-
ঢেউয়ের বুকে নোঙর
নোনা বাতাস আর সমুদ্রের গর্জন সজিব ও তারেকদের মজ্জায় মিশে ছিল। পটুয়াখালীর এক চিলতে উপকূলীয় গ্রামে যখন সাগরের জল উপচে উঠত, তখন বাবা বলতেন, “মানুষের মনটাও সাগরের মতো বড় হতে হয় রে বাবা, তবেই টিকে থাকা যায়।”
সংসারটা ছিল বেশ বড়। সজিব আর তারেক—দুই ভাই, আর তাদের পাঁচ বোন—আমিনা, ফাতিমা, হালিমা, কুলসুম ও হাফসা। বাইরে থেকে ভাই-বোনদের হাসিমুখ দেখা গেলেও, এর পেছনে ছিল মা-বাবার এক অদৃশ্য ও অবিরাম যুদ্ধ। বছরের পর বছর ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের সাথে লড়াই করে বাবার শরীরটা ভেঙে পড়েছিল। বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি যখন নোনা পানিতে তলিয়ে বন্ধ্যা হয়ে গেল, তখন কৃষিজীবী বাবা রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে যান। সংসারের হাল ধরে রাখতে মা নিজের জমানো শেষ সম্বলটুকু, এমনকি গলার হারটিও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সন্তানদের মুখে দুবেলা অন্ন তুলে দেওয়া এবং তাদের পড়াশোনা সচল রাখাই ছিল সেই মা-বাবার জীবনের একমাত্র ব্রত।
পড়ালেখার খাতিরে আর স্রেফ বেঁচে থাকার তাগিতে পরিবারটিকে বারবার বাসস্থান বদলাতে হয়েছে। এই স্থান পরিবর্তন মোটেও সহজ ছিল না; এটি ছিল একেকটি নির্মম উপড়ানোর গল্প। গ্রাম থেকে প্রথমে উপজেলা শহর, তারপর জেলা শহর, আর সবশেষে ঢাকার এক ঘিঞ্জি উপশহর। প্রতিবার নতুন জায়গায় যাওয়ার অর্থ ছিল—পুরোনো চেনা পরিবেশ, শৈশবের খেলার মাঠ আর বন্ধুদের এক নিমেষে হারিয়ে ফেলা। প্রতিবার নতুন করে ঘর ভাড়া করা, নতুন স্কুলে সন্তানদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিক যন্ত্রণা এবং একেকটি নতুন কর্মসংস্থানে বাবার শূন্য থেকে শুরু করার লড়াই পরিবারটিকে ভেতর থেকে পরিপক্ক করে তুলেছিল। সজিব ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে একটা সংস্থায় চাকরি পেয়েছে, আর তারেক মন দিয়েছে নিজেদের ছোট উদ্যোগে। বোনেরাও লড়াকু মা-বাবাকে দেখে বড় হয়েছে, তাই তারাও নিজেদের পড়াশোনায় সর্বোচ্চ মনোযোগী ছিল।
জীবনের নতুন রঙ
স্থান পরিবর্তনের এই দীর্ঘ মিছিলে বড় বোন আমিনার বিয়ে হয়ে গেছে। মেজো বোন ফাতিমা তখন ঢাকার এক কলেজে অনার্সে পড়ে। প্রতিদিন বাসে করে কলেজে যাওয়ার পথে একটি ছেলের সাথে তার প্রায়ই দেখা হতো। ছেলেটির নাম নিয়াজ—শান্ত, চশমা পরা, আর চোখে একরাশ স্বপ্ন।নিয়াজ লক্ষ্য করত, বাসের ভিড়েও ফাতিমা কেমন যেন এক অদ্ভুত আত্মমর্যাদা আর স্নিগ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে বাস থমকে দাঁড়াল। ফাতিমার ছাতাটা বাতাসে উল্টে যাওয়ার উপক্রম হতেই নিয়াজ তার নিজের ছাতাটা এগিয়ে দিল।
“নিন, এটা ধরুন। উপকূলের মেয়েদের ঝড় সামলানোর অভ্যাস থাকতে পারে, কিন্তু ঢাকার এই নোংরা বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর আসবে।”
ফাতিমা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। নিয়াজ মুকছি হেসে বলল, “আমি আপনার ভাইয়ের বন্ধু। সজিবের মুখে আপনাদের লড়াকু জীবনের গল্প অনেক শুনেছি। আজ সামনাসামনি দেখার সুযোগ হলো।”
সেই বৃষ্টির দিন থেকেই তাদের নীরব বোঝাপড়ার শুরু। নিয়াজ প্রায়ই সজিবদের বাসায় আসত। উপকূলের এই লড়াকু পরিবারের একতা, ভাই-বোনদের গভীর ভালোবাসা তাকে মুগ্ধ করত। তবে তারা দুজনেই জানত, ছাত্রাবস্থায় প্রেম মানেই কেবল আবেগ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব। ফাতিমা তার মা-বাবার কষ্টের কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলত না, তাই পড়াশোনায় সে ছিল অবিচল।
দায়িত্বশীল সম্মতি
একদিন বিকেলে সজিব আর তারেক ড্রয়িংরুমে বসে অফিসের কাজ করছিল। ফাতিমা তার ঘরে বসে নিয়াজের দেওয়া একটি চিঠি মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল। হঠাৎ ভাইদের ড্রয়িংরুম থেকে চায়ের কথা মনে করিয়ে দিতেই সে কিছুটা তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ে। রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে ড্রয়িংরুমের টেবিলে রাখার সময়, ফাতিমার খেয়ালই ছিল না যে চিঠিখানা তার কাপড়ের ভাঁজে আটকে ড্রয়িংরুমের টেবিলটিতেই পড়ে গেছে।ফাতিমা চলে যাওয়ার পর সজিবের চোখে কাগজটা পড়ে। কৌতূহলবশত চিঠিটা খোলে সে। চিঠিতে কোনো চপলতা ছিল না, ছিল এক বুক সততা ও দায়বদ্ধতা:
“ফাতিমা, সাগরের ঢেউ যেমন তীরে এসে স্থিতি খোঁজে, আমিও তোমার ওই শান্ত চোখের মাঝে আমার জীবনটা সাজাতে চাই। আমি জানি তুমি এখনো শিক্ষার্থী, আমিও কেবল ক্যারিয়ার শুরু করছি। আমি সজিব ভাইকে সব জানাতে চাই, কারণ আমি কোনো লুকোচুরি করে তোমাদের লড়াকু মা-বাবার সম্মান ক্ষুণ্ন করতে চাই না।”
সজিব চিঠিটা পড়ে তারেকের দিকে তাকাল। ছাত্রাবস্থায় এমন পরিপক্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ তাদের মন ছুঁয়ে গেল। সজিব নিজেই নিয়াজকে ফোন করে পরদিন সন্ধ্যায় তাদের বাসায় আসার আমন্ত্রণ জানাল।
পরদিন সন্ধ্যায় নিয়াজ যখন ওদের বাসায় এল, পরিবেশটা একটু গম্ভীর ছিল। সজিব নিয়াজকে ডেকে বলল, “নিয়াজ, তুমি আমাদের জীবনযাত্রা দেখেছ। আমাদের মা-বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের এই পর্যন্ত এনেছেন। ফাতিমা এখনো পড়াশোনা করছে। ছাত্রাবস্থায় আবেগের বশে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না।”
নিয়াজ সোজা সজিবের চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল, “আমি ফাতিমার পড়াশোনা বা তার পারিবারিক দায়িত্বে কখনো বাধা হব না, ভাইয়া। আমি নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, আপনাদের মা-বাবার দোয়া নিয়ে তবেই ফাতিমাকে আমার ঘরে তুলতে চাই। তার আগে নয়।”
নিয়াজের এই পরিণত ও সৎ কথা শুনে সজিবের মনের সব সংশয় কেটে গেল। ছাত্রাবস্থায় সস্তা প্রেমের আনন্দের চেয়ে এই সম্পর্কে দায়িত্ববোধটাই ছিল প্রধান। সজিব ফাতিমাকে ডেকে মৃদু হেসে বলল, “আমাদের পক্ষ থেকে অভিভাবকসুলভ সম্মতি দেওয়া হলো। তবে মিষ্টিমুখ এখনই নয়; আগে দুজনে পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াও, সেদিন ধুমধাম করে মিষ্টি খাওয়া যাবে।”
আড়াল থেকে আমিনা, হালিমা আর ফাতিমা সব শুনছিল। ফাতিমার চোখ দুটো কৃতজ্ঞতায় ভিজে উঠল। বারবার বাসস্থান আর কর্মসংস্থান বদলানো এই পরিবারটি সেদিন বুঝতে পারল—স্থান যেখানেই হোক না কেন, ভেতরের সততা আর মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা অটুট থাকলে জীবনের যেকোনো দুর্যোগই সুন্দর এক পরিণতিতে রূপ নেয়।
3 Comments
Friends
ডা.এম.এইচ.রহমান খান
@drmhrahmankhan
মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি
@wuqbabinrafigmail-com
মোঃ আবু সাঈদ বিশ্বাস
@mdabusayeedbiswas
মো. আবু মোহাদ্দেস
@mohaddesh1967
যুবক অনার্য
@jajan
এফ. আর. মাহদী
@frmahedi
নতুন করে শুরু
@amrin-shimu
JB Ayon
@jbayon
ফারহান সীমান্ত
@melbetkhan



ঝড় সয়েও অটুট ভিত…..🤍