-
জিগস পদ্ধতির আলোকে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিখন নিশ্চিতকরণে শিক্ষকের ভূমিকা
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।শিক্ষা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা কেবল তথ্য সরবরাহ করে না, বরং শিক্ষার্থীদের চিন্তা-চেতনা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা এবং মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে অবস্থান করেন শিক্ষক, যিনি শিক্ষার্থীদের শিখন নিশ্চিত করার প্রধান কারিগর। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব হলো বিষয়বস্তু অনুযায়ী নির্ধারিত শিখনফল অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশ সাধন করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশলের সঠিক প্রয়োগ এবং শিক্ষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় “জিগস পদ্ধতি” একটি অত্যন্ত কার্যকর সহযোগিতামূলক শিখন কৌশল হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে।
শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার সফলতা মূলত দুটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল—শিক্ষকের সক্রিয় সহযোগিতা এবং উপযুক্ত পদ্ধতি ও কৌশলের কার্যকর প্রয়োগ। একটি বিষয় যতই জটিল হোক না কেন, সঠিক পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে তা সহজে এবং অল্প সময়ে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব। তাই শিক্ষক যদি পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে পরিকল্পিতভাবে পাঠদান করেন, তবে শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জন অনেক সহজ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে জিগস পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ এটি শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং শেখার দায়িত্ব তাদের নিজেদের মধ্যে ভাগ করে দেয়।
জিগস পদ্ধতি মূলত একটি সহযোগিতামূলক শিখন কৌশল, যেখানে একটি পাঠ বা সমস্যাকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি নির্দিষ্ট অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা প্রথমে নিজেদের অংশ নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করে এবং পরে দলগত আলোচনার মাধ্যমে অন্য সদস্যদের সাথে তা ভাগ করে। এর ফলে প্রতিটি শিক্ষার্থী একদিকে যেমন নিজ অংশে দক্ষতা অর্জন করে, অন্যদিকে অন্যদের কাছ থেকেও নতুন তথ্য শিখে। এভাবে পুরো দলটি সম্মিলিতভাবে সম্পূর্ণ বিষয়টি আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারস্পরিক নির্ভরতা, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে।
জিগস পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কেবল জ্ঞান অর্জনই করে না, বরং তাদের যোগাযোগ দক্ষতা, উপস্থাপন দক্ষতা এবং দলগত কাজের অভ্যাস গড়ে ওঠে। যখন একজন শিক্ষার্থী তার শেখা বিষয় অন্যদের সামনে উপস্থাপন করে, তখন তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং ভাষাগত দক্ষতা উন্নত হয়। একইসাথে, অন্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাদের মতামতকে মূল্যায়ন করার মাধ্যমে সামাজিক দক্ষতাও বিকশিত হয়। ফলে এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদেরকে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ শিখনের অন্যতম প্রধান শর্ত। জিগস পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা না হয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠে। তারা চিন্তা করে, আলোচনা করে, প্রশ্ন করে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করে। এই প্রক্রিয়ায় তাদের মানসিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি দলগত কাজ, উপস্থাপনা এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের দৈহিক সক্রিয়তাও বৃদ্ধি পায়। ফলে শিখন প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য।
তবে জিগস পদ্ধতির সফল প্রয়োগের জন্য শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষককে প্রথমেই বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে তা উপযুক্তভাবে ভাগ করতে হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের দল গঠন, কাজ বণ্টন, সময় নির্ধারণ এবং কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হয়। শিক্ষককে একজন গাইড বা সহায়কের ভূমিকা পালন করতে হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে শিখতে পারে। একইসাথে শিক্ষককে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, যাতে কোনো শিক্ষার্থী পিছিয়ে না পড়ে এবং সবাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।
শিক্ষক কখন কোন পদ্ধতি বা কৌশল ব্যবহার করবেন, তা নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষার্থীর স্তর এবং পাঠের প্রকৃতির উপর। জিগস পদ্ধতি সব সময় প্রযোজ্য না হলেও, এটি এমন একটি কৌশল যা শিক্ষার্থীদের সক্রিয় ও সহযোগিতামূলক শিখনে উৎসাহিত করে। তাই শ্রেণিকক্ষে বৈচিত্র্য আনতে এবং শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে বিভিন্ন পদ্ধতির সাথে জিগস পদ্ধতির সমন্বয় করা যেতে পারে।
প্রত্যেক শিক্ষার্থী আলাদা এবং তাদের শেখার গতি ও ধরনও ভিন্ন। জিগস পদ্ধতি এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করে, কারণ এতে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার নিজস্ব গতিতে নিজের অংশটি শিখতে পারে। একইসাথে দলগত আলোচনার মাধ্যমে তারা অন্যদের কাছ থেকেও শিখতে পারে। এতে করে দুর্বল শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস অর্জন করে এবং শিখনে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সাথে নতুন জ্ঞানের সংযোগ স্থাপন করলে শিখন আরও সহজ ও স্থায়ী হয়। জিগস পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং তা অন্যদের সাথে ভাগ করে। ফলে শিখন হয় অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী।
শিক্ষা কখনোই মুখস্থনির্ভর হওয়া উচিত নয়। বরং বুঝে শেখার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। জিগস পদ্ধতি শিক্ষার্থীদেরকে বুঝে শেখার সুযোগ দেয়, কারণ এখানে তারা বিষয়টি বিশ্লেষণ করে এবং নিজেদের ভাষায় অন্যদের কাছে উপস্থাপন করে। এর ফলে তাদের ধারণা পরিষ্কার হয় এবং শিখন আরও গভীর হয়।
শিখনকে স্থায়ী করতে নিয়মিত অনুশীলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিগস পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা বারবার আলোচনা, উপস্থাপনা এবং ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিষয়টি অনুশীলন করে, যা তাদের শিখনকে স্থায়ী করে তোলে। একইসাথে এটি শিখনের সঞ্চালন বা transfer of learning নিশ্চিত করে, যা বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের জন্য অপরিহার্য।
শিক্ষকের সহানুভূতিশীল আচরণ শিক্ষার্থীর শিখনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখেন এবং তাদের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস করেন, তবে শিক্ষার্থীরাও নিজেদের প্রতি আস্থা অর্জন করে। জিগস পদ্ধতির মতো সহযোগিতামূলক কৌশলে এই ইতিবাচক পরিবেশ আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা গড়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, জিগস পদ্ধতি একটি শক্তিশালী শিখন কৌশল, যা শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সহযোগিতা এবং স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করে। এটি শুধু শিখনফল অর্জনেই সহায়তা করে না, বরং শিক্ষার্থীদেরকে সামাজিক, মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উন্নত করে তোলে। তবে এই পদ্ধতির সফলতা নির্ভর করে শিক্ষকের দক্ষতা, পরিকল্পনা এবং আন্তরিকতার উপর। একজন দক্ষ শিক্ষকই পারেন জিগস পদ্ধির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষকে একটি কার্যকর, আনন্দময় এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে রূপান্তরিত করতে। তাই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় জিগস পদ্ধতির গুরুত্ব অপরিসীম এবং এর যথাযথ প্রয়োগ শিক্ষার্থীর শিখন নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।5 Comments-
-
শিক্ষার দর্শনটাকেই নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখকপ্রিয়!
জিগস পদ্ধতির সবচেয়ে সুন্দর যে দিকটি লেখক তুলে ধরেছেন তা হলো এর মানবিক মাত্রা। শিক্ষার্থী এখানে শুধু জ্ঞান গ্রহণ করে না, সে নিজেও একজন শিক্ষক হয়ে ওঠে। এই পারস্পরিক নির্ভরতার ধারণাটি আমাদের প্রচলিত “শিক্ষক বলবেন, ছাত্র শুনবেন” মানসিকতাকে একটি সুন্দর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
লেখাটি সহজ ভাষায়, যুক্তিক্রমে সাজানো এবং বাস্তব প্রয়োগযোগ্য, যা একটি ভালো শিক্ষামূলক প্রবন্ধের মূল গুণ। শিক্ষকতা পেশায় যারা আছেন তাদের জন্য এটি সত্যিই একটি কার্যকর পাঠ।
-
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe



শিক্ষকদের জন্য অবশ্য পাঠ্য