-
পৃথিবীর প্রতিটি বৃক্ষ এক একটি শব্দের মতো,
যা ভাষা গড়তে জানে অথচ নিজে নীরব এক একটি প্রাণের মতো, যা রক্তে না হলেও রসে অশ্রু-জলে না হলেও পাতার কম্পনে কাঁদে।এক একটি মানুষ,
—যারা মানুষের ভিড়ে থেকেও মানুষ নয়, যাদের জীবন বহমান নদীর মতো নয় বরং স্থবির এক জলাশয়ের —মতো যেখানে প্রতিটি ঢেউ অর্থহীন হাহাকার।এ পৃথিবী যখন শহরের অদ্ভুত মৃগয়া তার চোয়ালে সবুজকে বিদ্ধ করে, তখনও একটি গাছ
—যেমন শিমুল, তেঁতুল, কিংবা একাকী কড়ই
—জীবনের স্তব্ধ নাট্যমঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে।যেন বলে,
—আমি আছি,
—যতক্ষণ না তোমরা নিঃশেষ করে ফেলো আমার
—মূলমন্ত্র।একজন কৃষকের কথা ভাবো, যার নাম কেউ জানে না।
পদ্মা পাড়ের চরে তার খুপরি ঘর, আর তার পাঁজরের হাড় গাছের শুকনো ডাল হয়ে উঠেছে বহু আগেই, সে জানে গাছ কেমন করে বাঁচে।
—বৃষ্টি না পড়লেও শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে
— জল খুঁজে নেয়।সেই কৃষক প্রতিদিন একটি পুরাতন নিম গাছের নিচে বসে এক কাপ লবণ ছাড়া ভাত খায়,
—শুধু এ জন্যে নয় যে তা তার রুচি বরং সে জানে
—গাছের মতো মানুষও একদিন অভ্যাসে পরিপক্কতা লাভ করে বেঁচে থাকা শিখে যায়।আমরা যাদের “অসহায়” বলি,
—আসলে তারাই আমাদের সমাজের
—মৌলিক গাছপালা।আমরা কাগজে লিখি “সামাজিক বনায়ন”,
—আর তারা রোজ রোদের নিচে
— ঝলসে যায়।একটি শিশু যাকে আমরা পথশিশু বলি, একদিন ঢাকার ফুটপাতে একটি মেহগনি গাছের ছায়ায় বসে তার মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে গাছ তাকে ভালোবেসেছিল, কারণ মানুষ তাকে তাড়িয়েছিল।
—গাছগুলো যেমন দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি এই হারিয়ে ফেলা মানুষকে তাদের দেওয়া স্মৃতি কে ঘিরে
—মানুষগুলোও দাঁড়িয়ে থাকে অপেক্ষায়।কেবল তাদের ছায়া কাউকে ছুঁয়ে যায় না, তাদের ফুল কেউ গন্ধ নেয় না, কারণ তারা ফল দেয় না, নয়তো তাদের শেকড়ের গল্প কেউ বোঝে না।
আর যারা বোঝে তারা কবি হয়ে ওঠে,
—পথে বসে গাছের দিকে চেয়ে ভাবেন,
—জীবন তো এইরকমই
—শিকড়বিহীন প্রাণ নয়, শিকড়বদ্ধ যন্ত্রণার নাম।
একটি বটগাছ,
—যার বয়স চার শতাব্দী
—তার নিচে এক বৃদ্ধা নারী রোজ বসেন।তার পুত্র শহরের ব্যস্ত ট্রাফিককে নিখোঁজ,
আর তার চোখের পাতা শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ে সন্ধ্যায়।বটগাছটি তাকে চেনে, যেমন চেনে সে সেই নারীর জীবনের প্রতিটি ক্রন্দন মানুষ যেমন ইতিহাস ধারণ করতে ভুলে যায়, গাছ তা পারে।
গাছ নিজের শরীরে বয়ে রাখে শত শত শোক, শীত, শুকায়া যাওয়া সন্ধ্যার স্মৃতি।একটি পাতা ঝরার মধ্যেও কত “দুঃখগাঁথা” কবিতা লুকিয়ে থাকে, সাথে হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর।
একটি তালগাছ,
—যার মাথায় বিদ্যুৎ চলে এসেছে সে কাঁপে না,
—কারণ সে জানে, মরে যাওয়াও এক
— ধরনের প্রতিবাদ।একজন শ্রমিক,
যিনি দিন শেষে ধুলায় সেজে বাড়ি ফেরেন, জানেন না তার ঘরের উঠোনে যে লিচুগাছটা আছে,তা বছরের পর বছর তার মায়ের না বলা গল্প শুনেছে।সেই গাছও কাঁদে, শুধু কান্নার ভাষা
পাতা হয়ে ঝরে পড়ে,
—যা আমরা পরিচ্ছন্নতার নামে ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে দিই।
—আমাদের পৃথিবী এখন এমন এক সমীকরণে
—দাঁড়িয়ে, যেখানে মানুষ গাছকে মনে করে
বাতাসের মেশিন ।অথচ গাছ কেবল বাতাস দেয় না,
—সে দেয় আশ্রয়, দেয় আত্মীয়তা,দেয় নিঃশব্দে কান্নার স্বীকৃতি।একজন প্রবাসীর মতো,
—যে দূরদেশে নিজেকে পুঁতে দেয় সে জানে না আদৌ ফেরত আসতে পারবে কি না মাতৃকূলে?তারা সবসময়ই দ্বিধাদন্ডে ভুগে।গাছেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই,
—একদিন হয়তো বুলডোজারের নিচে অথবা আড়ির সাথে ঘসাঘসি তার মায়া চাপা পড়বে, যেমন সমাজ চাপা দেয় একটি মেয়ে শিশুরস্বপ্ন, একটি বয়জোষ্ঠ —মানুষের বেঁচে থাকার আগ্রহ।
গাছেরও আত্মা আছে,
এ কথা বিজ্ঞান নাও যদি মানে কিন্তু একজন প্রকৃত প্রেমিক জানে কোনো এক মধুর লগনে সে যে গাছের ছালে প্রেমিকার নাম খুঁচিত করে লিখেছিল সেই গাছ তাকে আজও চেনে।যেমন এক তেঁতুলগাছ জানে,
—সেখানে প্রতিদিন একটি বালক পড়ে কাঁদে
—যার মা-কে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারোও নেই
—চলে গিয়েছে বিধাতার ডাকে সাড়া দিয়ে আকাশপুঞ্জের তারা হয়ে ।
তবে সব গাছ একরকম নয়,
— সব মানুষও নয় মানুষের মন উননাভের জালের
— মতো এত বিভ্রান্তি এত জটিলতা,যতটুকু কাটা
—ততটুকু মুক্তি এটা এক গোলকধাঁধাঁর মতো চলতে
—চলতে হারিয়ে ফেলে দিশা,সঠিক পথ খুঁজে পাওয়া কখনো সহজ নয় দেখাও মেলে অনেক দূরত্বের ক্ষন-গননার মধ্যে ।আর শব্দগুলো?তারা যেন মানচিত্রের মতো,
—প্রতিটি রাস্তায় আলাদা গল্প,বিভিন্ন দিক থেকে
—আপন মনে হইলে কিন্তু একসাথে গিয়ে শেষ হয় অন্য এক প্রান্তরে অস্তিত্বের সাথে লড়াই এর মুখোমুখি করে ।কিন্তু কিছু গাছ বিদ্রোহী,শিকড়ে মাটিকে স্পর্শ করে ,
—যেমন বট, সেগুন তারা দাঁড়িয়ে
—থাকে মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করে তাদের দেখে আমি
—ভাবি, আমার বাবা বলেন মানুষ গাছের মতো হতে
—শেখে না বলেই মানুষের পতন কারণ গাছ মরেও রেখে যায় ভবিষ্যৎ।আজকের এই নিঃস্বতা, কেন এই নিসর্গের চুরি হয় যা মানবসমাজ-কে একাকিত্বের অতল-সাগরে তলিয়ে ফেলে, এই সমাজে কখনও কারোর খোঁজ নিলে বা কাউকে পর্যবেক্ষন করলে তার মধ্যে একাকিত্বের ছাপ থাকবে সেগুলো সমাজের লুকায়িত চিত্র।
এই প্রকৃতির রক্তপাতের স্রোতের ভেতর দাঁড়িয়ে,
—গাছ আমাদের শেখায় কীভাবে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা যায় কীভাবে নিজের ছায়া বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই মহত্ব।আর আমরা এই তথাকথিত সভ্য মানুষ,
— র্নিবিচারে গাছ কাটি গাছ কেটে কাগজ বানাই, সেই কাগজে লিখি সভ্যতার গল্প কিন্তু কাগজ কাঁদে না গাছ কাঁদত মানুষ যে তারা গাছের ব্যাথা কি বুঝে যদি বুঝতো আজও র্নিবিচারে গাছ কাটা লাগতো না |গাছ কাঁদতো না,তাহলে প্রকৃতি-কে এতো বির্পযয়ের মধ্যে সম্মুখীন হতে হতো না ।
ভালোবাসা,
এই শব্দটি কি কেবল মানব হৃদয়ের একমাত্র অভিজ্ঞান?
গাছ কি ভালোবাসতে জানে না?প্রশ্নটি হয়তো হাস্যকর মনে হতে পারে তাদের কাছে, যারা প্রেমকে কেবল চিঠির অক্ষরে কিংবা শরীরের ঊষ্ণতায় সীমাবদ্ধ ভাবে।
অথচ একটি গাছ, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একটানা দাঁড়িয়ে থাকে,
—কোনো এক হারিয়ে যাওয়া ছায়ার প্রতীক্ষায়
—কোনো এক ফেলে আসা পাতার স্মৃতিতে, যেমন
—দাঁড়িয়ে থাকে একজন বুড়ো প্রেমিক, তার প্রেয়সীর স্মৃতি ধারণ করা রুমাল হাতে, বারান্দায়, নিঃশব্দে।যে প্রেমিকা একদিন হারিয়ে যায়,
—তার চলে যাওয়ার পরেও একটি কদমগাছ অনবরত ফুল ফোটায় সে জানে না, তার সৌরভ কাকে
—ডাকছে, কাকে ভুলছে না।মানব প্রেম কখনো কখনো আত্মসমর্পণ নিয়ে আসে,
অথচ গাছের প্রেম একান্ত নিঃস্বার্থ,
—যে প্রেম ছায়া হয়ে ঝরে পড়ে, ফল হয়ে পচে যায়,
তবুও কারও জন্য ক্লান্ত হয় না,এমনকি আত্মাহুতি দিতেও দ্বিধা করে না তারা যেমন একজন মা তার সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে নিজের শেষ রুটিটুকুও বিলিয়ে দেয়।গাছের মাতৃত্ব,
—প্রতিটি ডালে দুলতে থাকা বাসার মাঝে খুঁজে পাওয়া —যায়, যে বাসায় একটি চড়ুই প্রতিদিন ফিরে আসে ক্লান্তি নিয়ে।হেই মানুষ তোমারা দু চক্ষু মেলিয়া দেখতে যদি পাও তবে দেখিতে পারিবে,
—একটি গাছ তার প্রতিটি পাতা হারিয়ে ফেলেও বসে থাকে তবুও সে বলে না, “আমি শেষ।”সে জানে, আবার পাতা আসবে আবার দিন আসবে,
—ঠিক যেমন একজন প্রেমিক, হারানোর মধ্যেও আশা পুষে রাখে, “তুমি একদিন ফিরবে” বলে।এখানে গাছ হয়ে ওঠে সবচেয়ে ধৈর্যশীল প্রেমিক,
—সবচেয়ে বিশ্বাসভরা সঙ্গী মানুষ বিশ্বাস ভাঙে, গাছ ভাঙে না।
মানুষ মুখে বলে ভালোবাসি |—গাছ কোনোদিন বলে না তবুও তার ছায়া, তার রস, তার ছুঁয়ে থাকা বাতাস সব বলে, “তুমি যদি থাকো, আমি থাকবো তুমি না থাকলেও তোমার জন্য
—থাকবো।”গভীর রাতের একাকিত্বেও গাছের পাত্রপল্লব ফিসফিস করে যেন কথা বলে বাতাসের সঙ্গে,
—যেমন একা মানুষ কথা বলে তার নিজের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে আয়নায়।
যাদের কেউ নেই, তাদের একমাত্র বন্ধু হয়ে ওঠে গাছ,
—যেমন অনাথ বালিকার একমাত্র শ্রোতা হয় আঙিনার শুকনো পাতা একাকিত্বের প্রতীক গাছ ।—সেই বালিকা ভাবে, এই গাছটি অন্তত তাকে ফেলে যাবে না।
এ এক নিঃসঙ্গতার ভাষা,
—যে ভাষায় কাঁদে গাছ আর কাঁদে মানুষ যার নীরবতা কেউ কখনও বুঝতে চাই না |—মানুষ যখন একা হয়, তখন সে ছায়া খোঁজে
—গাছ সেই ছায়া হয়ে তার কাঁধে মাথা রাখতে দেয়।
—অথচ কেউ কোনোদিন গাছের কাঁধে মাথা রাখে না।
—সেই নিঃসঙ্গতা যে স্তব্ধতা নিয়ে জন্ম নেয়, তা এক
—একটি শেকড়ের মতো সময়কে আঁকড়ে ধরে।মানবধর্ম বলে সহমর্মিতা,
করুণা,
ক্ষমা,
—এই শব্দগুলো কি আমরা গাছের মাঝে খুঁজে দেখি?না!
“কেউ তো এই ভাবধারার মাঝেও নাই
তারা শুধু বৃক্ষ নিধনের খেলায় মেতেছে।”
একটি আমগাছ, যার ফল শিশুরা পাথর ছুড়ে খায়,
সে কি কখনো প্রতিশোধ নেয়?একটি শিমুল, যার ফুল নিয়ে উৎসব হয় অথচ মূল উপেক্ষিত, সে কি ক্ষোভে তার ডাল ফেলে দেয়?
“মানবধর্ম যা শিক্ষা দেয় মৌখিক
গাছ তা পালন করে মৌনভাবে।”গাছ বিশ্বাসঘাতকতা করে না,
গাছের ছায়া-তলে যতবারই ফিরে আসা যাবে ততবারই দাঁড়িয়ে থাকবে একাকিত্বের প্রতীকি চিহ্ন হয়ে ।এমনকি গাছ-কে কেটে ফেললেও গোঁড়ায় এক নতুন চারা পাঠিয়ে দেবে—বলে, “আমি আবার ফিরব, আবার তোমার পাশে দাঁড়াব পরিবেশ-কে রক্ষা করিবো।”
এ যেন সেই প্রেমিকের মতো,
— যে দূর থেকে প্রিয়জনকে দেখে
—কিন্তু তার অস্তিত্বকে বিরক্ত না করে,
—শুধু প্রতীক্ষা করে যায়।
জীবন শেষে,
—মানুষ যেমন একা পড়ে, গাছও পড়ে তার ডাল ভেঙে পড়লে, কেউ তুলে নেয় না।—তার গায়ে আঁচড় কাটে, কেউ মলম দেয় না।
মানুষ যেমন মৃত্যুর পরে কবরে চলে যায়,
—গাছের লাশ পড়ে থাকে রোদে, বৃষ্টিতে।তবুও গাছের শরীর থেকেই আবার জন্ম নেয় আরেক জীবন।
“যেখানে মানুষের পূর্নজন্ম নেয়”সেখানে গাছ যেন
বলে ওঠে,—একাকিত্ব আমার শেষ নয়,
—আমি একাকিত্ব থেকেই জন্ম দেব নতুন কোনো গল্প।আমরা যাকে সভ্যতা বলি,
তা হয়তো আসলে গাছের শিক্ষা থেকেই জন্ম নেবার কথা ছিল।কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি কৃত্রিম আলো, কৃত্রিম প্রেম,
গাছ—
যে এখনো সত্যিকার প্রেমিক, মহান আল্লাহ তায়ালার অপরূপ সৃষ্টি , এবং নিঃসঙ্গতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।—সে আজ কত শত মানুষের সবচেয়ে অবহেলিত সঙ্গী।
একদিন মানুষ ঠিকই বুঝবে,
—গাছের ছায়াতলের শান্তি আমরা ভুলে গেছি,
—তাদের শীতলতাই ছিল প্রকৃত ভালোবাসা।
—গাছ তখন আর আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না।আরও একদিন,
সেই গাছটি, যার ছায়ায় কখনো আমাদের আবেগ মাখা ছিল,
শাখা হারিয়ে পড়ে যাবে,
আর তার ডালগুলো একে একে অবলুপ্ত হয়ে যাবে।আমরা হয়তো তাকে দুঃখের প্রতীক হিসেবে দেখব,
—একটি নিঃশেষিত প্রাণী, যে আর দাঁড়াতে পারে না।
কিন্তু বাস্তবে, সে ‘নিঃশেষ’ নয়।—তার এই মৃত্যুর মধ্যেও এক অপরিচিত সুর রয়েছে, এক রহস্যময় জীবন যা শেষ হয়ে যায় না, শুধুমাত্র —এক অন্যভাবে রূপান্তরিত হয়।
এটাই হলো প্রকৃত সত্য,
—নিঃশেষতা কোনো চিরস্থায়ী অবস্থা নয়,
—এটি কেবল অন্তরালের প্রতিফলন।একটি গাছ,
যখন তার পাতা হারায়,
—তখন তা মনে করে না যে, সে শেষ হয়ে গেছে।তার শিকড়ের মধ্যে একটি অদৃশ্য শক্তি লুকানো থাকে, যেটি জানে
—আমার অন্তরঙ্গ মৃত্যুর মধ্যে নিহিত রয়েছে
—পুনর্জন্মের অমর চক্র।
—মানুষের মতো নয়,যারা অন্তর্গত ক্ষতির মাঝে নিঃশেষ হতে যায়,
গাছ জানে,
—একদিন নতুন পাতা আসবে, কড়ি,ফুল ফল নতুন শাখা বের হবে,
মানুষ, যদিও বিশ্বাস করে
—শেষ বলে কিছু নেই,
প্রকৃতপক্ষে,—তার অন্তরে এক অব্যাখ্যিত আতঙ্ক বিরাজ করে
—তাকে বিশ্বাস করতে দেয় না নিজের শেষের সঙ্গীকে।মানুষ কখনোই সম্পূর্ণভাবে পরিপূর্ণ নয় ,
—তার মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ শূন্যতা বরাবরই
—সঞ্চালিত থাকে আর সে শূন্যতা থেকেই জন্ম নেয়
—তার দ্বন্দ্ব, তার আবেগ, তার ক্ষোভ।তাই কখনো শান্তি,
এবং তৃপ্তি ,
“মানুষ আর তার অন্তরে খুঁজে পায় না, চিরকাল ঘুরে ফিরে আসে তার অক্ষমতার পথে।”
তবে,—গাছ তার নিঃশেষতাকে আলিঙ্গন করে।
—কারণ যত বড়ই তার কষ্ট বা অবস্থা হোক না কেন, তার অস্তিত্বকোনো প্রকার সংকটের কারণে
—সংকুচিত হয় না।তার একাকিত্ব,কোনো মনের কোণে এসে স্থির হয় না |
—একটি গাছ একাকী হয়ে পরিপূর্ণ নিজের ভেতর
—এতটা শক্তি ধারণ করে, যে কোনো কিছু হারানোর
—পরও তার মধ্যে নতুন জীবন বয়ে আনে, তার
—সাথে ডাল-পালা আবারও প্রস্ফুটিত হয়।প্রকৃত জীবনের মূলেই, সঙ্গী হওয়া হলো আত্মার পূর্ণতা।
প্রেম, সম্পর্ক, অর্থ এসব বাইরে, রূপান্তরিত হয়। কিন্তু আত্মা, সে অন্তর্দৃষ্টি থেকে একে অপরকে দেখতে শিখে প্রকৃতি থেকে, গাছ থেকে, কোনো এক নীরবতার মধ্যে।তাই, এই পৃথিবীতে আমরা যা দেখছি,
তা প্রকৃত নয় এগুলো কেবলই এক সাময়িক অভিনয়। আমাদের আর কিছু প্রয়োজন নেই কেবল নিজেকে জানার প্রয়োজন, নিজে থেকেই আলো পেতে, বুঝে যেতে, সবকিছুই এক সূক্ষ্ম বৃত্তে ফিরে আসে।গাছের শাখায় ছায়া,
তার পাতায় বাতাস, তার মাটির গভীরে শিকড়এই সকলই এক অন্তর্নিহিত যোগফল।
মানুষের মতো, গাছও কখনো নিজেকে ‘নিঃশেষ’ মনে করে না সে জানে, তার প্রতিটি শ্বাসে পৃথিবী বেঁচে থাকে, প্রতিটি ধুলোর মাঝে নতুন একটি জীবন বেঁচে থাকে।নিঃশেষতা, প্রকৃতপক্ষে একটি প্রবাহ এটি কোনো শেষ নয়, বরং স্রোতের ধারায় প্রবাহিত হতে থাকা অমৃত।
—আরও একদিন, আমরা সব বুঝব গাছের নিঃশব্দ সমর্থন আমাদের প্রাণের গভীরে গেঁথে থাকে |
—এটাই প্রকৃত প্রেম, প্রকৃত একাকিত্ব যেখানে নিঃশেষিতা আর পুনর্জন্ম একই সুতায় গাঁথা।
প্রিয় জাতি! তোমরা তো জানো, এ পৃথিবী সেই অদৃশ্য বাতাসের মতো যা শুধু ঊর্ধ্বে উঠে, কখনো দেখতে পাও না তবু তা অনুভব হয় যেমন এক হাওয়ার গতি, আর তেমনি এক বিদ্যুৎ যা জানে না গন্তব্য কিন্তু তার থেমে যাওয়া নাই।
গাছের যে শিকড়,
সে তো জানে না কই পৌঁছাবে,তবে সে জানেএ মাটি, যা নষ্ট করবে না,অথবা সে অনুভব করে তাকে ভাঙবে না,কারণ তার আসল শক্তি মাটি যে মাটির প্রেরণায় সৃষ্টি।তবে,
এখনকার মানুষ, যারা পাথরের মত শক্তি খুঁজে,তারা কি জানে—মাটির মায়ায় নড়াচড়া থাকে না!বড় বড় স্বপ্নের মতো ছড়ানো আঁকা ছবি,তবে স্বপ্ন তো চিরকাল সেই আশার মতো তারা কি জানে, গাছের যেমন জীবনের গল্প থাকে,মানুষেরও এমন এক অদৃশ্য প্রেম থাকে যা কখনো কেটে যায় না, ঝরে না!
যে কৃষক,যে প্রত্যন্ত গ্রামে বেঁচে থাকে দানের স্নেহে,
তার জীবনও জানে অসহায় হওয়ার পরেও সে শিকড়ের ভেতর দেবে পূর্ণ জীবন।কিন্তু, সে কোনোদিন গাছ কাটে না,কোনোদিন একটি দুঃখের চিহ্ন পুঁতে রাখে না অন্তর্দ্বন্দ্বের মাটির ভেতর।
হে মানবজাতি! তুমি যখন দেখতে পাও,
যখন একটি গাছ,বসন্তের উষ্ণতায় এক মৃদু হাওয়ায় দুলে ওঠে,সে তখন গাছ তোমাকে জানাতে চায়,
“আমি বেঁচে আছি,তবে আমি এক দৃষ্টিতে তোমাকে শিখিয়ে যাচ্ছি,
যতবার তুমি আমার ছায়া আঁকো,
ততবার তুমি নতুন করে এক জীবন পাও।
এই মাটি, এই জল, এই আলো—
এগুলো শুধু তোমার নয়,
এগুলো সবার জন্য।
তবে, আজকের এ পৃথিবী,আজকের উন্মাদ সমাজ
খুব দ্রুত ভুলে যাচ্ছে।তারা জানে না, গাছের ঠাণ্ডা ছায়া,এক জীবনের ইশারা!
যারা ভেবেছিল পাথরের নীচে বেঁচে থাকা,তারা এখন আমাদের কাছে ফিরে আসছে,এ কেবল আমাদের শিকড়ই জানে কীভাবে আমাদের পৃথিবী গড়তে হবে।তবে তারা ভুলে যায়,যতই উঁচুতে উঠুক না কেন,
তাদের পায়ের নিচে যদি মাটি না থাকে,তবে তারা কখনো শক্ত হবে না,যেমন একটি গাছ যদি মাটির শিকড় না পায়,তবে সে কখনো দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না,তবে সে কখনো ফুল ছড়াতে পারবে না।তবে, যে গাছের শিকড়ে এমন কত শত যন্ত্রণা, কত শত রক্ত জমে থাকে,সে জানে না তার পথে মৃত্যুর ধ্বনি,কিন্তু জানে সে কখনো হারাবে না,কারণ তার বেঁচে থাকার গল্প প্রতিটি মাটির কণায় ধ্বনিত হবে।
এ পৃথিবী, যার প্রতিটি স্তরে,
আছে শান্তি এবং বিপর্যয় নিয়ে মিশ্রিত,
এ পৃথিবী, যার প্রতিটি রন্ধ্রে,
আছে এক বিরক্তি এবং ভালবাসা।কিন্তু একে অপরকে জানতে হবে প্রকৃতি, গাছ, জল, মাটি এগুলো শুধু তোমার নয়,এগুলো এক সুরে বেঁচে থাকে।
তবে আজ থেকে তুমি গাছ হয়ে দাঁড়াও,
যতই ঝড় আসুক না কেন,
তুমি জানো—এই ঝড়ের পর
নতুন পাতা আসবে,
নতুন গতি আসবে।
তুমি গাছের মতো দাঁড়াও,
প্রতিটি যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে
তুমি গড়ে তুলবে নতুন পৃথিবী,
এই পৃথিবী এক নতুন পরিচয়ে বিকশিত হবে—
তুমি যখন জীবনকে মাটির মতো আবৃত করবে,
তুমি যখন ভালোবাসাকে ছড়িয়ে দেবে,তখন শুধু গাছ নয় তখন প্রচুর শান্তি অনুভূতির সঞ্চার হবে ।“তখন মনে বিষাদ থাকবে না,
শুধু আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখো,
তিনি যিনি সব দুঃখের পরও শান্তি দেন,
তাঁর কৃপায় জীবন সুরেলা হয়ে ওঠে।কেউ তো এই ভাবধারার মাঝেও নাই,যে গাছের কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়।
যে জানে—
পাতারা ঝরে না শুধু ঋতুর ডাকে,
ঝরে অবহেলায়, বিস্মৃতির ধুলোয় ঢাকা পড়ে।
কেউ কি কখনও থেমে বলে,
—“তোমার ছায়া আমাকে একদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল?”
যেদিন রোদের ঘাম শরীর ছেঁকে নিত,
আর তুমি নীরবে হাতে ছায়া তুলে দিতে।আমরা কেবলই ছুটে চলি,
—গতি আর উচ্চতার দম্ভে আরও উঁচুতে উঠতে গিয়ে নিচের সবুজ ভুলে যাই।
আর সেই সবুজ অরন্য?—চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে,
—আকাশের দিকে তাকিয়ে,
—শিকড় ডুবে থাকে মাটির ভেতর,
—জানে, মানুষ একদিন হয়তো ফিরে আসবে,
—হয়তো তার ছায়া খুঁজবে,
—হয়তো আবার কারো একজনবলবে,
“এই গাছটা একদিন আমার মায়ের মতো ছিল মা যেমন সত্নানের জন্য অপেক্ষা করে ঠিক সেই গাছটা, যে অপেক্ষা করত।শুকনো ছায়া নিয়ে,
—ঝড়ে পড়েও দাঁড়িয়ে থাকত মায়ার প্রতীক্ষায়।
সে জানে না মানুষ ফিরে আসবে কিনা,তবুও সে ঝরে না আজও,সে নিজেকে ছায়া করে রাখে।
কারো একদিন বলা কথার আশায়
“তুমি ছিলে আমার একদিনের আশ্রয়।”
“কিন্তু মানুষ সভ্যতায় বৃক্ষের মর্যাদা করেই বা কইজন,
মর্যাদা যদি বুঝিতো, সারা দুনিয়া সবুজে ঢেকে যেত,
যে বৃক্ষ একলা দাঁড়িয়ে, শত ঝড়-তুফানে অটুট থাকে,
মানুষের সাধনায় যেমন, তার আশাও কখনো পূর্ণ হয় না তেমনি বৃক্ষেরও মুখে হাসি।আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘যতটুকু বাতাস, আমি ততটুকু স্পর্শ করতে চাই!’
তবে, সভ্যতা যদি বৃক্ষকে না জানে, তবে সে কখনো সভ্য হতে পারে না।আর যে বৃক্ষ দাঁড়িয়ে থাকে, সে তো শুধু প্রকৃতিরই নয়,
সে তো সভ্যতার পুরাণ, সমাজের বুকে নতুন আশা—
বৃক্ষের কোলেই তো প্রকৃতির মহাশক্তি।ফুল গাছ,
যাকে আমরা প্রকৃতির সৌন্দর্য বলে জানি, তার কাছে মানুষ কেবল এক ক্ষুদ্র পরিচয় একটা নাম।এক সময় গাছের শাখায় শোভিত ছিল হাজার হাজার ফুল, যা প্রকৃতির অমিত সৌন্দর্যকে প্রকাশ করত। কিন্তু আজ, সেই ফুল মানুষের হাতে চলে আসে, এবং তার সজীবতা, তার রঙিনতা, তার প্রাণ, একে একে হুমকির মুখে পড়ে।
মানুষ চায় যতটুকু ফুল, ততটুকু—
কিন্তু সে ভুলে যায় যে, ফুলের আসল সৌন্দর্য গাছের মধ্যে নিহিত গাছের শরীরে, তার শাখায় এটাই তার “প্রকৃত রূপ, তার পূর্ণতা”।কিন্তু যখন মানুষ ফুল ছিঁড়ে নেয়,
তখন সে একেবারেই ভুলে যায় যে, ফুল তার পূর্ণতা পায় গাছের শাখায় যে ফুল গাছের শাখায় ছিল, তা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তার মধ্যে ছিল গাছের জীবনদানের প্রতিফলন।ঝড়ে যখন ফুল পড়ে যায়, তখনও গাছের সঙ্গে তার এক অমোঘ সম্পর্ক থাকে, কারণ গাছ তার শাখায় সেই ফুলকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রেখেছে এবং ফুলের রঙিন পাপড়ির মধ্যে গাছের ত্যাগ ফুটে ওঠে।
মানুষ কি জানে, ফুলের সৌন্দর্যের পেছনে গাছের অগণিত ত্যাগ? গাছ তার প্রাণের অঙ্গ দিয়ে, নিজের সমস্ত রস দিয়ে ফুলকে সজীব রাখে।
কিন্তু মানুষ সেই ফুল ছিঁড়ে নেয়, কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায় অথচ ভুলে যায় যে, ফুলের এই সৌন্দর্য তার শিকড়, তার হৃদয় থেকে আসে।
ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার এই অস্থিরতা, মানুষের অব্যবহৃত চাহিদা, যে চাহিদা কখনোই শেষ হয় না।
তবে গাছ কখনো অভিশাপ করে না,
সে জানে, তার জীবন শুধু নেয় না, বরং সে সবকিছু দেয় গাছের কাছে, প্রকৃতি তার সার্বজনীন দান দিয়ে চলে এক টুকরো পৃথিবী, এক টুকরো রূপ, এক টুকরো জীবন।“বসন্ত আসে, নতুন ফুল ফুটে, নতুন শাখা গজায় এটাই তার অমল প্রার্থনা।”
তাহলে,
মানুষকে শিক্ষা দেওয়া উচিত যে প্রকৃতির সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত না করে, তা যেন সে গ্রহণ করে তার অন্তর্গত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়ে।
প্রকৃতি কখনোই তার প্রেমের গভীরতা, তার ত্যাগের শাশ্বততা বুঝতে দেয় না কারণ মানুষ শুধু নিত্য নতুন চাহিদা ও উপভোগের মাঝে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে।প্রকৃতির এই বর্ধিত নিয়ম, এই অমিত দান, একমাত্র তখনই প্রকৃত শিক্ষা লাভ করবে, যখন মানুষ জানবে যে প্রকৃতি শুধু নেয়ার নয়, বরং নিজেকে দেবার অপরিসীম ক্ষমতা রাখে।
ফুলের গাছ শিখিয়ে দেয়—
নিঃস্ব হয়ে দিয়েও কত মহৎ হওয়া যায়,
পাপড়ি ঝরিয়ে দেয় সে, সুবাস বিলায়
তবু চায় না কিছু ফেরত;
মানুষের উচিত,
তার দানশীলতা থেকে শেখা —
নিজের ভোগে নয়,
অপচয়হীন নিঃস্বর্গে হোক জীবন পরিপূর্ণ।”— একটি গাছ, বহু জীবনের গল
— শিকড়ের ভেতর রুদ্রের ক্ষতচিহ্ন
কলমে: মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি |3 Comments
Friends
Moin Uddin
@moinuddin1
মোস্তফা কামাল সাকি
@mostofakamal
উত্তম কুমার
@uttamkumarpaul75
তিতা ফুল
@nadia1
মুনতাছির আহমেদ
@moontasirahmed
Pulock Sheth
@pulocksheth
Shahadat Hossain Bhuiyan
@shahadathossainbhuiyan
Kaoser Ahmed
@kaoserahmed
Nayan Monir
@nayanmonir


আমরা গাছ কাটি কাগজ বানাতে, আর সেই কাগজে লিখি সভ্যতার গল্প! কী নিদারুণ পরিহাস!