-
গুমরাতের শেষ সাক্ষী
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমনরাতের আকাশ ছিল অন্ধকারে জড়ানো, যেন তার কোনো সীমা নেই। শহরের আলো দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিল, কিন্তু সেই আলোও নিঃশব্দ, নিঃশেষ। এমন রাতে, যখন শহরের প্রায় সব মানুষ ঘুমোয়, তখন একা একা রাস্তায় হাঁটা পথিকেরা প্রায়ই নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলে। আর সেই ছায়ার সঙ্গে কথা বলা কেউ শুনে না, কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য চোখ সব দেখছে।
নূরানী, এক তরুণী, একেবারেই সাধারণ জীবনের মানুষ। তবে আজকের রাতটা তার জন্য ছিল অস্বাভাবিক। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সে হঠাৎ অনুভব করল রাত যেন তার চারপাশে অদৃশ্যভাবে ঘনিয়ে আসছে। গাছের ছায়া তার উপর নেমে এল, রাস্তার বাতিগুলো যেন আরও দূরে সরে গেল। তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল না, কিন্তু মনে হচ্ছিল কেউ তার পেছনে আছে।
একটি গলিতে ঢুকতেই সে দেখল, একটি পুরনো ঘর। ঘরের জানালা থেকে আলো ফেটে আসছে না, কিন্তু ভেতরের অন্ধকারে যেন কেউ তাকিয়ে আছে। নূরানী স্থির হয়ে দাঁড়াল। হৃদয় দ্রুত ধড়ধড় করছিল, কিন্তু কৌতূহল তাকে দূরে যাওয়ায় বাধা দিল।
“কে আছে সেখানে?” সে ধীরে ধীরে বলল। কোনো উত্তর এল না। কিন্তু অদৃশ্য চোখগুলো তার প্রতি নজর রেখেছে তাকে দেখছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না।
গলির শেষে পৌঁছে নূরানী বুঝতে পারল, শহরের এই নিঃশব্দ রাতে কেউ তার গল্প শুনছে। সে নিজেও অবাক হয়েছিল কেন রাতের এই নিঃশব্দে তাকে কেউ খুঁজে বের করল। এই অনুভূতি একধরনের অদ্ভুত এক শান্তি এনে দিল, যা তার কখনও আগে অনুভূত হয়নি।
নূরানীর মতো শহরে অনেক মানুষ রাতের নিঃশব্দে একাকী হয়। কেউ তার একাকীত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে, কেউ স্মৃতির সঙ্গে। কিন্তু এই রাতের সাক্ষী—যে গুম হয়ে যাওয়া রাতের একমাত্র জীবন্ত চোখ সব কিছুই দেখছে। সে শুধু দেখেই থেমে থাকে না; রাতকে অনুভব করে, রাতকে নিজের করে নেয়।
নূরানী অজান্তে সেই সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগ করছিল। তার চোখের কোণে কিছু অদ্ভুত ছায়া নাচছে। মনে হচ্ছিল, যদি সে একটু সাহস দেখায়, সে অদৃশ্য চোখের রহস্যের সঙ্গে মিলিত হতে পারবে।
হঠাৎ, একটি হাওয়া বয়ে এলো। গাছের পাতার শব্দ, দূরের কুকুরের ঘেউ ঘেউ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করল। নূরানী বুঝতে পারল, সে কেবল এই রাতে একা নয়। কেউ, কিছু, বা এমনকি রাতের নিজস্ব এক চেতনা তাকে দেখছে, শোনছে।
তার পথ চলা আরও গভীরে প্রবেশ করল। গলির মোড়ে হঠাৎ একটি ছোট ছায়াময় বারান্দা দেখা গেল। বারান্দার নিচে একটি পুরনো বেঞ্চ। বেঞ্চে বসে থাকা মানুষগুলো নিঃশব্দে চেয়ে থাকে। কিন্তু আজ সেখানে কোনো মানুষ নেই শুধু শীতল বাতাস আর কিছু অদৃশ্য উপস্থিতি। নূরানী অনুভব করল, এই রাতের সাক্ষী তার চারপাশে ঘিরে আছে।
সে ধীরে ধীরে বসল। মনে হচ্ছিল, এই নিঃশব্দ রাতের মধ্যে সে তার সব ভয়, তার সব কষ্ট, তার সমস্ত অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবে। কিন্তু কোন শব্দ বের হয়নি শুধু নিঃশব্দ। নিঃশব্দ সেই শক্তি যা মানুষকে কখনও ভয় দেয়, কখনও শান্তি দেয়।
একটা মুহূর্তে নূরানী নিজেকে হারাতে বসেছিল। কিন্তু সেই সময়েই সে বুঝল এই রাতের সাক্ষী কেবল দেখছে না, সে বাঁচতে চায়। বাঁচার ইচ্ছা এমন এক শক্তি যা রাতের আঁধারেও জীবন্ত।
নূরানী নিজের বুকের ভেতর সেই শক্তি অনুভব করল। তার জীবনের ছোট ছোট ঘটনা ভালোবাসা, দুঃখ, হাসি, কান্না সব কিছু যেন একসাথে তার সামনে চলে এল। সেই অভিজ্ঞতা তাকে বলল, রাত কখনও শেষ হয় না; রাতের গভীরে সঠিক চোখ থাকলেই সব কিছু জীবন্ত থাকে।
সেই অদৃশ্য চোখ নূরানীর দিকে আরও ঘনিষ্ঠ হলো। মনে হলো, এটি শুধু একজন সাক্ষী নয়, বরং সেই নিঃশব্দ রাতের প্রতিফলন, যা জীবনের এক অদ্ভুত বাস্তবতা জানাচ্ছে। নূরানী হঠাৎ অনুভব করল, এই সাক্ষী তার নিজের জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে।
রাত আরও গভীরে ঢুকে গেছে। শহরের সব শব্দ ধীরে ধীরে মরে গেছে। কেবল নিঃশব্দ এবং নিঃশব্দের সঙ্গে তার হৃদয়ের স্পন্দন বাকি। নূরানী বুঝতে পারল, এই নিঃশব্দে তার জীবন এবং এই রাতের সাক্ষীর জীবন একাকার হয়ে গেছে।
নূরানী কিছুটা ভয় পেলেও, তার ভয় আর ভাঙতে পারল না। কারণ সে বুঝেছে এই গুমরাতের শেষ সাক্ষী শুধু দেখছে না, বাঁচার চেষ্টা করছে। আর বাঁচার চেষ্টা করলেই, নিঃশব্দ রাতের মধ্যে নতুন এক জীবন খুঁজে পাওয়া যায়।
8 Comments
Friends
ফারহান সীমান্ত
@melbetkhan
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
জে এস এম অনিক
@00anik
জিনাতুন নেছা
@zinatunnesa99
Rashed Mahamud Mithun
@rashedmithun
মো:শাহীন হাওলাদার
@hmshahin
Shrabon
@shrabon1
Smsadek__
@smsadek__
Deepro Ruhul Wahab
@deeproruhulwahab



গুমরাতের এই শেষ সাক্ষী যেন আমাদের প্রত্যেকের ভেতরের একাকীত্বেরই প্রতিচ্ছবি। খুব সুন্দর লিখেছেন।