Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    1 month ago

    চতুর্থ স্তম্ভ

    একটি চিলতে রোদ এসে পড়েছে বসার ঘরের দেয়ালে। বাবা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে কাঠের সোফাটার কুশনগুলো ঠিক করছিলেন, আর মা রান্নাঘর থেকে এসে বারবার বলছিলেন, “ফারাহ, ঘরের কোণের ওই নীল ফুলদানিটা কি একটু বাঁকা লাগছে? আরেকটু ডান দিকে সরালে ভালো হতো না?”

    ​মা-বাবার এই মিষ্টি অস্থিরতা সকাল থেকেই চলছে। পাত্রপক্ষ আসবে আমাকে দেখতে। আমাদের তিনজনের ছোট্ট, ছিমছাম পরিবার। ঘরের প্রতিটি ধূলিকণা আমরা নিজেদের হাতে গুছিয়ে রাখি। কিন্তু আজ যেন কোনো গোছানোই মনঃপূত হচ্ছিল না। বাবা একটা ডিজাইন ভাবলে মা বলেন কালার জমেনি, মা একটা পর্দা টাঙালে বাবা বলেন একটু খাটো লাগছে। সিনেমা-নাটকে কনে দেখার কত দৃশ্যই তো দেখেছি, কিন্তু নিজের ঘরের চৌকাঠে যখন সেই মুহূর্তটা এসে দাঁড়ায়, তখন চেনা ঘরটাও কেমন অচেনা ঠেকে। ভুল হওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই।

    ​ঠিক এমন সময় একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলো। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা মার্জিত, খানিকটা কৌতুকী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “আচ্ছা, আপনাদের বাসায় অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্তটা কার ছিল? ঘরোয়া আয়োজন হলে পারিবারিক আমেজ থাকে ঠিকই, কিন্তু ঘর সাজাতে তো অনেক খাটুনি। আমি কি এসে একটু সাহায্য করব?”
    ​আমি হকচকিয়ে গেলাম। পাত্রপক্ষের ছেলেটি নিজেই ফোন করেছে, অথচ কোনো আনুষ্ঠানিক গাম্ভীর্য নেই! কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই বললাম, “হ্যাঁ… চলে আসতে পারেন।”

    ​বাবা আড়ি পেতে শুনছিলেন। ফোন রাখতেই চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে হেসে বললেন, “বেশ ভালো হলো। ছেলেটি আগেই আমাদের জীবনযাত্রা দেখতে পাবে। কনে দেখার ওই আধা ঘণ্টার কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতায় কি আর একটা পরিবারকে চেনা যায়? ও আসুক।”

    ​ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ছেলেটি চলে এলো, একা নয়, সঙ্গে তার দুই বন্ধু। বসার ঘরে ঢুকেই সে মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল, যেন এ বাড়িরই কোনো ছেলে বহু বছর পর বাড়ি ফিরেছে। কোনো জড়তা নেই, কোনো আড়ষ্টতা নেই।
    ​মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরের আবহাওয়া বদলে গেল। ছেলেটি জিন্সের হাতা গুটিয়ে বাবার সঙ্গে সোফা সরাতে লেগে গেল। ওর এক বন্ধু ড্রেইপস ঠিক করতে মইয়ে চড়ল, আর সে নিজে মায়ের সঙ্গে ডাইনিং টেবিলের ম্যাটগুলোর কালার কম্বিনেশন মেলাতে বসল। মা যে বলছিলেন কালার ঠিক হয়নি, ছেলেটি চট করে বলল, “খালাম্মা, এই অফ-হোয়াইট পর্দার সাথে আপনার ওই মেরুন কুশনগুলো দারুণ খুলবে।” মা তো হবু জামাইয়ের নান্দনিক বোধ দেখে গদগদ!

    ​দুপুরের মধ্যে খাবার মেন্যু নিয়ে যে দোলাচল ছিল, তাও ও এক তুড়িতে সমাধান করে দিল। নিজেই ফোন করে শহরের নামী এক রেস্তোরাঁ থেকে ঐতিহ্যবাহী আর হালকা কিছু খাবারের অর্ডার দিয়ে দিল, যা বয়স্ক-তরুণ সবার মুখে রুচবে।
    ​বিকেলের দিকে যখন বসার ঘরটা পুরোপুরি তৈরি, তখন চারপাশটায় একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা নেমে এসেছে। দেয়ালের ল্যাম্পশেডের আলোয় ঘরটাকে ঠিক আমাদের মনের মতো চেনা, অথচ একদম নতুন লাগছিল। মা চা করে এনে ওদের দিলেন। বাবা সোফায় হেলান দিয়ে পরম তৃপ্তিতে ছেলেটির পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন।

    ​আমি দরজার আড়াল থেকে দেখছিলাম। যে মানুষটিকে আজ ‘পরীক্ষক’ হয়ে আসার কথা ছিল, সে নিজেই কখন যেন আমাদের এই তিনজনের সংসারে এসে চতুর্থ স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রথাগত কনে দেখার যে ভয় আর সংকোচ আমাকে সকাল থেকে চেপে ধরেছিল, তা কখন যে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে, টের canও পাইনি।
    ​সন্ধ্যায় ওর বাবা-মা আসার সময় হয়ে এলো। ছেলেটি বন্ধুদের নিয়ে চটপট গাড়িতে গিয়ে বসল, একটু পরেই সে আবার আসবে—তবে এবার পাত্র হিসেবে, বাইরের অতিথি হয়ে।

    ​গাড়িটা স্টার্ট নেওয়ার শব্দ হতেই মা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। বাবার মুখে এক চিলতে চওড়া হাসি। কনে দেখার মূল পর্বটা তো এখনো শুরুই হয়নি, অথচ আমার মনে হলো, গল্পটা বোধহয় তার আগেই সুন্দর এক সমাপ্তির দিকে মোড় নিয়ে নিয়েছে। অথবা, একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু?

    6
    5 Comments
Skip to toolbar