Profile Photo

Md Nurnobi islam sumonOffline

  • mdnurnobiislamsumon
  • Profile picture of Md Nurnobi islam sumon

    Md Nurnobi islam sumon

    3 weeks, 2 days ago

    ভাঙা হোস্টেলের জানালা
    মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন

    ভাঙা হোস্টেলের জানালার কাচ এখন শুধুই শব্দমুক্ত ধুলো। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সেই জানালা ছিল একটি ছোট জগৎ। ছাত্রের একা থাকা, রাতের নিঃশ্বাস, এবং অদৃশ্য হাওয়ার গল্পে ভরা।

    সুমন প্রথমদিন হোস্টেলে এলে দেখেছিল কেমন অচেনা শান্তি। বর্ষার ঝড় এসে হোস্টেলের পুরনো দেয়াল গিলে খেয়েছে, আর জানালার একপাশে কাঁচ ফাটার রেখা নদীর মতো ছড়িয়ে আছে। সেই ফাটায় ঢুকা বাতাস কেঁপে ওঠে তার হৃদের সঙ্গে।

    প্রথম রাতেই সুমন বুঝতে পারে, হোস্টেল কেবল দেয়াল ও দরজা নয়। এখানে স্মৃতিগুলোই বসবাস করে। সে জানালার কাছে বসে এক ডায়েরি খুঁজে পায়। ধুলো ছুঁয়ে কিছু শব্দও উঠে আসে “যদি কেউ পড়ে, জানো আমি এখানে ছিলাম।”

    ডায়েরিটা একটি ছাত্রের লেখা। নাম নেই। কিন্তু হাতের দাগ, শব্দের ফাটল, তার দৃষ্টির আঘাত সবকিছু জানায় এটি একজনের জীবনের টুকরো। সে লিখেছে,

    “এই জানালার বাইরে আমি কখনো যাব না। সবাই বাইরে জীবনের দিকে ছুটে যায়, আমি শুধু এখানে তাকিয়ে থাকি। হয়তো কেউ বুঝবে, হয়তো কেউ চোখ রাখবে, আর আমি অদৃশ্য হব।”

    সুমন প্রথমে ভেবেছিল, এটি শুধু এক ভাঙা ছাত্রের ডায়েরি। কিন্তু পড়তে পড়তে সে বুঝতে পারে, প্রতিটি শব্দ তার নিজের হৃদয়ের ভাঙা অংশকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।

    প্রতিদিন বিকেলবেলা হোস্টেলের উঠোনে আড্ডা হয়। কেউ জানালার দিকে তাকায় না। কেবল সুমন। সে বুঝতে পারে যে, জানালার ফাঁক দিয়ে কখনো একজন ছাত্র চুপচাপ বাইরে তাকাতো। কখনো কাঁদতো, কখনো হাসতো। কেউ তা লক্ষ্য করত না।

    একদিন সন্ধ্যায়, বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ আসে। ধুলো ও গামছার মিশ্রণ। সুমন জানালার কাছে বসে থাকে। হঠাৎ সে দেখে, ডায়েরির পাতা যেন নিজেই উড়ে গেছে, বাতাসে। লেখা এসেছে “আমি চলে যাচ্ছি। জানালা হবে শুধু একটি স্মৃতি।”

    সুমন অবাক হয়ে যায়। কি করে এটি সম্ভব? ডায়েরি তার হাতেই আছে। কিন্তু শব্দগুলো যেন বাতাসে ভেসে গেছে।

    পরের দিন সুমন জানালার পাশে বসে নতুন চিঠি খুঁজে পায়। এইবার শব্দগুলো আরও তীব্র, আরও গভীর।

    “যখন কেউ শোনে না, তখন শব্দই আমার বন্ধু। জানালা আমার কান, বাতাস আমার আত্মা। তুমি যদি পড়ো, বুঝবে। কিন্তু তুমি থাকবে কেবল পাঠকের মতো, কখনো আমার মতো।”

    সুমন বুঝতে পারে, এই জানালা শুধু একটি কাঁচের ফাটাই নয়। এটি এক জীবনের কাহিনী, যেটা কোনো মানুষ পড়তে পারে না। সে ভেতরে ভেতরে কেঁদে ওঠে, জানালা যেন তার চোখের জলও চুষে নেয়।

    কয়েকদিন পর হোস্টেলে খবর আসে, যে ছাত্রটি অদৃশ্য। কেউ জানে না কোথায় গেল। কেউ খুঁজে পায়নি। কিন্তু জানালার ফাটায়, বাতাসে, ধুলোতে এখনও তার চিঠি লুকানো।

    সুমন জানালার পাশে বসে থাকে। বাতাসের শব্দ শুনে। ধুলোয় লেখা পড়ে। কিছু বলতে চায় না। শুধু বসে থাকে। কখনও কখনও মনে হয়, জানালার দিকে তাকিয়ে কেউ তাকে দেখে।

    হোস্টেল আরও পুরনো হয়ে গেছে। কিন্তু জানালার ফাঁক, বাতাসের শব্দ, ধুলো—সবকিছু অদৃশ্য ছাত্রটির গল্প বলতে থাকে। সুমন জানে, সে আর ফিরে আসবে না। তবে তার চিঠি, তার শব্দ, জানালার ফাটায় লুকানো সবকিছু আছে।

    সুমন নিজেও অদৃশ্য হয়ে যেতে চায়। জানালা দেখেছে তাকে। বাতাস শুনেছে। ধুলো লিখেছে। সে লিখে রাখে,

    “আমি জানালার পাশে বসে তার গল্প শুনি। সে নেই, তবে আছে। অদৃশ্য, কিন্তু জীবিত।”

    শরতের রাত আসে। হোস্টেলের উঠোনে বাতাস নেমে আসে। জানালার কাচের ফাটায় ঝলসানো আলো পড়ে। সুমন চুপচাপ বসে থাকে। বাতাস ভেঙে যায়, শব্দ ভেঙে যায়, কিন্তু চিঠি এখনও আছে।

    দিন যায়। কেউ জানালা লক্ষ্য করে না। কেউ ডায়েরি পড়ে না। কিন্তু সুমন জানে, প্রতিটি শব্দ তার হৃদয়ে মেলে। সে বুঝতে পারে, এই জানালা শুধু স্মৃতি নয়, এটি হলো একটি ছাত্রের অদৃশ্যতার সাক্ষ্য।

    কয়েক সপ্তাহ পর হোস্টেলের দরজা বন্ধ থাকে। ধুলো জমে। কিন্তু জানালার ফাটায়, বাতাসের হাওয়ায়, অদৃশ্য ছাত্রের চিঠি লুকানো থাকে।

    সুমন প্রতিদিন জানালার পাশে বসে। পড়ে, শব্দ শোনে। ধুলো ছুঁয়ে অনুভব করে। সে জানে, এই জানালা আর কেবল জানালা নয়। এটি একটি জীবনের প্রতিচ্ছবি, একটি অদৃশ্যতার চিঠি, একটি গল্প যা কেউ লিখেছে, কেউ পড়েছে, কিন্তু কেউ কখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

    5
    9 Comments
Skip to toolbar