-
নীরব চত্বরে ছায়া
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমনআন্দোলনের দামামা থেমে গেছে। পিছনে ফেলে যাওয়া সেই তীব্র উত্তেজনার রেশটুকুও আজ আর বাতাসে নেই। এখন কেবল একটিই শব্দ, যা এই বিশাল শিক্ষাঙ্গনকে গ্রাস করে আছে—সেটি হলো নীরবতা। সেই নীরবতা এতই ঘন, এতই ভারি যে মনে হয় এটি যেন কোনো শূন্যস্থান নয়, বরং একটি নতুন, অপ্রকাশিত পদার্থের মতো ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণে জমে আছে।
প্রধান ফটক থেকে শুরু করে অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোর মাঝের পথ ধরে হেঁটে গেলে পায়ের নিচে স্যান্ডেলের ঘর্ষণে সৃষ্ট যে শব্দ হয়, তা-ও যেন এই নৈঃশব্দ্যের কারণে অস্বাভাবিক জোরে কানে বাজতে থাকে। পিচ্ছিল পথে ধূলো জমে আছে বহুদিনের অব্যবহারে, যেন সময় এখানে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কিছুদিনের জন্য। আর সেই ধুলোর সঙ্গে মিশে আছে ঝরা পাতার এক গাঢ়, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ; যা একই সঙ্গে পুরনো স্মৃতি এবং বর্তমানের শূন্যতাকে মনে করিয়ে দেয়।
যেখানে এক সপ্তাহ আগেও হাজারো কণ্ঠের উন্মত্ত চিৎকার, স্লোগানের গর্জন, এবং প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতিতে আকাশ বাতাস কাঁপতো, আজ সেখানে কেবল নীরবতা। চারপাশের বিশাল অট্টালিকাগুলো যেন বোবা সাক্ষী। ক্লাসরুমের বন্ধ, কিন্তু কাঁচ ভাঙা জানালা দিয়ে ফিসফিস করে বাতাস ঢুকছে। সেই বাতাস ফাঁকা ব্ল্যাকবোর্ড, ধুলো জমা ডেস্ক আর চকহীন ডাস্টার স্পর্শ করে বেরিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু কোনো ছাত্র নেই, কোনো শিক্ষকের উপস্থিতি নেই। অডিটোরিয়ামের ভেতরে অসংখ্য লাল রঙের চেয়ারগুলো সারি সারি করে ফাঁকা পড়ে আছে। প্রতিটি চেয়ার যেন একজন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর প্রতীক, যাদের জায়গা এখন চিরকালের জন্য শূন্য। কারো পদচারণার শব্দ নেই, কোনো সাইকেলের রিংটোন নেই। শুধু একটি দূরের ঘড়ির যান্ত্রিক টিকটিক শব্দ, যা সময়ের সাথে সঙ্গে যেন একাকীত্বের সুর বাজাচ্ছে।নূরনবী প্রধান গেটের ঠিক বাইরে, পরিচিত মার্বেল পাথরের পিলারের পাশে দাঁড়ানো ছিল। তার চোখে এক অদ্ভুত ক্ষতচিহ্ন লেগে আছে—যা কেবল বাইরের চোখ দিয়ে দেখা যায় না, বরং তা হৃদয়ের গভীরতম স্তরের আঘাত। এটি কোনো সাধারণ শারীরিক আঘাত নয়, বরং আন্দোলনের চরম মুহূর্তগুলোতে দেখা কিছু দৃশ্য যা তার আত্মাকে বিদ্ধ করেছে।
সেদিন, যখন পুলিশবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো, নূরনবী অনুভব করেছিল তার বুক পকেটে হৃদপিণ্ড যেন আছড়ে পড়ছে। শব্দহীন সেই চিৎকারের স্মৃতি আজও তার কানে বাজে—চিৎকারটি তার নিজের ছিল না, ছিল তার সামনের সারিতে দাঁড়ানো এক বন্ধুর। ছুরির মতো ধারালো পুলিশের দৃষ্টি, হাতের লাঠির নির্মমতা এবং একটু দূরে মাটিতে লুটিয়ে পড়া এক বন্ধুর কাঁদা মুখ—এই দৃশ্যগুলো এখন তার কাছে ফ্যাকাশে ফটোগ্রাফের মতো, যা কখনোই স্মৃতি থেকে মোছা যাবে না।
নূরনবী নিজের বুকের ভিতরে হাত চেপে ধরল। সে ভয় অনুভব করছে, কিন্তু এই অনুভূতিটি সাধারণ ভয় নয়; এটি হলো এক ধরনের অসহায় কষ্ট। সেই কষ্ট যা আসে যখন কেউ দেখে যে সে তার সবটুকু দিয়েও একটি পবিত্র উদ্দেশ্যকে রক্ষা করতে পারেনি। একটি প্রশ্ন তার মনে বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে: এত রক্ত, এত অশ্রু কি তবে বৃথা গেল?
ক্যাম্পাসের মধ্যবিত্ত চত্বরে—যেখানে একসময় ছাত্ররা মুক্ত পাখির মতো উড়ত, হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডায় মেতে থাকত—আজ শুধু লম্বা লম্বা ছায়া। সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ছিল, তাই প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ভবন তাদের দীর্ঘায়িত ছায়া ফেলেছিল মাটিতে। প্রতিটি ছায়া যেন চিৎকার করছে, কিন্তু শব্দ নেই—তারা যেন সেই ছাত্রদের অনুপস্থিতির শোক পালন করছে।
নূরনবী দেখল মাটিতে পড়ে থাকা একটি রঙহীন ব্যাগ, হয়তো কোনো ছাত্রী তাড়াহুড়োয় ফেলে গিয়েছিল। ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়ে আছে কিছু প্রতিবাদী পোস্টার, যাদের স্লোগান এখন নীরব। আর একটু দূরে, ধূলোর মধ্যে চকচক করছে একটি জিনিস—একটিমাত্র ছুরি। কেউ হয়তো আত্মরক্ষার জন্য এনেছিল, বা ভয়ের তাড়নায় দ্রুত ফেলে দিয়েছিল। সেই ছুরিটি দেখে নূরনবীর হাতে এক দমবন্ধ করা অনুভূতি হলো। সে অনুভব করল—ভয় এখনও বাতাসে মিশে আছে, এবং এই নীরবতা কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী বিরতি মাত্র।
নূরনবী ভাবলো, এই ক্যাম্পাস এখন আমাদের স্মৃতিগুলোর বিশাল কবরস্থান। আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছি সেই কবরগুলোর ওপর দিয়ে।নূরনবী ধীরে ধীরে মধ্য চত্বরের গভীর শূন্যতার দিকে এগিয়ে চলল। প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে গিয়ে তার মনে হলো, যেন সে মাটির ওপর দিয়ে নয়, বরং সময়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে—এমন এক সময়, যা বর্তমানে স্থির কিন্তু অতীতে ভারাক্রান্ত। আন্দোলনের রেশে ক্ষতবিক্ষত এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণেই তার সহযোদ্ধাদের স্মৃতি যেন একটি অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করছে।
হঠাৎ, একটি অচেনা শীতলতা অনুভব করে সে থমকে দাঁড়াল। সূর্য আরও খানিকটা হেলে পড়েছে, তাই চারপাশের ছায়াগুলো এখন গাঢ় এবং দীর্ঘ। ভিড়ের মধ্যে থেকেও সে স্পষ্ট দেখতে পেল জাকিয়ার ছায়া, যদিও জাকিয়া বাস্তবে সেখানে ছিল না। এই ছায়াটি কেবল একটি মায়া বা দৃষ্টিভ্রম ছিল না; এটি ছিল গভীর সংযোগের ফল। জাকিয়া ছিল আন্দোলনের সময় তার পাশে, তার অবিচল হাসি ছিল কঠিনতম সময়েও তাদের অনুপ্রেরণা। আজ সেই হাসি কেবল স্মৃতি, আর বাস্তবে সে নেই।
“জাকিয়া, তুমি কি সত্যিই চলে গেছো, নাকি এই নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে আছো?” নূরনবী ফিসফিস করে ভাবলো।কেবল সেই ছায়া, নীরব কিন্তু শক্তিশালী। নূরনবী বুঝতে পারল, তার বন্ধুরা কেবল অনুপস্থিত নয়, তারা এই ক্যাম্পাসের প্রতি ইঞ্চি জায়গায় তাদের শক্তি এবং প্রতিজ্ঞা রেখে গেছে। সে এগিয়ে চলল, যেন ছায়াটি তাকে পথ দেখাচ্ছে—প্রতিটি ধাপ যেন মাটির মধ্যে হারাচ্ছে, কিন্তু এক অদৃশ্য পথে তারা আবার মিলিত হতে চলেছে।
নূরনবী একসময় তাদের প্রিয় ক্লাসরুমের দিকে এগোতে শুরু করল। করিডোরেও একই নীরবতা, কিন্তু একটি কক্ষের দিকে তাকাতেই সে একটি পরিচিত দৃশ্য দেখল: মিমির ব্যাগ। ব্যাগটি খোলা, এবং তার বইগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মিমি, যে সবসময় গুছিয়ে থাকতে ভালোবাসতো, তার ব্যাগ এভাবে পড়ে থাকাটা এক অস্বাভাবিক সংকেত।
নূরনবী বইগুলো হাতে তুলে নিল। কয়েকটি পৃষ্ঠায় কিছু লেখা, কিছু আঁকা—হয়তো শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়োয় কিছু লিখে গিয়েছিল। সে মিমিকে জানে, সে সাধারণত কোনো লেখা শেষ করে যায় না, কিন্তু এবার যেন তাকে থামানো হয়েছিল। একটি নির্দিষ্ট পৃষ্ঠায় তার দৃষ্টি আটকে গেল:
“আমরা হারব না। তারা চাইছে আমরা ভয় পাই। কিন্তু আমরা নীরব নই।”এই লাইনগুলো কোনো সাধারণ লেখা ছিল না; এটি ছিল একটি শপথ, একটি অদম্য আত্মার শেষ বার্তা। নূরনবী নিজেকে শক্ত হাতে ধরে রাখল। এই ক্যাম্পাস চত্বরে সে হয়তো একা, কিন্তু তার বন্ধুরা এই নীরবতার মধ্যেই তাদের বার্তা রেখে গেছে। প্রতিটি লিফলেট, প্রতিটি দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি, প্রতিটি ছায়ায় সে তাদের স্মৃতি আর সংকল্প খুঁজে পাচ্ছে। এই নীরবতাই তাদের যোগাযোগ মাধ্যম।
ক্যাম্পাসের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে পুরনো বট গাছটির নিচে প্রায়শই তাদের আলোচনা সভা বসতো, সেখানে একটি মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে ছিল সুমি। তার চোখ লাল, স্পষ্টতই বহু কান্নার ছাপ, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। তার নীরবতা যেন এই ক্যাম্পাসের সামগ্রিক কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
নূরনবী খুব সাবধানে তার কাছে চলে গেল। কোনো প্রশ্ন নয়, কোনো সান্ত্বনাও নয়। তারা দুজনে কেবল একে অপরের দিকে চেয়ে রইল—এক গভীর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে। এই চুপ, এই দৃষ্টির সংযোগ—হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। এটি ছিল একে অপরকে বোঝার, একে অপরের ভয়কে স্বীকার করে নেওয়ার এবং টিকে থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার একটি ভাষা।
ঠিক সেই মুহূর্তে, পিছনের গেটের দিকে একটি দ্রুত নড়াচড়া দেখা গেল। ঘাসের উপর লাফিয়ে আসে সৌরভ, যার চোখে ভয়ের চিহ্ন থাকলেও তার মুখে বিজয়ের দৃঢ়তা। সে কিছু বলল না, কেবল তার হাতে ধরা বস্তুটি দেখাল—একটি ছিন্ন-ভিন্ন পোস্টার, যা সে সম্ভবত গেটের কাছে লুকিয়ে রেখেছিল বা খুঁজে পেয়েছে।
পোস্টারে লেখা ছিল: “আমাদের মুক্তি অনিবার্য।”
নূরনবীর চোখে পানি আসে। সৌরভের এই নীরব উপস্থাপনাই যেন তাদের শক্তিকে ধরে রেখেছে। সেই ছিন্নভিন্ন পোস্টার—আন্দোলনের শেষ প্রতীক—যেন তাদের মনে করিয়ে দিল যে তারা কেবল ব্যক্তি নয়, তারা একটি ধারণা, যা সহজে ধ্বংস করা যায় না।
ছায়ার মধ্য দিয়ে তারা ধীরে ধীরে একত্রিত হতে শুরু করল। নূরনবী, সুমি এবং সৌরভ—তিনজন নীরব যোদ্ধা। প্রতিটি চত্বরে, প্রতিটি ফাঁকা জায়গায় তারা অনুভব করল তাদের বন্ধুরা এখনও অদৃশ্যভাবে উপস্থিত। তবে সবাই জানে, কোথাও কোথাও পুলিশের আতংক এখনও বাস করছে। নীরবতা কীভাবে কাটানো যাবে, তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই, কিন্তু তাদের এই সংযোগই ছিল প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। এই গভীর নীরবতা আর বিচ্ছিন্নতা তাদের নতুন করে এক হতে সাহায্য করছে।6 Comments
Friends
জিনাতুন নেছা
@zinatunnesa99
Rashed Mahamud Mithun
@rashedmithun
মো:শাহীন হাওলাদার
@hmshahin
Shrabon
@shrabon1
Smsadek__
@smsadek__
Deepro Ruhul Wahab
@deeproruhulwahab
আনিস কবির
@aniskabir
Suranjit Master
@suranjitmaster
Surjotoron সূর্যতোরণ দূরশিক্ষণ
@surjotoron



কাঁচ ভাঙা জানালা দিয়ে ফিসফিস করে বাতাস ঢোকা আর মাটির ধূলোয় চকচক করা সেই পরিত্যক্ত ছুরির রূপক—পুরো গল্পে আতঙ্কের আর শূন্যতার এক অনন্যসাধারন গথিক আবহ তৈরি করেছে। আপনার লেখার অপেক্ষায় থাকবো।