখা তারিখ- ই- বাংলা (১৭৬৩) গ্রন্থে উল্লেখ আছে নবাব মুর্শিদকুলি খান পয়লা বৈশাখের পূর্ণ উৎসব চালু করেন। এতে জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটে ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নত হয় । ব্যবসায়ীরাই পূর্ণাহর আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান হিসাবে হালখাতা উৎসব চালু করেন।
নারী :কৃষি নির্ভর অর্থনীতির কৃষকের হাতে টাকা আসতো ফসল কাটার পরে। তাই বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা বাকিতে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস দিত।নতুন দিনের হালখাতার উৎসবে বকেয়া অর্থের পুরোটা বা আংশিক পরিশোধ করে হালখাতা বা নতুন খাতায় নাম লেখা হতো। বাকি আদায়ের জন্য বিলি করতো হালখাতার দাওয়াত পত্র। ফসল ভালো না হলে কৃষক পরতো মহা চিন্তায়। হালখাতার চিঠি দিলো রহিম উদ্দিন ভাই ক্ষেতে ফসল হয়নি এবার কি করে বুঝাই।
গান।। ০৩।।পল্লীগীতি।। পুরুষ।। একক
হাল খাতার চিঠি দিলো রহিম উদ্দিন ভাই,
ক্ষেতে ফসল হয়নি এবার কি করে বুঝাই।।ধান হইছে যে কয় মন তা দিয়ে কি হবে,
বাকি টাকা শোধ না করলি তার পরাণ কী সবে।
কনে পাবো বীজ ধান আর কার যে কাছে যাই,
ক্ষেতের ফসল হয়নি এবার কি করে বুঝাই।।হালের বলদ কিনতি হবে চাষ দেবো মাঠে,
বউয়ের বাউটি বেঁচতি যাবো কালকে আমি হাটে।
সুদের টাকা দিতি গেলি পরাণ খাবি খায়,
ক্ষেতের ফসল হয়নি এবার কি করে বুঝাই।।গ্ৰন্হনা পুরুষ:
পুরুষ : নবাবেরা তাদের শাসনের স্বার্থেই প্রজাদের মন তুষ্টির জন্য পূর্ণাহ হালখাতা ছাড়াও নানা লোক উৎসবের যোগদান করতেন লাঠি খেলা হাডুডু গরু দৌড় ঘোড়া দৌড়, নৌকা বাইচ, এসব নববর্ষের আঞ্চলিক উৎসব।নারী : নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ উৎসবে ইংরেজ আমলে ইংরেজি নববর্ষের প্রভাব পড়ে তাই নতুন আদলে রূপ আঙ্গিক পরিগ্রহণ করে। ভারতবর্ষের স্বাদেশিকতার চেতনাও নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
পুরুষ বাংলাদেশে পাকিস্তান আমলের নববর্ষ উদযাপন বাঁধার মধ্যে পড়ে পূর্ব বাংলার বাঙালির জাতীয়বাদী চেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া নববর্ষ উৎসব প্রবাল তাড়নায় বৃদ্ধি পেতে থাকে।১৮৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৬৭ সাল থেকে নববর্ষকে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসবের রূপদান করে। এই উৎসব প্রতি বছর বিশাল থেকে বিশাল তর হয়ে বাঙালি একটি সার্বজনীন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।
নারী : গ্রামীণ গম্ভীরা যাত্রা-জারি লোকগীতি ছাড়াও রবীন্দ্র নজরুল সংগীত দেশাত্মবোধক গান এখন বাংলার নববর্ষের মূল উপাদান বৈশাখী মেলা বসে শহর বন্দর গ্রামে।
পুরুষ : বৈশাখী মেলায় যাব ঠিক করে নাও সাজ। জলদি করে নাও গুছিয়ে হাতের যত কাজ।
গান ।।০৪।। আধুনিক ।। নারী, পুরুষ
পুরুষ : বৈশাখী মেলায় যাব
ঠিক করে নাও সাজ
নারী :জলদি করে নাও গুছিয়ে
হাতের যত কাজ।
পুরুষ :রাগ করো না লক্ষ্মীটি
চড়বো নাগর দোলায়,
নারী :পুতুল নাচ আর যাত্রা পালায়
দেবো মনটা ভোলায়।।পুরুষ : ঝুরি ভাজা দানাদার
কিনবো পাঁপড় ভাজা,
নারী : দুজন মিলে ঘুরবো মেলায়
মনটা হবে তাজা।
নারী-পুরুষ: স্বপ্নগুলো উড়িয়ে দেব
মেঠো পথের ধুলায়।।পুরুষ : লাল টিপ কাঁচের চুড়ি
দেবো কানের দুল,
নারী : রঙ বাহারি চুলের ক্লিপ
আরো নাকের ফুল।
নারী-পুরুষ: সাজ পোশাকের বাঙালিয়ানা
দেখে মাথা ঘুরায়।।গ্রন্থনা নারী:
নারী :প্রচন্ড গরমে হাঁপিয়ে উঠেছি আর পারছিনা!
পুরুষ :এক কাজ করি ওই পুকুর পাড়ে একটু বসি বাতাস পুকুরের গাছে যখন তোমার আমার গায়ে লাগবে তখন শীতল হবে দেহ মন আগে মেয়েরা রং বেরঙের কারু কাজে হাতপাখা তৈরি করত। সুতো এবং বাঁশের শলা দিয়ে তালের পাখা কদর কমও ছিল না ।লেখা থাকতো তালের পাখায় প্রাণের সখা
হ্যাঁ তালের পাখা প্রানের সখা তখন হয়ে যায় বন্ধুর হাতের পরশ মাখা বাতাস যদি পায়।গান ।।০৫।। পল্লীগীতি ।।নারী ,পুরুষ।।
পুরুষ : তালের পাখা প্রানের সখা
তখন হয়ে যায,
নারী : বন্ধুর হাতের পরশ মাখা
বাতাস যদি পায়।।নারী : গরমের ক্লান্তি ভুলে
মনটা উঠবে দুলেপুরুষ : ভালোবাসা ছড়িয়ে যাবে
আমার সারা গায়।।নারী : সোহাগের কোমল হাতে
মনটা তোমার সাথে
পুরুষ :বুকে জমা স্বপ্নগুলো
সত্যি হয়ে যায়।।নারী : গরমে এমন দিনে
নিয়েছো বন্ধু চিনে
পুরুষ : মনের মাঝে রঙিন আশা
উতাল-পাথাল বাই।।গ্রন্থনা : পুরুষ:
পুরুষ : এই নদী এই মাটি আকাশ পেরিয়ে পৌঁছে যাব বহুদূর।
নারী : হাওয়ার তুফান ছোটে মনের সমুদ্দুর।পুরুষ : আজ বৈশাখী ভালোবাসা ছড়িয়ে দিলাম তোমার মনের বাঁকে মাতাল হাওয়ায় দুটি মনে রঙিন স্বপ্ন আঁকে।
গান।। ০৬।। আধুনিক ।। পুরুষ একক
আজ বৈশাখে
ভালোবাসা ছড়িয়ে দিলাম
তোমার মনের বাঁকে,
মাতাল হাওয়ায় দুটি মনে
রঙিন স্বপ্ন আঁকে,
আজ বৈশাখে ।।কালো মেঘের ভেলা দেখে
পেওনা তুমি ভয়
বৈশাখের এই লীলা খেলায়
ভয়ের কিছু নাই।
মেঘলা রাতে ফুটবে মুকুল
মনের শাখে শাখে
আজ বৈশাখে ।।ঝড়ো বাতাস হঠাৎ করে
যদি উঠে যায়,
তোমার মনের ভীরু কাঁপন
দেবো বুকে ঠাই
দুটি হিয়া মিশে যাবে
গুরু মেঘের ডাকে
আজ বৈশাখে ।।গ্রন্থনা নারী:
নারী : গ্রাম বাংলার আবহমান ঐতিহ্য বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ।
পুরুষ : বাঙালির এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে চিরকাল। এসো আমরা অবগাহন করি নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ তরুণ তরুণী সবাই।।
নারী : নতুন স্বপ্ন নিয়ে এলো নতুন দিন নতুন বছর।
বৈশাখী সকালবেলায় রং বেরঙের সাজ তাইতো বলতে ইচ্ছে করে চুলে চুলে খোঁপা ফুলে নানা রঙে সাজ লাল সাদা শাড়ি পরা মুখে আছে লাজ চুড়ি পরা হাত জুড়ে ছিমছম মেয়ে।।গ্রন্থনা পুরুষ
কবিতা ।।আবৃত্তি।। নারী, পুরুষচুলে চুলে খোঁপা ফুলে নানা রঙে সাজ,
লাল সাদা শাড়ি পরা মুখে আছে লাজ।।চুড়ি পরা হাতে জুড়ে ছিমছাম মেয়ে,
বৈশাখী মেলাতে আসে সব ধেয়ে,
মন খুলে নেচে গেয়ে প্রাণ ভরে আজ।
চুলে চুলে খোঁপা ফুলে নানা রঙে সাজ,
লাল সাদা শাড়ি পরা মুখে আছে লাজ।।দিনভর হাসিখুশি নেই কোন ভয়,
ঝড়ো হাওয়া দূরে থাক দিন আলোময়,
বৈশাখী মাতামাতি নেই কোন কাজ।
চুলে চুলে খোঁপা ফুলে নানা রঙে সাজ,
লাল সাদা শাড়ি পরা মুখে আছে লাজ।।একই স্রোতে মিশে যাবো সবকিছু ভুলে,
বাঙালির সাজ দেখে মন উঠে দুলে,
পান্তা ইলিশে হবে কারুকাজ।।
চুলে চুলে খোঁপা ফুলে নানা রঙে সাজ,
লাল সাদা শাড়ি পরা মুখে আছে লাজ।।নয় ভুল এক চুল বৈষবী দিনে,
হালখাতা নিয়ে বসি দায় দেনা ঋণে,
স্বপ্নের ডালি নিয়ে পড়ে নেব তাজ।
চুলে চুলে খোঁপা ফুলে নানা রঙে সাজ,
লাল সাদা শাড়ি পরা মুখে আছে লাজ।।রচনা কাল ০৬/০৪/২০১৭
3 Comments

Abul Hasan Tuhen
Friends
abrar
@abrar
জামান বারভী
@zamanbarovi
MUHAMMAD TAHSEEN
@muhammadtahseen
Kokeshas King
@kokeshasking
মোরশেদ সাকিব
@morshedsakib
Ekhtiar Uddin
@ekhtiar2003
ইভান
@ivan
মো: ফারহান হাবীব
@farhan-habib
Masfi K
@masfi-mohammad


পহেলা বৈশাখের এই গীতিনকশায় ইতিহাস, লোকজীবন আর প্রেম এত সুন্দরভাবে মিশেছে যে পড়তে পড়তে মনে হলো চোখের সামনে একটা মঞ্চায়ন হচ্ছে। “তালের পাখা প্রাণের সখা” এই লাইনে এসে মন ভালো হয়ে গেল। শুভ নববর্ষ!