Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    1 week ago

    ​জ্যৈষ্ঠের দ্বিপ্রহর ও একটি গোপন তলোয়ার

    ​জ্যৈষ্ঠ মাস। আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছে। দুপুরের এই কাঠফাটা রোদে খোলা আকাশের নিচে হাঁটা শুধু কষ্টকরই নয়, রীতিমতো বিপজ্জনক। মাথার ওপর সূর্যটা ঠিক যেন একটা জ্বলন্ত কড়াইয়ের মতো ঝুলে আছে। বাতাসে কোনো আর্দ্রতা নেই, শুধু তপ্ত লু-হাওয়া। ঠিক এই অসহ্য মুহূর্তেই চৈতীর ফোনটা এলো।

    ​ফোনের ওপাশ থেকে চৈতীর উত্তেজিত গলা, “তক্ষুনি বের হও। কাঞ্চনপুর চৌধুরী বাড়ির পিছনের পুরান দীঘির পাড়ে আসতে হবে। দারুণ একটা ব্যাপার আছে!”
    ​আমি মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। চৈতীর এই এক বাতিক—অ্যান্টিক বা প্রাচীন জিনিসের প্রতি ওর অন্ধ ঝোঁক। আসলে, প্রাচীন জিনিসের প্রতি আমার অনুরাগ, ঘরভর্তি আমার দুর্লভ সব সংগ্রহ আর সেগুলো দিয়ে নান্দনিকভাবে ঘর সাজানো দেখে চৈতী মনে মনে ভীষণ হিংসা করে। মুখে কোনোদিন স্বীকার করে না, কিন্তু আমি ওর চোখের কোণে সেই পরশ্রীকাতরতার চিলতে আলো স্পষ্ট দেখতে পাই। কোথাও কোনো পুরোনো ভাঙা তামা-কাঁসার টুকরো পেলেই ও সেটা নিয়ে আমার কাছে ছুটে আসবে। তারপর শুরু হবে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা—এটা কত বছরের পুরোনো, কে ব্যবহার করেছিল, এর আর্টিস্টিক দিক কেমন, ঐতিহাসিক গুরুত্ব কতখানি! যেন আমাকে টেক্কা দেওয়াই ওর একমাত্র লক্ষ্য।

    ​আজ না গেলে অন্তত এক মাস ওর খোঁটা শুনতে হবে। অগত্যা, এই গনগনে রোদ মাথায় নিয়েই রওনা হলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাঞ্চনপুর চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে।

    ​চৌধুরী বাড়ির পিছনের পুরান দীঘির পাড়ে যখন পৌঁছালাম, তখন চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় থমথম করছে। বিশাল প্রাচীন দীঘির জল কালো, পাড়ের বড় বড় বটগাছগুলো দুপুরের রোদেও একধরণের রহস্যময় ছায়া তৈরি করে রেখেছে। স্থানটা এমনিতেই একটু গা ছমছমে।
    ​সেখানে গিয়ে দেখলাম চৈতী একা নয়। ওর সাথে দাঁড়িয়ে আছে একজন বিদেশি নাগরিক, কাঁধে দামি ক্যামেরা। আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত দর্শন মানুষ। জট পড়া চুল, মুখ ভর্তি উষ্কখুষ্ক দাড়ি, আর এই তীব্র গরমেও তার গায়ে জড়িয়ে আছে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা একটা পুরোনো কোট। মানুষটার পুরো অবয়বে এক অপরিচ্ছন্ন, রহস্যময় আবরণ।

    ​সেই জটধারী লোকটির পায়ের কাছে চটের বস্তার ওপর সাজানো কিছু জিনিস। চৈতী তীব্র চোখ মেলে জিনিসগুলো দেখছিল। বিদেশি লোকটি পকেট থেকে ডলারের বান্ডিল বের করে লোকটার হাতে দিল। চৈতী ঝটপট কিনে নিল কয়েকটা প্রাচীন ফুলদানি, দুটি প্লেট, পাঁচটি প্রাচীন তামার পয়সা এবং কাপড়ে জড়ানো একটি ভারী তলোয়ার।

    ​আমার কৌতুহল হচ্ছিল। আমি একটু এগিয়ে দেখতে চাইলাম। কিন্তু চৈতী ঝট করে তলোয়ার আর প্লেটগুলো ব্যাগে পুরে ফেলল। আমাকে দেখালোই না! ওর চোখেমুখে তখন একাধারে এক তীব্র জয়ের আনন্দ এবং গোপন চাতুরী। যেন ও এমন কিছু পেয়ে গেছে, যা আমার সমস্ত সংগ্রহকে এক নিমেষে মলিন করে দেবে।
    ​আমরা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ওখান থেকে ফিরে আসলাম।

    ​মধ্যরাতে তখন জ্যৈষ্ঠের কালবৈশাখীর মেঘ জমছিল আকাশে। হঠাৎ দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা।
    ​কপাট খুলতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল একদল পুলিশ। মুহূর্তের মধ্যে আমার সাজানো গোছানো শান্ত ঘরটা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। পুলিশের ইন্সপেক্টর কর্কশ গলায় বললেন, “আমাদের কাছে নিশ্চিত খবর আছে। আপনি ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির ব্যবহার্য ঐতিহাসিক জিনিসপত্র অবৈধভাবে চোরাচালান করে ঘরে লুকিয়ে রেখেছেন। এগুলো রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, জাদুঘরে যাবে। আপনার কাছে থাকার কোনো অধিকার নেই।”
    ​আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম! বখতিয়ার খলজির তলোয়ার? জিনিসগুলো তো চৈতী কিনেছে! তবে কি…? আমার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। চৈতী আমাকে হিংসা করত, কিন্তু সেই হিংসা কি এতদূর গড়াতে পারে যে সে নিজে জিনিস কিনে পুলিশকে আমার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দিয়েছে? আমাকে ছোট করতে, আমার অহংকার ভাঙতে এই চাল?
    ​পুলিশ আমার সারা ঘর তচনচ করল। আলমারি, বুকশেলফ, খাটের তলা—সবকিছু খুঁজে ওলটপালট করে ফেলল। আমার এত বছরের ভালোবাসার সংগ্রহগুলো মেঝেময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রইল। কিন্তু দীর্ঘ এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেও তারা কিচ্ছু পেল না। পাবে কী করে? জিনিসগুলো তো আমার কাছে আসেইনি, ওগুলো তো রয়েছে চৈতীর জিম্মায়!

    ​পুলিশ দলবল নিয়ে ক্ষুব্ধ মুখে ফিরে গেল। ঝড়ের হাওয়া এসে ঘরের খোলা জানালা দিয়ে আমার ছড়িয়ে থাকা বইয়ের পাতাগুলো উল্টে দিতে লাগল। আমি মেঝের ওপর বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। চৈতী হয়তো ভেবেছিল পুলিশকে খবর দিয়ে আমাকে চোর প্রমাণ করবে, কিন্তু নিজের অতি চালাকির কারণে ও নিজেই এখন ঐতিহাসিক চোরাচালানের খাঁচায় বন্দি হওয়ার অপেক্ষায়।

    ​বাইরে তখন জ্যৈষ্ঠের প্রথম বৃষ্টি নামার শব্দ। আমার মনে হলো, আমার বুকের ভেতরের সমস্ত সংশয় আর তপ্ত রোদকে ধুয়ে দিতেই এই বৃষ্টির আগমন।

Skip to toolbar