-
আড়ালের ছায়া (ক্রাইম থ্রিলার)
“দুই”
রাফির ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে পুলিশ। চারপাশ কেমন যেন থমথমে। কোন সাড়া-শব্দ নেই। দুইতলার করিডোরে মোট দুইটা ফ্ল্যাট। অপর পাশের ফ্লাটের দরোজা খোলা। ভেতর থেকে একজন মহিলার কৌতুহলী মুখ উঁকি দিচ্ছে।প্যাসেজ জুরে নরম আলো ছড়িয়ে আছে। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী মুখে ২এ ফ্লাটের দিকে তাকিয়ে আছে কিছু মানুষ। তাদের চোখেও একি জিজ্ঞাসা, রাফি কোথায়?
রাফি ছেলেটা এই ২এ ফ্ল্যাটের একমাত্র বাসিন্দা। সেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। শান্ত, চুপচাপ স্বভাবের ছেলে। কারো সঙ্গে অযথা কথা বলে না। তেমন মেশেও না। নিজের মত থাকে। মাঝে মাঝে তার বাবা-মা আসে গ্রামের বাড়ি থেকে। ক’দিন থেকে আবার চলেও যায়। কারো বাসাতেই তাদের কিংবা রাফির যাওয়া-আসা নেই। পুরোই নির্বিবাদি চরিত্র। কিন্তু আজ কপাল দোষে তারই নাম জড়িয়ে গেছে খুনের মতো একটা জটিল ঘটনায়।
ইন্সপেক্টর শামীম দরজায় কড়া নাড়লেন। কোনো সাড়া পেলেন না। আবার ঠুক ঠুক করে দরজায় ধাক্কা দিলেন। ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ নেই।
দারোয়ান ইউনুস বলল, “স্যার, ও তো দুপুরের একটু আগেই আইছিল। আমি দেখি সিঁড়ির ধারে দাঁড়ায়া ফোনে কথা কইতেছিল। তারপর দেখি সিঁড়ি ধইরা উপরে উইঠা গেল। আবার কতক্ষণ পরেই বের হয়া গেল। আমি ভাবছিলাম হইতো ক্লাসে গেছে।”
শামীম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “এই ফ্লাটের ডুপ্লিকেট চাবি আছে?”
“ও তো সবসময় তালা মাইরা যায়। আরেকটা থাকলে হেইডা মনে হয় হের বাবা-মা’ইর কাছে আছে।” দাড়োয়ান ইউনুস উত্তর দেয়।
শামীম সাহেব পকেট থেকে মোবাইল বের করে বললেন। “আইসোটেক টিমরে খবর দাও। দরজার তালা খুলতে হবে।”
আইসোটেক টিম এল আধা ঘণ্টার মধ্যে। তারা প্রথমে দরজার হ্যান্ডল স্ক্যান করল। সেখানে একটা ফিঙ্গারপ্রিন্ট থাকার প্রমাণ পাওয়া গেল। তবে সেটা রাফির কিনা, বুঝা গেল না। সেটা জানতে হলে আগে অবশ্যই ওকে পেতে হবে।
তিন তলা থেকে বাড়িওয়ালাকে ডেকে আনা হলো। পুলিশ এসেছে শুনে নিজের ঘরে ভয়ে সেধিয়ে ছিলেন তিনি। তার অনুমতি নিয়ে ২এ ফ্লাটের দরজা খোলা হলো। ঘরের ভেতরে পরিবেশ আর সব ব্যাচেলর ছেলের রুমের মতোই। টেবিলে পড়ে আছে খোলা ল্যাপটপ, বিছানায় ছড়ানো জামা কাপড়, সাইড টেবিলে আধ খাওয়া পানির প্লাস্টিক বোতল।
তবে একটা জিনিস নজর কাড়লো ইনস্পেক্টরের । টেবিলের নিচে সযত্নে রাখা একটা গোল কৌটো। কৌটোটা গোল কিছুটা চ্যাপ্টা, মেয়েদের অর্ণামেন্টস রাখার বাক্সের মত। খুলে দেখা গেল ভেতরে একটা মেয়েলি চুড়ি! লাল রঙের ছোট চুড়ি।
ইনস্পেক্টর চুড়িটা হাতে নিয়ে বললেন, “এইটা কার? রাফির হবে না, এটা তো শিউর।”
সাথে সাথে সায়মা রহমান, যিনি এরই মধ্যে নিচ থেকে চলে এসেছেন, বললেন, “এইটা… এইটা তো লিনার চুড়ি! ওর এক জোড়া ছিল। একটা বেশ কিছুদিন হলো হারিয়ে গেছে। আরেকটা এখনো ওর হাতেই আছে!”
শামীম সাহেব চুপ করে গেলেন। লিনার চুড়ি কেন রাফির কাছে থাকবে ! যেখানে সবাই বলছে যে তার সঙ্গে লিনার কোনো সম্পর্ক ছিল না?
এর তার সাথে কথা বলে জানা গেল, রাফি কিছুদিন আগে হোস্টেলে থাকলেও গত এক সপ্তাহ ধরে টানা এই ফ্ল্যাটেই ছিল। আর আজকের দিন দুপুর ১২টার সময় অর্থাৎ লিনা খুন হবার সময় সে বাসায়ই ছিল।
২এ ফ্ল্যাটের উল্টোদিকে ২বি ফ্লাটে থাকেন সোহেল ভাই ও রুখসানা ভাবী দম্পত্তি। সোহেল ভাই এখনো অফিসে। বাসায় আছেন তার স্ত্রী রোকসানা ভাবী। তার দরোজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন এখন। তিনি বললেন, “ছেলেটা মোটামুটি ভদ্রই। তবে গত এক সপ্তাহ ধইরা দেখি একটু বেশীই বাইরে ঘোরাঘুরি করছে। খালি বাইরে যায় আবার ফিরেও আসে। সবসময় কানে এয়ার ফোন থাকে। কারো সাথে যেন কথা বলে আর বারান্দায় হাঁটে। মাঝে মাঝে দরজা বন্ধ করে জোরে গান চালায়। কেমন যেন একটু অস্থির।”
নীচতলার লিনাদের পাশের বাসার ভাড়াটে মহিলা বললেন, “ও মাঝে মাঝে লিনাদের দরজার সামনে দাঁড়ায়া থাকে, যেন ওদের জন্যই অপেক্ষা করছে। কিন্তু, সায়মা ভাবি বা লিনাকে দেখা মাত্রই সরে যায়। আমি একদিন জিজ্ঞেস করছি তুমি কি কাউরে খুঁজতেছ? সে হেসে বলছে — ‘না, এমনি’। আমি ভাবছি ওরা দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা নয়তো।”
ইন্সপেক্টর ভাবনায় পড়ে গেলেন। রাফি তাহলে লিনার প্রতি আগ্রহী ছিল। তবে সেটা লিনা জানত কি না, সেটা বুঝা যায়নি এখনো।
ইতিমধ্যে লিনার ফোনটা পুলিশ হেফাজতে নিয়ে গেছে। ফোন আনলক করে দেখা গেল, কললিস্টে শেষ কল এসেছে সকাল ১০টা ১৮ মিনিটে।
কিন্তু যে নাম্বার থেকে কলটা এসেছে ওটা কোনো নামে সেভ করা নেই। কেবল একটা নম্বর যেটার শুরু “01730…”।ওই নাম্বারে কল ব্যাক করতেই ফোন বন্ধ পাওয়া গেল। মোবাইল সার্ভিস কোম্পানির অপারেরটরের সাথে যোগাযোগ করে জানা গেল নাম্বারটা
রাফি হাসান নামে রেজিস্টার্ড করা ।শামীম সাহেব এক ঝটকা খেলেন। “তার মানে? রাফি লিনাকে ফোন করছিল? তাও কিনা খুনের ঠিক আগে?”
ঠিক তখন, রাফির বিছানার নিচ থেকে আরেকটা জিনিস বের করে আনলেন আইসোটেক টিমের এক সদস্য। একটা ছোট্ট ডায়রি।
ডায়রির ভেতরের পাতা উল্টাতেই ইনস্পেক্টরের মুখ কেঁপে উঠল। ভেতরের পাতায় খসখসে হাতে লেখা, “ও আমাকে দেখেও দেখেনা। অথচ আমি ওকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছি।”
আরেক পাতায় লিখা, “ ও যদি আমার নাই হবে। তবে কখনোই আর কারো হবে না।”
আইসোটেক টিমের এক সদস্য নিশ্চিত করে বললো, শেষের লেখাটা লিখা হয়েছে আজ সকালেই।
(চলবে)4 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন
ডিজাইনার
স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
Friends
জুলহাজ আলী জীবন
@julhaj
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
পিপীলিকা
@abujubair
কাশফিয়া নাহিয়ান
@kashfianahian
জিসান মাহমুদুল হাসান
@mxesun
Md fujal Hossen
@mdfujalhossen
shewly khatun
@shewlykhatun
আরাফাত আল মেহেদী
@arafat76
Hossain Muhammad Anwar
@hossainmuhammadanwar

দুর্দান্ত মনস্তাত্ত্বিক বিল্ড-আপ! সকাল ১০:১৮-র সেই শেষ ফোন কলটাই রাফিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল। তবে থ্রিলারের নিয়ম অনুযায়ী, এত সহজে যাকে খুনি মনে হয়, আসল খুনি হয়তো তার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে। শামীম সাহেব এই জট কীভাবে খোলেন, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি!