Profile Photo

Israt LamiaOffline

  • Israt-Lamia
  • Profile picture of Israt Lamia

    Israt Lamia

    4 years, 11 months ago

    আগন্তুক (পর্ব-১)
    ইসরাত লামিয়া

    “একটা সরু ফাঁকা জায়গা। দৈর্ঘ্যে এক থেকে দেড় মিটারের মতো প্রস্থ অনেকটা কম। দুপাশে বিল্ডিং এর দেয়াল। একটা ঘর ও আছে। পিছনে একটা ছোট দরজা দিয়ে এই অবরুদ্ধ জায়গাটায় প্রবেশ করা হয়। সামনে পুরোটা অংশজুড়ে একটা বড় গেট তালাবদ্ধ করা। নিচে মাটি আর উপরে বন্ধ করে দেয়া আকাশ। মধ্যে ফাঁকা জায়গাটায় একটা হাহাকার যা সবার মন কে নাড়িয়ে দেয়। শুধু নারায় না তাদের মন। ওকে ছেড়ে দিন ছাড়ুন না চিৎকার করছে একটা মেয়ে কন্ঠ। বিল্ডিংয়ের পাশে ঘর সেই পাশের দেয়ালটা খানিক পেছনে সরানো একটা ঘর ও কয়েকটা থাম এর কারণে তারই একটা থামে বাধা মেয়েটি। তার সামনে একটা ছেলেকে বিরামহীনভাবে মেরে যাচ্ছে একদল লোক। আর মেয়েটা তার হাতে বাঁধা দড়ি ছেড়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছে যা ইতোমধ্যে তার হাতে রক্তপাতের শুরু করেছে। আর ছেলেটির শরীরের রক্তে মাটি ভিজে কাদা কার যেন মাত্রই বৃষ্টি হলো। আস্তে আস্তে শব্দ বেড়ে চলল। মেয়েটার কান্না ছেলেটার আর্তনাদ আর তাদের হাসি সব মিলে এক জঘন্য আওয়াজ যে কারো কাছে অসহ্য লাগবে তা। কিন্তু শব্দটা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ছে আরো বাড়ছে আরো।”না” চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠে বসে পরে দিবা। সে খুব দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। ঘেমে গেছে অবশেষে স্বপ্ন বুঝতে পেরে একটু শান্ত হল। কাঁপা হাতে গ্লাস থেকে পানি খেতে লাগল দিবা। তখনই তার কানে এলো, “আল্লাহু আকবর” এতক্ষণে সে খেয়াল করল ঘরে তমা আর পরী নেই। পাশে রাখা ওড়নাটা চট করে পড়ে ঘর থেকে বের হলো সে। বারান্দায় দাঁড়াতেই দেখতে পেল মাঠে জানাজার নামাজ পড়ানো হচ্ছে। সেখানে স্থির হয়ে দাড়িয়ে গেল দিবা এক অজানা ভাবনায়। “দিবা তুমি শুনেছ কেশব স্যার আর আমাদের ক্লাস নেবেন না। ভালোই হলো” কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে বলল পরি। “নীচে চলো। আনসু কে তো এখনই নিয়ে যাবে,” তাগিদ দিয়ে বলল তমা। কিন্তু একই রকম স্থির চলো বিরক্ত হল পরী থাক পরী ও হয়তো একটু বেশি আপডেট আনসার জন্য চলো আমরা যাই তমার কথায় দুজনে নিচে চলে গেলো। দিবা এখনও স্থির। যখন তার ঘোর ভাঙলো তখন সবাই আনসুকে নিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে চলে যাচ্ছে। দিবা ছিল 6 তলায়। খুব দ্রুত নামতে শুরু করলো সে। আনসু দিবাদের সাথেই পড়ত। কাল রাতে মারা গেছে। রিপোর্ট বলছে অপুষ্টির জন্য। দিবা যখন নিচে পৌঁছালো তখন তারা আনসু কে নিয়ে gate এর বাইরে। দিবা তবুও থামলো না।ছুঁতে চললো। গেট এর সামনে পৌঁছাতেই দারোয়ান তাকে থামিয়ে দিল। “আর জাইয়ও না দিবা মা। ওরা দেখলে তোমারে শাস্তি দিবো। এমনিতেই তোমার উপর খেইপ্পা আছে। তুমি ঘরে চইল্যা যাও।” ” জানি চাচা। আমি আর যাবো না। এখানেই একটু দাড়াই।” বলেই পিছনে ফিরে চলে যেতে লাগলো দিবা। খুব আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল তাকে। ” দিবা মা একটু শুইনা যাও” পেছন থেকে ডাকলো দারোয়ান চাচা। দিবা কাছে এসে দেখলো তার সাথে আর একজন দাড়ানো। ” ইনি তোমাগো নতুন স্যার। ওনারে একটু টিচারস রুমডা দেখায় দাও তো মা। ” নমঃস্কার। আসুন আমার সাথে”। নতুন টিচার মাথা নেড়ে শুধু রেসপন্স করলো মুখে কিছুই বলল না। দিবা তাকে কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে বা দিকের পথটা দেখিয়ে দিয়ে নিজে ঘরে ফিরে এলো।

    প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্টারন্যাশনাল হলি কেয়ার গার্লস স্কুল এন্ড অ্যাকম্মোডেশন সেন্টার। এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু মা-বাবা হীন মেয়েদের জন্য। যেসব মেয়েরা ন্যূনতম ১১ বছর বয়সী এবং অনাথ আশ্রমে থাকে তারা এখানে আসে। তারা এখানে পড়াশুনা ও থাকার সুযোগ পায়। বড় বড় বিল্ডিং গুলোর মধ্যে আছে ক্লাসরুম, লাইব্রেরী, সাইন্সল্যাব আর থাকার জায়গা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের জন্য। যেহেতু এরকম প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বেশি একটা নেই তাই এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারের থেকে একটা বড় অনুদান পায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হাওয়া সত্বেও। পুরো বাংলাদেশে প্রায় ৯-১০ টি এরকম প্রতিষ্ঠান আছে। তার মধ্যে ৬ টিই সরকারি। সরকারের অনুদান ছাড়াও এনজিও, বিরোধী দল, বড় নেতা যাদেরই মহান হবার প্রয়োজন হয় তারাই বড় একটা সংখ্যা অনুদান করে। ১৯৯৫ সালে শরীফ ইসলাম প্রথম এই প্রতিষ্ঠান চালু করেন যা কিনা বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম করা হয়। শরীফ ইসলামের টাকা পয়সা ছিল অনেক কিন্তু দেয়ার মত কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। কোনো দাতব্য সংস্থায় দান না করে তিনি এই উদ্যোগ নেন। এর জন্য অনেক প্রশংসিত ও হন। তারপর যখন ওনার মৃত্যু হয় তখন প্রতিষ্ঠানটিকে চালাতে শুরু করে এনজিও। বারবার সরকার বদল, প্রতিযোগিতা, ক্ষমতা সবকিছুর জেরে অনেকবার হাতবদল হয় প্রতিষ্ঠানটির। যখন যে পেয়েছে প্রতিষ্ঠানকে বড় করেছে মহান হতে। সময় বদলেছে, বদলেছে নিরাপত্তা। এভাবে ২০২০ সালে এসে এই প্রতিষ্ঠানের আছে তিনদিকে ৬ তোলা ভবন। মোটামুটিভাবে এটাই হলো এই প্রতিষ্ঠানের বেড়ে ওঠার ইতিহাস।

    তারপর সূর্যের মিষ্টি রোদে সাথেই শুরু হলো একটা দিন। দিবা ক্লাসেই আছে। সবকিছু আগের মত শুধু health education and defence বিষয়ের শিক্ষক টি বদলেছেন। তাদের নতুন স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। যে কিনা এই স্কুলেও নতুন। দিবা বুঝতে পারল ইনাকে গতকাল ও টিচার্স রুম দেখিয়ে দিয়েছিল। নতুন স্যারের বয়স কম তা দেখলেই বোঝা যায়। মুখে একটা শান্তভাব। পরিপাটি করা পোশাক আর চুল। হাতে একটা সাধারন ঘড়ি। কথা বলেন বেশ গুছিয়ে, বিরামহীনভাবে। চোখ সবসময় যেন কিছু খুঁজতে থাকে। এটা ক্লাস টুয়েলভ। “আমি তোমাদের hed এর নতুন স্যার। আমার নাম মিহির মিত্র। এটা আমার প্রথম কাজ আর তোমরা আমার প্রথম ব্যাচ। এভাবে অনেকক্ষণ কথা বলে সবার সাথে হালকা হলো মিহির। ” আমরা কথা দিয়ে শুরু করবো?” একজন দাড়িয়ে মিহিরকে দেখিয়ে দিল। এই ক্লাসে আর কিছুই পড়ানোর সময় হলো না মিহিরের।

    দিবা দেখল মিহির খুব স্পষ্ট ভাবে সবকিছু বোঝাতে পারে। অন্য টিচারদের থেকে অনেকটা আলাদা। অনেকটা focused তার বিষয়ের উপরে। তবুও সে কিছুতেই পড়ায় মন দিতে পারছে না। সে অন্যকিছু নিয়ে ভাবছে। ক্লাস শেষে সাইন্সল্যাবে আসে দিবা। যেভাবেই হোক নিজের উপর আঘাত করতে হবে তাকে তাই ল্যাবের একটা ভারী পাথর নিজের পায়ের উপর ফেলবে বলেই স্থির করলো সে। ” তুমি এখানে কি করছো?” জিজ্ঞাসা করলো মিহির। চমকে ওঠে দিবা। ” গ্লোব নিতে এসেছি।” “ও” দিবা গ্লোব টা হতে নিয়ে নেয়। ” ও হ্যা আগামী সপ্তাহে তোমাদের একটা hed এক্সাম আছে তার সিলেবাস টা আমি দিচ্ছি। তুমি ক্লাসে দিয়ে দেবে।” লিখতে লিখতে মিহির জিজ্ঞাসা করে,”তোমার নাম?” ” দিবা” ” এই নাও। সবাইকে দেবে। এরপর আমার যে ক্লাসটা আছে তাতে আমি পুরানো শুরু করবো।” দিবার এবারের চেষ্টাটা ব্যর্থ হল। মিহির ক্লাসে এসে বলতে শুরু করে, “তোমরা জানো আগামী সপ্তাহে তোমাদের এক্সাম। সিলেবাসও জানো।” তখন পুরো ক্লাস একসাথে বলে ওঠে, “না…” “জানো না?”
    – “না”
    – আমি তো একজনকে দিয়ে পাঠালাম। কোথায় সে?
    দিবা সাথে সাথেই দাঁড়িয়ে যায়। মিহির কিছু না বলে শুধু থাকে।
    – “ভুলে গেছি” দিবা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। মিহির হালকা ধমকের সুরে বলে, “বস”। মিহির আবার সিলেবাস টা দিয়ে দেয়।

    রাতটা খুব নীরব। যদিও পূর্ণিমা রাত ছিল তবুও কেমন একটা ছিমছিমে পরিবেশ। মিহির ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় দাঁড়ালো। “না ঘুমানো যাবে না। আজকে পুরো স্কুলটা ঘুরে দেখতে হবে।” একা একাই বলল। মিহিরের ঘরটা ৬ তালায়। মিহির ভবনগুলো ঘুরে লক্ষ্য করলো একোমোডেশন এর ক্ষেত্রে প্রত্যেক তালাই টিচার আর স্টুডেন্ট আছে শুধু ৬ ও ৭ ছাড়া। তার ইচ্ছে করলেই স্টুডেন্টদের একোমোডেশন একেবারে শেষ করে টিচারদের টা দিতে পারত কিন্তু তা করা হয়নি। করলে সিস্টেমটা আরো ভালো হতো। ঘুরতে ঘুরতে আবার ছয় তলায় এসে পরল মিহির। এবার নিজের ঘরে যাবে বলেই মনস্থির করে। কিন্তু হঠাৎ একটা ছায়া দেখতে পায় যেন কেউ তাড়াতাড়ি করে হেটে গেল। মিহির তাকে অন্ধের মত অনুসরণ করতে শুরু করে। হঠাৎই সে হারিয়ে ফেলে ছায়াটাকে। তখন চারদিকে তাকিয়ে দেখে সে এক অবরুদ্ধ জায়গায় এসে পড়েছে। সরু গলির মত একটা জায়গা। দিবার স্বপ্নে দেখা জায়গাটা শুধু স্বপ্নই ছিল না। মিহির চারদিক দেখতে দেখতে হঠাৎই একটা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল। বুঝতে পারল ছায়া মানবী আশেপাশেই কোথাও আছে। শব্দের অনুসরণ করতে করতে ধীরে ধীরে ছায়া মানব কে খুঁজে পেয়ে তার হাত চেপে ধরলো মিহির। হাত ছাড়াতে চেষ্টা করতে লাগল ছায়া মানব। মিহির তাকে টেনে থামের গায়ে ফেলল। এতে সে চিৎকার করতে গেলে তার মুখ চেপে ধরে মিহির। এতক্ষণে তারা দুজনেই স্থির। মিহির তার হাত সরালো ধীরে ধীরে। ছায়া মানবী কে দেখে চমকে যায় মিহির। “তুমি!!” মিহিরের চমক না কাটতেই নিজেকে ছাড়িয়ে পালিয়ে যায় সে। মিহির উচ্চ স্বরে বলল, “দাঁড়াও দিবা”। কিন্তু সে দাড়ালো না। পরদিন ক্লাসে ঢুকে একটা ভীড় লক্ষ্য করলো মিহির। অনেক জন এক জায়গায় জড়ো হয়ে আছে। “কি হয়েছে এখানে?” ছাত্রীরা সরে গেলে মিহির দেখে দিবা একটা বেঞ্চের উপর বসা আর তার পা থেকে রক্ত পড়ছে। একজন মিহিরকে জানায় দিবার পায়ের ওপর বেঞ্চ পড়েছে ক্লাসের মধ্যে কারোর ছুটির প্রয়োজন পড়লে তার অনুমতি দেয় তরিকুল স্যার, ভূগোল টিচার। তাই তাকে ডেকে আনা হয়। তরিকুল স্যার এসব দেখে খুব বিরক্ত হন এবং দিবার উপর রেগেও যান সমানভাবে। উপস্থিত সবাই তা বোঝে। মিহিরও বোঝে। সাথে সাথে মিহির এটাও বুঝতে পারে যে দিবা ইচ্ছে করেই নিজেকে আহত করেছে। যেহেতু তরিকুল স্যার রেগে যায় তাই দিবা কোন ওষুধ পায়না। বিকেলে দিবা, পরী আর তমা ছাদে বসে কথা বলছিল।
    -“তোমার পায়ের যা অবস্থা ওষুধ না লাগালে ইনফেকশন হবে।” চিন্তিত হয়ে বলে পরী
    -“সত্যিই এত বেশি আঘাত কেউ করে?” পরীর কথার সায় দেয় তমা।
    – “করলাম বলেইতো বাঁচলাম। ভূগোলে তো ফেল করলাম তাই বলে ওই স্যারের কাছে ধরা দিলে হবে? জানিনা তারপর কি হবে তাছাড়া…”
    আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল দিবা কিন্তু থেমে গেল মিহিরকে দেখে। মিহিরের হাতে একটা বক্স ছিল। মিহির তমা আর পরী কে উদ্দেশ্য করে বলল, “তোমরা নিচে যাও। আমি দিবার সাথে একটু কথা বলব।” তমা আর পরী নিচে চলে যায়।
    -“পায়ের কি অবস্থা?”
    -ভালো
    -ওষুধ দিয়েছো?
    – লাগবেনা
    – পা টা দাও। ওষুধ লাগাতে হবে নাহলে ইনফেকশন হবে। ব্যাথাও বাড়বে।
    -আমি লাগিয়ে নিতে পারব।
    -“নেও” ,বলে ডেটলের শিশিটা দিবা কে দিল মিহির। দিবা একটু লাগাতেই জলে উঠলো আর পারলো না। তখন মিহির ওর সামনেই বসে পড়ল তারপর পা তাই নিজেই ওষুধ লাগাতে শুরু করলো। “এত বড় একটা বেঞ্চ ফেলতে পারো আর পায়ে সামান্য ওষুধ লাগাতে পারো না।” দিবা চমকে উঠে পা সরিয়ে নিল। মিহির জানে যে সব দিবা ইচ্ছে করে করেছে। এক সরকারের ভয়ে ও নিজেকে আহত করেছে তা অন্য এক স্যার জেনে গেছে। মিহির যে অন্যদের মতোই হবে সেটাই স্বাভাবিক আর তার দরুন দিবার উপর চাপ নতুন শর্ত। আগের সপ্তাহের ভূগোল পরীক্ষায় ফেল করেছিল দিবা। তাই তরিকুল স্যার ওকে উনার ঘরে যেতে বলেছিল যেগুলো ভুল হয়েছে তা বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। দিনে ক্লাসের জন্য সময় হবে না তাই রাতে। দিবা তার উত্তরে বলেছিল যে তার লাগবেনা সে নিজেই বুঝে নিতে পারবে। তখন স্যার যা বলল তার সারাংশ এই যে যদি সে স্যারের কথা না শুনে তাহলে এই ফেলের জন্য তাকে প্রি টেস্ট পরীক্ষায় বসতে দেয়া হবে না। কিন্তু তারপর কি হবে তা দিবার জানা নেই। অনেক মেয়েই এই প্রস্তাবের সম্মুখীন হয়েছে। দিবাও এর আগে ২-৩ বার এই প্রস্তাব পেয়েছি তবে তা এড়াতে সক্ষম হয়েছে। আর এবারও তাই করল। “আমার দুইটা শর্ত আছে”। দিবা যেন এই কথাটা শোনার অপেক্ষাতেই ছিল। “কি শর্ত?” মিহির ওর মত ফার্স্ট এইড এর কাজ চালাতে চালাতে বলল, “প্রথম শর্ত কাল রাতে তুমি যেখানে গিয়েছিলে সেখানে আবার আমাকে নিয়ে যেতে হবে”। চমকে উঠলো দিবা পারলে এখনই ছুটে পালাতে সে। কিন্তু মিহির এখন দিবার পায়ে ব্যান্ডেজ বাধছে। “আমার দ্বিতীয় শর্ত তুমি কেন তোমার পায়ে বেঞ্চটা ফেলেছ সেটা আমাকে বলবে।”
    -এখানেই তো আছেন ক’দিন পর এমনিতেই সব জানতে পারবেন।
    – আমি এখনই জানতে চাই।
    – আমি বলতে পারব না
    -তুমি কিন্তু শর্ত মানছো না।
    – আমার পক্ষে সম্ভব না। বলে চলে যায় দিবা। “কেউ যদি কিছু না বলে কাজটা করব কিভাবে? দিবার দিকে নজর রাখতে হবে মেয়েটা অনেক কিছুই জানে মনে হচ্ছে।”

    রাত প্রায় তিনটা বাজে। ঘরের বাহিরে মিহির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্লুটুথ দিয়ে কারো সাথে কথা বলছে। “এত সহজ হবে না কাজটা। স্কুলটা তো ঘুরে দেখলাম কিন্তু এর আড়ালেও অনেক জায়গা আছে যা দেখা বাকি আছে। সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় অনেকটা সুবিধা হচ্ছে।” তখন এক অন্ধকার মূর্তিকে চলে যেতে দেখল মিহির। যদিও রাতটা অমাবস্যার ছিল তাও মিহিরের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ওটা দিবা ছিল। “ফোনটা রাখ আমি পরে কথা বলছি”। মিহির ফোন কেটে দিবার পিছুপিছু চলতে শুরু করে। তারা আবার অবরুদ্ধ জায়গাটায় এসে পড়ে। দিবা লক্ষ্য ই করেনি যে কেউ তাকে অনুসরণ করছিল। “বাহ আমি নিয়ে আসতে বললে পারব না অথচ একা একা ঠিকই আসা হচ্ছে।” চমকে উঠে পেছনে তাকায় দিবা।
    – আমি!!
    – হুম আমি। সেদিন বেশ বলছিলে পারবে না। এখন কি হলো?
    – “দেখুন আমি এখানে ঘুরতে আসি নি। আপনি ঐদিন এত জোরে টানলেন যে আমার পায়েলটা এখানে কোথাও পড়েছে। আমাকে খুঁজতে হবে সময় নষ্ট করতে পারব না। আপনি যান এখান থেকে।” বলে দিবা খুঁজতে শুরু করে।
    – “তুমি তোমার কাজটা করতে থাকো। একি! অন্ধকার যে কিভাবে খুজবে? এই নেও আলো।” মিহির মোবাইলে ফ্ল্যাশ অন করে দিবার হাতে দেয়। দিবাও নিয়ে নেয়। পায়েল খুঁজতে থাকে আর মিহির আশপাশটা ভালোভাবে লক্ষ্য করছে। “আচ্ছা দিবা এখানে তো আলোও ঠিকমতো আসে না বৃষ্টি তো দূরের কথা তাহলে মাটিটা ভিজা ভিজা কেন?” মাটিতে এক হাঁটু নুইয়ে বসে মাটি দেখছিল মিহির। দিবাও মাটিতে বসে খুঁজছিল। মিহিরের প্রশ্ন শুনে দাঁড়িয়ে যায় দিবা। মিহির ও দাড়িয়ে যায়। “আপনি এরকম কেন? সব সময় ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব প্রশ্ন করেন।” মিহির কি বলবে বুঝতে না পেরে দিবার দিকে তাকিয়ে থাকে। “কি হচ্ছে এখানে?” সর্বনাশের আর একটুও বাকি নেই বুঝতে পারে দিবা। কেশব স্যার ফরিদ স্যারসহ আরো কিছু স্টাফ। “দিবা, তুমি এখানে কেন? আর স্যার আপনি?….” আতঙ্কে অস্থির হয়ে ওঠে দিবা। মিহির এখনো কিছুই বোঝেনি। “আসলে স্যার উপর থেকে আমার ঘড়িটা পড়ে যায় তাই একা আসতে পারছিলাম না তাই দিবাকে.…” । দিবা বুঝতে পারলো এই অজুহাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। “আপনারা এটা ঠিক করেননি। একটু বেশি চিনে ফেলেছেন। এটা তো ভালো কথা হল না।” ওদের কথায় দিবার ভয় বেড়ে চলল। সেদিন রাতে দিবার দেখা স্বপ্ন চোখের সামনে ভেসে উঠলো। “আর কখনো হবে না। স্যার সত্যি বলছি।” “এই তোমরা ধরো স্যারকে।” কেশব স্যারের হুকুম পাওয়া মাত্র স্টাফরা দুদিক থেকে শক্ত করে ধরে মিহিরকে। দিবা এবার কাঁদতে শুরু করে। “কি করছেন এসব?” মিহির অবাক হয়ে প্রশ্ন করে। “স্যার বলছি তো আর হবে না। আমরা সত্যিই ঘড়ি খুঁজতে এসেছি। স্যার প্লিজ ছাড়ুন না ওনাকে। স্যার প্লিজ।” “খুব আকুতি দেখছি। ছাড়বো তবে শর্ত আছে শুনবে?” দিবা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, “হ্যাঁ শুনবো।”
    -তাহলে কাল রাতে চলে এসো। বাকি কথা সেখানেই হবে। কেশব স্যারের কথার মানে সবাই বুঝতে পারে। মিহির দিবার দিকে তাকিয়ে দেখে অপমানে দিবার চোখ থেকে আবার পানি পরছে। দিবাকে উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়ে মিহির বলে, “আবার কথার কি আছে ঘড়ি খুঁজতেই তো এসেছি তাহলে…”
    -আমি রাজি
    – না তুমি যাবে না।
    -“আমি যাব, যাব আমি” বলতে বলতে দৌড়ে চলে যায় দিবা।

    সকালে টিচার্স রুমে কেশব স্যার মিহিরকে বলে, “স্যার, আপনাকে ধন্যবাদ। আর কাল রাতের জন্য দুঃখিত ও।”
    – বুঝলাম। কিন্তু ধন্যবাদ কেন?
    -আরে স্যার, আপনার জন্যই তো সম্ভব হলো ওই মেয়েকে বাগে আনা। সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল তো বাঁকাতেই হয়। আপনাকে মারার ভয় না দেখালে ওই মেয়ে জীবনে রাজি হতো না। শুধুমাত্র ওই মেয়েটাই জায়গাটার খবর জানে। ওকে দমিয়ে রাখতে হবে তো।
    – কিভাবে দমাবেন?
    -কেন আজ রাতে আসছে তো! কোনো মতে একটা ভিডিও করতে পারলেই হবে। তারপর না হয় আপনার কাছেও একদিন পাঠিয়ে দেব। বেশি ডানা হয়েছে মেয়েটার কারো কথাই শোনে না। এবার ডানা ছেঁটে দেব।” বলতে বলতে চলে যায় কেশব। মিহিরের রাগ হয় নিজের উপর। দিবার কথা শুনলেই ভালো হতো। দিবা বারণ করেছিল ওই জায়গাটায় যেতে। দিবা ক্লাশে আসেনি আজ। বাইরে বের হয়নি পর্যন্ত। দিবা বিকেলে ছাদে যাচ্ছিলো, হঠাৎ হ্যাঁচকা টানে দেয়ালের উপর পড়ে যায়। যদিও বারান্দায় তবুও থামের এই আড়ালে দাড়ালে কেউ দেখতে পায় না। দিবার সামনে মিহির।
    -“আমি তোমাকে অন্য রকম ভেবেছিলাম। আলাদা। কিন্তু তুমিও সবার মত। এতো সহজে রাজি হয়ে গেলে। লড়াই করতে পারলে না হেরে গেলে।” মিহির নিজের উপরে রাগ দিবার উপরেই দেখালো।
    -“কেন ভেবেছেন আমাকে অন্যরকম? আমিও ওদের একজন। ওদের ভবিষ্যৎ যা আমারও তাই।” মিহিরকে সরিয়ে দিয়ে ঘরে চলে এলো দিবা। কিন্তু মিহিরের কথাটা ভুলতে পারল না দিবা। রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দিবার ঘরের দিকে তাকিয়ে আছে মিহির। একটু আগে ও দিবাকে কেশবের ঘরের দিকে যেতে দেখেছে। মিহির কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না এই সবকিছু। ঘরে ঢুকে যাচ্ছিল মিহির।
    -স্যার
    – তুমি!!
    – চলে এলাম।
    – কিন্তু কিভাবে?
    – ওই স্যারকে তিনটা ঘুমের ওষুধ খাওয়ালাম।
    মিহিরের বিস্ময় কাটছিলই না। দিবার মুখে হাসি আর উল্লাস প্রথম দেখলো মিহির।
    -“good, very good. কিন্তু কাল কি হবে?
    -পরে দেখা যাবে। আপনাকে thanks. আপনি না বললে বুঝতেই পারতাম না লড়াই এখনো বাকি আছে।
    – “ঘুমোতে যাও এখন।” দিবা চলে যাচ্ছিল তখন মিহিরের ডাকে আবার পিছনে ফিরে তাকালো।
    – দিবা তোমার পায়েল। মিহিরের থেকে পায়েল টা নিল দিবা। মিহিরের প্রতি এক অদ্ভুত ভালো লাগা নিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেল দিবা। পরদিন ক্লাস নিতে এসে মিহির দেখল দিবা বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে এটাই তার শাস্তি।

    একদিন বিকেলে মিহির ছাদে এসে দেখে দিবা ছাদে একা বসে আছে। মিহির পাশে গিয়ে বসে। দিবা খেয়াল করলো কিনা বোঝার জন্য দিবার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে দিবা অন্যকিছু ভাবায় মগ্ন আছে। মিহির দিবাকর হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে, “কি ভাবছো তুমি?”
    – আনসুর কথা
    – “আনসু?” জিজ্ঞাসু ভাবে বলে মিহির।
    -আপনি যেদিন আসলেন সেইদিনই ওর লাশ নিয়ে গেল।
    – দেখেছিলাম বটে। কি হয়েছিল ওর সাথে? -ও hed এক্সাম এ ফেল করেছিল তাই স্যার ওকে ঘরে ডেকেছিল কিন্তু ও যায়নি। স্যার তাতে খুব রেগে যান এবং মাঝরাতে ওকে জোর করে ঘরে নিয়ে যায়। তারপর ভোরে এম্বুলেন্স এর শব্দ।

    “খেলাটা একটু অন্যরকম ভাবে খেলতে হবে। আস্তে আস্তে, সময় নিয়ে।” ফোনে কথা বলছে মিহির। অন্যদিক থেকে জবাব আসে, “তোর প্ল্যানটা কি বলতো?” “ভালো করে শোন…”

    দিবা টেবিলে বসে অংক করছিল। তখন তমা এসে বলে, “দিবা, তাড়াতাড়ি দেখবি চল দুদক থেকে লোক এসেছে। আনসুর মৃত্যুর তদন্ত করতে।”
    – সত্যি!! চল
    দিবা আর তমা সুবিধামত একটা জায়গা করে নিল যাতে সব দেখতে পারে। সব টিচারই ওখানে উপস্থিত ছিল শুধু মিহির বাদে।
    -“রিপোর্ট এ আছে মৃত্যুটা অপুষ্টির জন্য হয়েছে কিন্তু এমনটা হলো কি করে? অপুষ্টিতো ১-২ দিনের রোগ নয়। ডাক্তার দেখাননি। প্রেসক্রিপশন কোথায়? আমরা সবটা দেখতে চাই।” দুদকের লোকেরা একের পর এক জেরা করতে থাকে। কিন্তু টিচাররা কোনো প্রশ্নেরই ঠিকমতো উত্তর দিতে পারে না। আর প্রেসক্রিপশন তো দেখাতেই পারে না কারণ আনসুর সাথে এরকম কিছু হয়নি। তাতে আস্তে আস্তে হেরে যাচ্ছিল টিচাররা আর উত্তেজনা বাড়ছিল দিবা আর তমার মধ্যে। খুশি হয়ে হাত মিলালো তারা।
    -“সব রিপোর্ট আমার কাছে।” ফাইল হাতে আগমন মিহিরের। “দেখুন, আনসুর প্রথম প্রেসক্রিপশন। তিন মাস পর আরও একটা। ওর ইমিউনিটি লেভেল ফল করছিল। তাই যখন হাই ফেভার হয় তখন ওর শরীর এন্টিবডি তৈরি করতে পারেনি। এই কাগজটা দেখুন। ডেট সার্টিফিকেট এখানে স্পষ্ট লেখা আছে।” টিচারদের মুখে এতক্ষণে জয়ের হাসি। দিবার মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। শেষে মিহির এই কাজটা করতে পারলো। দুদকের লোকেরা ভালো করে কাগজ দেখে চলে গেলো। সব টিচারের মধ্যে মিহির এখন মধ্যমণি। তার জন্যই তো রক্ষা। শুধু তাই নয়, এখানকার মেয়েদের পুষ্টিকর খাবারের জন্য মিলল নতুন অনুদান।

    “তাহলে স্টেপ ওয়ান এ আমরা সফল।” ফোনে কথা বলছি মিহির ছাদে বসে। সে এখন অনেক খুশি। অপর পাশে থেকে জবাব আসে, “ভেরি গুড। তাহলে নেক্সট প্ল্যান কী?” “প্লান তো আছেই। একটা না অনেকগুলো।” কথা বলতে বলতে মিহির পিছনে ঘুরে দেখে দিবা দাড়িয়ে আছে। “পরে কথা বলছি।” ফোন রেখে দেয় মিহির।
    -“আপনিতো খুব ফাস্ট। আসতে না আসতেই খেলায় নেমে পড়লেন। কিন্তু আপনার জানা উচিত সবকিছুরই একটা শেষ আছে। আপনারাও শেষ হবেন। আজকে আনসার মৃত্যু নিয়ে আপনারা যা করলেন একদিন আপনাদের মৃত্যু হবে ততটাই নিষ্ঠুরভাবে যতটা নিষ্ঠুর আপনারা আজকে হলেন।
    -কথায় বলে পিপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। যাদের মারতে চাও তাদের উড়তে দিতে হবে তো, এটাই তো খেলার মজা!!!

    দিবা এখন খুব কনফিউশনে আছে। কিছুতেই মিহিরকে বুঝতে পারছে না সে। দিবা আর তমা পড়ার টেবিলে বসে পড়ছে। – তমা, পরী কোথায় গেছে?
    -মিহির স্যার ঘরে ডেকেছে,সেখানে।
    -“কি!!!” অবাক হয়ে যায় দিবা।
    -হুম, আমিও গিয়েছিলাম দুদিন আগে। স্যার খুব ভালো করে পড়া বুঝিয়ে দেন। একদম বাজে কথা বলেন না আর উনার পড়ানোর সময় উনি ডিফেন্সের কথাও বলেন শুনতে খুব ভাল লাগে। পরীর মুখেও একই বর্ণনা শুনে দিবার কনফিউশন আরো বেড়ে যায়।

    দিবা বারান্দা দিয়ে যাচ্ছিল মিহিরের কথা ভাবতে ভাবতে। হঠাৎ হেচকা টানে এসে পরল বারান্দার সেই ফাঁকা স্থানে যেখানে আগেরবার মিহিরের সাথে কথা হয়েছিল। আজও সামনে আর পিছনে দেয়াল। -আজকে রাতে একবার ঘরে আসতে হবে।
    -কেন?
    -“আর হ্যা, তোমার ঘরে যার থাকে তারা ঘুমানোর পর।” আর কথা না বাড়িয়ে মিহির চলে যায়। দিবা অনেক ভাবল হঠাৎ এভাবে ডাকার কারণ কি হতে পারে। কিন্তু কিছুই মাথায় আসলো না। রাতে দরজায় হালকা নক করলো দিবা কারন সবাই এখন ঘুমাচ্ছে। রাত প্রায় একটা বাজে। ভেতর থেকে শব্দ এলো,”কে?” “দিবা” দরজা খুলল মিহির।
    -“তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম” বলতে বলতে বাইরে বের হয় সে। ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে বলে, “চলো” “কোথায়?” মিহির চলতে শুরু করে দিবা ও যায় সাথে সাথে।
    -ওই জায়গাটায়।
    – না আমি যাব না।
    – “কিছু হবে না।” আশ্বাস দেয় মিহির। “একটা নাম দেয়া উচিৎ জায়গাটার। কি নাম দেয়া যায় বলোতো? আচ্ছা, প্যানেল নামটা কেমন?”
    – আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
    -বুঝতেও হবে না। কথা বলতে বলতে এসে পড়ে ওরা। প্যানেলে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দেয় যাতে কেউ সন্দেহ না করে।
    – “আপনি কি করতে চাইছেন?”মিহির কোনো উত্তর দেয় না। দিবা শুধু অবাক হয়ে দেখতে থাকে। মিহির প্রথমে চারদিক ভাল করে দেখল তারপর পকেট থেকে রুমাল বের করে তাতে কিছু মাটি নিল। রুমালে গীট বেধে হাতে নিল। তারপর ছুটে গেল ঘরের কাছে। খুব অস্থির ছিল মিহির। যেন ভয় করছিল আর সেই ভয়ে সরাতে কাজে ব্যস্ত হয়ে পরলো। ‘এই ঘরের মধ্যে কি আছে বলতো?”
    -জানি না।
    – তলার চাবি কার কাছে থাকতে পারে? -দারোয়ান চাচার কাছে একটা বড় চাবির গোছা আছে। কিন্তু এই ঘরের চাবি আছে বলে মনে হয় না।
    -” হুম…” চিন্তিত হয়ে পড়ে মিহির।
    -কি হলো?
    – কিছু না চলো এবার যাই। বের হয়ে যায় ওরা।
    -আপনি ওই জায়গায় কি করলেন?
    – “প্যানেল” শুধরে দিল মিহির
    – “হা ওই প্যানেলে।”
    -তোমার ঘর
    – মানে?
    -“তোমার ঘরে এসে গেছে। গুডনাইট” চলে যায় মিহির।

    আজ চার দিকে রঙের ছড়াছড়ি। স্কুলের মাঠে হচ্ছে দোল উৎসব। ভীড় কমাতে বিল্ডিংয়ের ছাদেও সমান আয়োজন। সবাই সাদা পোশাকে। মিহির একটা সাদা পাঞ্জাবি পড়ে থামের উপর ভর করে দাঁড়িয়েছিল। মিহিরের মনটা আজ খুব খারাপ। পরিবার থেকে দূরে এটাই তার প্রথম দোল। বাসর সবার কথা খুব মনে পড়ছে তার। “sir” দিবার ডাকে মিহির সোজা হয়ে দাঁড়াল। “আবির লাগাবো?” “হ্যাঁ নিশ্চয়ই”। মিহিরের গায়ে কোনো আবির ছিল না দিবা ই প্রথম আবির লাগিয়ে প্রণাম করল। মিহির দিবার হাতে থাকা আবির থেকেই তাকে একটু আবির মাখালো। দিবা চলে যাচ্ছিল। কিছুদূর গিয়ে মিহিরের ডাকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মিহির দিবার কাছে গিয়ে বললো, “চোখ বন্ধ কর, একটা সারপ্রাইজ আছে”। “সারপ্রাইজ!!”
    -“চোখ বন্ধ করো না বলা পর্যন্ত খুলবে না।” দিবা চোখ বন্ধ করলো মিহির পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কাগজে মোড়ানো লাল আবির বের করে দিবার সিথিতে পরিয়ে দিল। দিবা সাথে সাথে চোখ খুলে ফেলল। তারপর নিজের সিঁথিতে হাত দিলে সিঁথির লাল রং দিবার হতেও লাগল। দিবা এমন ভাবে মিহিরের দিকে তাকালো যেন সে অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছে। হাতের আবির ফেলে দিবা দৌড়ে চলে গেল। মিহির ও ছুটতে ছুটতে এলো। সবাই দল খেলায় ব্যস্ত। তাই বিল্ডিংগুলো ফাঁকা। দিবা বাথরুমে গিয়ে পানি দিয়ে সিঁদুর মুছতে শুরু করে।
    – ধুয়ে ফেলছো? জানো সিঁদুর মুছে ফেললে কি হয়?
    – আপনি কেন করলেন এটা?
    – তোমাকে ভালোবাসি তাই।
    – ওরা যদি জানতে পারে আমাদের দু’জনকেই মেরে ফেলবে।
    – ওরা জানতে পারবে এটাই শুধু সমস্যা তো!! দাঁড়াও।
    মিহির দিবার কাছে এগিয়ে এলো। দিবার চুলে মাঝখান থেকে সিথি করা ছিল মিহির পাশ থেকে সিথী করে দিল।
    – দেখতো এবার বোঝা যায় কিনা।

    উৎসবে শেষে আবার ক্লাস শুরু। মিহির দেখল আজকে দিবা কে পাশ থেকে সিথী করায় আরো বেশী সুন্দর লাগছে। লাইব্রেরীতে দাঁড়িয়ে বই নিচ্ছিল দিবা। মিহির দিবার পাশে দাঁড়িয়ে একটা বই হাতে নিয়ে দেখতে শুরু করে। বইয়ের দিকে তাকিয়েই বলে, “দিবা”। চমকে উঠে দিবা। এতক্ষণ মিহিরকে লক্ষ্যই করেনি সে। “আজ রাতে একবার ঘরে আসতে হবে।” কথাটা বলেই বই রেখে স্বাভাবিক ভাবেই চলে যায় মিহির। রাতে মিহির ল্যাপটপে কাজ করছিলো। দরজার নক শুনেই বলে, “ভিতরে এসো”। দিবা ভিতরে এসে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। “দরজাটা বন্ধ করে দাও।” মিহির কাজ করতে করতেই বলল, “এখানে বস”। মিহির খাটেই বসে ছিল। দিবাকেও বসার জন্য খাটই দেখিয়ে দেয়।
    – তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।
    – কি কাজ?
    – “মন দিয়ে শোনো” মিহির বলতে শুরু করে। দিবা ভালো করে বুঝে নেয় তার কাজটা। কিন্তু এসব কেন করবে বুঝতে পারে না। সব শেষে দিবা যখন চলে যাচ্ছিল তখন মিহির বলে, “দিবা, তোমাকে না এভাবেই বেশি সুন্দর লাগে।”

    2 Shares
    8
    11 Comments
    • চমৎকার লেখা। অভিনন্দন তোমাকে।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 27 September 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • ভাল লেগেছে । অভিনন্দন রইল ।

    • অভিনন্দন। ভাল লাগল।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 04 July 2023 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 05 April 2024 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 15 January 2025 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Skip to toolbar