Profile Photo

AlockOffline

  • alock
  • শৈলীর প্রেমের আত্মকাহিনী
    ✍️ (পঞ্চম পর্ব)
    কিছুদিন পরেই রবিনের এস.এস.সি পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। পরীক্ষার ঠিক আগের দিন বিকেলে রবিন তার এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে শৈলীদের বাড়ি গেল—উদ্দেশ্য পরীক্ষার জন্য বড়দের দোয়া নেওয়া। তবে মনের গহীনে উদ্দেশ্য যে অন্য কিছু ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না; এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের মতোই অনেকটা! শৈলীদের বাড়ি যাওয়ার অবশ্য আরও একটি সহজ উছিলা ছিল—রবিনের সেই বন্ধুটি ছিল শৈলীদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আর এদিকে রবিন ও শৈলীর এই নতুন প্রেমের সূচনা তখন পর্যন্ত শৈলীর মা আর বড় বোন ছাড়া পরিবারের অন্য কেউ, বিশেষ করে তার ভাইয়েরা জানত না।

    ঠিক সেই পড়ন্ত বিকেলে শৈলীও স্কুল থেকে বাড়ি ফিরল। রবিন যখন তার মায়ের সাথে কথা বলছিল, তখন বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যার উপক্রম। এমন সময় শৈলী কোনো কথা না বলে একদম চুপচাপ ঘরের দরজার পাশে, বাইরের উঠোনে কুমড়ো আর শসার বীজ রোপণ করতে এলো। নিভৃতে কাজ শেষ করে সে আবার নীরবেই ঘরে চলে গেল।

    মিনিট তিনেক পর তার মা ঘর থেকে ডেকে বললেন, “কিরে শৈলী! তুই রবিনদের সালাম করবি না? শুভ কাজের আগে বড়দের সালাম করে দোয়া নিতে হয়।”

    মায়ের কথা শেষ হতে না হতেই শৈলী ঘর থেকে প্রায় দৌড়ে এলো। আচমকা রবিনের পা ছুঁয়ে কদমবুসি করেই আবার এক দৌড়ে ভেতরের ঘরে নিখোঁজ! আকস্মিক এই কাণ্ড দেখে রবিন ভীষণ ইতস্তত বোধ করতে লাগল। তার এই অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে শৈলীর মা এবং বড় বোন হেসেই ফেললেন। তারা বলেই বসলেন, “কেউ সালাম করলে তার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতে হয়, রবিন।”

    সত্যি বলতে, এভাবে হঠাৎ কেউ কদমবুসি করলে কী করতে হয় বা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়, তা রবিনের একদমই জানা ছিল না। তাছাড়া সবার সামনে আমতা আমতা করতে গিয়ে যদি তাদের এই নতুন সম্পর্কের কথা প্রকাশ পেয়ে যায়—সেই ভয়ে তার বুক দুরুদুরু করছিল। অবশেষে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যে যার বাড়ি ফিরে এলো। এবার সব ভাবনার ইতি টেনে শুধু পড়ার টেবিলে বসার পালা, কারণ পরদিনই জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা।

    চারদিকে তখন পরীক্ষার তীব্র চাপ—বই, খাতা আর রাত জেগে চূড়ান্ত প্রস্তুতির ব্যস্ততা। ক্লাসের টপ ছাত্র হওয়ায় রবিনের ওপর সবার প্রত্যাশাও ছিল আকাশচুম্বী। তবে এত ব্যস্ততা আর পড়ার চাপের মাঝেও, তার মনের একটা বড় অংশ জুড়ে সারাক্ষণ মায়াবী এক আলোড়ন তুলে যাচ্ছিল শৈলী এবং সেই কদমবুসি করার চঞ্চল দৃশ্যটি।

    মাঝে মাঝে বইয়ের পাতা খুললেই চোখের সামনে ভেসে উঠত সেই আমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা শৈলীর মুখ। তার সেই বিদায়বেলার শেষ চাহনি—যে চাহনিতে লুকিয়ে ছিল না-বলা হাজারো আকুলতা।

    রবিন নিজের অবুঝ মনকে বোঝানোর চেষ্টা করত—

    “এখন নয়, আগে পরীক্ষা ভালো করে দিতে হবে। সবকিছুরই একটা নির্দিষ্ট সময় আছে।”

    তবুও মন কি আর সবসময় সব যুক্তি মানতে চায়?

    অন্যদিকে, শৈলীও কিন্তু দূর থেকে চুপচাপ রবিনের খবর রাখত। সরাসরি কথা বলার সুযোগ না থাকলেও, তাদের কমন বন্ধু নীরার মাধ্যমে সে প্রায়ই খোঁজ নিত—

    “রবিন কেমন পড়াশোনা করছে?”

    “ও ঠিকঠাক আছে তো?”

    অবশেষে এলো সেই পরীক্ষার প্রথম দিন। পরীক্ষার হলের গেটে ঢোকার মুহূর্তে হঠাৎ করেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। ভিড়ের মাঝে কোনো কথা হলো না ঠিকই, তবে শৈলী খুব মৃদু ঠোঁট নাড়িয়ে আস্তে করে বলল, “ভালো করে পরীক্ষা দিও।”

    রবিনও প্রত্যুত্তরে আলতো মাথা নেড়ে একটা মৃদু হাসি উপহার দিল। এই যৎসামান্য শুভকামনাটুকুই যেন রবিনের ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তির জোগান দিল।

    প্রথম দিনের পরীক্ষা শেষ হতেই একঝাঁক বন্ধুবান্ধবসহ রবিনের সাইকেলের বহরটি এসে থামল শৈলীদের বাড়ির নিচে। শৈলীর মা যেন আগে থেকেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। রবিনকে দেখেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন পরীক্ষা কেমন হয়েছে।

    সেই সুবর্ণ সুযোগটা হাতছাড়া না করে রবিন কথা বলতে বলতে একেবারে তাদের মূল ঘরে গিয়ে প্রবেশ করল। তার সাথে সেই পরীক্ষার্থী বন্ধুটিও ছিল। তখন শৈলীর ভাই ঘরে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিল, সেও এবার এস.এস.সি পরীক্ষা দিচ্ছিল। শৈলীর বড় বোন আর মায়ের আন্তরিক জবরদস্তিতে রবিন আর তার বন্ধুটিকেও সেদিন তার ভাইয়ের সাথে খেতে বসতে হলো।

    এদিকে শৈলী তখন পাশের রুমে শুয়ে শুয়ে সব খেয়াল করছিল। হয়তো একফালি জানালার পর্দার আড়াল থেকে চাতক পাখির মতো দেখছিল তার প্রিয় মুখটি। খাওয়া-দাওয়া শেষে রবিনরা বিদায় নিয়ে বাড়ির পথ ধরল।

    দিন গড়াতে লাগল, আর এক এক করে সবগুলো পরীক্ষাই শেষ হয়ে এলো। পরীক্ষার চাপ কমার সাথে সাথে রবিনের মনের ভেতরের শূন্যতাটা যেন আরও ঘনীভূত হতে শুরু করল।

    শেষ পরীক্ষার দিন, হল থেকে বের হয়ে রবিন বেশ কিছুক্ষণ স্কুলের চেনা গেটটার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার মন অবচেতনভাবেই আশা করছিল—আজ অন্তত শেষবারের মতো একটা দেখা হবে। কিন্তু না, সেদিন শৈলী আসেনি।

    বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে রবিন একা একাই বাড়ির পথ ধরল। সে জানত না—তাদের মাঝের এই সাময়িক দূরত্বটা কি কেবলই সময়ের খেলা, নাকি এটাই তাদের অসমাপ্ত গল্পের কোনো নতুন রোমাঞ্চকর মোড় !

    (গল্প চলমান থাকবে…)

    5
    3 Comments
    • মন ভালো করে দেওয়া এক মিষ্টি ও নস্টালজিক প্রেমের গল্প। চমৎকার লিখেছেন!

      • ধন্যবাদ আপনাকে সুন্দর মন্তব্যের জন্য। ইহা কাল্পনিক নয়, বাস্তব ঘটনা থেকে নেয়া… তবে কিভাবে যে গল্পের শেষ মিলাবো তা এখন বেভেই পাচ্ছি না।

    • খুব ভালো লাগলো। সুন্দর একটা প্রেমের গল্প। অনেক অনেক শুভেচ্ছা 🧚‍♀️

Skip to toolbar